খাঁচার ভেতর খাঁচা
পর্ব: ০২+০৩
#Choto_Dairy_01
নার্স ফাতেমা আপার মুখের ফ্যাকাশে রঙটা দেখে আমার বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। কার রক্ত ওটা? রাঘব গত রাতে কী করেছে? আর নয়নার স্কুল ব্যাগেই বা সেটা লুকাল কেন? আমার মাথায় তখন হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু কোনো উত্তর পাচ্ছিলাম না। রাঘব ফোন রেখে হাসিমুখে এগিয়ে আসতেই ফাতেমা আপা চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের টেবিলে চলে গেলেন। তার হাঁটার গতিতে একটা চাপা তাড়াহুড়ো ছিল, যা রাঘবের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াতে পারল না।
“কী ব্যাপার আয়েশা? ওই নার্সটা তোমাকে কিছু বলছিল?” রাঘব আমার কপালে হাত বুলিয়ে দিল। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কত যত্নশীল স্বামী। কিন্তু আমার সারা শরীর ওর ছোঁয়ায় ঘেন্নায় আর ভয়ে কুঁকড়ে গেল।
“না, ও জাস্ট প্রেসার চেক করছিল,” আমি কোনোমতে নিজের কাঁপানো গলা সামলে বললাম।
রাঘব এক সেকেন্ডের জন্য আমার চোখের দিকে তাকাল, যেন আমার মনের ভেতরটা পড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তারপর ও নয়নার দিকে ঘুরে তাকাল। “নয়না মা, তোমার ব্যাগটা এত ভারী লাগছে কেন? ওটার ভেতর কী আছে?”
নয়না চমকে উঠল। ওর ফ্যাকাশে মুখটা আরও সাদা হয়ে গেল। ও ব্যাগটা নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “কিছু না বাবা… শুধু স্কুলের কিছু প্রজেক্টের খাতা।”
“তাই? তা প্রজেক্টের খাতা দেখতে তো ভারী হওয়ার কথা নয়,” রাঘব একটা কুৎসিত হাসল। ও যখনই এইরকম হাসে, তার মানে ও সব বোঝে, শুধু শিকারকে নিয়ে একটু খেলা করে।
ঠিক তখনই ওয়ার্ডের বাইরে একটা শোরগোল শোনা গেল। দুজন পুলিশ অফিসার হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তারের সাথে কথা বলতে বলতে আমাদের কেবিনের দিকেই এগিয়ে আসছিলেন। তাদের সাথে ছিলেন নার্স ফাতেমা আপাও। ওনার আঙুলটা ছিল আমাদের কেবিনের দিকে।
রাঘব পুলিশ দেখেই এক পলকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর মুখের সেই চেনা দেবদূতের মুখোশটা মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এলো। “আরে, ইন্সপেক্টর বাবু! কোনো সমস্যা? আমরা তো আমার স্ত্রীর এক্স-রে রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি।”
ইন্সপেক্টর রাঘবের দিকে না তাকিয়ে সোজা নয়নার দিকে এগিয়ে গেলেন। “খুকি, তোমার পিঠের ওই গোলাপী ব্যাগটা একটু আমাদের দেবে? আমাদের কাছে একটা বিশেষ অভিযোগ আছে।”
রাঘবের মুখের হাসিটা এক পলকে মিলিয়ে গেল। ওর চোখের কোণ দিয়ে একটা হিংস্র চাউনি বেরিয়ে এল, যা শুধু আমিই চিনতে পারলাম। ও চট করে নয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “কী ব্যাপার অফিসার? আমার মেয়ের স্কুল ব্যাগে কী থাকবে? ও তো নাবালিকা, ওকে এভাবে হ্যারাস করার অধিকার আপনাদের কে দিল?”
“অধিকার আমাদের আইন দিয়েছে, রাঘব বাবু,” ইন্সপেক্টর কড়া গলায় বললেন। “কাল রাতে আপনার এলাকার একটা বড় জুয়েলারি শপে ডাকাতি হয়েছে এবং সিকিউরিটি গার্ডকে গুরুতর জখম করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে আপনার গাড়িটা দেখা গেছে। আর আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে যে, ডাকাতির মালপত্র আপনার মেয়ের এই ব্যাগেই লুকানো আছে।”
আমার দম আটকে আসার জোগাড় হলো। ডাকাতি? রাঘব চোর? নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো খেলা আছে?
