সাদা বালিশের আড়ালে
পর্ব: ০২
লেখনীতে: চোটো ডায়েরি ০১
ডাক্তারের মুখের কথাগুলো যেন রিভলবারের গুলির মতো এসে আমার বুকে বিঁধল। আঠারো বছর আগের কাগজ? কীসের কাগজ? আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একবার ডাক্তারের দিকে, আরেকবার আরশাদের দিকে تাকালাম।
আরশাদ তখনো চোখ বন্ধ করে আছে। তার ফর্সা কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম নেমে আসছে। যে মানুষটাকে আঠারোটা বছর ধরে পাথরের মতো শক্ত আর অবিচল দেখে এসেছি, সেই মানুষটাকে আজ এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে আমার ভেতরের অচেনা এক ভয় শাঁ শাঁ করে জেগে উঠল।
"কীসের কাগজ ডাক্তার সাহেব? দয়া করে পরিষ্কার করে বলুন। আমি কিছুই জানি না।" আমার গলা কাঁপছিল।
ডাক্তার বাবু চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে হলুদ ফাইলটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, "আজ থেকে ঠিক আঠারো বছর আগে, মিস্টার আরশাদের একটা মেজর এক্সিডেন্ট হয়েছিল। আপনার কি মনে আছে?"
স্মৃতির পাতাগুলো ওলটপালট করে হুড়মুড় করে একটা দিন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। হ্যাঁ, মনে আছে। মগবাজারের সেই অভিশপ্ত বৃষ্টির রাতের ঠিক এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। আরশাদ অফিস থেকে ফেরার পথে একটা মিনিবাসের ধাক্কায় মারাত্মক আহত হয়েছিল। সেদিন তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। কিন্তু সে আমাকে হাসপাতালে যেতে দেয়নি। তার এক দূর সম্পর্কের ভাই তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করিয়েছিল এবং তিন দিন পর আরশাদ যখন বাড়ি ফেরে, তার সারা গায়ে ব্যান্ডেজ ছিল।
আমি ভেবেছিলাম, স্রষ্টা বুঝি আমার পাপের শাস্তি আরশাদকে দিয়ে দিচ্ছেন। অপরাধবোধে আমি তখন এতই ম্রিয়মাণ ছিলাম যে, কোনো মেডিকেল ফাইল বা রিপোর্টের দিকে তাকানোর সাহস আমার হয়নি। আরশাদও বাড়ি ফিরে শুধু বলেছিল, "সামান্য চোট লেগেছে, ঠিক হয়ে যাবে।"
"হ্যাঁ ডাক্তার সাহেব, মনে আছে।" আমি বললাম।
ডাক্তার কাগজটার একটা নির্দিষ্ট লাইনে আঙুল রেখে বললেন, "সেদিন শুধু সামান্য চোট লাগেনি, মিসেস নয়না। সেই সড়ক দুর্ঘটনায় মিস্টার আরশাদের স্পাইনাল কর্ডের নিচের অংশ এবং পেলভিক নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যার ফলে উনি চিরতরে ওনার পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ, ওনার শরীর কোনোদিন কোনো নারীর স্পর্শ পাওয়ার বা স্পর্শ করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলেছিল।"
ডাক্তারের কথাগুলো শোনার পর ঘরের ফ্যানটা যেন অনেক জোরে ঘুরতে লাগল। চারপাশের দেয়ালগুলো দুলতে লাগল। আমার কানের ভেতর একটা তীব্র ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হতে লাগল।
ডাক্তার বলতে থাকলেন, "এই যে দেখুন ওনার সই। ওনার ডাক্তার তখন ওনাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন যে কোনো চিকিৎসার মাধ্যমেই ওনাকে আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো সম্ভব নয়। মিস্টার আরশাদ নিজেই ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিলেন, এই সত্যটা যেন ওনার পরিবারের কেউ, বিশেষ করে ওনার স্ত্রী যেন কখনো জানতে না পারে। মেডিকেল রিপোর্টে সেটা গোপন রাখার বন্ড সই দিয়ে এসেছিলেন উনি।"
আমি পাথরের মতো বসে রইলাম। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল না, চোখ দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল।
আঠারো বছর! আঠারোটা বছর ধরে আমি যে সাদা বালিশটাকে আমার পাপের শাস্তি, আরশাদের ঘৃণা আর প্রতিশোধের দেয়াল ভেবে এসেছি—সেটা আসলে কোনো প্রতিশোধ ছিল না?
