#অন্ধকার_ঘরের_রাজকুমারী

পর্ব: ০২ (কল্পিত ধারাবাহিকতা)

রক্ত যেন আমার শরীরের ভেতর জমে গেল।

লাল খাতার প্রথম পাতায় লেখা ছিল—

"অপরাধ: ফিরনির দিকে লোভের চোখে তাকিয়েছে।

শাস্তি: রাতের খাবার বন্ধ।"

পরের পাতায়—

"অপরাধ: অনুমতি ছাড়া রান্নাঘরে প্রবেশ।

শাস্তি: ১২ ঘণ্টা গুদামঘরে অবস্থান।"

আরেক পাতায়—

"অপরাধ: অতিথিদের সামনে কান্না করেছে।

শাস্তি: মিষ্টি ও দুধ এক সপ্তাহ বন্ধ।"

আমার হাত কাঁপতে লাগল।

এগুলো কোনো শাসনের তালিকা ছিল না।

এটা ছিল নির্যাতনের হিসাব।

“তোমরা পাগল হয়ে গেছ?” আমি চিৎকার করে উঠলাম।

আম্মার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।

“আমরা ওকে মানুষ করছি,” তিনি শান্ত গলায় বললেন।

“মানুষ?” আমি ইরাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। “একটা ছয় বছরের বাচ্চাকে না খাইয়ে মানুষ করা হয়?”

আব্বা এবার এগিয়ে এলেন।

“তুই বুঝবি না, আহনাফ। ছোটবেলা থেকে কঠোর শিক্ষা না দিলে বাচ্চারা বখে যায়।”

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই ইরা আমার শার্ট আঁকড়ে ধরল।

“মামা... আমি কি খারাপ মেয়ে?”

প্রশ্নটা শুনে আমার বুক ভেঙে গেল।

“না, মা,” আমি ফিসফিস করে বললাম। “তুই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মেয়ে।”

ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এল।

আমি ঢাকায় আসার আগেই এক বন্ধুকে সব বলেছিলাম। ফোন কেটে যাওয়ার পর সে স্থানীয় থানায় খবর দিয়েছিল।

আম্মার মুখের রঙ বদলে গেল।

প্রথমবারের মতো তার চোখে ভয় দেখা দিল।

দুইজন পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকে চারপাশে তাকালেন।

গুদামঘরের দৃশ্য, দড়ি, খালি থালা, আর আমার কোলে কাঁপতে থাকা ইরাকে দেখে তাদের একজন ধীরে ধীরে বললেন—

“এখানে আসলে কী হচ্ছে?”

আমি কোনো উত্তর দিলাম না।

আমি শুধু লাল খাতাটা তার হাতে তুলে দিলাম।

অফিসার প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

আর তখনই আমি বুঝলাম—

আজ রাতটা শুধু ইরার মুক্তির রাত নয়।

আজ রাতটা এমন একটা সত্যের শুরু, যা বহু বছর ধরে এই নিখুঁত বাড়ির দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে ছিল...

পুলিশ অফিসার লাল খাতার শেষ পাতাটা বন্ধ করলেন।

ঘরের ভেতর এমন নীরবতা নেমে এলো যে বাইরে ঝড়ের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

“এই খাতাটা আমরা জব্দ করছি,” অফিসার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন।

আম্মা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন।

“ওটা আমাদের পারিবারিক বিষয়! বাইরের কারও নাক গলানোর অধিকার নেই!”

“একটা শিশুকে আটকে রাখা, না খাইয়ে রাখা এবং ভয় দেখানো কোনো পারিবারিক বিষয় নয়,” অফিসার ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলেন।

আমি ইরাকে কোলে নিয়ে সোফায় বসালাম।

একজন মহিলা পুলিশ ব্যাগ থেকে বিস্কুট আর পানির বোতল বের করে তার হাতে দিলেন।

ইরা বিস্কুটটা এমনভাবে ধরল যেন কেউ আবার কেড়ে নেবে।

তারপর ছোট্ট একটা প্রশ্ন করল—

“আমি কি সবগুলো খেতে পারি?”

আমার চোখ ভিজে উঠল।

মহিলা পুলিশও কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।

“অবশ্যই পারবে, মা।”

ইরা ধীরে ধীরে বিস্কুট খেতে শুরু করল।

ঠিক তখনই একজন অফিসার বাড়ির অন্য ঘরগুলো দেখতে গেলেন।

কয়েক মিনিট পরে তিনি ফিরে এলেন।

তার হাতে ছিল একটা পুরোনো টিনের বাক্স।

“স্যার, এটা মেয়েটার বিছানার নিচে পাওয়া গেছে।”

বাক্সটা খুলতেই আমার বুক কেঁপে উঠল।

ভেতরে ছিল—

একটা ভাঙা পুতুল।

দুটি শুকনো রুটি।

কয়েকটা চকলেটের মোড়ক।

আর কিছু ভাঁজ করা কাগজ।

আমি একটা কাগজ খুললাম।

শিশুসুলভ হাতের লেখায় লেখা—

“আল্লাহ, আমি যদি খারাপ মেয়ে হই তাহলে আমাকে ভালো বানিয়ে দাও। কিন্তু দাদী যেন আর আমাকে অন্ধকার ঘরে না রাখে।”

আমার হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

আরেকটাতে লেখা—

“আজ আমি খুব ক্ষুধার্ত। যদি আব্বু ফিরে আসে, আমি তাকে কিছু বলব না। শুধু জড়িয়ে ধরব।”

ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

নিখোঁজ আরিফ ভাইয়ের কথা মনে হতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

কিন্তু তখনই আরও বড় একটা রহস্য সামনে এল।

বাক্সের একদম নিচে একটা পুরোনো খাম ছিল।

খামের ওপর লেখা—

“শুধু আহনাফের জন্য।”

আমি কাঁপা হাতে খামটা খুললাম।

ভেতরে থাকা চিঠির প্রথম লাইন পড়েই আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল—

“আহনাফ, যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি আর বেঁচে নেই কিংবা আমাকে জোর করে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে...”

চিঠির নিচে স্বাক্ষর—

আরিফ রহমান।

আমার নিখোঁজ বড় ভাই।

দুই বছর আগে যে মানুষটা হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছিল।

আর সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো—

হয়তো ইরা এই বাড়ির একমাত্র বন্দি ছিল না।

হয়তো আরিফের নিখোঁজ হওয়ার রহস্যও এই বাড়ির দেয়ালের মধ্যেই লুকিয়ে আছে...

চলবে... 🔥📖

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url