#পাথরের_মানুষ
পর্ব: ০২
#Choto_Dairy_01
তানভীরের হাত থেকে শপিং ব্যাগগুলো ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেল।
তার ঠোঁট কাঁপছিল।
"না... না... এটা সত্যি না।"
সে টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট হাসপাতালের ব্রেসলেটটা তুলে নিল।
সেখানে স্পষ্ট লেখা—
রায়হান তানভীর শেঠী।
ভর্তি তারিখ।
আর মৃত্যুর সময়।
তানভীরের চোখ দুটো বড় হয়ে গেল।
"ইশরাত... তুমি মিথ্যা বলছ।"
আমি স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার ভেতরের সমস্ত কান্না যেন পাঁচ দিন আগেই শেষ হয়ে গেছে।
এখন শুধু একটা হিমশীতল শূন্যতা।
"মিথ্যা?"
আমার কণ্ঠস্বর শুনে ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল।
"যে রাতে আমি তোমাকে ফোন করেছিলাম, মনে আছে?"
তানভীর কিছু বলল না।
আমি মোবাইল বের করে একটা অডিও চালু করলাম।
ঘরে ভেসে উঠল তার নিজের কণ্ঠস্বর—
"টাকা আটকানোর জন্য এখন বাচ্চার বাহানা করছ?"
তারপর সেই অট্টহাসি।
আর তারপর কল কেটে যাওয়ার শব্দ।
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কানিজ ফাতেমার মুখের রঙ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
"এই রেকর্ডিং অবৈধ!" তিনি চিৎকার করে উঠলেন।
আমার বাবার আইনজীবী শান্ত গলায় বললেন,
"অবৈধ কি বৈধ, সেটা আদালত ঠিক করবে।"
এরপর তিনি আরেকটা ফাইল খুললেন।
"হাসপাতালের রিপোর্ট অনুযায়ী, শিশুটির জন্মগত হার্ট ডিফেক্ট ছিল। দ্রুত চিকিৎসা পেলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত বেশি।"
তানভীর যেন বসার জায়গা খুঁজে পেল না।
সে একবার আমার দিকে।
একবার রিপোর্টের দিকে তাকাচ্ছিল।
"না... ডাক্তাররা ভুল করছে..."
চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডাক্তার এবার কথা বললেন।
"আমি সেই রাতের দায়িত্বে ছিলাম।"
তিনি ফাইল থেকে একটা কাগজ বের করলেন।
"বাচ্চাটিকে হাসপাতালে আনার সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরি হয়ে গিয়েছিল।"
কানিজ ফাতেমা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,
"সব দোষ ওই মেয়ের!"
পুলিশ অফিসারদের একজন সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
"ম্যাডাম, আপনার প্রতিটি কথা রেকর্ড করা হচ্ছে।"
কানিজ ফাতেমা থেমে গেলেন।
তানভীর এবার আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
"ইশরাত..."
আমি তার মুখের দিকে তাকালাম।
এই প্রথম আমি তার চোখে ভয় দেখলাম।
সত্যিকারের ভয়।
"আমি জানতাম না..."
আমার ঠোঁটে একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠল।
"তুমি জানতে চাওনি।"
কথাটা শুনে সে মাথা নিচু করল।
তার কাঁধ কাঁপছিল।
"একবার... শুধু একবার আমাকে ক্ষমা করো।"
আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।
তারপর ঘরের কোণে রাখা ছোট্ট একটা সাদা বাক্সের দিকে এগিয়ে গেলাম।
বাক্সটার ওপর নীল ফিতের একটা টুকরো বাঁধা ছিল।
তানভীর বাক্সটা দেখে জমে গেল।
কারণ সে বুঝে গেছে—
ওটার ভেতরে কী আছে।
আমি বাক্সটা তার হাতে তুলে দিলাম।
"এটা তোমার ছেলে তোমার জন্য রেখে গেছে।"
তানভীর কাঁপতে কাঁপতে ঢাকনা খুলল।
ভেতরে ছিল—
এক জোড়া ছোট্ট মোজা।
একটা নীল রঙের খেলনা হাতি।
আর হাসপাতালের শেষ রিপোর্ট।
রিপোর্টের নিচে নার্সের হাতে লেখা একটা লাইন—
"মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শিশুটি মায়ের বুকের ওপরেই ছিল।"
তানভীর হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
কিন্তু আমার চোখে আর কোনো পানি ছিল না।
কারণ কিছু মৃত্যু শুধু মানুষকে ভাঙে না—
তাকে পাথরও বানিয়ে দেয়।
ঠিক তখনই পুলিশ অফিসার সামনে এগিয়ে এলেন।
আর বললেন—
"জনাব তানভীর শেঠী, আপনার এবং আপনার মায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে।"
কানিজ ফাতেমা চিৎকার করে উঠলেন।
"আমার ছেলে কিছু করেনি!"
