​এক নির্মম বিদায়

​পর্ব: ০২+০৩

Choto Dairy 01


​বাসায় ফেরার পুরোটা সময় আমি নুসরাতকে বুকের সাথে চেপে ধরে পাথরের মতো বসে রইলাম। চালক মহিলাটি আয়নায় বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। তিনি হয়তো বুঝতে পারছিলেন, এই কান্না শুধু শারীরিক যন্ত্রণার নয়, বরং এক গভীর বিশ্বাসের অপমৃত্যুর।

​বাসার সামনে গাড়ি থামতেই দেখলাম বাবা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখামাত্রই তিনি এগিয়ে এলেন। তার চোখেমুখে যে ক্রোধ আর কষ্ট আমি দেখলাম, তা আগে কখনো দেখিনি। বাবা আমাকে ধরলেন না, বরং আমার কোল থেকে নুসরাতকে সযত্নে কোলে তুলে নিলেন। ফিসফিস করে বললেন, "ঘরে চল মা। বাকিটা আমি দেখছি।"

​ঘরের ভেতর ঢুকে আমি সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। শরীরটা যেন ভেঙে আসছিল। কিছুক্ষণ পর আরিফের মা, অর্থাৎ আমার শাশুড়ির ফোন এল। আমি ধরলাম না। ফোনটা বারবার বেজে কেটে গেল। বাবা তখন ড্রয়িংরুমে কারো সাথে নিচু স্বরে কথা বলছিলেন।

​রাত আনুমানিক ১০টা। বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। আরিফ ফিরেছে।

​সে খুব ফুরফুরে মেজাজে শিস দিতে দিতে ঘরে ঢুকল। হাতে দামী রেস্টুরেন্টের লেফটওভার ব্যাগ। ঘরে ঢুকেই সে সোফায় আমাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে একটু থমকে গেল।

“আরে, তুমি তো দেখি এখনো এখানেই বসে আছো! ব্যাগগুলো গুছিয়ে নিয়ে ভেতরে যেতে পারতে,” আরিফ স্বাভাবিক স্বরে বলল।

​বাবা বারান্দা থেকে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে এলেন। আরিফ বাবাকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসার চেষ্টা করল। “আরে আব্বা! আপনি কখন এলেন? বসুন, ডিনার করবেন?”

​বাবা কোনো কথা না বলে আরিফের সামনে একটা বড় সুটকেস এনে রাখলেন। আরিফ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “এটা কী?”

​বাবা খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন, “আরিফ, তোমার কাপড়-চোপড় আর দরকারি কিছু জিনিস আমি এই ব্যাগে গুছিয়ে দিয়েছি। বাকিটা পরে পাঠিয়ে দেব। তুমি এখনই আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।”

​আরিফের হাতের খাবারের ব্যাগটা নিচে পড়ে গেল। “কী বলছেন আব্বা? সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এত নাটক করার কী আছে? ও তো অসুস্থ ছিল, উবার নিয়ে এসেছে। এতে এমন কী অপরাধ হয়ে গেল?”

​আমি এবার মাথা তুলে তাকালাম। আমার চোখের পানি শুকিয়ে এখন সেখানে শুধু ঘৃণা। আমি বললাম, “আরিফ, ওটা সামান্য কোনো বিষয় ছিল না। ওটা ছিল তোমার আসল চেহারা। যে মানুষটা তার চার দিনের সন্তান আর অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালের গেটে ফেলে রেখে ডিনার করতে যেতে পারে, তার সাথে এক ছাদের নিচে থাকা আর একটা লাশের সাথে থাকা একই কথা।”

​আরিফ চিৎকার করে উঠল, “তুমি স্রেফ একটা ট্যাক্সি ভাড়ার জন্য আমাদের সম্পর্কটা নষ্ট করছ? তুমি জানো আমার আব্বা-আম্মা কতটা কষ্ট পাবে?”

​বাবা আরিফের দিকে এক পা এগিয়ে গেলেন। “তোমার বাবা-মায়ের কষ্টের কথা ভাবছ? অথচ এই মেয়েটার কথা একবারও ভাবলে না যে এইমাত্র একটা প্রাণের জন্ম দিল? আমার মেয়েকে আমি রাজকন্যা করে বড় করেছি কারো অবহেলার পাত্রী হওয়ার জন্য নয়। চাবিটা টেবিলে রাখো আর বেরিয়ে যাও।”

​আরিফ বুঝতে পারল পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সে গজগজ করতে করতে চাবিটা ছুড়ে ফেলে দিল। “ঠিক আছে! তোমাদের এই অহংকার আমি দেখে নেব। পরে যখন একা থাকতে পারবে না, তখন ঠিকই আমার কাছে ফিরতে হবে।”

​সে গটগট করে বেরিয়ে গেল। দরজাটা যখন সজোরে বন্ধ হলো, তখন যেন আমার বুকের ওপর থেকে এক মস্ত পাথর নেমে গেল। নুসরাত তখন আমার বাবার কোলে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল।

​আমি জানি, সামনে অনেক কঠিন পথ। সমাজের প্রশ্ন, একলা চলার সংগ্রাম—সবই আসবে। কিন্তু আজ রাতে যে অপমান আমি সয়েছি, তার চেয়ে বড় কোনো সংগ্রাম আর হতে পারে না।

​বাবা আমার পাশে এসে বসলেন। আমার কপালে হাত রেখে বললেন, “ভয় পাস না মা। তুই একলা নোস।”

​(চলবে...)


