উত্তরাধিকারের বলি
পর্ব: ০৪
হলের ভেতর কানফাটানো চিৎকার আর হুড়োহুড়ি। আমি পাগলের মতো অর্জুনের পাশে গিয়ে বসলাম। ওর কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
"অর্জুন! চোখ মেলুন অর্জুন!" আমি চিৎকার করে ডাকছিলাম।
রোহান আর নিশা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে ভয় নাকি আনন্দ—তা বোঝা দায়। ঠিক সেই মুহূর্তে সিকিউরিটি গার্ডরা ছুটে এল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মিস্টার খুরানা ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেছেন, ঠিক যেমন কোনো মরীচিকা মিলিয়ে যায়।
অর্জুন আধোবোজা চোখে আমার হাতটা শক্ত করে ধরল। তার ঠোঁট নড়ছে। আমি কান কাছে নিতেই সে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল:
—"লাইব্রেরি... টেবিলের নিচে... নীল ডায়েরি। এখনই যাও।"
পরক্ষণেই সে জ্ঞান হারাল। স্ট্রেচারে করে তাকে যখন হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, আমার মন বলছিল এটা কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। কেউ একজন চায় না অর্জুন আর মিস্টার খুরানা একসাথে থাকুক।
আমি সবার নজর এড়িয়ে লাইব্রেরির দিকে ছুটলাম। মেহরা ম্যানসনের এই অংশটা সবসময় অন্ধকার থাকে। লাইব্রেরির সেই বিশাল টেবিলের নিচে হাতড়াতে হাতড়াতে আমি একটা ছোট গোপন ড্রয়ার খুঁজে পেলাম। সেখানে সত্যিই একটা নীল ডায়েরি রাখা।
ডায়েরিটা খুলে প্রথম পাতাটা পড়তেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। সেখানে শান্তা দেবীর হাতের লেখা! আমার পালক মা—যাকে আমি সারাজীবন দরিদ্র ভেবে এসেছি—তার হাতের লেখা এখানে কেন?
ডায়েরিতে লেখা ছিল:
"আনিয়াকে রক্ষা করার একটাই উপায়—তাকে মেহরাদের থেকে দূরে রাখা। কিন্তু যদি কখনো সে এই বাড়িতে প্রবেশ করে, তবে জানবে তার জীবনের ওপর নেমে আসবে 'উত্তরাধিকারের অভিশাপ'। অর্জুনকে বিশ্বাস করো না আনিয়া, সে তোমাকে বাঁচাতে নয়, বরং এক পুরনো প্রতিশোধ নিতে বিয়ে করেছে।"
আমার হাতের ডায়েরিটা নিচে পড়ে গেল। অর্জুন আমাকে ব্যবহার করছে? কিন্তু কেন? সে তো নিজেই এখন বিপদে।
পেছন থেকে একটা ঠান্ডা গলার স্বর ভেসে এল:
—"ডায়েরিটা পেয়ে গেলে তাহলে?"
আমি চমকে ঘুরে তাকালাম। দরজায় দাঁড়িয়ে রোহান মেহরা। তার হাতে একটা পিস্তল। তার সেই শান্ত, সুভদ্র মুখোশটা এখন আর নেই।
"তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমার বাবা এত বোকা যে এক অনাথ মেয়েকে এই বাড়ির বউ করে আনবেন?" রোহান ধীর পায়ে এগিয়ে এল। "অর্জুন পঙ্গু হওয়ার নাটক করছিল যাতে আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বসি। আর ও মিস্টার খুরানাকে ব্যবহার করে তোমাকে এই বাড়ির মালিক বানাতে চেয়েছিল যাতে পুরো সম্পত্তি ওর নিয়ন্ত্রণে থাকে।"
"আপনি মিথ্যে বলছেন!" আমি চিৎকার করে বললাম।
"মিথ্যে?" রোহান হাসল। "মিস্টার খুরানা তোমার বাবা নন, আনিয়া। তিনি একজন ভাড়াটে অভিনেতা। অর্জুন তাকে টাকা দিয়ে আনিয়েছিল যাতে আজ রাতে সবার সামনে তোমার এক রাজকীয় পরিচয় তৈরি করা যায়। কিন্তু শান্তা দেবী... তিনি সত্যিই একজন ভয়ংকরী নারী ছিলেন।"
আমার মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। মা কি তবে কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত ছিলেন?
রোহান পিস্তলটা আমার দিকে তাক করে বলল, "ডায়েরিটা আমাকে দাও। ওখানে এমন একটা কোড আছে যা মেহরা পরিবারের সুইস ব্যাংকের লকার খোলে। ওই টাকাগুলো পেলেই তোমার আর অর্জুনের এই চ্যাপ্টার আমি শেষ করে দেব।"
আমি ডায়েরিটা শক্ত করে জাপটে ধরলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরির জানলা ভেঙে কেউ একজন ভেতরে ঢুকল। একঝলক কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তি। সে চোখের পলকে রোহানের হাত থেকে পিস্তলটা লাথি মেরে ফেলে দিল।
রোহান ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। কালো পোশাক পরা ব্যক্তিটি তার মাস্ক খুলল। আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
মিস্টার খুরানা! কিন্তু তার চোখে এখন আর সেই অসহায় বাবার দৃষ্টি নেই। তিনি পকেট থেকে একটা ইনজেকশন বের করে রোহানের ঘাড়ে পুশ করে দিলেন। রোহান সাথে সাথে নিস্তেজ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
মিস্টার খুরানা আমার দিকে তাকালেন। "আনিয়া, সময় খুব কম। অর্জুন হাসপাতালে নিরাপদ নয়। ওর ওপর আবার হামলা হবে। আর এই ডায়েরিটা... এটা তোমার মায়ের নয়, এটা মেহরা পরিবারের আসল খুনি কে তার প্রমাণ।"
"আপনি কে? কেন সাহায্য করছেন আমাকে?" আমি আর্তনাদ করে উঠলাম।
তিনি আমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন। "আমি অভিনেতা নই আনিয়া। আমি একজন আন্ডারকভার এজেন্ট। পঁচিশ বছর ধরে আমি এই মেহরা পরিবারের অন্ধকার ব্যবসার তথ্য সংগ্রহ করছি। তোমার মা শান্তা দেবী আমার একমাত্র সূত্র ছিলেন। তাকে খুন করা হয়েছে, আনিয়া। তাকে ক্যান্সার মারেনি, তাকে ধীরে ধীরে বিষ দিয়ে মারা হয়েছে।"
আমার পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। মা... মা খুন হয়েছেন?
"কে করেছে এটা?" আমার গলার স্বর ক্রোধে কাঁপছে।
মিস্টার খুরানা ডায়েরির শেষ পাতাটা ওল্টালেন। সেখানে একটা ছবি আঠা দিয়ে লাগানো। ছবিতে তরুণ বয়সের অর্জুন মেহরা আর এক অচেনা মহিলা। ছবির নিচে লেখা:
"প্রতিশোধ শুরু হলো।"
অর্জুন মেহরা পঙ্গু নয়, সে অপরাধীও নয়। সে এক মরণপণ খেলায় মেতেছে যেখানে আমি কেবল একটা ঘুঁটি। কিন্তু সেই খেলার শেষ চালটা কার?
চলবে...
#উত্তরাধিকারের_বলি
#Choto_Dairy_01
