#হৃদয়জুড়ে_তুমি

#পর্বঃ৬+০৭+০৮ সব পর্ব 

#লেখিকাঃদিশা_মনি


সিমা নিজের যমজ বোনের ব্যাপারে জেনে তার সাথে দেখা করার আকুল আবেদন জানায় তার বাবা সাজ্জাদ চৌধুরীর কাছে। কিন্তু সাজ্জাদ চৌধুরী তার মুখের উপর বলে দেয়, 

'আমি চাইনা ঐ মেয়েটার সাথে কোন যোগাযোগ রাখতে। ও যেখানেই আছে ভালো আছে। তাই তোমাকে ওকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।'


সিমা তার বাবাকে এই ব্যাপারে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সাজ্জাদ চৌধুরী নিজের জেদে অটল থাকেন। অগত্যা সিমা নিরাশ হয়ে নিজের রুমে চলে আসে৷ অতঃপর নিজের মায়ের ছবি হাতে নিয়ে বলে, 

'আম্মু, তুমি যদি আজ বেচে থাকতে তাহলে বোধহয় সবকিছু এমন এলোমেলো হতো না। আব্বু এত কথা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন। আমার নাকি একটা যমজ বোনও আছে। আচ্ছা আমি কোথায় খুজব তাকে? আব্বু যে আমাকে কিছুই বলতে চাইছে না।'


এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে সিমা যে কখন গভীর ঘুমের মধ্যে আছন্ন হয়ে যায় সেটা সে নিজেও উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। ঘুমের মাঝেই একটি স্বপ্ন দেখে সিমা। স্বপ্নে তারই মতো দেখতে একটি মেয়েকে দেখে৷ যে অনেক কষ্টে, অনেক অবহেলায় বড় হচ্ছে। স্বপ্নটি দেখামাত্র সিমার ঘুম ভেঙে যায়। নিজের বোনের জন্য দুঃচিন্তা এসে ধরা দেয় তার মনে। সিমা তখন চোখ বন্ধ করে বলে, 

'আল্লাহ আমি যেটা স্বপ্নে দেখেছি সেটা যেন সত্য না হয়৷ আমার বোন যেখানেই থাকুক সে যেন ভালো থাকে।'


'গাড়িটা আস্তে চালা সামিহা!'


নিজের তথাকথিত বাবার কথায় কর্ণপাত করে না সামিহা। উল্টো সে বলে,

'আমি গাড়ি আরো জোরে চালাবো, যদি ভালো চাও তাহলে আমাকে আমার আসল পরিচয় বলো। আমি জানি, আমি তোমাদের আসল মেয়ে নই।'


'তুই ভুল ভাবছিস সামিহা।'


'ঠিক ভুলের বিচার করার মতো বুদ্ধি আমার হয়েছে। কাল আমি তোমার আর মায়ের সব কথা শুনেছি। তোমরা তো বলছিলে আমি তোমাদের আসল মেয়ে নই।'


'আমরা কি তোকে কোন অবহেলা করেছি?'


'এত কথা আমি শুনতে চাইনা। তুমি শুধু আমাকে আমার আসল পরিচয় বলো নাহলে আমি কিন্তু এক্সিডেন্ট করে দেব।'


'ঠিক আছে। আমি বলছি তোকে সব। তুই আমার না, আমার বোন সুমাইয়ার মেয়ে। তোর জন্মের সময় তোর মায়ের মৃত্যু হয়েছিস সেই জন্য তোর বাবা তোকে অপয়া মনে করে আমাদের কাছে রেখে গেছে৷ আর হ্যা, তোর একটা যমজ বোনও রয়েছে। যে তোর থেকে কয়েক মিনিটের বড়।'


সহসাই গাড়ি থামিয়ে দেয় সামিহা। বাইরে তুষারপাত হচ্ছে, অথচ তার শরীর ঘামছে। ফর্সা হাত বেয়ে গড়িয়ে পরছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সামিহা মিনমিনে স্বরে বলে, 

'তুমি আমার পাসপোর্ট ভিসার ব্যবস্থা করো৷ এক সপ্তাহের ভিতরেই আমি বাংলাদেশে যেতে চাই আমার রিয়্যাল ফ্যামিলির সাথে মিট করতে।'


১১.

সকালে ঘুম থেকে উঠতেই রায়হান খান চড়াও হন ইহানের উপর। কারণ ততক্ষণে তিনি জেনে গেছেন সিমা গতরাতে এই বাড়ি ত্যাগ করে গেছে। রায়হান খান ইহানকেই এরজন্য দোষারোপ করেন। তিনি বলেন,

'তোমার মতো কুলাঙ্গারের জন্য সিমা এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। তুমি মেয়েটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছ, যা মেয়েটা কোনভাবেই সহ্য করতে পারে নি। তাই,,'


মান্নাত বেগম নিজের ছেলের পক্ষ নিয়ে বলেন,

'তুমি আমার ছেলেকে দোষ দিচ্ছ কেন? সব দোষ তো ঐ মেয়ের। আমরা তো কেউ ওকে চলে যেতে বলিনি। আমার ছেলেও বলেনি। ও যখন নিজের ইচ্ছাতে চলে গেছে তখন তো ভালোই হয়েছে। এমনিতেও ওকে আমাদের কারোরই পছন্দ নয়। শুধু তুমি পছন্দ করলে তো হবে না। সংসার তো আমার ছেলেকেই করতে হবে নাকি!'


