#পাথরের_মানুষ

পর্ব: ০৩+শেষ পর্ব

#Choto_Dairy_01

উইলের কাগজটা আমার সামনে রাখা ছিল।

কিন্তু আমি সেটার দিকে তাকাতে পারছিলাম না।

কারণ আমার হাত কাঁপছিল।

একজন মা হিসেবে আমি এখনও বিশ্বাস করতে চাইছিলাম—কেউ এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে না।

কেউ নিজের নাতির মৃত্যুর পরিকল্পনা করতে পারে না।

কিন্তু কাগজের কালো অক্ষরগুলো অন্য কথা বলছিল।

অফিসার রহমান ধীরে ধীরে ফাইলটা খুললেন।

"ম্যাডাম, নিজেকে শক্ত করুন।"

আমি গভীর শ্বাস নিলাম।

তারপর কাগজটার দিকে তাকালাম।

উইল অনুযায়ী, আমার মৃত্যুর পর আমার সম্পত্তির প্রধান উত্তরাধিকারী ছিল রায়হান।

এটা স্বাভাবিক।

কিন্তু পরের অংশটা স্বাভাবিক ছিল না।

সেখানে লেখা—

"উত্তরাধিকারী রায়হান অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে সম্পূর্ণ সম্পত্তি তত্ত্বাবধান ও মালিকানার অধিকার পাবেন তানভীর শেঠী।"

আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

আরও ভয়ংকর ছিল নিচের হাতের লেখা নোটটা।

সেটা কোনো আইনজীবীর লেখা ছিল না।

সেটা ছিল কানিজ ফাতেমার নিজের হাতের লেখা।

"বাচ্চাটা থাকলে সব ঝামেলা। না থাকলে সব সহজ।"

ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

অফিসার রহমান ধীরে বললেন,

"হ্যান্ডরাইটিং বিশেষজ্ঞ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে লেখাটা তারই।"

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

আমার কোলের সেই ছোট্ট শিশুটার মুখ ভেসে উঠল।

যে কখনো হাঁটতে শেখেনি।

কথা বলতে শেখেনি।

কাউকে কষ্টও দেয়নি।

তবু কেউ তাকে নিজের স্বার্থের শত্রু ভেবেছিল।

ঠিক তখন দরজা খুলে একজন কনস্টেবল ভেতরে এল।

"স্যার, আদালতের শুনানির তারিখ ঠিক হয়েছে।"

অফিসার মাথা নেড়ে বললেন,

"আর সাক্ষী?"

কনস্টেবল একটু থেমে বলল,

"একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী পাওয়া গেছে।"

আমি তাকালাম।

"কে?"

কনস্টেবল আমার দিকে তাকিয়ে বলল,

"মালদ্বীপের সেই রিসোর্টের একজন কর্মচারী।"

আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল।

"সে কী জানে?"

কনস্টেবল বলল,

"তানভীর এবং কানিজ ফাতেমা সেখানে এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা রিসোর্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে রেকর্ড হয়ে গেছে।"

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

এক সপ্তাহ পরে।

আদালত কক্ষ মানুষে ভর্তি।

সাংবাদিক।

আইনজীবী।

পুলিশ।

কৌতূহলী দর্শক।

আর আমি।

সাদা শাড়ি পরে কাঠগড়ার দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম।

তানভীরকে দেখে আমি প্রায় চিনতেই পারলাম না।

মাত্র কয়েক দিনে তার মুখ শুকিয়ে গেছে।

চোখের নিচে কালি।

চুল এলোমেলো।

কানিজ ফাতেমার অবস্থাও একই।

কিন্তু তাদের চোখে এখনও একটা আশা ছিল।

হয়তো তারা ভেবেছিল প্রমাণ যথেষ্ট নয়।

হয়তো তারা ভেবেছিল টাকা দিয়ে সব সামলে ফেলবে।

বিচারক কক্ষে প্রবেশ করলেন।

শুনানি শুরু হলো।

একের পর এক প্রমাণ জমা দেওয়া হলো।

মেডিকেল রিপোর্ট।

ব্যাংক নথি।

ফোন রেকর্ড।

অডিও রেকর্ডিং।

তারপর ডাকা হলো বিদেশি সাক্ষীকে।

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি আদালতে যুক্ত হলেন।

রিসোর্টের নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

তিনি শপথ নিয়ে বললেন,

"আমি যা বলব, সত্য বলব।"

প্রসিকিউটর জিজ্ঞেস করলেন,

"আপনি কী শুনেছিলেন?"

লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"তাদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।"

তানভীরের মুখের রঙ বদলে গেল।

লোকটি বলতে লাগল—

"মহিলা বলেছিলেন— 'বাচ্চাটার ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবো না। এখন সব আমাদের নিয়ন্ত্রণে।'"

আদালত কক্ষে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।

প্রসিকিউটর আবার জিজ্ঞেস করলেন,

"তারপর?"

লোকটি উত্তর দিল,

"পুরুষটি জিজ্ঞেস করেছিল— 'যদি ইশরাত সন্দেহ করে?'"

আমার বুক ধক করে উঠল।

তারপর সাক্ষী বললেন—

"মহিলা হেসে বলেছিলেন— 'একজন ভেঙে পড়া মায়ের কথা কেউ বিশ্বাস করে না।'"

পুরো আদালত নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

তানভীর মাথা নিচু করে ফেলল।

প্রথমবারের মতো।

ঠিক তখন প্রসিকিউটর বিচারকের সামনে আরেকটা খাম রাখলেন।

"মহামান্য, আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।"

বিচারক ভ্রু কুঁচকে বললেন,

"কি আছে এতে?"

প্রসিকিউটর ধীরে ধীরে বললেন—

"একটি ডিএনএ রিপোর্ট।"

ঘরের সবাই অবাক হয়ে গেল।

আমি পর্যন্ত।

ডিএনএ রিপোর্ট?

এটার সঙ্গে এখন কী সম্পর্ক?

প্রসিকিউটর ফাইল খুললেন।

তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে তানভীর হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠল।

"এই রিপোর্ট অনুযায়ী..."

তিনি কয়েক সেকেন্ড থামলেন।

"...রায়হান সম্পর্কে এতদিন যে সত্য সবাই জানত, সেটি সম্পূর্ণ সত্য নয়।"

তানভীর চিৎকার করে উঠল—

"না! এটা আদালতে উপস্থাপন করা যাবে না!"

বিচারক কঠোর কণ্ঠে বললেন,

"বসুন, মিস্টার তানভীর।"

আমার হাত কাঁপছিল।

আমি বুঝতে পারছিলাম না কী হতে যাচ্ছে।

শুধু মনে হচ্ছিল—

আমার সন্তানের মৃত্যু নিয়ে লুকানো সত্য এখনও শেষ হয়নি।

আরও বড় কিছু সামনে আসছে।


আদালত কক্ষে তখন পিনপতন নীরবতা।

সবাই ডিএনএ রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে।

তানভীরের মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট।

তার হাত কাঁপছে।

প্রসিকিউটর ধীরে ধীরে রিপোর্টটা বিচারকের হাতে দিলেন।

তারপর বললেন,

"মহামান্য, এই রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে যে রায়হান জনাব তানভীর শেঠীর জৈবিক সন্তানই ছিল।"

পুরো কক্ষ অবাক হয়ে গেল।

আমিও।

কারণ এতক্ষণ সবাই ভেবেছিল হয়তো অন্য কোনো রহস্য বের হবে।

কিন্তু আসল ধাক্কা তখনও বাকি ছিল।

প্রসিকিউটর আবার বললেন,

"তবে এই রিপোর্টের সঙ্গে আরও একটি নথি সংযুক্ত আছে।"

তিনি আরেকটি ফাইল খুললেন।

"বিয়ের এক বছর আগে জনাব তানভীর গোপনে একটি চিকিৎসা পরীক্ষা করিয়েছিলেন।"

তানভীর চোখ বন্ধ করে ফেলল।

যেন সে আগেই জানত কী আসছে।

প্রসিকিউটর ফাইল থেকে পড়ে শোনালেন—

তানভীরের প্রজননক্ষমতায় গুরুতর সমস্যা ছিল। স্বাভাবিকভাবে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

ঘরে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।

আমি হতবাক হয়ে বসে রইলাম।

প্রসিকিউটর বললেন,

"এই রিপোর্ট তিনি নিজের মা ছাড়া আর কাউকে দেখাননি। এমনকি স্ত্রীকেও না।"

