​উত্তরাধিকারের বলি

​পর্ব: ০২+০৩

​রাত তখন তিনটা। জানলার বাইরে দিল্লির আকাশ আজ অস্বাভাবিক শান্ত, কিন্তু আমার মনের ভেতরে তিমির ঝড় বইছে। মেঝের কার্পেটে শুয়ে আমি যখন অর্জুনের অদ্ভুত আচরণের কথা ভাবছিলাম, ঠিক তখনই বারান্দার দিক থেকে একটা মৃদু খসখস শব্দ কানে এল।

​আমি চোখ পিটপিট করে তাকালাম। হুইলচেয়ারটা জানলার পাশে খালি পড়ে আছে। বিছানায় অর্জুন নেই! আতঙ্কে আমার বুক ধড়ফড় করে উঠল। একজন মানুষ, যে নিজে থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে না, সে গেল কোথায়?

​আমি পা টিপে টিপে বারান্দার দিকে এগোলাম। ভারী পর্দাটা সামান্য সরিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার চিৎকার করে ওঠার উপক্রম হলো।

​অর্জুন মেহরা, যে কয়েক ঘণ্টা আগে আমার চোখের সামনে মেঝেতে পড়ে গিয়েছিল, সে এখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! তার পিঠ আমার দিকে ফেরানো। অন্ধকারেও তার দীর্ঘকায় অবয়ব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে ফোনে কারও সাথে নিচু স্বরে কথা বলছে।

​"কাজটা হয়ে যাওয়া চাই। রোহান যেন টের না পায় যে আমি সব জানি," অর্জুনের কণ্ঠস্বর এখন আর সেই দুর্বল বা যন্ত্রণাকাতর মানুষের মতো নয়। এটি একজন আত্মবিশ্বাসী, শক্তিশালী পুরুষের কণ্ঠ।

​আমি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তার মানে কি এই বিয়ে, এই পঙ্গুত্ব—সবই নাটক? কেন?

​হঠাৎ অর্জুন ঘুরে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় তার চোখ দুটো হীরের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। আমাকে দেখতে পেয়েই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ফোনটা পকেটে রেখে ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বাভাবিক এবং বলিষ্ঠ।

​আমি কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম। "আপনি... আপনি তো হাঁটতে পারেন!"

​অর্জুন আমার খুব কাছে এসে থামল। তার গায়ের পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ আমার নাকে এল। সে নিচু হয়ে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে বিঁধছে।

​"আমার একটি গোপন কথা আছে, আনিয়া," সে ফিসফিস করে বলল। "আর এখন থেকে সেই গোপন কথাটি তোমারও। যদি চাও তোমার মায়ের চিকিৎসা ঠিকঠাক চলুক, তবে এই ঘর থেকে বের হওয়ার পর আমি আবার সেই পঙ্গু অর্জুন মেহরা।"

​আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলাম, "কেন করছেন এসব? আপনার নিজের পরিবারকে কেন ঠকাচ্ছেন?"

​অর্জুন একটা তিক্ত হাসি হাসল। সে ঘরের এক কোণে থাকা একটি লকার খুলে এক তাড়া ফাইল বের করল। "এই পরিবারে সবাই সবাইকে ঠকাচ্ছে, আনিয়া। আমার ওই তথাকথিত পঙ্গুত্বের সুযোগ নিয়ে রোহান আর নিশা কোম্পানির কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে। তারা ভাবছে আমি একলা কোণঠাসা হয়ে আছি। কিন্তু শিকারি যখন আক্রমণ করে, তখন সে শব্দ করে না।"

​সে ফাইলগুলো আমার হাতে দিল। "এগুলো আমাদের বিয়ের আসল চুক্তিনামা। তোমার মা তোমাকে বিক্রি করেননি, আনিয়া। বরং তোমাকে এই নরক থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি আমার শর্তে রাজি হয়েছেন।"