ইন্সপেক্টর নয়নার হাত থেকে ব্যাগটা জোর করে টেনে নিলেন। চেইনটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। তার ভেতরে ছিল রক্তমাখা একটা ভারী হাতুড়ি এবং একটা ছোট চাবির তোড়া। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—সেখানে কোনো গয়না বা টাকা ছিল না!
ইন্সপেক্টর ভ্রু কুঁচকে রাঘবের দিকে তাকালেন। “জিনিসপত্র কোথায়, রাঘব বাবু?”
রাঘব এবার হা হা করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক চরম অহংকার। “আমি তো আগেই বললাম অফিসার, আপনারা ভুল করছেন। আমার মেয়ে নির্দোষ। আর এই রক্ত? এটা তো আমার স্ত্রীর! কাল রাতে ও যখন রান্নাঘরে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পায়, তখন আমি এই হাতুড়িটা দিয়েই আলমারিটা ঠিক করছিলাম। বিশ্বাস না হলে আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করুন।”
রাঘব আমার দিকে তাকাল। সেই পরিচিত, চেনা ঠান্ডা চোখ। যে চোখ আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল—যদি এখন ওর পক্ষে মিথ্যা না বলি, তবে নয়নাকে আমি আর কোনোদিন দেখতে পাব না।
ইন্সপেক্টর আমার দিকে ঘুরলেন। “আয়েশা বেগম, আপনার স্বামী যা বলছেন তা কি সত্যি? এই রক্ত কি আপনার?”
আমি নয়নার দিকে তাকালাম। মেয়েটা ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছে, যেন ও আমাকে বারণ করছে মুখ খুলতে। ও রাঘবের কোনো এক গভীর চক্রান্তের কথা জানে, যা আমি জানি না।
আমার ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল। আমি যদি এখন সত্যি বলি, রাঘব হয়তো ধরা পড়বে, কিন্তু নয়নার কী হবে? আর যদি মিথ্যা বলি, তবে এই নরক থেকে আমাদের মুক্তি কোনোদিন হবে না।
ঠিক তখনই নার্স ফাতেমা আপা আমার একদম কাছে এসে দাঁড়ালেন। ওনার চোখ সটান রাঘবের দিকে। ফাতেমা আপা ফিসফিস করে ডাক্তারবাবুকে কিছু একটা বললেন, যা শুনে ডাক্তারবাবুর চোখ কপালে উঠল।
ডাক্তারবাবু চট করে এক্স-রে প্লেটটা নিয়ে কেবিনে ঢুকলেন এবং ইন্সপেক্টরের হাতে দিলেন। “ইন্সপেক্টর বাবু, এই মহিলাকে যেভাবে মারা হয়েছে, তা কোনো হাতুড়ির আঘাত নয়। আর ওনার পাঁজরের হাড় যেভাবে ভেঙেছে, তা কোনো সাধারণ পড়ে যাওয়ার ঘটনা হতেই পারে না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা…”
ডাক্তারবাবু থামলেন। ওনার মুখের ভাব দেখে মনে হলো উনি কোনো এক ভয়ানক সত্য আবিষ্কার করেছেন।
“বড় কথা কী ডাক্তারবাবু?” ইন্সপেক্টর জিজ্ঞেস করলেন।
ডাক্তারবাবু রাঘবের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “এই লোকটা শুধু ওনার স্বামী নন, এই লোকটার আসল পরিচয় অন্য কিছু। আয়েশা বেগমের ব্লাড গ্রুপ আর এই হাতুড়িতে থাকা রক্তের গ্রুপ একদম আলাদা। কিন্তু এই রক্তের গ্রুপটা মিলে যাচ্ছে আজ সকালে নদীতে পাওয়া একটা অজ্ঞাতপরিচয় লাশের সাথে!”
কেবিনের ভেতরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। নয়না একটা চিৎকার দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। রাঘব আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না, ও চট করে পকেট থেকে একটা ছোট ধারালো ছুরি বের করে ফাতেমা আপার গলায় চেপে ধরল!
“খবরদার! কেউ এক পা-ও এগোবে না!” রাঘব হিংস্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল। “যদি বাঁচতে চাও, তবে আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তা দাও!”
নয়না কাঁদতে কাঁদতে রাঘবের পায়ের কাছে গিয়ে বলল, “বাবা, প্লিজ ছেড়ে দাও! আমি কাউকে কিচ্ছু বলিনি! তুমি তো বলেছিলে ওই লোকটা ঘুমিয়ে আছে! তুমি ওনাকে মেরে ফেলেছ?”
