নিজের নামে ফেরা
পর্ব: ০২+০৩
Choto Dairy_01
সাভার থেকে ঢাকার পথে মিমের গাড়ি যখন ছুটছিল, বাইরের অন্ধকার আকাশটা যেন তার মনের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আজ মিমের চোখে জল নেই, আছে এক অদ্ভুত স্থিরতা। তার হাতে থাকা ফাইলটা সে শক্ত করে চেপে ধরল। জাহিদ ভেবেছে সে মিমের সই জাল করে সব হাতিয়ে নিয়েছে, কিন্তু সে হয়তো ভুলে গেছে—মিম এই সাম্রাজ্য শূন্য থেকে গড়েছে। খুঁটিনাটি সে জাহিদের চেয়ে অনেক ভালো বোঝে।
পরদিন সকাল ১০টা।
ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলের কনফারেন্স রুম। জাহিদ খুব ফিটফাট হয়ে বসে আছে। আজ বিদেশি বিনিয়োগকারী মিস্টার হ্যারিসনের সাথে তার চূড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার কথা। তার পাশে আনিকা বসে আছে মিমের সেই দামী শাড়িটা পরে, যা জাহিদ আলমারি থেকে চুরি করে তাকে উপহার দিয়েছিল।
“চিন্তা করো না আনিকা, আজ থেকে এই প্রজেক্টের মালিক অফিসিয়ালি আমি,” জাহিদ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন মিস্টার হ্যারিসন। কিন্তু তার পেছনে যাকে দেখে জাহিদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, সে আর কেউ নয়—মিম। মিম আজ কোনো সাধারণ শাড়ি নয়, পরেছে একটি গাঢ় নীল রঙের ফরমাল স্যুট। চোখেমুখে এক অদম্য তেজ।
“মিম? তুমি এখানে কেন?” জাহিদ দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল।
মিম কোনো উত্তর দিল না। সে সরাসরি মিস্টার হ্যারিসনের সামনে গিয়ে বসল। মিস্টার হ্যারিসন হেসে বললেন, “মিম, তোমাকে দেখে ভালো লাগল। জাহিদ তো বলছিল তুমি অসুস্থ, তাই আজ আসতে পারবে না।”
মিম হাসল, তবে সে হাসিতে ছিল বরফের শীতলতা। “অসুস্থ ছিলাম জাহিদ, কিন্তু সেটা শরীরে নয়—ভুল মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখায়। তবে এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ।”
জাহিদ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। “মিস্টার হ্যারিসন, আসলে মিম একটু ইমোশনাল হয়ে পড়েছে। ও আর এই কোম্পানির সাথে নেই, সই তো আগেই হয়ে গেছে।”
মিম এবার টেবিলের ওপর একটি ল্যাপটপ রাখল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল জাহিদের জালিয়াতির প্রমাণ। “মিস্টার হ্যারিসন, জাহিদ আপনাকে যে অ্যাডেন্ডাম দেখিয়েছে, তাতে আমার যে সই আছে সেটি ফরেনসিক রিপোর্টে ‘জাল’ প্রমাণিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত চার বছরে এই কোম্পানি থেকে জাহিদ তার নিজের মায়ের অ্যাকাউন্টে যত টাকা সরিয়েছে, তার সব অডিট রিপোর্ট আমার হাতে।”
আনিকা এবার ঘাবড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। “মিম আপু, আপনি এসব কী বলছেন? জাহিদ ভাই তো বলল...”
“চুপ করো আনিকা!” মিম শান্ত স্বরে বলল। “যে চুরির জুতো পরে অন্যের ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নেয়, তার মুখে নীতিবাক্য মানায় না। আর জাহিদ, তুমি বলেছিলে না আমি তোমার পরিচয় ধ্বংস করছি? ভুল। আমি শুধু আমার পরিচয় থেকে তোমার নামটা মুছে দিচ্ছি।”
মিস্টার হ্যারিসন গম্ভীর হয়ে ফাইলটা বন্ধ করলেন। “জাহিদ, আমি জালিয়াতির সাথে কোনো বিজনেস করি না। মিম, এই প্রজেক্টের লাইসেন্স যেহেতু তোমার নামে এবং আইডিয়াগুলো তোমার, তাই আমরা তোমার সাথেই এগোব।”
জাহিদ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “এটা হতে পারে না! মিম, তুমি জানো না আমার মা কী করতে পারে! আমাদের পারিবারিক আভিজাত্য...”
