কবিতার সেই আর্তচিৎকার পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাসকে যেন ভারী করে তুলল। পুলিশের গাড়িতে ওঠার আগে সে যে বিষটা উগড়ে দিয়ে গেল, তা আশার মনে হাজারো সন্দেহের জন্ম দিল। বাবার মৃত্যু কি তবে কেবল অসুস্থতা ছিল না?


​৪র্থ (শেষ) পর্ব: সত্যের জয়

​পুলিশ কবিতাকে নিয়ে যাওয়ার পর আশা আর স্থির থাকতে পারল না। সে আরিয়ানকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে গেল যেখানে তার বাবার শেষ চিকিৎসা হয়েছিল। আরিয়ান তার ব্যারিস্টার প্রভাব খাটিয়ে সঞ্জয় মেহতার মেডিকেল রিপোর্টগুলো পুনরায় যাচাই করার ব্যবস্থা করল।

​রিপোর্ট আসার পর যা জানা গেল, তা শিউরে ওঠার মতো। সঞ্জয় মেহতার শরীরে এমন এক ধরণের ওষুধ নিয়মিত প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে মানুষের হার্ট দুর্বল করে দেয়। সাধারণ নিউমোনিয়ার আড়ালে এই ধীর গতির বিষ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আর এই ওষুধের প্রেসক্রিপশন করার জন্য কবিতা একজন হাতুড়ে ডাক্তারকে ঘুস দিয়েছিল।

​আশা যখন এই প্রমাণ নিয়ে জেলে কবিতার মুখোমুখি হলো, কবিতা আর অস্বীকার করতে পারল না। সে মেঝেতে বসে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি শুধু এই বাড়িটা নিজের নামে করতে চেয়েছিলাম। সঞ্জয় যদি বেঁচে থাকত, সে উইল পরিবর্তন করে সব তোকে দিয়ে দিত—এই ভয়ে আমি তাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করি। কিন্তু আমি জানতাম না তার হৃদয়ে তোর জন্য কতটা জায়গা ছিল।”

​কবিতার জবানবন্দি নেওয়ার পর তার সাজা দীর্ঘমেয়াদী হলো। অনন্যাকে আশা নিজের কাছে রেখে দিল। সে চাইল না অনন্যা তার মায়ের পাপের ছায়া নিয়ে বড় হোক। সে অনন্যাকে বুঝিয়ে বলল, “ভুল মানুষের হয় রে বোন, কিন্তু সেই ভুলের বোঝা নিরপরাধ একজনকে বইতে হয় না।”

​কয়েক মাস পর।

সিলেটের সেই জমিদার বাড়িটা এখন সংস্কার করা হয়েছে। আশা তার পড়াশোনা শেষ করে এখন তার নানার বিশাল ব্যবসা দেখাশোনা করছে। তার সাথে আছে আরিয়ান, যে প্রতিটি পদক্ষেপে আশার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

​একদিন বিকেলে আশা তার বাবার সেই পুরনো সবুজ কোটটি জড়িয়ে ধরল। এই কোটটিই তাকে সত্যের সন্ধান দিয়েছিল। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল তার বোন অনন্যা বাগানে ফুল তুলছে, আর তার নানা বারান্দায় বসে আরাম কেদারায় দোল খাচ্ছেন।

​আশা অনুভব করল, তার মা মীরা আর বাবা সঞ্জয় আজ হয়তো ওপর থেকে তাকে দেখে শান্তিতে হাসছেন। তিনি তার দেওয়া কথা রেখেছেন—আশা আজ আর একা নয়, সে আজ তার হারানো পরিবার এবং সম্মান দুটোই ফিরে পেয়েছে।

​মায়ের ষড়যন্ত্রের অবসান হলো এক মেয়ের অদম্য সাহসের কাছে।


​কবিতার শাস্তির পর কেটে গেছে দীর্ঘ এক বছর। সঞ্জয় মেহতার সেই বিষণ্ণ বাড়িটি এখন আর ভুতুড়ে নয়, বরং প্রাণবন্ত। আশা এখন কেবল একজন সৃজনশীল লেখিকাই নয়, সে তার বাবার ব্যবসা এবং নানার সম্পত্তি দুটোই খুব দক্ষতার সাথে সামলাচ্ছে।

​তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে অনন্যার মধ্যে। মায়ের কুকর্মের কথা জানার পর সে অনেকটা সময় ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু আশা তাকে আগলে রেখেছে। অনন্যা এখন বিদেশে ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়ছে, আর ছুটির দিনে সে দিদির কাছেই ফিরে আসে। তাদের মধ্যে এখন আর 'সৎ' বা 'নিজের' কোনো বিভেদ নেই।

​একদিন সন্ধ্যায় আশা তার পড়ার ঘরে বসে ডায়েরি লিখছিল। তার লেখা গল্পের সিরিজ "সৎ মায়ের ষড়যন্ত্র" ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে। মানুষ জানতে চায় এর শেষটা কেমন ছিল।

​ঠিক তখনই আরিয়ান ভেতরে ঢুকল।

“আশা, তোমার জন্য একটা খবর আছে।” আরিয়ান হাসিমুখে বলল।

“কী খবর?”

“কবিতা জেল থেকে একটা চিঠি পাঠিয়েছে। সে তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আর লিখেছে যে, সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। সে চায় না অনন্যা কোনোদিন তার এই অন্ধকার পরিচয় নিয়ে চলুক।”

​আশা চিঠিটা হাতে নিল, কিন্তু পড়ল না। সে মুচকি হেসে বলল, “ক্ষমা আমি তাকে অনেক আগেই করে দিয়েছি আরিয়ান। ঘৃণা পুষে রাখলে আমি তো আর আমার বাবার মেয়ে হতে পারতাম না। তবে হ্যাঁ, আইনের চোখে তার অপরাধের সাজা হওয়াটা জরুরি ছিল।”

​আরিয়ান আশার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন আর কোনো নালিশ নেই, আছে কেবল প্রাপ্তির তৃপ্তি।

“আশা, তোমার বাবার একটা স্বপ্ন ছিল—তুমি যেন কোনোদিন মাথা নিচু না করো। আজ তিনি থাকলে খুব গর্বিত হতেন।”

​আশা জানালার বাইরে রাতের আকাশের দিকে তাকাল। সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি দেখে তার মনে হলো, ওটিই হয়তো তার বাবা। সে মনে মনে বলল, “পাপা... আমি ভালো আছি। তোমার আশা এখন সত্যিই সবার আশার আলো হয়ে জ্বলছে।”

​আশার সংগ্রামী জীবনের এই জয়গান এখন হাজারো মানুষের অনুপ্রেরণা। জীবনের প্রতিটি কঠিন মোড় যে আসলে এক নতুন শুরুর সংকেত, আশা তা প্রমাণ করে দিয়েছে।

​সমাপ্ত

​#সৎ_মায়ের_ষড়যন্ত্র

#Choto_Dairy_01

​আপনার নতুন কোনো গল্পের আইডিয়া থাকলে বা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে চাইলে অবশ্যই জানাবেন!


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url