রাঘব নয়নাকে একটা লাথি মেরে সরিয়ে দিল। “চুপ কর, হারামজাদি! তোর জন্যই আজ আমার এই হাল!”
আমি বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যন্ত্রণায় আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। রাঘব নার্স ফাতেমাকে জিম্মি করে আস্তে আস্তে কেবিনের দরজার দিকে এগোতে লাগল। পুলিশ অফিসাররা পিস্তল উঁচিয়ে ধরলেও ফাতেমা আপার জীবনের ঝুঁকির কারণে গুলি করতে পারছিলেন না।
ঠিক দরজার কাছে গিয়ে রাঘব আমার দিকে তাকিয়ে একটা পিশাচের মতো হাসল। “আয়েশা, তুই ভেবেছিলি এই সামান্য নার্সকে চিঠি দিয়ে তুই পার পেয়ে যাবি? খেলা তো কেবল শুরু হলো। তোর মেয়েকে আমি যেখানে রেখে এসেছিলাম, সেখানে ও আবার যাবে। তবে এবার আর জ্যান্ত ফিরবে না!”
কথাটা বলেই রাঘব ফাতেমা আপাকে ধাক্কা দিয়ে পুলিশের ওপর ফেলে দিল এবং করিডোর দিয়ে তীব্র গতিতে দৌড়ে পালাল।
পুলিশ ওর পেছনে ছুটল, কিন্তু ততক্ষণে হাসপাতালের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে ও হাওয়া হয়ে গেছে।
কেবিনে তখন শুধু পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ আর আমার ভাঙা পাঁজরের ভেতরের এক অসহ্য হাহাকার। রাঘব পালিয়ে গেছে। ও পুলিশকে ভয় পায় না, কারণ ওর পেছনে এমন কোনো বড় শক্তি আছে যা আমরা কেউ জানি না। আর নয়না? নয়না মেঝেতে পড়ে কাঁপছিল। ও দুই মাস আগের কোন ভয়ানক সত্য গোপন করে চলেছে? ও রাঘবের কোন খুনের সাক্ষী?
চলবে...
(৩য় পর্বে চোখ রাখুন)
খাঁচার ভেতর খাঁচা
পর্ব: ০৩
#Choto_Dairy_01
হাসপাতালের করিডোর দিয়ে পুলিশের বুটের আওয়াজ আর রাঘবের পালিয়ে যাওয়ার চিৎকার আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। কিন্তু কেবিনের ভেতরের বাতাস তখনো এক ভয়ানক আতঙ্কে ভারী হয়ে আছে। রাঘব নেই, কিন্তু ওর শেষ কথাগুলো—“এবার আর জ্যান্ত ফিরবে না”—আমার কানের কাছে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছিল।
নার্স ফাতেমা আপা মেঝেতে বসে হাঁপাচ্ছিলেন, ওনার গলার কাছে রাঘবের ছুরির ফলায় সামান্য কেটে রক্ত জমছে। ডাক্তারবাবু আর অন্য নার্সরা ছুটে এসে ওনাকে ধরলেন। কিন্তু আমার চোখ তখনো মেঝেতে কুঁকড়ে পড়ে থাকা নয়নার দিকে।
আমার পনেরো বছরের মেয়েটা, যে একটু আগেও পাথরের মতো শক্ত হয়ে বাবার হয়ে মিথ্যা বলছিল, সে এখন একটা ছোট বাচ্চার মতো নিজের হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁপছে।
“নয়না…” আমি ভাঙা গলায় ডাকলাম। প্রতিবার কথা বলার চেষ্টায় আমার পাঁজরের ভেতরটা মনে হচ্ছিল কেউ করাত দিয়ে কাটছে। “নয়না, আমার কাছে আয় মা…”
নয়না মুখ তুলল। ওর চোখ দুটো রক্তবর্ণ, ঠোঁট কামড়ে ধরার কারণে সেখান থেকে সামান্য রক্ত বেরোচ্ছে। ও হামাগুড়ি দিয়ে আমার বিছানার পাশে এসে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“আম্মু, বাবা একটা রাক্ষস! ও একটা জলজ্যান্ত মানুষকে…” নয়না আর বলতে পারল না, ওর গলা কান্নায় বুজে এলো।
ঠিক তখনই ইন্সপেক্টর বাবু ঘরে ঢুকলেন। ওনার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, মুখটা থমথমে। বোঝা গেল, রাঘবকে ধরা যায়নি। ও হাসপাতালের পেছনের দেওয়াল টপকে মেইন রোডের ভিড়ে মিশে গেছে।
ইন্সপেক্টর নয়নার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন। ওনার গলার স্বর এবার কিছুটা নরম। “নয়না মা, ভয় পেও না। তোমার বাবা আর এখানে আসতে পারবে না। কিন্তু আমাদের ওই লাশটার পরিচয় জানতে হবে। কাল রাতে তোমার বাবা তোমাকে নিয়ে কোথায় গিয়েছিল? আর ওই ব্যাগের ভেতর হাতুড়িটা তুমি কেন লুকিয়েছিলে?”