অফিসার শান্ত গলায় বললেন—
"সেটা আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।"
তানভীরের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।
আর আমি জানালার বাইরে তাকালাম।
বৃষ্টিটা আবার শুরু হয়েছে।
ঠিক সেই রাতের মতো।
কিন্তু এবার আমার কোলে রায়হান নেই।
আর আমার ভেতরে বেঁচে থাকা শেষ কোমল মানুষটাও নেই...
পুলিশ যখন তানভীর আর কানিজ ফাতেমাকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ কানিজ ফাতেমা আমার দিকে আঙুল তুলে চিৎকার করে উঠলেন—
"সব তোর সাজানো নাটক! তুই আমার ছেলেকে আমার বিরুদ্ধে লাগাতে চাস!"
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
উনার চিৎকার যেন অনেক দূরের কোনো শব্দের মতো লাগছিল।
কারণ আমার কানে তখনো বাজছিল রায়হানের শেষ ভাঙা শ্বাসের শব্দ।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর পুরো ফ্ল্যাট নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
একসময় সবাই চলে গেলেন।
আইনজীবী।
পুলিশ।
প্রতিবেশীরা।
শুধু আমি আর আমার বাবা রয়ে গেলাম।
আব্বু ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসলেন।
তারপর প্রথমবারের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন।
"মা, আমি দেরি করে ফেলেছি।"
আমি মাথা নাড়লাম।
"না আব্বু। দেরি আপনি করেননি।"
দেরি করেছিল অন্য কেউ।
যে মানুষটা বাবা হওয়ার যোগ্য ছিল না।
সেই রাতেই আইনজীবী আঙ্কেল আমাকে একটা ফাইল দিলেন।
ভেতরে ছিল কিছু ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
কিছু সম্পত্তির কাগজ।
আর কয়েকটা ই-মেইলের প্রিন্ট কপি।
প্রথম পাতাটা খুলতেই আমার বুক কেঁপে উঠল।
তানভীর গত তিন বছর ধরে আমার অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত টাকা সরিয়েছে।
একবার নয়।
দুইবার নয়।
মোট প্রায় তিন কোটি টাকা।
আমি নির্বাক হয়ে গেলাম।
আমার নিজের ব্যবসার লাভের টাকা।
আমার বাবার দেওয়া বিনিয়োগের টাকা।
সবকিছু।
আরও ভয়ংকর বিষয় ছিল পরের পাতায়।
সেখানে দেখা গেল—
তানভীর নিজের নামে কিছুই রাখেনি।
সব সম্পত্তি তার মা কানিজ ফাতেমার নামে।
বাড়ি।
জমি।
শেয়ার।
সব।
আইনজীবী আঙ্কেল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"তোমার স্বামী অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল।"
"কিসের জন্য?"
তিনি আমার চোখের দিকে তাকালেন।
"তোমাকে সর্বস্বান্ত করার জন্য।"
আমার হাত কাঁপতে লাগল।
"কিন্তু কেন?"
উত্তরটা এল পরের ফাইল থেকে।
সেখানে একটা ই-মেইল ছিল।
প্রেরক—
তানভীর শেঠী।
প্রাপক—
একজন নারী।
নাম— সাবিহা রহমান।
ই-মেইলের শেষ লাইনটা পড়ে আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
"ইশরাত সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ডিভোর্সটা সহজ হবে। তখন সবকিছু আমাদের হবে।"
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
ছয় বছরের সংসার।
ছয় বছর ধরে আমি যাকে ভালোবেসেছি।
সে আমাকে স্ত্রী হিসেবে নয়—
একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হিসেবে দেখেছে।
ঠিক তখনই আমার ফোনে একটা কল এল।
অপরিচিত নম্বর।
রিসিভ করতেই ওপাশে কাঁদো কাঁদো গলা।
"আপু... আমি সাবিহা।"
আমি চমকে উঠলাম।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বললাম না।
তারপর মেয়েটা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
"আমি সব জানতাম না আপু। আল্লাহর কসম, আমি সব জানতাম না।"
আমি ঠান্ডা গলায় বললাম—
"কী জানতেন না?"
ওপাশে নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।
"রায়হানের ব্যাপারটা।"
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
"আপনি কী জানেন?"
সাবিহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল—
"সেদিন মালদ্বীপে একটা কথা শুনেছিলাম।"
আমার আঙুল শক্ত হয়ে গেল।
"কী কথা?"
