অনাথ
পর্ব ০২
The Story Haven
ঘরটা এখন একদম নিস্তব্ধ। শুধু জানালার কাঁচের ওপর বৃষ্টির ঝাপটা মা*রার শব্দ শোনা যাচ্ছে। অবনী চলে গেছে, অথচ ওর রেখে যাওয়া শূন্যতা এই বিশাল বাড়ির প্রতিটি কোণায় যেন ভারী হয়ে আছে।
আমি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে হাত কাঁপানো অবস্থায় অবনীর ফেলে যাওয়া ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিশ বছর আগে অবনীকে অনাথ আশ্রম থেকে আনার দিনটি মনে পড়ে গেল। রেহানা সেদিন অঝোরে কেঁদেছিল—সে কেঁদেছিল সন্তানের অভাব পূরণ হওয়ার। অথচ আজ সেই রেহানার কণ্ঠে এত বি*ষ!
ডায়েরিটা খুললাম। হাতের লেখাটা অবনীরই, কিন্তু ভাষার চয়নগুলো অনেক পরিণত। ডায়েরির পাতায় পাতায় সে আমাদের পরিবারের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্তের কথা লিখেছে—আমার অফিসের ক্লান্তিতে ঘরে ফেরা, আমার তাকে নিয়ে বিকেলে পার্কে যাওয়া, এমনকি রেহানার অবহেলার পরেও সে কীভাবে আমাদের জন্য প্রার্থনা করত—সব।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেলাম শেষের পাতায় এসে। সেখানে কোনো লেখা নেই, আছে একটি ছবি আর একটি আইনি নথির ফটোকপি। ছবিটা রেহানার সাথে এক ব্যক্তির—যাকে আমি চিনি না। আর নথিতে লেখা, অবনী কোনো অনাথ ছিল না। অবনীর আসল বাবা ছিলেন আমারই এক ব্যবসায়িক পার্টনার, যিনি মা**রা যাওয়ার আগে পুরো সম্পত্তির দায়িত্ব আমার ওপর দিয়ে গিয়েছিলেন, আর অবনী ছিল তার একমাত্র উত্তরাধিকারী।
এখন বুঝতে পারলাম, রেহানা কেন তাকে বের করে দিল। সে কেবল এখনকার সম্পদের মোহেই অন্ধ নয়, সে অবনীর প্রকৃত পরিচয় জানত। সে ভয় পেত, অবনী যদি কোনোদিন তার বাবার সেই উইল সম্পর্কে জেনে যায়, তবে এই প্রাসাদের মালিকানা আর টিকে থাকবে না।
ঠিক তখনই আমার ফোনের স্ক্রিনে ম্যাসেজটা এল: "শফিক সাহেব, রেহানা আপনাকে এতদিন শুধু মানুষ হিসেবে নয়, একটি পুতুল হিসেবে ব্যবহার করেছে। আপনার নিজের সন্তান যে আসলে আপনারই নয়, বরং আপনার স্ত্রীরই পূর্বের সম্পর্কের ফসল—সেটা কি জানতে চেয়েছেন কখনো?"
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমি দ্রুত ড্রয়িংরুমের দরজার দিকে তাকালাম। রেহানা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে পানি নেই, আছে এক কঠিন শীতলতা। সে আমার হাতের ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
“পড়া শেষ? জানলেন তো সবকিছু? হ্যাঁ, শফিক, আমি অবনীকে ঘৃণা করতাম। কারণ ওই মেয়েটা আমার সব সাজানো পরিকল্পনা নষ্ট করে দিচ্ছিল। আর আপনার এই আদরের ছেলে? সে আপনার র**ক্ত নয়, শফিক। আমি আপনাকে ধোঁকা দিয়েছি কারণ আমি জানতাম, আপনার অর্থ ছাড়া আমার টিকে থাকার উপায় ছিল না।”
আমার মনে হলো পৃথিবীটা পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। অবনী এই সব জেনেও এতদিন চুপ করে ছিল শুধু আমার সম্মান বাঁচাতে! সে তার নিজের অধিকার ত্যাগ করে আমাকেই আগলে রেখেছিল, আর আমি তাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখেও নীরব ছিলাম।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। কোনো চিৎকার নয় আমার কণ্ঠে এখন এক হিমশীতল নীরবতা। আমি রেহানার চোখের দিকে তাকালাম।
“আমি আজ অবধি অন্ধ ছিলাম, রেহানা। কিন্তু আজ আমি দেখতে পাচ্ছি। অবনী শুধু অনাথ ছিল না, সে ছিল আমার একমাত্র ভরসা। তুমি আজ তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছো, কিন্তু তুমি জানো না, আজ থেকে এই বাড়ির চাবিকাঠি আর তোমার হাতে থাকবে না।”
আমি ডায়েরিটা পকেটে ভরে বাইরের বৃষ্টির দিকে পা বাড়ালাম। আমার জানতে হবে, অবনী এখন কোথায়। হয়তো সে অন্ধকারে হারিয়ে যায়নি, বরং সে এখন সেই সত্যের লড়াই লড়তে প্রস্তুত, যা এই বাড়ির ভিত্তি নাড়িয়ে দেবে।
চলবে...
খুব শীঘ্রই তৃতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে তৃতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।