“আভিজাত্য চুরিতে থাকে না জাহিদ, থাকে সততায়,” মিম উঠে দাঁড়াল। “সাভারের ওই বাগানবাড়িটি আমার বাবার টাকায় কেনা। আজ বিকেলের মধ্যে তোমাদের তিনজনকে সেখান থেকে ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে হবে। নোটিশ সার্ভ করা হয়ে গেছে।”
মিম ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একবার থামল। আনিকার দিকে তাকিয়ে বলল, “যে আংটিটা রেহানা বেগম তোমাকে দিয়েছেন, ওটা সাবধানে রেখো। ওটা আসলে আসল হীরে নয়, সিটি গোল্ডের। ঠিক তোমাদের সম্পর্কের মতো।”
মিম করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পেছনে জাহিদের হাহাকার শোনা যাচ্ছে, কিন্তু মিম আর ফিরে তাকাচ্ছে না। সে আজ কোনো স্ত্রীর পরিচয়ে নয়, নিজের নামে ফিরছে।
পর্ব: ০৩
সাভারের সেই বাগানবাড়ি, যেখানে কয়েক ঘণ্টা আগেও উৎসবের আমেজ ছিল, এখন সেখানে শ্মশানের নীরবতা। রেহানা বেগম লিভিং রুমে সোফায় বসে হাপাচ্ছেন। তার হাতে সেই লাল মখমলের বক্স। মিমের কথা শোনার পর থেকেই তার হাত কাঁপছে। তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে মিম এত বড় একটা চাল চালবে।
ঠিক সেই সময় জাহিদ আর আনিকা ঘরে ঢুকল। জাহিদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কেউ তার গালে সজোরে চড় মেরেছে।
“মা! সব শেষ! মিম আমাদের নামে পুলিশের কাছে জালিয়াতির কমপ্লেন করেছে। ব্যাংক আমাদের জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দিয়েছে!” জাহিদ চিৎকার করে বলল।
রেহানা বেগম সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আনিকার দিকে তাকালেন। “তুই? তুই না বললি মিমকে তুই তোর হাতের মুঠোয় রাখবি? ও তো আমাদের রাস্তায় নামিয়ে দিল!”
আনিকা কান্নায় ভেঙে পড়ল। “আমি কী করব মা? মিম আপু যে আড়ালে থেকে এত কিছু করছিল, আমি বুঝতেই পারিনি। আর মিস্টার হ্যারিসন তো ওর কথায় সায় দিল।”
ঠিক তখনই গেটে একটি কালো রঙের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামলেন মিমের আইনজীবী এবং দুজন পুলিশ অফিসার। রেহানা বেগমের মুখ ভয়ে নীল হয়ে গেল।
আইনজীবী মিস্টার রহমান ভেতরে ঢুকে শান্ত স্বরে বললেন, “মিসেস রেহানা বেগম, জাহিদ সাহেব—আপনাদের জন্য এই বাড়ির ইভিকশন নোটিশ (উচ্ছেদ পত্র) নিয়ে এসেছি। এই বাড়িটি মিমের বাবার কেনা এবং এর বর্তমান মালিক মিম। আপনাদের হাতে মাত্র দুই ঘণ্টা সময় আছে।”
জাহিদ রাগে ফেটে পড়ল। “মিম কোথায়? ওকে ডাকুন! আমি ওর স্বামী, ও আমাকে এভাবে বের করে দিতে পারে না!”
“আপনি এখন কেবল একজন জালিয়াতির মামলার আসামি, জাহিদ সাহেব,” মিস্টার রহমান একটি ফাইল টেবিলের ওপর রাখলেন। “মিম আপনার বিরুদ্ধে ডিভোর্স পেপারও রেডি করেছে। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে—বিশ্বাসঘাতকতা এবং আর্থিক জালিয়াতির কারণে সে আপনার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চায় না।”
এদিকে আনিকা দেখল তার ব্যাগগুলো পুলিশ বারান্দায় বের করে দিচ্ছে। সে জাহিদের হাত ধরে বলল, “জাহিদ, এখন কী হবে? আমার বাচ্চার কী হবে?”
জাহিদ বিরক্ত হয়ে আনিকার হাত ঝেঁটে ফেলে দিল। “এখন বাচ্চার দোহাই দিও না! মিমকে যদি আমরা ম্যানেজ করতে না পারি, তবে আমাদের জেলেই যেতে হবে।”
দূর থেকে নিজের গাড়ির ভেতরে বসে সব দেখছিল মিম। তার চোখে আজ কোনো রাগ নেই, আছে এক গভীর তৃপ্তি। সে তার ফোনের রেকর্ডারটা অন করল। জাহিদ আর রেহানা বেগমের সেই রাতের সব কথা তার কাছে রেকর্ড করা আছে।
মিম তার ড্রাইভারকে বলল, “গাড়ি ছাড়ো।”
গাড়ি যখন গেট দিয়ে বের হচ্ছিল, তখন জাহিদ মিমকে দেখে দৌড়ে এল। “মিম! মিম একবার শোনো! আমি ভুল করেছি, আনিকা আমাকে ভুল বুঝিয়েছে। মিম, আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
মিম গাড়ির গ্লাসটা একটু নামাল। জাহিদের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “জাহিদ, তোমার ভালোবাসাটা ঠিক ওই আংটিটার মতোই ছিল—চকচকে কিন্তু নকল। আর শোনো, তুমি বলেছিলে না আমি তোমার পায়ে এসে ভিক্ষা চাইব? আজ থেকে তোমার ভিক্ষার দিন শুরু হলো। শুভ বিদায়।”
গাড়ি ধুলো উড়িয়ে চলে গেল। মিম তার অফিসের নতুন প্রজেক্টের ফাইলে হাত রাখল। কাল সকালেই তাকে কক্সবাজার যেতে হবে। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো তার এই ফিরে আসা কেবল শুরু।
এদিকে রেহানা বেগম যখন আংটির বক্সটা খুললেন, দেখলেন সেটা আসলেই ধুলোয় মলিন হয়ে গেছে। আভিজাত্যের যে অহংকার তিনি করতেন, তা আজ ধুলোয় মিশে গেছে।
চলবে...
