খাঁচা
পর্ব: ০৩ (শেষ পর্ব)
কোর্টরুমের ভারী কাঠের দরজাটা যখন আমাদের পেছনে বন্ধ হয়ে গেল, তখন বাইরের সব কোলাহল যেন এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। ভেতরে শুধু ফ্যানের একঘেয়ে আওয়াজ আর বিচারকের গম্ভীর কণ্ঠস্বর। আমার বুকের ভেতর তখন একটা অজানা ঝড় বইছিল, কিন্তু চোখের দৃষ্টি ছিল স্থির।
কাঠগড়ার একপাশে আমি আর আশরাফ চাচা দাঁড়ালাম, অন্যপাশে আব্বা আর রাজীবের বাবা। সামিয়া আর আম্মা পেছনের বেঞ্চে বসে কাঁপছিলেন। সামিয়ার সেই চড়া মেকআপ করা মুখটা এখন ভয়ে মলিন হয়ে গেছে।
বিচারক মহোদয় ফাইলের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে চশমার ওপর দিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। “মামলা নম্বর ৪২। বাদী পক্ষ, আপনাদের বক্তব্য পেশ করুন।”
আশরাফ চাচা অত্যন্ত দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেলেন। “মাননীয় আদালত, আমার মক্কেল রাবেয়া বানু ‘বানু স্টেশনার্স’-এর প্রকৃত এবং একমাত্র আইনি মালিক। তার দাদিমা আমেনা বানুর রেজিস্ট্রিকৃত উইল অনুযায়ী, রাবেয়ার বয়স পঁচিশ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এই সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে তার নামে হস্তান্তরিত হয়েছে। কিন্তু বিবাদী পক্ষ, শওকত আলী, আসল সত্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে এই দোকান অন্য কারো নামে দলিল করার চেষ্টা করছেন। আমরা এই অবৈধ দলিলের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানাচ্ছি।”
বিবাদী পক্ষের উকিল দাঁড়িয়ে হেসে উঠলেন। “মাননীয় আদালত, এসব বানানো গল্প। শওকত আলী সাহেব গত ত্রিশ বছর ধরে এই দোকান চালাচ্ছেন। ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট—সব ওনার নামে। এই মেয়েটি পারিবারিক কলহের জেরে নিজের বাবার সম্পত্তি দখল করতে চাইছে।”
আব্বা কাঠগড়া থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, “হুজুর, ও আমার মেয়ে নয়, ও একটা রক্তচোষা ডাইনি! নিজের বোনের বিয়ে ভাঙার জন্য এই মিথ্যা নাটক সাজিয়েছে।”
তার এই শেষ কথাটা যেন আমার পাঁজরের ব্যথার চেয়েও বেশি আঘাত করল। কিন্তু আমি এবার আর চুপ করে থাকলাম না। বিচারকের দিকে তাকিয়ে হাত তুললাম।
“মাননীয় আদালত, আমি কিছু বলতে চাই।”
বিচারক আমার ভাঙা হাত আর পাঁজরের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে একটু নরম গলায় বললেন, “বলুন।”
“আমার বাবা বলেছেন আমি নাটক করছি। কিন্তু এই ‘নাটক’ করতে গিয়ে কাল রাতে আমার তিনটা পাঁজর ভেঙে গেছে। কারণ আমি এই জালিয়াতির প্রতিবাদ করেছিলাম,” আমি আমার ফোনটা বের করে আশরাফ চাচার হাতে দিলাম। “এই ফোনে কাল রাতের একটা অডিও রেকর্ড আছে। যেখানে আমার বোন আমাকে আঘাত করার কথা স্বীকার করেছে, আমার মা আমাকে হাসপাতালে যেতে বাধা দিয়েছে আর আমার বাবা দোকান জালিয়াতি করে লিখে দেওয়ার কথা বলেছে। আর সবচেয়ে বড় সত্য… শওকত আলী সাহেব আমার জন্মদাতা বাবা নন, তাকে আমার দাদিমা ফুটপাত থেকে কুড়িয়ে এনেছিলেন। সেই কাগজও অ্যাডভোকেট সাহেবের ফাইলে আছে।”
আমার এই কথায় পুরো এজলাসে একটা গুঞ্জন উঠে গেল। বিচারক গম্ভীর মুখে বললেন, “অডিও প্রমাণটি এবং ফাইলটি জমা দিন।”
কোর্টরুমের প্রজেক্টরে যখন কাল রাতের সেই ভয়েস রেকর্ডটা বাজানো হলো—আম্মার সেই নিষ্ঠুর কণ্ঠ, সামিয়ার চিৎকার আর আব্বার ডাল মোছার বিবরণ—তখন পুরো আদালত কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। বিচারকের মুখ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠল।
রেকর্ড শেষ হতেই রাজীবের বাবা রাজীবের হাত ধরে টান দিলেন। ফিসফিস করে বললেন, “এই আপদ বিদায় কর। এই জালিয়াতি আর খুনের মামলায় জড়াতে পারলে আমাদেরও জেল হবে। এই বিয়ে এখানেই শেষ!”
