সম্মানের খতিয়ান
পর্ব: ০৩+শেষ পর্ব
রেস্তোরাঁর এসি-র ঠান্ডা বাতাসেও অঞ্জলির বুকের ভেতরটা তখনো ধকধক করছিল। রাঘব নিজে হাতে মেনু কার্ড দেখে অঞ্জলির পছন্দের সব পদ অর্ডার করল। কিন্তু অঞ্জলির গলা দিয়ে যেন খাবার নামছে না।
রাঘব লক্ষ্য করল অঞ্জলির হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। সে আলতো করে অঞ্জলির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। "খাওয়া শুরু করো অঞ্জলি। আজ আর কোনো 'কিন্তু' বা 'যদি' নেই। আজ শুধু তুমি আর তোমার অধিকার।"
অঞ্জলি ধরা গলায় বলল, "বাড়িতে ওরা কি কিছু খেয়েছে? মা রেগে আছেন, পূজা হয়তো না খেয়েই বসে থাকবে..."
রাঘব একটু হেসে বলল, "যারা অন্যের থালার শেষ টুকরোটা পর্যন্ত নির্দ্বিধায় খেয়ে নিতে পারে, তাদের জন্য তোমার দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তারা নিজেদের ব্যবস্থা করে নেবে। আজ তুমি নিজের কথা ভাবো তো।"
প্রথম গ্রাসটা মুখে দিতেই অঞ্জলির মনে পড়ে গেল গত পাঁচ বছরের প্রতিটি দুপুরের কথা। কতবার ডালের বাটি ধুয়ে সেই জল দিয়ে সে ভাত খেয়েছে, কতবার কেবল নুন আর লঙ্কা দিয়ে তার পেট ভরেছে—সে হিসেব কেউ রাখেনি। আজ রাঘবের দেওয়া প্রতিটি লোকমা যেন সেই অপমানের ক্ষতে প্রলেপ দিচ্ছিল।
অন্যদিকে, উত্তর কলকাতার সেই পুরনো বাড়িতে তখন গুমোট অন্ধকার। কমলা দেবী বিছানায় শুয়ে কপালে বাম ঘষছেন। পূজা আর নিতিন ডাইনিং টেবিলে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মুখে কোনো কথা নেই। টিভির আওয়াজটাও বন্ধ।
নিতিন বিরক্ত হয়ে বলল, "দাদাটা ইদানীং বেশিই বাড়াবাড়ি করছে। একটা সামান্য মাছের জন্য মা-কে অতগুলো কথা শুনিয়ে চলে গেল?"
পূজা টেবিলের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, "কিন্তু মেজদা যে কথাগুলো বলল... সত্যিই তো, আমরা কি একবারও বৌদির কথা ভেবেছিলাম? মা, তুমিই তো বলেছিলে ও পরে খাবে।"
কমলা দেবী উঠে বসে ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "আমি কি না খাইয়ে রাখতে বলেছি? ও তো বাড়ির বউ, ওর দায়িত্ব সবাইকে খাওয়ানো। আমাদের কালে তো আমরা কতবার না খেয়ে থেকেছি, কৈ আমাদের স্বামীরা তো এভাবে হাত ধরে রেস্তোরাঁয় নিয়ে যায়নি!"
ঠিক তখনই সদর দরজায় চাবির শব্দ হলো। রাঘব আর অঞ্জলি ফিরল। তাদের হাতে খাবারের কয়েকটা প্যাকেট।
রাঘব সোজা রান্নাঘরে গিয়ে খাবারগুলো রাখল। তারপর বৈঠকখানায় এসে সবার সামনে দাঁড়াল। কমলা দেবী মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
রাঘব বলল, "বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। আর মা, তোমার জন্য তোমার প্রিয় সন্দেশ। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার করে বলে দিই—আজ থেকে এই বাড়িতে রান্নার দায়িত্ব অঞ্জলির একার নয়। সপ্তাহে দুদিন বাইরের খাবার আসবে, আর বাকি দিনগুলোতে নিতিন আর পূজা ওকে সাহায্য করবে।"
নিতিন লাফিয়ে উঠল, "আমি রান্নায় সাহায্য করব? আমি অফিস করি রাঘব ভাই!"
"অঞ্জলিও সারাদিন অফিস করে নিতিন, তবে সেটা বিনা বেতনে এবং বিনা ছুটিতে," রাঘব শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল। "যদি এই ব্যবস্থা মেনে নিতে কারো কষ্ট হয়, তবে আগামী মাস থেকে আমি আর অঞ্জলি আমাদের আলাদা ব্যবস্থা করে নেব। মা, তুমিই ঠিক করো—তুমি তোমার পরিবারকে এক সাথে দেখতে চাও, নাকি কেবল এক পক্ষকে সেবা করতে দেখতে চাও?"