​আমি ফাইলটা খুলে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সেখানে লেখা আছে, ছয় মাস পর এই বিয়ে ভেঙে যাবে এবং বিনিময়ে আমাকে দিল্লির বাইরে একটি নিরাপদ বাড়ি আর মায়ের চিকিৎসার জন্য আজীবন ফান্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

​"আমি তোমাকে এই খেলায় আমার সঙ্গী হিসেবে চাই," অর্জুন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। "কার্ডে পাঁচ হাজার টাকা দেখে তুমি রেগে গিয়েছিলে, তাই না? ওটা একটা পরীক্ষা ছিল। আমি দেখতে চেয়েছিলাম তুমি লোভী কি না। লোভী হলে তুমি ওই টাকা নিয়েই খুশি থাকতে।"

​আমি বুঝতে পারলাম, আমি এক বিশাল ষড়যন্ত্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে আমার অসুস্থ মা, অন্যদিকে এক রহস্যময় স্বামী—যার শত্রু তার নিজের রক্ত।

​"আমাকে কী করতে হবে?" আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।

​অর্জুন আবার তার হুইলচেয়ারে গিয়ে বসল এবং চাদর দিয়ে পা দুটো ঢেকে নিল। নিমেষেই তার চোখে সেই চেনা অবসাদ আর নির্লিপ্ততা ফিরে এল।

​"অভিনয়," সে শান্ত গলায় বলল। "কাল সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে রোহান তোমাকে অপমান করার চেষ্টা করবে। তোমাকে প্রমাণ করতে হবে যে তুমি কেবল এক অসহায় গরিব মেয়ে নও, তুমি অর্জুন মেহরার স্ত্রী।"

​পরদিন সকালে যখন ডাইনিং টেবিলে গেলাম, পুরো মেহরা পরিবার সেখানে উপস্থিত। রোহান মেহরা কফির কাপে চুমুক দিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল, "কী আনিয়া, রাজপ্রাসাদে ঘুম কেমন হলো? নাকি এখনো বস্তির মশার কামড় মিস করছ?"

​নিশা খিলখিল করে হেসে উঠল। আমি টেবিলের নিচে অর্জুনের হাতের ওপর নিজের হাত রাখলাম। অর্জুন আমার দিকে তাকাল না, কিন্তু তার হাতটা শক্ত হয়ে এল।

​আমি শান্ত গলায় রোহানের দিকে তাকিয়ে বললাম, "প্রাসাদ আর বস্তির পার্থক্য শুধু দেওয়ালে, রোহান ভাইয়া। মানুষের চরিত্রে নয়। আমি তো ভাবতাম বড় বড় ব্যবসায়ীরা সময়ের মূল্য বোঝেন, কিন্তু দেখছি আপনার হাতে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চর্চা করার প্রচুর সময় আছে। সম্ভবত ব্যবসায় মন্দা চলছে?"

​পুরো টেবিলে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। রোহানের মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই অর্জুন হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে টেবিল থেকে সরে এল।

​"আনিয়া, চলো। আমার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে," অর্জুন নির্বিকার মুখে বলল।

​ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতেই অর্জুন চট করে উঠে দাঁড়াল। সে জানলার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। "রোহান তোমাকে ছাড়বে না। সে আজ রাতেই কোনো একটা চাল চালবে।"

​"আমি ভয় পাই না," আমি দৃঢ়ভাবে বললাম।

​অর্জুন আমার দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখে প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা দেখতে পেলাম। "ভয় পাওয়া উচিত ছিল আনিয়া। কারণ আজ রাতে মেহরা ম্যানসনে এক বড় পার্টি আছে। আর সেই পার্টিতে এমন একজন আসছে, যে তোমার অতীত সম্পর্কে এমন কিছু জানে যা সম্ভবত তুমি নিজেও জানো না।"

​আমার বুকটা ধক করে উঠল। আমার অতীত? আমি তো এক অনাথ, আমার আবার কী অতীত থাকতে পারে?

​চলবে...