ওর কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।
"আপনার শাশুড়ি বলছিলেন, বাচ্চাটা যদি না বাঁচে তাহলে নাকি সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।"
আমি জমে গেলাম।
পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল।
"আপনি কী বললেন?"
সাবিহা এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল—
"আমি নিজের কানে শুনেছি আপু।"
আমার শ্বাস আটকে আসছিল।
"আরও বলুন।"
"তিনি বলেছিলেন— রায়হান বড় হয়ে গেলে আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবে। তখন তানভীর আপনাকে ছেড়ে যেতে পারবে না।"
আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
"আর তানভীর?"
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর একটা উত্তর।
যে উত্তর আমার জীবনের শেষ ভরসাটুকুও ভেঙে দিল।
"তানভীর কিছু বলেনি আপু।"
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
সাবিহা আবার বলল—
"সে শুধু চুপচাপ বসে ছিল।"
আমার বুকের ভেতরে তখন আর কোনো কান্না ছিল না।
শুধু আগুন।
বহুদিনের জমে থাকা আগুন।
ঠিক তখনই আরেকটা কল এল।
এইবার থানার নম্বর।
আমি কল রিসিভ করলাম।
ওপাশ থেকে অফিসার বললেন—
"ম্যাডাম, একটা নতুন তথ্য পাওয়া গেছে।"
"কী তথ্য?"
অফিসারের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে গেল।
"এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে আপনার শাশুড়ি হাসপাতালের একজন সাবেক নার্সকে ফোন করেছিলেন।"
আমার হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো।
"তারপর?"
"আমরা কল রেকর্ড সংগ্রহ করেছি।"
আমি নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছিলাম।
অফিসার ধীরে ধীরে বললেন—
"ম্যাডাম, মনে হচ্ছে এটা শুধু অবহেলার মামলা নয়।"
"তাহলে?"
ওপাশ থেকে একটা বাক্য ভেসে এল—
"সম্ভবত আপনার সন্তানের মৃত্যুর পেছনে আরও ভয়ংকর একটা পরিকল্পনা ছিল।"
ফোনটা আমার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল।
আর প্রথমবারের মতো আমার মনে হলো—
রায়হানের মৃত্যু হয়তো দুর্ঘটনা ছিল না।
কেউ হয়তো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল...
আমার সন্তানকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
থানার ফোন কেটে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিলাম।
আমার সামনে রায়হানের ছোট্ট ছবিটা রাখা।
ছবিটা তোলা হয়েছিল জন্মের পরের দিন।
চোখ দুটো বন্ধ।
মুখে শান্ত একটা হাসি।
যেন পৃথিবীর কোনো নিষ্ঠুরতার খবর সে জানত না।
কিন্তু আমি জানতাম।
আর এখন পুলিশও জানে।
পরদিন সকালে আমাকে থানায় ডাকা হলো।
আব্বু আর আইনজীবী আঙ্কেলকে নিয়ে আমি সেখানে গেলাম।
অফিসার রহমান আমাদের একটা কনফারেন্স রুমে বসালেন।
তারপর টেবিলের ওপর একটা ফাইল রাখলেন।
ফাইলের ওপর লাল অক্ষরে লেখা—
"গোপন সাক্ষ্য"
আমার বুক ধক করে উঠল।
"কে সাক্ষ্য দিয়েছে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
অফিসার ধীরে ধীরে বললেন—
"নার্স শারমিন আক্তার।"
নামটা শুনেই আমার মাথার ভেতর কিছু একটা ঝলসে উঠল।
শারমিন।
এই নাম আমি আগে শুনেছি।
হঠাৎ মনে পড়ল।
রায়হানের জন্মের দিন হাসপাতালে একজন নার্স বারবার আমার কেবিনে এসেছিলেন।
তিনি অদ্ভুতভাবে নার্ভাস ছিলেন।
আর কানিজ ফাতেমা তাকে দেখে আলাদা করে কথা বলেছিলেন।
অফিসার ফাইল খুললেন।
"শারমিন প্রথমে কিছু বলতে চাননি। কিন্তু গতকাল তিনি নিজে এসে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।"
আমার হাত কাঁপতে শুরু করল।
"কী স্বীকারোক্তি?"
অফিসার কয়েক সেকেন্ড চুপ রইলেন।
তারপর বললেন—
"আপনার শাশুড়ি তাকে টাকা দিয়েছিলেন।"
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
"কেন?"
"রায়হানের মেডিকেল রিপোর্ট গোপন করার জন্য।"
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
"কোন রিপোর্ট?"