কমলা দেবী অবাক হয়ে নিজের বড় ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে রাঘব সবসময় চুপচাপ থাকত, পুনের তপ্ত রোদে ঘাম ঝরিয়ে টাকা পাঠাত, সেই ছেলে আজ যেন এক অন্য মানুষ।
অঞ্জলি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। আজ আর তার চোখে জল নেই। সে বুঝল, সম্মান চেয়ে পাওয়া যায় না, কখনো কখনো সেটা আদায় করে নিতে হয়। আর সেই লড়াইয়ে আজ তার পাশে তার সবচেয়ে বড় শক্তি দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু রাঘবের এই বদলে যাওয়া কি বাড়ির বাকিরা এত সহজে মেনে নেবে? নাকি পর্দার আড়ালে দানা বাঁধছে নতুন কোনো ষড়যন্ত্র?
রাঘবের স্পষ্ট কথার পর ঘরজুড়ে যে স্তব্ধতা নেমে এল, তা ভাঙলেন কমলা দেবী নিজেই। তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছে কাঁপা গলায় বললেন, "তোর আলাদা হওয়ার দরকার নেই খোকা। আমি বুঝতে পারিনি আমার একটা কথা তোদের মনে এত বড় ক্ষত তৈরি করবে।"
নিতিন আর পূজা মাথা নিচু করে রইল। রাঘব এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাত ধরে বলল, "মা, অন্যায় করা যেমন পাপ, মুখ বুজে সহ্য করাও তেমন। অঞ্জলি বাড়ির লক্ষ্মী, ওকে যদি অবহেলা করো তবে এই ঘরের শান্তি কোনোদিন স্থায়ী হবে না।"
পরদিন সকাল থেকেই বাড়ির দৃশ্যপট বদলে গেল।
ভোরবেলায় অঞ্জলি যখন রান্নাঘরে ঢুকল, দেখল পূজা আগে থেকেই চা তৈরি করছে। অঞ্জলিকে দেখে পূজা একটু লজ্জিত হেসে বলল, "বৌদি, তুমি আজ মাছের ঝোলটা করো, আমি বাকি সব আনাজ কেটে দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, তোমার জন্য আলাদা একটা টিফিন বক্স কিনে এনেছি, আগে নিজের ভাগটা তুলে রাখবে, তারপর আমাদের দেবে।"
অঞ্জলি অবাক হয়ে পূজার দিকে তাকিয়ে রইল। পূজার এই পরিবর্তনটা যেন তার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। শুধু পূজা নয়, নিতিনও বাজার থেকে ফেরার সময় অঞ্জলির পছন্দের ফল নিয়ে এল।
দুপুরের খাওয়ার সময় টেবিলটা আজ পূর্ণ। রাঘব আসার আগেই কমলা দেবী অঞ্জলিকে ডেকে বললেন, "বৌমা, আগে তুই বস। আজ আমরা সবাই একসঙ্গে খাব।"
অঞ্জলি মৃদু স্বরে বলল, "কিন্তু মা, আরভ আর মীরাকে খাইয়ে নিয়ে আমি..."
"বাচ্চাদের আজ ওদের বাবা আর পিসিমণি খাওয়াবে, তুই বোস তো!" কমলা দেবী একরকম জোর করেই অঞ্জলিকে চেয়ারে বসালেন।
টেবিলে আজ সাজানো রয়েছে ধোঁয়া ওঠা ভাত আর সেই কষানো রুই মাছের ঝোল। কিন্তু আজ কোনো কাড়াকাড়ি নেই, নেই কোনো তাচ্ছিল্য। রাঘব অঞ্জলির দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। অঞ্জলি অনুভব করল, আজ তার পাতে শুধু মাছের টুকরো নয়, বরং উপচে পড়া সম্মান আর ভালোবাসা রাখা আছে।
খাওয়ার পর রাঘব যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াল, অঞ্জলি পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বিকেলের নরম রোদ তখন ধীরপায়ে উঠোনের দেয়াল ছেড়ে বিদায় নিচ্ছে।
অঞ্জলি নিচু স্বরে বলল, "তুমি না থাকলে আজ হয়তো আমার চোখের জলও ওই মশলার সঙ্গে শুকিয়ে যেত।"
রাঘব অঞ্জলির কাঁধে হাত রেখে বলল, "একটা সংসারে শুধু ভালোবাসা থাকলে চলে না অঞ্জলি, শ্রদ্ধার ভাগটাও সমান হতে হয়। আজ থেকে এই বাড়িতে তোমার পরিচয় শুধু মা বা বৌদি হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হলো।"
দূরে কোথাও শাঁখের আওয়াজ পাওয়া গেল। উত্তর কলকাতার সেই পুরনো পাড়ার বাড়িটা আজ যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। যে বাড়িতে এক সময় অবহেলা রাজত্ব করত, সেখানে আজ শ্রদ্ধার সূর্যোদয় হয়েছে। অঞ্জলি জানালার গ্রিল ধরে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল—আজকের ভাতটা সত্যি খুব মিষ্টি লেগেছে।
#সম্মানের_খতিয়ান
সমাপ্ত
