এক নির্মম বিদায়
পর্ব: ০৪+০৫
আরিফ চলে যাওয়ার পর দিনগুলো যেন পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে উঠল। শরীরটা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, কিন্তু মনের জোরে আমি বারবার উঠে দাঁড়াচ্ছিলাম। নুসরাতকে যতবার কোলে নিই, মনে হয় এই নিষ্পাপ মুখটার জন্যই আমাকে শক্ত হতে হবে।
সপ্তাহখানেক পর। বিকেল বেলা হঠাৎ আমার ফোনে একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এল। স্ক্রিনটা অন করতেই বুকটা ধক করে উঠল। আরিফ লিখেছে:
“নুসরাতকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও। ও আমাদের বংশের রক্ত। তুমি যদি ভালোয় ভালোয় ডিভোর্স পেপার সই করে দাও আর বাচ্চাকে আমার হাতে তুলে দাও, তবে তোমার বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেব না। নয়তো তোমার বাবার সম্মান থাকবে না।”
আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। ও কীসের আইনি ব্যবস্থার কথা বলছে? আর নুসরাতকে তুলে দেওয়ার কথা ভাবল কী করে? যে বাবা জন্মের চার দিনের মাথায় সন্তানকে রাস্তায় ফেলে যেতে পারে, সে আজ কিসের অধিকারে নুসরাতকে দাবি করছে!
আমি মেসেজটা বাবাকে দেখালাম। বাবা লেখাটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন, “ও ভয় দেখাচ্ছে মা। ও জানে ওর পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। নুসরাত ওর কাছে কোনো সন্তান নয়, ওটা ওর ইগো। ও হেরে যেতে পারছে না বলেই এখন নুসরাতকে হাতিয়ার বানাচ্ছে।”
পরদিন সকালে আমাদের বাসার নিচতলায় এক হুলস্থুল কাণ্ড বাধল। আরিফ একা আসেনি, সাথে তার এক বন্ধু আর এলাকার কিছু প্রভাবশালী লোক নিয়ে এসেছে। তারা গেটে দাঁড়িয়ে চিল্লাপাল্লা করছে।
বাবা নিচে নামলে আরিফ বুক ফুলিয়ে বলল, “আমার বাচ্চাকে আমার কোলে দিন। মা অসুস্থ থাকলে বাচ্চা বাবার কাছেই নিরাপদ। আমি খবর পেয়েছি আপনারা নুসরাতকে ঠিকমতো দেখাশোনা করছেন না।”
আমি আর থাকতে পারলাম না। গায়ে চাদরটা জড়িয়ে নুসরাতকে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। নিচে উৎসুক মানুষের ভিড়। আরিফের নাটক দেখে সবাই কানাকানি করছে।
আমি ওপর থেকেই উচ্চস্বরে বললাম, “আরিফ! যে মানুষটা হাসপাতালের গেটে আমাকে আর এই বাচ্চাটাকে ফেলে রেখে নিজের বিলাসিতার জন্য রেস্টুরেন্টে চলে গিয়েছিল, তার মুখে নুসরাতের নিরাপত্তার কথা মানায় না। তোমার বাবা-মা যে বাচ্চাটাকে ‘ভুল’ মনে করে, তার ওপর আজ তোমাদের কিসের মায়া?”
আরিফ থতমত খেয়ে গেল। সে হয়তো ভাবেনি আমি সবার সামনে এভাবে সত্যিটা বলে দেব। সে নিজেকে সামলে নিয়ে চিৎকার করে বলল, “মিথ্যে কথা! তুমি আমার নামে অপবাদ দিচ্ছ। কোর্টে আমি প্রমাণ করব তুমি একজন মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন মা।”
ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে একজন মহিলা এগিয়ে এলেন। তাকে দেখে আমার চেনা চেনা মনে হলো। আরে! এ তো সেই উবার চালক নারী, যিনি আমাকে সেদিন বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।
তিনি ভিড় ঠেলে সামনে এসে আরিফের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “বাবা, মিথ্যে বলো না। সেদিন হাসপাতালের সামনে যা দেখেছি, তা বলার জন্য আমি যেকোনো জায়গায় দাঁড়াতে রাজি আছি। নিজের চার দিনের বাচ্চা আর অসুস্থ বউকে ফেলে দামী গাড়ি নিয়ে কে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল, তা আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
পুরো এলাকা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। আরিফের সাথে আসা লোকজন এবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে শুরু করল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আরিফ রাগে গরগর করতে করতে তার বন্ধুদের নিয়ে চলে গেল। কিন্তু যাওয়ার সময় শাসিয়ে গেল, “আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব!”
সেদিন রাতে নুসরাতকে খাওয়াতে খাওয়াতে আমি ভাবছিলাম— লড়াইটা শুধু আইনি নয়, লড়াইটা নিজের সাথেও। আরিফ নিশ্চয়ই বড় কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। কিন্তু আমি আর আগের মতো সেই ভীতু মেয়েটি নই।
বাবা ঘরে এসে বললেন, “মা, কাল উকিলের সাথে কথা বলেছি। ওরা বাচ্চার কাস্টডি পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু আমাদের সাবধান থাকতে হবে।”
আমি জানতাম, এই নির্মম বিদায় এত সহজে শেষ হবে না। আরিফ তার ‘ইগো’র জন্য যে কোনো পর্যায়ে যেতে পারে। কিন্তু নুসরাতের জন্য আমি আজ বাঘিনীর মতো লড়াই করতে প্রস্তুত।
(চলবে...)