আমি আরশাদের দিকে তাকালাম। আরশাদ এতক্ষণে চোখ খুলেছে। তার চোখে এখন আর কোনো অহংকার নেই, কোনো বরফ শীতল চাউনি নেই। সেখানে শুধু এক চরম অসহায়ত্ব আর লজ্জার পাহাড়। সে আমার দিকে তাকাতে পারছিল না, মুখটা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।
ক্লিনিক থেকে বের হয়ে আমরা যখন গাড়িতে উঠলাম, দুজনেই নীরব। ঢাকার চেনা জ্যাম, হর্নের আওয়াজ, মানুষের কোলাহল—সবকিছুকে ছাপিয়ে গাড়ির ভেতরের নীরবতাটা যেন আমাদের গ্রাস করতে আসছিল।
বাসায় ফিরে আরশাদ সোজা শোবার ঘরে চলে গেল। আমি ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে রইলাম। ঘরের প্রতিটি কোনা, ডাইনিং টেবিল, দেয়ালঘড়ি—সবকিছু যেন আমাকে দেখে উপহাস করছে।
আমি নিজেকে অপরাধী ভাবতাম। ভাবতাম, আমার পাপের কারণে আরশাদ আমাকে ছোঁয় না। আমি নিজেকে তিলে তিলে শেষ করেছি, লিপস্টিক দিয়েছি, নতুন শাড়ি পরেছি, তার একটুখানি মনোযোগের জন্য ভিক্ষুকের মতো অপেক্ষা করেছি। আর আরশাদ? সে প্রতি রাতে ওই সাদা বালিশটা can মাঝখানে রেখে নিজের অক্ষমতা ঢেকে রাখত! সে তার পুরুষালি অহংকার আর আত্মসম্মান বাঁচাতে আমার অপরাধবোধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে!
সন্ধ্যা নেমে এল। ঘরে কোনো আলো জ্বলছিল না। আমি অন্ধকারেই উঠে দাঁড়ালাম এবং ধীর পায়ে শোবার ঘরের দিকে গেলাম।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম আরশাদ বিছানার এক কোণে বসে আছে। মাঝখানে যথারীতি সেই সাদা বালিশটা রাখা। আঠারো বছরের অভ্যস্ত দৃশ্য। কিন্তু আজ এই বালিশটা দেখে আমার ঘৃণা হতে লাগল।
আমি এগিয়ে গেলাম। বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে ঝটকা মেরে সেই সাদা বালিশটা মেঝেতে ফেলে দিলাম।
আরশাদ চমকে আমার দিকে তাকাল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল।
"কেন করলে এমন আরশাদ?" আমার গলা দিয়ে চিৎকার বের হলো না, এক অদ্ভুত ফিসফিসে হিংস্র আওয়াজ বের হলো। "কেন আঠারোটা বছর ধরে আমাকে জ্যান্ত কবর দিলে? নিজের অক্ষমতা ঢাকার জন্য তুমি আমার অপরাধবোধকে অস্ত্র বানালে? আমি ভাবতাম তুমি দেবতা, আর তুমি আসলে এক নিষ্ঠুর অভিনেতা!"
আরশাদ কোনো কথা বলল না। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। কিন্তু তার এই কান্না আজ আমার মন গলাতে পারল না।
আমি যখন রাগে কাঁপছি, ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। আমাদের বড় ছেলে আবির অফিস থেকে ফিরে এসেছে। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকাল। মেঝেতে পড়ে থাকা বালিশ আর আমাদের থমথমে মুখ দেখে সে বলল, "মা, বাবা... কী হয়েছে তোমাদের? কোনো সমস্যা?"
আরশাদ চট করে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আবির এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখা সেই পুরনো হলদে ফাইলটার দিকে হাত বাড়াল, যেটা আমি ক্লিনিক থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম।
আরশাদ চিৎকার করে উঠল, "আবির, ওটাতে হাত দিও না!"
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। আবির ফাইলটা তুলে নিয়েছে। আর সেই ফাইলের ভেতর থেকে শুধু ডাক্তারের রিপোর্ট নয়, একটা ভাঁজ করা পুরনো চিঠি মেঝেতে পড়ে গেল।
চিঠিটার ওপরে ধুলোবালি মাখা হাতের লেখায় লেখা—"সাজিদ"।
আমার হৃদস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে গেল। আঠারো বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সাজিদের চিঠি আরশাদের এই গোপন ফাইলে কী করছে?
চিঠিটার ওপরে 'সাজিদ' নামটা দেখামাত্রই আমার পায়ের নিচের মাটি যেন আরও একবার সরে গেল। আঠারো বছর আগের সেই অভিশপ্ত নাম, যা আমি আমার মন থেকে, আমার স্মৃতি থেকে চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিলাম—সেটা আজ এই ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে।
আবির নিচু হয়ে চিঠিটা তুলতে গেল। আমি কোনো কিছু না ভেবেই চিৎকার করে উঠলাম, "আবির! ওটা ধরো না!"
