​এক নির্মম বিদায়

​পর্ব: ০৬+০৭


​ফেসবুকের সেই পোস্টটি আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল। আরিফ তার পরিচিত কিছু ফেক আইডি আর ভাড়াটে লোক দিয়ে প্রচার করছে যে, আমি অন্য কারো সাথে সম্পর্কের টানে নুসরাতকে নিয়ে ঘর ছেড়েছি। কমেন্ট বক্সে মানুষ আমাকে চেনে না, জানে না—অথচ তারা যে ভাষায় আমাকে আক্রমণ করছিল, তা পড়ে আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা এখনই কেন দুই ভাগ হয়ে যায় না!

​আমি অন্ধকারে নুসরাতকে নিয়ে কাঁদছিলাম। মনে হচ্ছিল এই অপমান নিয়ে আমি মানুষের সামনে মুখ দেখাব কী করে?

​ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে সেই মানুষটির নাম ভেসে এল যার কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম—আফ্রিদি। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু, যে এখন দেশের নামকরা একজন সাইবার ক্রাইম লয়ার।

​“হ্যালো, আকাশী? আমি সব দেখেছি। তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না। আরিফ ভাবছে ও আড়ালে বসে নোংরামি করবে আর তুমি সহ্য করবে? এই ধারণা ওর আজই ভাঙবে,” আফ্রিদির কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী।

​বাবার সাথে কথা বলে আফ্রিদি রাতেই থানায় জিডি করার ব্যবস্থা করল। সে আমাকে বলল, “আকাশী, এই লড়াইটা এখন শুধু তোমার একার নয়। ও যদি ডিজিটাল স্পেস ব্যবহার করে তোমাকে ধ্বংস করতে চায়, তবে আইনিভাবেই ওকে এর জবাব দিতে হবে।”

​পরদিন সকালে। আরিফ তার ড্রয়িংরুমে বসে আয়েশ করে চা খাচ্ছিল আর হয়তো ভাবছিল—এতক্ষণে আমার মান-সম্মান সব শেষ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই তার দরজায় কড়া নাড়ল পুলিশ।

​সাইবার অ্যাক্টে আরিফের নামে মামলা হয়েছে। যে আইডিগুলো থেকে পোস্ট করা হয়েছিল, সেগুলোর আইপি অ্যাড্রেস সরাসরি আরিফের ল্যাপটপ এবং ফোনের সাথে মিলে গেছে। আরিফ এবার আর পালানোর পথ পেল না। তার সেই আভিজাত্যের মুখোশ আর দাম্ভিকতা এক মুহূর্তেই চূর্ণ হয়ে গেল।

​পুলিশ যখন ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, ওর মা চিৎকার করে বলতে লাগলেন, “আমার ছেলে নির্দোষ! ও তো শুধু ওর বউকে ফিরে পেতে চেয়েছে!”

​পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন, “বউকে ফিরে পাওয়ার জন্য কেউ তার চরিত্র নিয়ে ওভাবে পোস্ট দেয় না। আপনাদের যা বলার কোর্টে বলবেন।”

​আরিফ যখন জিপে উঠছিল, আমি তখন গেটের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। নুসরাত আমার কোলে। আরিফ আমার দিকে তাকানোর সাহস পেল না। তার মাথাটা আজ নিচের দিকে ঝুঁকে আছে।

​আমি শুধু বললাম, “আরিফ, কাল যখন তুমি আমার চরিত্র নিয়ে লিখছিলে, তখন একবারও নুসরাতের কথা ভাবলে না? বড় হয়ে ও যখন জানবে ওর বাবা ওর মাকে কতটা জঘন্যভাবে অপমান করেছিল, তখন ও তোমাকে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই দেবে না। তুমি আজ শুধু আমাকে হারালো না, তুমি তোমার সন্তানের শ্রদ্ধাও চিরতরে হারিয়ে ফেললে।”

​আরিফের চোখ দিয়ে তখন জল পড়ছিল, কিন্তু সেই জলে কোনো অনুশোচনা ছিল না—ছিল ধরা পড়ার গ্লানি।

​বাসার ভেতরে এসে আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা বললেন, “লড়াইটা অনেক বড় মা। কেবল তো শুরু। ও জামিনে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে।”

​আমি নুসরাতকে আদর করে বললাম, “বাবা, ও আর আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না। কারণ আমি আজ বুঝেছি—যে সম্মান আমি নিজের কাছে ফিরে পেয়েছি, তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।”

​সেদিন বিকেলে আমি আমার ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিলাম। আমার সেই উবার চালক নারীর সাথে তোলা একটি ছবি এবং নুসরাতের ছোট্ট হাতের একটি ছবি। ক্যাপশনে লিখলাম: “একটি গল্পের শেষ মানেই সব শেষ নয়। এক নির্মম বিদায় আসলে এক নতুন ও শক্তিশালী সূচনার নাম।”


​(চলবে...)