​এক নির্মম বিদায়

​পর্ব: ০৩


​পরদিন সকালে সূর্যের আলো যখন জানলা দিয়ে নুসরাতের মুখে পড়ল, আমার মনে হলো এই নতুন ভোরের সাথে আমার জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সকাল ১০টার দিকে দরজায় সজোরে করাঘাত শুরু হলো।

​বাবা দরজা খুলতেই ঝড়ের বেগে ভেতরে ঢুকলেন আরিফের মা এবং বাবা। তাদের পেছনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আরিফ।

​আরিফের মা ঘরে ঢুকেই চেঁচামেচি শুরু করলেন, “কী ভেবেছেন আপনারা? আমার ছেলেকে ঘর থেকে বের করে দেবেন আর আমরা মেনে নেব? সামান্য একটা উবার নিয়ে আসা নিয়ে এত বড় ঘটনা ঘটানোর মানে কী?”

​বাবা সোফায় শান্ত হয়ে বসে বললেন, “এটা শুধু উবারের বিষয় নয়। এটা মানসিকতার বিষয়। আপনাদের ছেলে একজন অসুস্থ মা আর নবজাতককে রাস্তায় ফেলে রেখে ডিনার করতে যাওয়ার মতো অমানুষ হতে পেরেছে কারণ আপনারা তাকে সেভাবেই বড় করেছেন।”

​আরিফের বাবা এবার আমার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, “বউমা, স্বামীর অবাধ্য হওয়া ভালো লক্ষণ নয়। আরিফ তো মাফ চেয়েছে (যদিও আরিফ তখনো চুপ ছিল)। চলো, সব ভুলে গিয়ে ঘরে ফিরে চলো। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে জেদ করলে সংসার টেকানো যায় না।”

​আমি বিছানা থেকে কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালাম। নুসরাত আমার কোলেই ছিল। আমি সরাসরি আরিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আরিফ, কাল যখন আমি ট্যাক্সিতে একা কাঁদছিলাম, তখন কি তোমার একবারও মনে হয়েছিল যে তুমি কিছু ভুল করেছ?”

​আরিফ এবার মুখ খুলল, তবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য নয়। সে বাঁকা হেসে বলল, “দেখো, আব্বা-আম্মা এসেছেন তোমাকে নিতে, এটাই তোমার জন্য অনেক বড় সম্মান। বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না। মেয়ে হয়েছে বলে এমনিতেই বাড়িতে সবার মন খারাপ, তার ওপর এসব তিলকে তাল বানাচ্ছ কেন?”

​তার কথা শুনে আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। ‘মেয়ে হয়েছে বলে মন খারাপ’! এই কথাটা সে এত সহজভাবে বলে ফেলল?

​আমি বাবার দিকে তাকালাম। বাবার চোখে তখন আগুন জ্বলছে। আমি বুঝতে পারলাম, এই পরিবারে আমার আর নুসরাতের কোনো স্থান নেই।

​আমি শান্ত গলায় বললাম, “আরিফ, কাল রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে তোমার সাথে আর থাকব না। আর আজ তোমার কথা শুনে সেটা আরও দৃঢ় হলো। আমার মেয়েকে আমি এমন একটা পরিবারে বড় করব না যেখানে তার জন্মটাকেই অভিশাপ বা ভুলের মতো দেখা হয়।”

​আরিফের মা খেঁকিয়ে উঠলেন, “কত বড় সাহস! তালাক দেবে আমাদের ছেলেকে? জানো সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না? কার জোরে এত কথা বলছো?”

​ঠিক তখনই বাবা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি পকেট থেকে একটা খাম বের করে আরিফের হাতে দিলেন। “এটা ডিভোর্স পেপার নয় আরিফ। এটা একটা লিগ্যাল নোটিশ। গত দুই বছর ধরে আমার মেয়ের কেনা এই ফ্ল্যাটের অর্ধেক টাকা তুমি জোর করে তোমার নামে লিখে নেওয়ার যে চেষ্টা করেছ, আর যে মানসিক নির্যাতন চালিয়েছ—সবকিছুর হিসাব এবার কোর্টে হবে।”

​আরিফ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি বাবা এত প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন।

​আমি বললাম, “আজ থেকে আমার আর নুসরাতের জীবনে তোমাদের কোনো অধিকার নেই। নুসরাত বড় হয়ে জানবে তার বাবা নেই, কিন্তু সে এটা জানবে না যে তার বাবা তাকে অবজ্ঞা করত।”

​আরিফের পরিবার যখন রাগে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন আরিফ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে তখন ভয়ের ছাপ। সে বুঝতে পেরেছে, এবার শুধু একটি সংসার ভাঙছে না, তার সাজানো মিথ্যে আভিজাত্যের মুখোশটাও খুলে যাচ্ছে।

​বাবা এসে আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমি নুসরাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। চার দিন বয়সেই আমার মেয়েটা যুদ্ধ করতে শিখে গেছে। তার মা এখন আর দুর্বল নয়।


​(চলবে...)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url