নয়না আমার দিকে তাকাল, যেন ও এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে রাঘব সত্যিই চলে গেছে। আমি ওর হাতটা একটু চাপ দিয়ে ইশারা করলাম সব বলে দিতে।
নয়না চোখ মুছে বলতে শুরু করল, “কাল রাত তখন আনুমানিক বারোটা। আম্মুকে ওভাবে মারার পর বাবা আমাকে বলল জামাকাপড় পরে নিতে। বাবা যখন খুব রেগে থাকে, তখন ওনার কথার অবাধ্য হওয়া মানেই মৃত্যু। আমি বাধ্য মেয়ের মতো ওনার গাড়িতে উঠলাম। বাবার হাতে একটা কালো ব্যাগ ছিল। গাড়িটা ঢাকা শহরের বড় রাস্তা ছেড়ে বুড়িগঙ্গার দিকে একটা নির্জন গলির ভেতর গিয়ে থামল।”
নয়না থামল। ও একটা বড় শ্বাস নিয়ে আবার বলল, “সেখানে একটা পুরনো আড়ত ঘরের মতো ছিল। বাবা আমাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে ভেতরে গেল। প্রায় বিশ মিনিট পর ভেতরে একটা ধস্তাধস্তির শব্দ হলো, আর তারপর একটা গোঙানির আওয়াজ। আমি ভয়ে গাড়ির সিটের নিচে লুকিয়ে পড়লাম। আরও কিছুক্ষণ পর বাবা হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এলো। ওনার শার্টে রক্ত ছিল। ওনার হাতের ওই হাতুড়িটা আমার স্কুল ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল—‘যদি পুলিশ বা তোর মা একটাও প্রশ্ন করে, বলবি তুই এটা দিয়ে স্কুলের প্রোজেক্টের কাঠ কাটছিলি। আর যদি মুখ খুলিস, তবে তোর মাকে কাল সকালেই বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেব’।”
ইন্সপেক্টর নোটবইয়ে চটপট কিছু লিখে নিলেন। “কিন্তু নয়না, নদীর পাড়ে যে লাশটা পাওয়া গেছে, ডাক্তারবাবু বললেন ওটার রক্তের গ্রুপ আর এই হাতুড়ির রক্ত এক। তুমি কি ওই লোকটাকে চিলতে দেখেছিলে?”
নয়না মাথা নাড়ল। “না স্যার। কিন্তু বাবার ফোনালাপ থেকে আমি একটা নাম শুনেছিলাম। বাবা গাড়িতে বসে কাউকে বলছিল—‘সুলেমানকে চিরকালের মতো ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। এবার ফাইলগুলো আমার হাতে।’”
‘সুলেমান!’
নামটা শুনতেই আমার মাথার ভেতর যেন একটা বজ্রপাত হলো। আমার শরীর কাঁপতে লাগল। বিশ বছর আগের একটা পুরনো, ধূলিজমা স্মৃতি এক ঝটকায় আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
“আয়েশা বেগম? আপনি এই সুলেমান নামের কাউকে চেনেন?” ইন্সপেক্টর আমার মুখের ভাব পরিবর্তন দেখে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।
আমি শুকনো ঢোক গিললাম। আমার গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ। “সুলেমান… সুলেমান ছিল রাঘবের বড় ভাইয়ের পার্টনার। আজ থেকে বিশ বছর আগে, আমাদের বিয়ের ঠিক এক বছর পর, রাঘবের ভাই একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। কিন্তু পাড়ার মানুষ ফিসফিস করত যে ওটা দুর্ঘটনা ছিল না। আর সেই ঘটনার পর থেকেই সুলেমান উধাও হয়ে গিয়েছিল। রাঘব সবসময় বলত সুলেমান নাকি ভাইয়ের সব টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে।”
“তার মানে সুলেমান পালায়নি,” ইন্সপেক্টর গম্ভীর গলায় বললেন। “ও হয়তো এই শহরেই লুকিয়ে ছিল। আর রাঘব এত বছর পর ওনাকে খুঁজে বের করে খুন করেছে। কিন্তু কেন? ওই ফাইলে কী এমন আছে?”