​এক নির্মম বিদায়

​পর্ব: ০৭


​আরিফ জেলে যাওয়ার পর কয়েকটা দিন বেশ শান্তিতেই কাটল। নুসরাতের কান্নায় এখন আর ভয় লাগে না, বরং তার ছোট ছোট হাত-পা ছোড়া দেখে আমার বেঁচে থাকার নতুন রসদ পাই। কিন্তু এই শান্তি ছিল ঝড়ের আগের স্তব্ধতা।

​আরিফের বাবা অনেক প্রভাবশালী লোক ধরে দুই সপ্তাহের মাথায় আরিফের জামিন করিয়ে নিলেন। জেল থেকে বেরিয়েই সে যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠল। তবে এবার সে সরাসরি কোনো নোংরামি না করে অন্য এক চাল চালল।

​একদিন সকালে উকিল মারফত আমার কাছে একটি আইনি নোটিশ এল। আরিফ এবার নুসরাতকে তার নিজের জিম্মায় (Custody) নেওয়ার জন্য মামলা করেছে। তার দাবি হলো— আমি মানসিকভাবে অস্থির এবং আমার বাবার বাড়ির পরিবেশ বাচ্চার জন্য উপযুক্ত নয়। তার যুক্তি হলো, আমি বেকার এবং আমার কোনো আয় নেই, তাই বাচ্চার ভবিষ্যৎ তার কাছেই নিরাপদ।

​নোটিশটা পড়ে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। বাবা বললেন, “আকাশী, ও তোমার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে। ও জানে তুমি নুসরাতকে ছাড়া বাঁচবে না।”

​আমি আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। এই কয়েকদিনের যন্ত্রণায় আমি সত্যিই ম্লান হয়ে গেছি। কিন্তু নুসরাতের অধিকার হারানোর ভয়ে আমার ভেতরে এক আগ্নেয়গিরি জ্বলে উঠল। আমি আফ্রিদিকে ফোন দিলাম।

​আফ্রিদি বলল, “আকাশী, আইনের চোখে বাচ্চার ভরণপোষণ দিতে পারাটা অনেক বড় একটা দিক। তোমার কি নিজের কোনো আয়ের উৎস আছে?”

​আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “আফ্রিদি, আমি যখন ভার্সিটিতে ছিলাম, তখন অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং আর লেখালেখি করতাম। আরিফের সাথে বিয়ের পর ওসব ও বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু আমার সেই দক্ষতাগুলো তো মরে যায়নি।”

​ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আমি নুসরাতকে এক হাতে সামলানো আর অন্য হাতে ল্যাপটপ নিয়ে বসা শুরু করলাম। রাত জেগে আমি আমার পুরনো ক্লায়েন্টদের সাথে যোগাযোগ করলাম। নিজের লেখা গল্পগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে শুরু করলাম। আমার পেজ ‘Choto Dairy 01’-এ যখন আমার নিজের জীবনের এই লড়াইয়ের গল্পগুলো লিখতে শুরু করলাম, তখন দেখলাম হাজার হাজার মানুষ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

​মাসখানেক পর কোর্টে শুনানির দিন ধার্য হলো।

​আরিফ তার দামী সুট পরে খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল। তার উকিল তর্জনী উঁচিয়ে বলছিলেন, “মাননীয় আদালত, এই বাচ্চার মা একজন বেকার নারী। তিনি কীভাবে বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবেন? অন্যদিকে আমার মক্কেল একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।”

​আমি তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়ালাম। আমার হাতে ছিল আমার গত এক মাসের আয়ের স্টেটমেন্ট এবং আমার কাজগুলোর স্বীকৃতি। আমি শান্ত গলায় বিচারককে বললাম, “মাননীয় আদালত, টাকা দিয়ে ডিনার কেনা যায়, কিন্তু মমতা কেনা যায় না। যে বাবা বাচ্চার জন্মের চার দিনের মাথায় তাকে রাস্তায় ফেলে যায়, তার কাছে বাচ্চার নিরাপত্তা একটা ব্যবসার মতো। আমি হয়তো ওর মতো অঢেল সম্পদের মালিক নই, কিন্তু আমি স্বাবলম্বী। এই এক মাসে আমি প্রমাণ করেছি যে নুসরাতকে বড় করার ক্ষমতা আমার আছে।”

​বিচারক নথিপত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখলেন। তিনি আরিফের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মিঃ আরিফ, আপনি কি বাচ্চার জন্মের পর থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাঠিয়েছেন?”

​আরিফ তোতলাতে শুরু করল। সে কোনো জবাব দিতে পারল না।

​বিচারক রায় দিলেন— নুসরাত আপাতত মায়ের কাছেই থাকবে এবং আরিফকে প্রতি মাসে বাচ্চার ভরণপোষণের জন্য নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হবে। তবে আরিফের মানসিক অবস্থা এবং আগের আচরণের কারণে সে বাচ্চার সাথে দেখা করতে চাইলে তাকে আইনি পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে হবে।

​কোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় আরিফ আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে জলন্ত প্রতিহিংসা। সে ফিসফিস করে বলল, “আজ জিতে গেলে মানেই সব শেষ নয়। নুসরাতকে আমি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেবই।”

​আমি নুসরাতকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম, “চেষ্টা করে দেখো আরিফ। আগের সেই ভীতু আকাশী আর আজকের এই মায়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। নুসরাত আমার শক্তি, দুর্বলতা নয়।”

​আমি যখন কোর্ট চত্বর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন দুপুরের কড়া রোদ আমার চোখেমুখে পড়ছিল। কিন্তু আজ সেই রোদ আমাকে পোড়াচ্ছিল না, বরং মনে হচ্ছিল এই আলো আমাকে এক নতুন জীবনের পথ দেখাচ্ছে।


​(চলবে...)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url