অফিসার একটা কাগজ বের করলেন।
ডাক্তারের স্বাক্ষর করা রিপোর্ট।
আমি পড়তে শুরু করলাম।
আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
রিপোর্টে লেখা ছিল—
জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রায়হানের হার্টের সমস্যা ধরা পড়েছিল।
ডাক্তার জরুরি ভিত্তিতে বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে শিশুটির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল ৮৫ শতাংশেরও বেশি।
আমি চেয়ার আঁকড়ে ধরলাম।
"না..."
অফিসার নিচু গলায় বললেন—
"কিন্তু সেই রিপোর্ট আপনার হাতে পৌঁছায়নি।"
আমার চোখ দিয়ে অবশেষে পানি গড়িয়ে পড়ল।
"কেন?"
তিনি আরেকটা কাগজ এগিয়ে দিলেন।
সেখানে শারমিনের লিখিত জবানবন্দি।
"কানিজ ফাতেমা আমাকে বলেছিলেন, মাকে কিছু জানানো যাবে না। তাকে বলবেন শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ আছে।"
আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
"আর তানভীর?"
অফিসার রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"এখানেই সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ।"
তিনি টেবিলের ওপর একটা পেনড্রাইভ রাখলেন।
"এখানে এয়ারপোর্ট যাওয়ার আগের দিনের একটা অডিও রেকর্ডিং আছে।"
আমার আঙুল ঠান্ডা হয়ে গেল।
রেকর্ডিং চালু হলো।
প্রথমে কানিজ ফাতেমার কণ্ঠ।
"মেয়েটাকে কিছু বলবে না।"
তারপর তানভীরের গলা।
"যদি পরে জানতে পারে?"
আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।
এরপর যে কথাটা শোনা গেল, তা শুনে ঘরের সবাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
"ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে।"
কানিজ ফাতেমা বলছিলেন।
"বাচ্চাটা থাকলে সম্পত্তির ভাগ বদলে যাবে। এখন যা করার, এখনই করতে হবে।"
আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল।
আমি শব্দও করতে পারছিলাম না।
রেকর্ডিং বন্ধ হয়ে গেল।
ঘরে শুধু নীরবতা।
অনেকক্ষণ পর অফিসার রহমান বললেন—
"আমরা আর্থিক উদ্দেশ্য, চিকিৎসা অবহেলা এবং ষড়যন্ত্র—তিনটি দিক থেকেই তদন্ত করছি।"
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম।
"তানভীর কি সব জানত?"
অফিসার সরাসরি উত্তর দিলেন না।
বরং একটা ছবি আমার সামনে রাখলেন।
ছবিটা এয়ারপোর্টের সিসিটিভি থেকে নেওয়া।
সেখানে দেখা যাচ্ছে—
কানিজ ফাতেমা একটি খাম তানভীরের হাতে দিচ্ছেন।
আর তানভীর সেটা খুলে পড়ছে।
খামের ওপর লেখা—
"রায়হানের মেডিকেল রিপোর্ট"
আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
শেষ সন্দেহটুকুও মরে গেল।
সে জানত।
সব জানত।
তারপরও চলে গিয়েছিল।
ঠিক তখন থানার দরজা খুলে একজন কনস্টেবল ভেতরে ঢুকলেন।
তার মুখে উত্তেজনা।
"স্যার, নতুন আপডেট।"
অফিসার রহমান তাকালেন।
"কি হয়েছে?"
কনস্টেবল বলল—
"কানিজ ফাতেমার ব্যাংক লকার খুলে পাওয়া গেছে কিছু নথি।"
"কী নথি?"
কনস্টেবল ফাইলটা টেবিলে রাখল।
"উইল।"
আমার বুক ধক করে উঠল।
"কার উইল?"
কনস্টেবল আমার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
"রায়হানের নামে করা আপনার সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত উইল।"
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
কিন্তু পরের কথাটা শুনে পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল।
"আর সেই উইলের নিচে আরেকটা কাগজ ছিল..."
অফিসার রহমান ভ্রু কুঁচকে বললেন—
"কী কাগজ?"
কনস্টেবল ফিসফিস করে বলল—
"রায়হান মারা গেলে সম্পত্তি কার কাছে যাবে, তার পরিকল্পনা।"
আমার হাত থেকে পানির গ্লাস মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
কারণ এখন স্পষ্ট—
এটা শুধু অবহেলা ছিল না।
এটা শুধু নিষ্ঠুরতাও ছিল না।
কারও কারও লোভ এত গভীর ছিল যে...
একটি তিন দিনের শিশুও তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
চলবে...