ঠিক তখনই কেবিনের দরজা ঠেলে একজন জুনিয়র পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকলেন। ওনার হাতে একটা ছোট ডায়েরি, যা রাঘবের ফেলে যাওয়া পকেট থেকে পাওয়া গেছে।
“স্যার, রাঘবের মানিব্যাগ আর এই পকেট ডায়েরিটা ও তাড়াহুড়োয় ফেলে গেছে। এটাতে কিছু অদ্ভুত কোড আর একটা ঠিকানা লেখা আছে,” অফিসারটি ডায়েরিটা ইন্সপেক্টরের হাতে দিলেন।
ইন্সপেক্টর ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা জায়গায় গিয়ে থমকে গেলেন। ওনার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আয়েশা বেগম, রাঘব কি কখনো আপনাদের কোনো গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছে? এখানে ‘মিরপুর ১০, ব্লক-সি’ এর একটা পরিত্যক্ত বাড়ির নম্বর লেখা আছে, আর তার পাশে লেখা—‘আয়েশার শেষ ঠিকানা’।”
আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। মিরপুরের ওই বাড়িটা আমার বাবার বাড়ি ছিল! বাবার মৃত্যুর পর রাঘব জালিয়াতি করে ওটা নিজের নামে লিখে নিয়েছিল এবং গত পাঁচ বছর ধরে ওটা তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ওটাকে ও ‘আমার শেষ ঠিকানা’ কেন লিখে রেখেছে?
তাহলে কি রাঘব আমাকে হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ওখানেই চিরদিনের মতো শেষ করে দেওয়ার ছক কষেছিল?
ইন্সপেক্টর চট করে ওনার ওয়াকিটকি বের করলেন। “সবাই শোন, মিরপুর ১০ নম্বর ব্লকের ওই ঠিকানায় এক্ষুনি ফোর্স পাঠাও। রাঘব ওখানে লুকিয়ে থাকতে পারে। আর ল্যাব থেকে যে রাসায়নিকগুলো চুরি গেছে, ওগুলো খুব বিপজ্জনক। ও ওগুলো দিয়ে কী করতে চায় আমাদের জানতে হবে।”
পুলিশ অফিসাররা কেবিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই, নয়না হঠাৎ আমার হাতটা আরও জোরে চেপে ধরল। ওর চোখ দুটো এবার আতঙ্কে চড়কগাছ হয়ে গেছে।
“আম্মু… একটা ভুল হয়ে গেছে!” নয়না ফিসফিস করে বলল।
“কী ভুল মা?” আমি আশঙ্কায় শিউরে উঠলাম।
নয়না কেবিনের দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে কেঁদে উঠল, “বাবা যখন আমাকে বাইরে জুস খেতে পাঠিয়েছিল, তখন ওনার ফোনটা আমার কাছেই ছিল। বাবা আমার কানে ফিসফিস করে একটা কথা বলেছিল, যা আমি ভয়ে পুলিশকে বলতে ভুলে গেছি।”
“কী বলেছিল রাঘব?” নার্স ফাতেমা আপাও এগিয়ে এলেন।
নয়না কাঁপতে কাঁপতে বলল, “বাবা বলেছিল—‘পুলিশকে তোরা যা ইচ্ছে বলিস। কিন্তু মনে রাখিস, তোদের মুক্তি এত সহজ নয়। আজ দুপুর ২টোর সময় তোর মায়ের স্যালাইনের বোতলে এমন একটা জিনিস মিশিয়ে দিয়ে এসেছি, যা তোরা কেউ টের পাবি না। ২টোর পর আয়েশা এমনিতেই শেষ!’”
আমি চমকে দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালাম। ঘড়ির কাঁটায় তখন একটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট! আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি! আমার হাতের দিকে তাকালাম, স্যালাইনের ফোঁটা ফোঁটা তরল তীব্র গতিতে আমার শিরার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে!
চলবে...
(৪র্থ পর্বে চোখ রাখুন)