কানিজ ফাতেমার মুখ সাদা হয়ে গেল।

হঠাৎ সবকিছু পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল।

সন্তান না হওয়ার জন্য বছরের পর বছর আমাকে দোষ দেওয়া।

আমাকে অপয়া বলা।

চিকিৎসকের কাছে যেতে না দেওয়া।

সবকিছুর পেছনে ছিল একটা ভয়—

সত্যটা প্রকাশ পেয়ে যাবে।

তানভীর মাথা নিচু করে কাঁদতে শুরু করল।

কিন্তু আদালতে কেউ তার জন্য সহানুভূতি অনুভব করল না।

কারণ এরপর প্রসিকিউটর যে কথাটা বললেন, সেটাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

"যখন রায়হানের জন্ম হয়, তখন জনাব তানভীর বুঝতে পারেন যে চিকিৎসকদের পূর্বাভাস ভুলও হতে পারে। কিন্তু তখন তিনি এবং তার মা ইতোমধ্যেই সম্পত্তি দখলের পরিকল্পনা অনেক দূর এগিয়ে ফেলেছিলেন।"

আদালতে একের পর এক প্রমাণ উপস্থাপন করা হলো।

গোপন ফোনকল।

ব্যাংক লেনদেন।

নার্সকে ঘুষ দেওয়ার তথ্য।

মেডিকেল রিপোর্ট গোপন করা।

জরুরি চিকিৎসা বিলম্বিত করা।

সবকিছু।

বিচারক দীর্ঘ সময় নথিপত্র পর্যবেক্ষণ করলেন।

তারপর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করলেন।

এক মাস পরে।

আদালত আবার মানুষে ভর্তি।

আমি এবারও সাদা শাড়ি পরে এসেছি।

তবে আজকের আমি আগের সেই ভেঙে পড়া মানুষ নই।

আজ আমি শুধু একজন মা।

যে তার সন্তানের জন্য ন্যায়বিচার চাইতে এসেছে।

বিচারক রায় পড়া শুরু করলেন।

তার কণ্ঠস্বর দৃঢ়।

"আদালতের কাছে প্রমাণিত হয়েছে যে অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুর চিকিৎসা বিলম্বিত করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন এবং আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে গুরুতর অবহেলা করেছেন।"

তানভীর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

কানিজ ফাতেমা কাঁদছিলেন।

কিন্তু তাদের কান্না আর কাউকে স্পর্শ করছিল না।

বিচারক শেষবারের মতো বললেন,

"আদালত অভিযুক্ত তানভীর শেঠী এবং কানিজ ফাতেমাকে দোষী সাব্যস্ত করছে।"

হাতুড়ির শব্দ পড়ল।

একটা অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো।

ছয় মাস পরে।

আমি প্রথমবার রায়হানের কবরের সামনে একা দাঁড়িয়ে ছিলাম।

চারপাশে নীরবতা।

হালকা বাতাস।

কবরের পাশে ছোট্ট সাদা ফুল ফুটে আছে।

আমি নিচু হয়ে ফুলগুলো ছুঁয়ে দিলাম।

তারপর আস্তে করে বললাম,

"মা কথা রেখেছে, বাবা।"

আমার চোখে পানি এসেছিল।

কিন্তু সেটা আর অসহায়তার কান্না ছিল না।

সেটা ছিল ভালোবাসার।

আমি ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করলাম।

ভেতরে ছিল নতুন একটি প্রকল্পের নকশা।

"রায়হান শিশু সহায়তা ফাউন্ডেশন"

যেসব বাবা-মায়ের অর্থ বা সহায়তার অভাবে শিশু চিকিৎসা হয় না, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমি এই প্রতিষ্ঠান শুরু করেছি।

রায়হান পৃথিবীতে মাত্র তিন দিন ছিল।

কিন্তু তার নাম বেঁচে থাকবে হাজারো শিশুর হাসিতে।

আমি আকাশের দিকে তাকালাম।

অনেকদিন পর মনে হলো বুকের ভেতরের পাথরটা একটু হালকা হয়েছে।

কিছু ক্ষত কখনো পুরোপুরি সারে না।

কিন্তু মানুষ সেই ক্ষত নিয়েও বাঁচতে শেখে।

আর কখনো কখনো—

নিজের সবচেয়ে বড় শোককে অন্য কারও জীবনের আলো বানিয়ে ফেলে।

দূরে আজানের ধ্বনি ভেসে এলো।

আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।

তারপর শেষবারের মতো কবরটার দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

"ভালো থেকো, আমার কলিজার টুকরো।"

বাতাসে সাদা ফুলগুলো দুলে উঠল।

আর সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো—

রায়হান যেন ঠিকই শুনতে পেয়েছে।

সমাপ্ত। ❤️


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url