সামিয়া রাজীবের হাত ধরার চেষ্টা করতেই রাজীব ঝাড়ি দিয়ে হাত সরিয়ে নিল। সামিয়া সেখানেই মেঝেতে বসে ডুকরে কেঁদে উঠল। যে ‘নিখুঁত জীবনের’ জন্য সে আমাকে লাথি মেরেছিল, তা এক মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেল।
বিচারক হাতুড়ি পিটিয়ে সবাইকে শান্ত করলেন। তারপর তার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন:
“নথিপত্র এবং অডিও প্রমাণ যাচাই করে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, ‘বানু স্টেশনার্স’-এর একমাত্র আইনি উত্তরাধিকারী রাবেয়া বানু। শওকত আলী বা অন্য কারো এই সম্পত্তি হস্তান্তর করার কোনো আইনি অধিকার নেই। অতএব, চকবাজারের ওই দোকানের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। একই সাথে, বাদীকে গুরুতর শারীরিক আঘাত এবং তথ্য গোপনের অপরাধে শওকত আলী ও সামিয়া আলীর বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলো।”
হাতুড়ির শেষ শব্দটা যখন পড়ল, তখন আমার মনে হলো মাথার ওপর থেকে যেন শত টনের একটা পাথর নেমে গেল।
কোর্ট থেকে যখন বের হলাম, তখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে। ঢাকার আকাশে একটা চমৎকার লালচে আভা।
আম্মা আর আব্বা করিডোরের এক কোণায় পাথরের মতো বসে ছিলেন। সামিয়া চোখ মুছে আমার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুই আমাদের রাস্তায় বসিয়ে দিলি, রাবেয়া? তুই জিতলি?”
আমি সামিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। “আমি জিতিনি রে সামিয়া। আমি শুধু নিজের বেঁচে থাকার অধিকারটা ছিনিয়ে নিয়েছি। তোরা আমার পাঁজর ভেঙেছিস, কিন্তু আমার ভেতরের দাদিমাকে ভাঙতে পারিসনি।”
আমি আম্মার দিকে তাকালাম। তিনি একবারও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারলেন না। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশরাফ চাচার সাথে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলাম।
আজ থেকে আমার এক নতুন জীবন শুরু। চকবাজারের ‘বানু স্টেশনার্স’ কাল সকাল থেকে আবার খুলবে। এবার আর কোনো অবহেলিত মেয়ে হিসেবে নয়, এবার আমি যাব তার মালিক হিসেবে।
আমার নাম রাবেয়া বানু।
আর আজ আমি শিখেছি—খাঁচাটা যতই শক্ত হোক না কেন, নিজের ডানার ওপর বিশ্বাস থাকলে আকাশটা একদিন নিজের হয়েই যায়।
--- (সমাপ্ত) ---