এক নির্মম বিদায়
পর্ব: ০৫
আরিফের সেই জনসম্মুখের অপমান সে সহজে হজম করার পাত্র নয়। কয়েকদিন শান্ত থাকার পর একদিন দুপুরবেলা হঠাৎ আমাদের ল্যান্ডফোনে একটা কল এল। ওপাশ থেকে একজন অচেনা ব্যক্তি নিজেকে জেলা সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিলেন।
তিনি বললেন, “আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে যে আপনাদের বাড়িতে একটি নবজাতক শিশু অবহেলা আর অনিরাপদ পরিবেশে আছে। বাচ্চার মা মানসিকভাবে অসুস্থ এবং বাবার কাছ থেকে বাচ্চাকে জোর করে কেড়ে আনা হয়েছে। আমরা তদন্তে আসছি।”
আমি ফোনটা হাতে নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আরিফ এতদূর নামতে পারে? সে নিজের সন্তানের মাকে ‘পাগল’ প্রমাণ করতে চাইছে শুধু তাকে জব্দ করার জন্য?
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দুইজন লোক আমাদের বাসায় এলেন। তাদের সাথে আরিফ আর তার মা-ও ছিলেন। আরিফের মায়ের মুখে এক কৃত্রিম কান্নার অভিনয়। তিনি ঘরে ঢুকেই কর্মকর্তাদের বলতে শুরু করলেন, “বাবা, দেখুন আমার নাতিটার কী অবস্থা! এই মেয়েটা একটা জেদি আর উগ্র। ও আমার ছেলেকে মারধর করে বাচ্চাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে।”
বাবা তখন অত্যন্ত শান্তভাবে কর্মকর্তাদের বললেন, “আপনারা আপনাদের কাজ করুন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ভিডিওটা একটু দেখুন।”
বাবা তার ফোনটা বের করে সেই দিনের সিসিটিভি ফুটেজ দেখালেন, যেখানে আরিফ আমাকে অসুস্থ অবস্থায় গেটে ফেলে গাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছিল। শুধু তাই নয়, বাবা আলমারি থেকে আমার সমস্ত মেডিকেল রিপোর্ট এবং গত কয়েক মাসের আরিফের পাঠানো কিছু অসংলগ্ন মেসেজের স্ক্রিনশট বের করে দিলেন।
কর্মকর্তারা যখন রিপোর্টগুলো দেখছিলেন, তখন আরিফের মা বলে উঠলেন, “ওসব ভুয়া কাগজ! আপনারা বাচ্চাটাকে আমাদের হাতে দিন। আমার ছেলে ওর সব খরচ চালাবে।”
ঠিক তখনই নুসরাত কাঁদতে শুরু করল। আরিফ তার মায়ের ইশারায় এগিয়ে এল নুসরাতকে কোলে নেওয়ার জন্য। কিন্তু নুসরাত তার কাছে যাওয়া মাত্রই কান্নার বেগ আরও বাড়িয়ে দিল। শিশুরাও বোধহয় অশুভ মানুষদের চিনতে পারে।
আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। কর্মকর্তাদের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আরিফ সাহেব নুসরাতের সব খরচ চালাবে বলছেন? গত চার দিনে এই বাচ্চার এক ফোঁটা দুধের টাকা কিংবা ওষুধের খরচও তিনি দেননি। উল্টো তিনি আমাকে ডিভোর্সের হুমকি দিয়ে মেসেজ পাঠিয়েছেন। একজন বাবা হিসেবে তার দায়িত্ববোধ কতটুকু, তা তো হাসপাতালের গেটেই প্রমাণ হয়ে গেছে।”
তদন্তকারী কর্মকর্তারা একে অপরের দিকে তাকালেন। তাদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তিটি আরিফকে বললেন, “মিঃ আরিফ, আপনার অভিযোগের কোনো ভিত্তি আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। উল্টো আপনার বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতনের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এরপর যদি আপনি এই পরিবারকে এভাবে বিরক্ত করেন, তবে আমাদের রিপোর্ট আপনার বিপক্ষেই যাবে।”
আরিফের মা এবার চিৎকার করে উঠলেন, “আপনারা কি ঘুষ খেয়েছেন? আমি বড় উকিল ধরব!”
কর্মকর্তারা বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় আরিফকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে গেলেন। আরিফ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমার দিকে এক হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল। সে নিচু স্বরে বলল, “বাচ্চা দিয়ে আমাকে দমাতে পারবে না। এবার আমি এমন কিছু করব যে তুমি নুসরাতকে নিয়ে পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।”
তারা চলে যাওয়ার পর বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বললেন, “মা, আরিফ এখন মরিয়া হয়ে গেছে। ও হয়তো এবার আমাদের ওপর সামাজিকভাবে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে।”
আমি নুসরাতকে জড়িয়ে ধরে জানলার বাইরে তাকালাম। আকাশটা অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি জানতাম না, আরিফের পরবর্তী চালটা কী। কিন্তু মনে মনে নিজেকে তৈরি করছিলাম—আঘাত যেদিক থেকেই আসুক, আমি আর এক কদমও পিছু হটব না।
সেদিন রাতেই আমার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। ফেসবুকের একটি বড় গ্রুপে আমার আর নুসরাতের ছবি দিয়ে একটা পোস্ট করা হয়েছে। ক্যাপশনটা পড়ে আমার মাথা ঘুরে গেল। আরিফ এবার ডিজিটাল দুনিয়ায় আমার চরিত্র নিয়ে নোংরা খেলা শুরু করেছে।
(চলবে...)