আমার চিৎকারে আবির চমকে হাতটা গুটিয়ে নিল। সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল, তারপর আরশাদের দিকে। আরশাদ তখন খাটের কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে, তার পুরো শরীর কাঁপছে। বাতাসে তখন এক দমবন্ধ করা নীরবতা।
"কী হচ্ছে এই ঘরে মা? তোমরা দুজনেই এমন করছ কেন? আর এই ফাইলটাই বা কীসের?" আবির সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করল।
আমি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, "কিছু না বাবা। ওটা তোর বাবার অফিসের পুরনো কিছু রিটায়ারমেন্টের কাগজ। তুই সারাদিন অফিস করে এসেছিস, যা ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নে। আমরা একটু কথা বলছি।"
আবির সহজে দমবার পাত্র নয়, কিন্তু আমাদের মুখের অস্বাভাবিক থমথমে ভাব দেখে সে আর কথা বাড়াল না। ফাইলটা টেবিলের ওপর রেখে একনজর আমাদের দিকে তাকিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ড্রয়িংরুমের দরজাটা আটকে যাওয়ার শব্দ হতেই আমি ঝড়ের বেগে এগিয়ে গিয়ে মেঝে থেকে চিঠিটা তুলে নিলাম।
কাগজটা পুরনো, হলদেটে হয়ে গেছে। ভাঁজ খুলতেই সাজিদের সেই চেনা হাতের লেখা আমার চোখে পড়ল। কিন্তু চিঠির ভেতরের কথাগুলো পড়তে পড়তে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসতে লাগল।
চিঠিতে লেখা ছিল:
"মিস্টার আরশাদ,
আপনার স্ত্রী নয়নাকে আমি ভালোবাসি না, আর ওকেও আমি আমার জীবনে চাই না। ও একটা বোকা মেয়ে, যে সামান্য একটু মিষ্টি কথায় নিজের সবকিছু হারিয়ে আমার কাছে চলে এসেছিল। পুরান ঢাকার হোটেলে ও নিজেই ওনার গহনাগুলো আমার কাছে রেখে এসেছিল একটা নতুন ব্যবসার পুঁজি হিসেবে। আমি সেই গহনাগুলো বিক্রি করে টাকা পেয়ে গেছি। নয়না এখন আপনার মাথা ব্যথার কারণ, আমার নয়। ও যদি আর আমার কাছে আসার চেষ্টা করে, আমি নিজেই ওকে তাড়িয়ে দেব। ওনার মতো সস্তা মেয়েকে নিয়ে সংসার করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। টাকাটা আমি ফেরত দেব না। পারলে কিছু করে নিয়েন।"
চিঠিটা পড়া শেষ করে আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না। ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লাম। আমার চোখের সামনে তখন আঠারো বছর আগের মগবাজারের সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলটা ভাসছে। সাজিদ আমার কাছে টাকা চেয়েছিল, বলেছিল সে একটা বড় বিপদে পড়েছে। আমি অন্ধের মতো বিশ্বাস করে আমার বিয়ের শেষ গহনাটুকু তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আর সেই মানুষটা... সেই মানুষটা আরশাদকে এই চিঠি লিখেছিল?
"সেদিন..." আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছিল না। আমি আরশাদের দিকে তাকালাম। "সেদিন মগবাজারের রাতে যখন আমি বাড়ি ফিরি... তুমি আমার গলার শূন্য চেইনের দিকে তাকিয়ে বলেছিলে আমার গা থেকে অন্য পুরুষের গন্ধ আসছে। তুমি এই চিঠিটা তার আগেই পেয়েছিলে, তাই না আরশাদ?"
আরশাদ ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে এখন আর জল নেই, সেখানে এক বিষাক্ত হাহাকার।
"হ্যাঁ, পেয়েছিলাম," আরশাদ খুব শান্ত গলায় বলল। "সেদিন দুপুরে সাজিদ নিজে আমার অফিসে এসে এই চিঠিটা আমার টেবিলে ফেলে দিয়ে যায়। সাথে একটা ঠিকানাও দিয়ে যায়—পুরান ঢাকার সেই হোটেলের ঠিকানা। সে আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, আমি যদি 'পুরুষ' হই, তবে যেন গিয়ে আমার স্ত্রীকে ওখান থেকে ধরে নিয়ে আসি।"
আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন কেউ হাত দিয়ে চিপে ধরল। "তাহলে... তাহলে তুমি সেদিন হোটেলে এসেছিলে?"