​#উত্তরাধিকারের_বলি

#Choto_Dairy_01

:

​উত্তরাধিকারের বলি

​পর্ব: ০৩

​অর্জুনের শেষ কথাগুলো আমার কানে বিষের মতো বাজছিল। আমার অতীত সম্পর্কে এমন কী আছে যা আমি জানি না? শান্তা দেবী কি আমাকে সবটা বলেননি?

​বিকেলের দিকে মেহরা ম্যানসনে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। শহরের নামী-দামী সব ব্যবসায়ীরা আসছেন। অর্জুন আবার সেই পঙ্গুত্বের খোলসে ঢুকে পড়েছে। সে তার ঘরে চুপচাপ বসে আছে, আর আমি দাসীর মতো তার সেবা করার অভিনয় করছি।

​হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। ভেতরে ঢুকল নিশা, তার হাতে একটি দামি ডিজাইনার শাড়ি।

​"এটা পরে তৈরি হয়ে নাও আনিয়া। আমাদের বাড়ির বড় বউ বলে কথা, একটু তো জাঁকজমক থাকা চাই," নিশার হাসিতে আজ কোনো বিষ ছিল না, বরং এক অদ্ভুত কুটিল আনন্দ ছিল।

​আমি শাড়িটা হাতে নিলাম। দগদগে লাল রঙের শাড়ি, ঠিক যেন রক্ত। অর্জুন ইশারায় আমাকে তৈরি হতে বলল।

​পার্টি শুরু হওয়ার পর আমি যখন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম, সবার নজর আমার দিকে আটকে গেল। কিন্তু আমার নজর খুঁজছিল সেই মানুষটিকে, যার কথা অর্জুন বলেছিল।

​রোহান মেহরা স্টেজের পাশে এক দীর্ঘকায় প্রৌঢ় ব্যক্তির সাথে কথা বলছিল। লোকটির পরনে ধবধবে সাদা স্যুট, চোখে চশমা। লোকটিকে দেখামাত্রই আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। মনে হলো, এই মুখটা আমি চিনি, অনেক পুরনো কোনো আবছা স্মৃতিতে এই মানুষটা আছে।

​অর্জুন তার হুইলচেয়ার নিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। সে নিচু স্বরে বলল, "ওই যে দেখছ লোকটাকে, ওনার নাম মিস্টার খুরানা। তিনি এই শহরের সবথেকে বড় ট্রাস্টের মালিক। আর মজার ব্যাপার হলো, পঁচিশ বছর আগে তোমার অনাথ আশ্রমের সব নথিপত্র ওনার হাতেই ছিল।"

​আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে রোহান আমাদের দিকে এগিয়ে এল। তার সাথে মিস্টার খুরানা।

​"মিস্টার খুরানা, আলাপ করুন আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী আনিয়ার সাথে," রোহান এক বিদ্রূপের হাসি নিয়ে বলল।

​মিস্টার খুরানা আমার দিকে তাকালেন। তার হাতের কাঁচের গ্লাসটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, "অবিকল অমৃতাকে দেখতে... এই মেয়ে এখানে কীভাবে এল?"

​"অমৃতা কে?" আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম।

​রোহান এবার বোমাটা ফাটাল। "অমৃতা হলো সেই মহিলা, যাকে মেহরা পরিবারের বড় ছেলে অর্থাৎ আমার আর অর্জুনের বাবা ভালোবাসতেন। কিন্তু আমাদের দাদু তাকে ত্যাজ্য করার ভয় দেখানোয় তিনি এক অনাথ আশ্রমে অমৃতাকে ফেলে আসতে বাধ্য হন। আনিয়া, তুমি কোনো সাধারণ অনাথ নও—তুমি মেহরা পরিবারের সেই রক্ত, যাকে ময়লা ভেবে ডাস্টবিনে ফেলা হয়েছিল!"

​আমার চারপাশের পৃথিবীটা দুলতে শুরু করল। তার মানে শান্তা দেবী আমাকে কুড়িয়ে পাননি? আমাকে পরিকল্পিতভাবে সেখানে রাখা হয়েছিল?

