​নিজের নামে ফেরা

​পর্ব: ০৪+০৫


​বাগানবাড়ির গেটের বাইরে জাহিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে দিয়ে মিমের গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে চলে গেল, ঠিক যেভাবে মিম তার জীবন থেকে জাহিদের অস্তিত্ব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেছে।

​পেছনে রেহানা বেগমের কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এটা দুঃখের কান্না নয়, এটা ছিল পরাজয়ের আর্তনাদ। আনিকা বারান্দার এক কোণে বসে নিজের স্ফীত উদরে হাত দিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। সে বুঝতে পারছে, যে ক্ষমতার লোভে সে মিমের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছিল, সেই ক্ষমতা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে।

​“জাহিদ, এখন আমরা কোথায় যাব?” আনিকা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল।

​জাহিদ কোনো উত্তর দিল না। তার মাথায় তখন ঘুরছে মিমের সেই শেষ কথাটা—“আজ থেকে তোমার ভিক্ষার দিন শুরু হলো।”

​এক সপ্তাহ পর।

​কক্সবাজারের নীল জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে মিম। তার পরনে হালকা সাদা রঙের লিনেন কোট আর প্যান্ট। সমুদ্রের বাতাস তার চুলে দোলা দিয়ে যাচ্ছে। তার হাতে ‘ব্লু ওয়াটার রিসোর্ট’ প্রজেক্টের চূড়ান্ত ব্লু-প্রিন্ট। এই প্রজেক্টটি করার স্বপ্ন সে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে দেখেছিল, কিন্তু জাহিদের নাম উজ্জ্বল করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে আড়ালে রেখেছিল।

​মিস্টার হ্যারিসন মিমের পাশে এসে দাঁড়ালেন। “মিম, তুমি সত্যিই অসাধারণ। গত এক সপ্তাহে তুমি যেভাবে ইনভেস্টরদের কনভেন্স করেছো এবং জাহিদের করে যাওয়া সব গোলমাল ঠিক করেছো, তা অবিশ্বাস্য।”

​মিম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। “আমি শুধু আমার প্রাপ্যটা বুঝে নিচ্ছি, মিস্টার হ্যারিসন। এতদিন আমি অন্যের ছায়া হয়ে বেঁচে ছিলাম, এখন আমি রোদে পুড়তে শিখেছি।”

​ঠিক তখনই মিমের ফোনে একটি মেসেজ এল। তার আইনজীবী পাঠিয়েছেন।

​জাহিদ আর রেহানা বেগম এখন সাভারের একটি ছোট ভাড়াবাড়িতে উঠেছে। জাহিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতির যে মামলা মিম করেছে, তাতে তার জেল হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর জাহিদ যখন কোনো উপায় না পেয়ে আনিকাকে তার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল, আনিকা তখন উল্টো জাহিদের বিরুদ্ধেই যৌতুকের মামলা করার হুমকি দিয়েছে।

​মিম ফোনটা পকেটে রেখে দিল। সে চাইলে জাহিদকে ক্ষমা করতে পারত, কিন্তু সে জানে—যে সাপ একবার ছোবল দেয়, সে সুযোগ পেলে আবারও বিষ ঢালবে।

​হঠাৎ মিমের মনে পড়ল সেই লাল মখমলের বক্সটার কথা। রেহানা বেগম যেটিকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করতেন। আসলে ওই আংটিটা মিম নিজেই বদলে দিয়েছিল যেদিন সে জাহিদ আর আনিকার সত্যটা প্রথম জানতে পারে। জাহিদ ভেবেছিল সে মিমকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু মিম খেলাটা শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই।

​সূর্য ডুবছে। মিম তার অফিসের কলিগদের ডাকল। “আজ রাতে আমরা সেলিব্রেট করব। তবে কোনো ব্যক্তির নামে নয়, আমাদের এই নতুন প্রজেক্টের নামে।”

​মুনলাইট ডিনারে মিম যখন সবার সামনে বক্তব্য দিতে দাঁড়াল, তখন সে শান্ত স্বরে বলল:

“আপনারা অনেকেই আমাকে জাহিদের স্ত্রী হিসেবে চিনতেন। কিন্তু আজ থেকে আমার একটাই পরিচয়—আমি মিম। যে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে জানে।”

​দূর থেকে কেউ একজন মিমের ছবি তুলছিল। মিম খেয়াল করেনি। তার জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে শত্রু যেমন আছে, বন্ধুও হয়তো আসবে। তবে মিম এখন আর কারো ওপর নির্ভর করতে রাজি নয়।

​পর্ব: ০৫


​কক্সবাজারের সমুদ্রতীরে মিমের নতুন প্রজেক্টের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। মিম এখন আর সেই আগের মিম নেই, যে সারাদিন ফাইলের আড়ালে মুখ লুকিয়ে স্বামীর অনুমতির অপেক্ষায় থাকত। এখন তার প্রতিটি হাঁটাচলায় একটা নেতৃত্ব দেওয়ার ছাপ স্পষ্ট।

