উত্তরাধিকারের বলি
শেষ পর্ব
মিস্টার খুরানার কথাগুলো আমার কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছিল। মা অসুস্থ ছিলেন না, তাকে তিলে তিলে বিষ দিয়ে মারা হয়েছে! আর সেই নীল ডায়েরির ছবিতে অর্জুনের সাথে যে রহস্যময়ী মহিলাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি কে?
"অর্জুন হাসপাতালে নেই আনিয়া," মিস্টার খুরানা সতর্কভাবে বললেন। "ওকে এক গোপন আস্তানায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আজ রাতেই সব হিসেব চুকিয়ে দিতে হবে।"
আমি আর দেরি না করে মিস্টার খুরানার সাথে বেরিয়ে পড়লাম। শহরের উপকণ্ঠে এক পরিত্যক্ত গুদামের সামনে আমাদের গাড়ি থামল। ভেতরে ঢুকে দেখলাম, অর্জুন সেখানে একটি চেয়ারে বসে আছে—কপালে ব্যান্ডেজ, কিন্তু চোখে আগ্নেয়গিরির লাভা। তার সামনে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে নিশা।
আমাকে দেখে অর্জুন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে অপরাধবোধ আর দৃঢ়তা একসাথে খেলা করছে।
"আনিয়া, আমি জানি তুমি অনেক কিছু জেনে গেছ," অর্জুন শান্ত গলায় বলল। "কিন্তু পুরো সত্যটা ডায়েরির পাতায় নেই।"
সে পাশের দেয়ালের প্রজেক্টরে একটি ভিডিও ক্লিপ অন করল। ঝাপসা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে—শান্তা দেবী (আমার মা) এক হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করছেন। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মেহরা পরিবারের বড় ঘরণী, অর্থাৎ অর্জুনের মা। অর্জুনের মা শান্তা দেবীর হাতে একটি নবজাতককে তুলে দিয়ে বলছেন, "একে নিয়ে যাও শান্তা। মেহরাদের এই নোংরা রাজনীতি আর সম্পত্তির লোভ থেকে একে বাঁচাও। নাহলে ওরা একেও মেরে ফেলবে।"
আমার বুক ফেটে কান্না এল। অর্জুন আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল, "আনিয়া, তুমি মেহরাদের অবৈধ সন্তান নও। তুমি এই পরিবারের আসল উত্তরাধিকারী। আর আমার মা, যিনি ওই ছবিতে ছিলেন, তিনি তোমাকে বাঁচানোর জন্যই নিজের জীবন দিয়েছিলেন। নিশা আর রোহানের বাবা আমার মাকে খুন করেছিলেন কারণ মা সব সম্পত্তি তোমার নামে লিখে দিতে চেয়েছিলেন।"
আমি হতভম্ব হয়ে নিশার দিকে তাকালাম। নিশা দাঁত কিড়মিড় করে বলল, "হ্যাঁ! করেছি! কারণ আমরা ভিখারি হতে চাইনি। ওই শান্তা দেবী যখন আবার দিল্লিতে ফিরে এল তোমাকে নিয়ে, আমরা বুঝেছিলাম তুমি ফিরে এলে আমাদের সব শেষ হয়ে যাবে। তাই আমরা ওকে স্লো পয়জন দিতে শুরু করি।"
অর্জুন নিশার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। "কিন্তু তোমরা জানত না যে আমি সব জেনে গিয়েছি। আনিয়াকে বিয়ে করাটা আমার কাছে কেবল সম্পত্তি রক্ষার উপায় ছিল না, বরং ওকে মেহরাদের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখার একমাত্র পথ ছিল।"
হঠাৎ দরজায় পুলিশের সাইরেন শোনা গেল। মিস্টার খুরানা মুচকি হাসলেন। "অপারেশন সাকসেসফুল। রোহান অলরেডি কাস্টডিতে আছে, এবার নিশার পালা।"
পুলিশ নিশাকে নিয়ে যাওয়ার সময় সে আমার দিকে তাকিয়ে অভিশাপ দিতে থাকল। কিন্তু আমার কানে তখন কেবল মার সেই ম্লান হাসিমুখটা ভাসছিল। যিনি নিজের রক্ত না হয়েও আমার জন্য বিষের যন্ত্রণা সয়েছেন।
সব শান্ত হওয়ার পর অর্জুন আমার সামনে এসে দাঁড়াল। সে পকেট থেকে একটি চাবির গোছা আর মেহরা এম্পায়ারের সমস্ত কাগজপত্র বের করে আমার হাতে দিল।
"আজ থেকে তুমি মুক্ত আনিয়া। এই সমস্ত সম্পত্তি তোমার। আর আমাদের বিয়ের সেই চুক্তি? ওটা আমি ছিঁড়ে ফেলেছি। তুমি চাইলে এখনই চলে যেতে পারো।"
আমি কাগজগুলোর দিকে তাকালাম, তারপর অর্জুনের চোখের দিকে। যে মানুষটা আমাকে রক্ষা করার জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছে, যে এক বছর পঙ্গু হওয়ার অভিনয় করে ঘৃণা কুড়িয়েছে কেবল সত্য উন্মোচনের জন্য—তাকে ছেড়ে যাওয়া কি সম্ভব?
আমি কাগজগুলো টেবিলের ওপর রেখে অর্জুনের হাত ধরলাম। "সম্পত্তি দিয়ে আমি কী করব অর্জুন? আমি তো শুধু চেয়েছিলাম কেউ আমাকে ভালোবাসুক, আমাকে নিরাপত্তা দিক।"
অর্জুন মৃদু হাসল। "আমি হয়তো রোমান্টিক রাজপুত্র হতে পারিনি আনিয়া, কিন্তু তোমার ছায়া হয়ে থাকতে পারি।"
ভোর হচ্ছে। মেহরা ম্যানসনের সেই অভিশপ্ত উত্তরাধিকারের বলি হওয়ার দিন শেষ হয়েছে। আজ থেকে এক নতুন গল্পের শুরু—যেখানে কোনো চুক্তি নেই, আছে শুধু বিশ্বাস।
সমাপ্ত
#উত্তরাধিকারের_বলি
#Choto_Dairy_01