​অর্জুন হঠাৎ সবার সামনে হুইলচেয়ার থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুরো পার্টিতে হুলুস্থুল পড়ে গেল। মেহরা পরিবারের মৃতপ্রায় ছোট ছেলে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে!

​"খুব ভালো চিত্রনাট্য সাজিয়েছ রোহান," অর্জুন বজ্রকণ্ঠে বলল। "আনিয়াকে এই বাড়ির অবৈধ সন্তান প্রমাণ করে তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পনাটা মন্দ নয়। কিন্তু তুমি একটা তথ্য ভুল জানো।"

​অর্জুন আমার হাত শক্ত করে ধরল। সে মিস্টার খুরানার দিকে তাকিয়ে বলল, "আনিয়া অমৃতা দেবীর মেয়ে ঠিকই, কিন্তু সে কোনো অবৈধ সন্তান নয়। আমার বাবা আর অমৃতা দেবী আইনত বিয়ে করেছিলেন, যার প্রমাণ মিস্টার খুরানার এই লকারেই আছে। আর সেই হিসেবে, এই বাড়ির অর্ধেকের বেশি সম্পত্তি এখন আনিয়ার নামে।"

​রোহান আর নিশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কিন্তু টুইস্ট এখানেই শেষ নয়।

​মিস্টার খুরানা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এলেন। "অর্জুন, তুমি ভুল বলছ। আনিয়া অমৃতার মেয়ে ঠিকই, কিন্তু সে মেহরা পরিবারের রক্ত নয়। সে যার মেয়ে, তার নাম শুনলে আজ এই বাড়ির ভিত্তি নড়ে যাবে।"

​অর্জুন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। "কার কথা বলছেন আপনি?"

​মিস্টার খুরানা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আনিয়া, তুমি শান্তা দেবীর পালক মেয়ে নও। শান্তা দেবীই তোমার জন্মদাত্রী মা ছিলেন। তিনি নিজের পরিচয় লুকিয়ে মেহরা পরিবারের এই রহস্য আড়াল করার জন্য তোমাকে অনাথ সাজিয়ে বড় করেছেন।"

​আমি চিৎকার করে উঠলাম, "মিথ্যা কথা! মা আমাকে জন্ম দেননি, তিনি নিজেই আমাকে বলেছেন!"

​"কারণ তিনি চেয়েছিলেন তুমি যেন এই অভিশপ্ত পরিবারের ছায়া থেকে দূরে থাকো," মিস্টার খুরানা পকেট থেকে একটা পুরনো ছবি বের করলেন। ছবিতে তরুণী শান্তা দেবী আর মিস্টার খুরানা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

​"আমিই তোমার বাবা, আনিয়া।"

​মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। যে মাকে আমি সবথেকে বেশি শ্রদ্ধা করতাম, তিনি আমাকে সারাজীবন এক মিথ্যে পরিচয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন? আর যে লোকটা আজ আমার বাবা হওয়ার দাবি করছে, সে কি সত্যিই আমার হিতৈষী, নাকি এর পেছনেও কোনো সম্পত্তি দখলের লড়াই আছে?

​আমি অর্জুনের দিকে তাকালাম। তার চোখেও আজ অবিশ্বাস। সে কি জানত এই সত্যটা? নাকি সে-ও আমাকে কেবল নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে?

​হঠাৎ হলের আলো নিভে গেল। এক বিকট শব্দে কাঁচ ভাঙার আওয়াজ হলো। অন্ধকারে কারও আর্তনাদ শোনা গেল।

​আলো যখন জ্বলল, দেখলাম অর্জুন মেঝেতে পড়ে আছে, তার কপাল দিয়ে রক্ত ঝরছে। আর মিস্টার খুরানা গায়েব!

​চলবে...

​#উত্তরাধিকারের_বলি

#Choto_Dairy_01


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url