"গিয়েছিলাম," আরশাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল। "কিন্তু আমি যখন পৌঁছালাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমি দেখলাম তুমি হোটেল থেকে বের হয়ে একটা রিকশায় উঠছ। তোমার চোখে-মুখে তখন এক তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জার ছাপ। আমি চাইলে সেদিন হোটেলের ভেতরেই সাজিদকে খুন করতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। আমি বাড়ি ফিরে এসে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। দেখতে চেয়েছিলাম তুমি নিজের মুখে স্বীকার করো কি না।"
আমি দুহাতে নিজের মুখ ঢাকলাম। আঠারোটা বছর ধরে আমি নিজেকে যে নরকের আগুনে পুড়িয়েছি, তার চেয়েও বড় নরক আরশাদ আমার জন্য তৈরি করে রেখেছিল।
"তুমি সব জানতে আরশাদ... তুমি জানতে সাজিদ আমাকে ব্যবহার করেছে, ধোঁকা দিয়েছে। তাও তুমি আমাকে ক্ষমা করোনি?" আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম।
"কীভাবে ক্ষমা করতাম নয়না?" আরশাদ আচমকা চিৎকার করে উঠল। "সাজিদ আমার অহংকারে আঘাত করেছিল। সে আমার অফিসে গিয়ে আমার সহকর্মীদের সামনে আমাকে অপমান করতে চেয়েছিল। আর তার ঠিক এক সপ্তাহ পর... যখন আমার সেই এক্সিডেন্টটা হলো, আর ডাক্তার বলল আমি চিরতরে অক্ষম হয়ে গেছি... আমার ভেতরের পুরুষটা সেদিন পুরোপুরি মরে গিয়েছিল। আমি ভাবলাম, ঈশ্বর আমার সাথে রসিকতা করেছেন। যে স্ত্রীর পরকীয়ার প্রতিশোধ আমি নিতে চেয়েছিলাম, প্রকৃতি আমাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করাল যে আমি আর কোনোদিন কোনো নারীর স্বামী হওয়ার যোগ্যই রইলাম না।"
আরশাদ খাট থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। "তুমি ভাবছ আমি নাটক করেছি? হ্যাঁ, করেছি। যখন আমি জানলাম আমি অক্ষম, তখন আমার মাথায় একটা কুৎসিত বুদ্ধি খেলে গেল। আমি ভাবলাম, আমি যদি তোমাকে বলি যে আমি শারীরিকভাবে অক্ষম, তুমি হয়তো আমাকে করুণা করতে। কিংবা তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে। সমাজ ভাবত, আরশাদ একটা অপূর্ণাঙ্গ পুরুষ, তাই তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি সেই করুণা আর অপমান সইতে পারতাম না নয়না। তাই আমি তোমার অপরাধবোধকে হাতিয়ার বানালাম। মাঝখানে ওই সাদা বালিশটা রেখে তোমাকে বোঝালাম—শাস্তিটা আমি দিচ্ছি। অথচ আসল সত্য হলো, শাস্তিটা প্রকৃতি আমাকে দিয়েছিল, আর আমি তার দায় তোমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলাম।"
আমি আরশাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই মানুষটাকে আমি আঠারো বছর ধরে ভালোবেসেছি, ভয় পেয়েছি, শ্রদ্ধা করেছি। আর আজ মনে হচ্ছে, আমার সামনে কোনো চেনা মানুষ বসে নেই, একটা হিংস্র মুখোশধারী রূপ দাঁড়িয়ে আছে।
"কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ নয় নয়না," আরশাদ হঠাৎ এক অদ্ভুত হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক গা শিউরে ওঠা রহস্য। "তুমি কি জানো, আঠারো বছর আগে সাজিদের সেই এক্সিডেন্টটা কীভাবে হয়েছিল? যে এক্সিডেন্টে সে পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল এবং তার ঠিক দুদিন পর সে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়?"
আমার বুকের ভেতর একটা নতুন ঝড় আছড়ে পড়ল। সাজিদের এক্সিডেন্ট হয়েছিল? আমি তো তা জানতাম না!
আমি কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলাম, "কী বলতে চাইছ তুমি আরশাদ?"
আরশাদ আমার দিকে এক কদম এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "মগবাজারের মোড়ে যে মিনিবাসটা আমাকে ধাক্কা দিয়েছিল... সেই বাসটার নিচে আমি একা ছিলাম না নয়না। সাজিদকে আমি নিজেই টেনে এনেছিলাম সেই বাসের নিচে..."
(চলবে)