​এদিকে ঢাকার এক জরাজীর্ণ গলির ভেতর ছোট একটা কামরায় বসে জাহিদ নিজের কপাল চাপড়াচ্ছে। যে আভিজাত্যের দম্ভ রেহানা বেগম করতেন, তা এখন পলেস্তারা খসা দেওয়ালের মাঝে বন্দী। আনিকা তার বাপের বাড়িতে চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু জাহিদের নামে সে নিয়মিত হুমকি দিচ্ছে—টাকা না দিলে সে বাচ্চার অধিকার আদায়ের মামলা করবে।

​“জাহিদ, তুই একবার মিমের কাছে যা না বাবা,” রেহানা বেগম কাতর স্বরে বললেন। “ও তোকে এক সময় অনেক ভালোবাসত। একটু কাঁদলে হয়তো মন গলবে।”

​জাহিদ একটা কুটিল হাসি দিল। “ওর মন অনেক আগেই পাথর হয়ে গেছে মা। কিন্তু ও ভাবছে ও জিতে গেছে? মিম আমার পরিচয় কেড়ে নিয়েছে, আমি ওর প্রাণটাই কেড়ে নেব।”

​জাহিদের চোখে এক হিংস্র জেদ। সে জানে মিম এখন কক্সবাজারে। সে গোপনে মিমের প্রজেক্ট সাইটে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করল। তার মাথায় একটাই চিন্তা—মিমকে শেষ না করতে পারলে সে শান্তি পাবে না।

​কক্সবাজারে তখন উৎসবের আমেজ। বিদেশি ডেলিগেটদের বিদায় জানিয়ে মিম তার হোটেলের বারান্দায় একা বসে কফি খাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

​“হ্যালো?” মিম ধরল।

​ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর শোনা গেল জাহিদের ভাঙা গলা। “মিম, আমি শেষ হয়ে গেছি। মা খুব অসুস্থ। তুমি কি শেষবারের মতো একবার ক্ষমা করতে পারো না?”

​মিম শান্ত স্বরে বলল, “জাহিদ, ক্ষমা আমি অনেক আগেই করে দিয়েছি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি তোমাদের আর আমার জীবনে জায়গা দেব। তুমি যে মা’র অসুস্থতার নাটক করছ, তা আমি জানি। কারণ তোমার মা’র ইনস্যুরেন্স ফাইলটা এখনো আমার টেবিলে।”

​জাহিদ ফোনের ওপাশে চিৎকার করে উঠল, “তুই অনেক বদলে গেছিস মিম! তুই এখন আর নারী নেই, তুই একটা মেশিন হয়ে গেছিস!”

​“নারী থেকে মেশিন আমি হইনি জাহিদ, তোমরা আমাকে ‘যুদ্ধ’ শিখিয়েছ,” মিম শান্তভাবে ফোনটা কেটে দিল।

​পরদিন সকালে মিম যখন প্রজেক্ট সাইটে ঢুকল, সে লক্ষ্য করল কিছু লোক তাকে অনুসরণ করছে। সে তার সিকিউরিটি টিমকে অ্যালার্ট করল। জাহিদ ভেবেছিল মিমকে একা পাবে, কিন্তু সে জানত না—মিম এখন প্রতিটা পদক্ষেপ মেপে ফেলে।

​ঠিক দুপুরে যখন মিম ড্রয়িং নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে কথা বলছিল, তখন পেছন থেকে জাহিদ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। তার হাতে একটা ধারালো অস্ত্র।

​“সব শেষ করে দেব মিম! তুই আমার জীবন ধ্বংস করেছিস!” জাহিদ তেড়ে এল।

​কিন্তু মিম বিন্দুমাত্র নড়ল না। সে শুধু তার সিকিউরিটি হেডকে ইশারা করল। চোখের পলকে জাহিদকে চারপাশ থেকে ধরে ফেলল পুলিশ। আসলে মিম আগে থেকেই জানত জাহিদ এমন কিছু একটা করবে, কারণ সে জাহিদের ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করার ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছিল।

​মিম জাহিদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচু স্বরে বলল, “আমি জানতাম তুমি আসবে জাহিদ। তোমার মতো কাপুরুষেরা কাজ হাসিল করতে না পারলে শেষমেশ হামলা করতেই আসে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজকের পর তোমার ঠিকানা হবে কারাগার।”

​পুলিশ জাহিদকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় সে পাগলের মতো আর্তনাদ করতে লাগল। মিম তার চশমাটা ঠিক করে ইঞ্জিনিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল, “কোথায় যেন ছিলাম আমরা? হ্যাঁ, এই পিলারটার স্ট্রাকচার নিয়ে কথা হচ্ছিল...”

​মিম আজ আর কাঁদে না। সে জানে, তার এই ফিরে আসাটা কোনো অলৌকিক কিছু নয়—এটা তার ধৈর্যের জয়। সে প্রমাণ করে দিয়েছে, স্বামীর পরিচয়ে নয়, নিজের নামেই আকাশ ছোঁয়া সম্ভব।


​চলবে...


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url