সম্মানের খতিয়ান
পর্ব: ০২
থালাটা ডাস্টবিনে ফেলার শব্দটা যেন সারা বাড়িতে একটা ভূমিকম্পের মতো আছড়ে পড়ল। কমলা দেবী সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর চোখেমুখে বিস্ময় আর রাগ।
"রাঘব! এটা কী করলি? লক্ষ্মী ছুঁড়ে ফেললি?" কমলা দেবীর গলায় কাঁপুনি।
রাঘব শান্ত গলায় উত্তর দিল, "মা, যেখানে মানুষের সম্মান নেই, সেখানে লক্ষ্মী থাকেন না। তোমরা যে খাবার ওকে খেতে দিয়েছিলে, সেটা খাবার নয়—সেটা ছিল তোমাদের অবহেলার অবশিষ্টাংশ।"
নিতিন আর পূজা অস্বস্তিতে একে অপরের দিকে তাকাল। পূজা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, "দাদা, তুমি মিছিমিছি সিন ক্রিয়েট করছ। আমরা তো আর ইচ্ছে করে শেষ করিনি।"
রাঘব পূজার দিকে ফিরে তাকাল। তার দৃষ্টিতে এমন এক শীতলতা ছিল যে পূজা তক্ষুনি চুপ করে গেল। রাঘব বলল, "পূজা, তুই আজ মাছের সবচেয়ে বড় পেটিটা খেয়েছিস। একবারও কি তোর মনে হলো না যে তোর বৌদি সকাল ৬টা থেকে উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে এই রান্নাটা করেছে? নিতিন, তুই তো বললি মাছটা খুব ভালো হয়েছে, কিন্তু যে মানুষটা রান্না করল, তাকে এক টুকরো মাছ দেওয়ার কথা কি তোর মনে পড়ল না?"
অঞ্জলি শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াচ্ছিল। সে কোনোদিন রাঘবকে এভাবে কথা বলতে দেখেনি। সে ফিসফিস করে বলল, "থাক না, আমি ম্যানেজ করে নিতাম। তুমি শুধু শুধু ঝগড়া কোরো না।"
"ম্যানেজ তুমি আজ ৫ বছর ধরে করছ অঞ্জলি," রাঘব তার স্ত্রীর হাত ধরে তুলল। "কিন্তু আজ থেকে আর নয়।"
রাঘব আলমারি থেকে তার মানিব্যাগ আর ফোনটা তুলে নিল। তারপর কমলা দেবীর দিকে তাকিয়ে বলল, "মা, তুমি বলেছিলে না অঞ্জলি সব সময় পরেই খায়? আজ থেকে এই নিয়মটা বদলে গেল। আজ ও সবার আগে খাবে, আর সেটা এই বাড়িতে নয়।"
"মানে? কোথায় যাচ্ছিস তোরা?" কমলা দেবী আর্তনাদ করে উঠলেন।
রাঘব কোনো উত্তর দিল না। সে অঞ্জলিকে নিয়ে বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। নিতিন পেছনে পেছনে এসে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, "ভাই, বাইরের লোক জানলে কী বলবে? একটা মাছের টুকরোর জন্য তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিস?"
রাঘব দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরল। "বাইরের লোক কী বলবে সেটা বড় কথা নয় নিতিন, ঘরের লোক কী ভাবছে সেটাই বড়। আজ মাছের টুকরো দিয়ে শুরু হয়েছে, কাল হয়তো অঞ্জলির অস্তিত্ব নিয়েই তোমরা প্রশ্ন তুলবে। তোমাদের সবার পেট ভরেছে, কিন্তু আমার স্ত্রীর পেট আজ খালি। আর একজন স্বামী হিসেবে আমি সেটা মেনে নিতে পারছি না।"
রাঘব অঞ্জলিকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। উত্তর কলকাতার সেই পুরনো গলিতে তখন রোদের তেজ কমতে শুরু করেছে। অঞ্জলি যেন ঘোরের মধ্যে হাঁটছিল। তার দুচোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছে, কিন্তু এই জল অপমানের নয়, এই জল এক অদ্ভুত মুক্তির।
রাঘব একটা রিকশা ডাকল। "চলো, আজ তোমার প্রিয় রেস্তোরাঁয় গিয়ে আমরা দুজনে মন ভরে খাব। তারপর বাচ্চাদের জন্য নিয়ে আসব।"
রিকশায় বসে অঞ্জলি রাঘবের হাতটা শক্ত করে ধরল। সে বুঝতে পারল, এতদিন সে শুধু এই বাড়িটাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আজ রাঘব তাকে আগলে নিল। বাড়ির ভেতর তখন শ্মশানের নীরবতা। কমলা দেবী বুঝতে পারছেন না ভুলটা ঠিক কোথায় ছিল, আর পূজা-নিতিন প্রথমবারের মতো অনুভব করল যে 'মাছের কাঁটা' শুধু খাবারের অংশ নয়, সেটা ছিল কারো হৃদয়ে বিঁধে থাকা অপমানের তীক্ষ্ণ শলাকা।
রেস্তোরাঁয় বসে রাঘব যখন অঞ্জলির পাতে মাছের বড় এক টুকরো তুলে দিল, অঞ্জলি দেখল রাঘবের চোখে এক নতুন প্রতিজ্ঞা। আজ হয়তো সে শুধু একবেলা খেল না, আজ সে তার হারিয়ে যাওয়া সম্মানটুকু ফিরে পেল।
#সম্মানের_খতিয়ান
পর্ব: ০২
#Choto_Dairy_01