রায়হান খান ভীষণ রেগে চান। তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। তিনি হুংকার দিয়ে বলে ওঠেন,

'আমি কিচ্ছু শুনতে চাইনা। ইহানের জন্যই সিমা এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। এখন ওকেই সিমাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। যতক্ষণ না সিমা এই বাড়িতে ফিরছে ততক্ষণ ইহানেরও কোন যায়গা হবে না এই বাড়িতে।'


ইহানের সম্মানে লাগে তার বাবার মুখে এহেন কথা শুনে। তাই সেই রাগ থেকে ইহান বলে দেয়,

'ঠিক আছে। আমিও থাকবো না এই বাড়িতে। চলে যাচ্ছি আমি।'


ইহান বাড়ি থেকে বের হতে গেলে মান্নাত বেগম তার পথ আটকে বলেন,

'কোথাও যাবি না তুই। এটা তোর বাড়ি। এখানে তোর অধিকার আছে।'


ইহান নিজের জেদে অটল থেকে বলে, 

'না আম্মু। এই বাড়ি রায়হান খানের। উনি যখন আমাকে চলে যেতে বলেছেন তখন আমি আর এখানে থাকবো না।'


কথাটা বলেই হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ইহান। মান্নাত বেগম রায়হান খানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন,

'এবার শান্তি পেয়েছ তো তুমি? একটা বাইরের মেয়ের জন্য নিজের ছেলেটাকে এভাবে বের করে দিলে বাড়ি থেকে।'


'তুমি ভুল ভাবছ মান্নাত। আমি কাউকে বাড়ি থেকে বের করিনি। আমি শুধু ওকে শর্ত দিয়েছিলাম। এখন ও যদি সেটা না মানে তাহলে ওর এই বাড়িতে থাকতে দেবো না আমি।'


কথাটা বলে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ান রায়হান খান।


ইহান দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। রাগ তার মাথায় উঠে গেছে। একটা বাইরের মেয়ের জন্য তার বাবা যে তাকে এভাবে অপমান করল সেটা সে মানতেই পারছে না। অসাবধানতাবশত গাড়ি চালাতে গিয়ে আচমকা একটি পিলারের সাথে ধাক্কা খায় ইহান। তৎক্ষনাৎ তার মাথা বেয়ে তরল রক্তের স্রোত নামে।


১২.

বিয়ে একটি অদ্ভুত সম্পর্ক! এই সম্পর্কের মাধ্যমে দুজন অচেনা মানুষ চিরকালের জন্য এক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সেই বন্ধনের টান থেকেই সিমা শত অপমানের পরেও ছুটে এসেছে হসপিটালে ইহানকে দেখার জন্য। রায়হান খান কল দিয়ে সিমাকে জানিয়েছেন ইহানের এক্সিডেন্টের ব্যাপারে। হাসপাতালে আসামাত্রই রায়হান খানকে দেখতে পায় সিমা। ছুটে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, 

'আপনার ছেলে এখন কেমন আছে?'


রায়হান খান শান্ত কন্ঠে বলেন,

'মাথায় বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে। তবে ওর লাইফ রিস্ক নেই। ডক্টর বললেন, ও এখন সেইফ জোনে আছে।'


কিছুক্ষণ পরেই সিমার কানে আসে কারো কান্নার আওয়াজ। মান্নাত বেগম ও ইনায়া কান্না করতে করতে এদিকেই আসছিল। সিমাকে এখানে দেখে ক্ষেপে যান মান্নাত বেগম। সিমাকে গালাগালি করে বলেন,

'এই ডাই'নিটা কেন এসেছে এখানে? আমার ছেলের এক্সিডেন্ট করিয়ে কি ওর শান্তি হয়নি? এখন কি আমার ছেলেটাকে খেতে এসেছে?'


সিমার খুব খারাপ লাগে এমন কথা শুনে। রায়হান খান সিমার হয়ে প্রতিবাদ করে বলেন,

'তুমি একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছ। যা হয়েছে তাতে সিমার তো কোন হাত নেই। দূর্ঘটনা তো আর বলে কয়ে আসে না। দোষ তোমার ছেলের। রাস্তায় উদ্ভ্রান্তের মতো গাড়ি চালাতে কে বলেছিল তাকে?'


ইনায়া বলে ওঠে,

'তুমি এখানেও ভাইয়ার দোষ দেখছ আব্বু? দোষ তো এই মেয়েটার। ও বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল জন্যই তো তুমি ভাইয়াকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছিলে। আর তারপরই তো এসব হয়ে গেল।'


সিমার এবার একটু অপরাধবোধ অনুভব হয়। তার মনে হয় তার জন্যই বোধহয় সব হয়েছে। এমন সময় একজন নার্স এসে বলে, 

'আপনাদের পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে।'


কথাটা শোনামাত্রই সবাই মিলে যায় ইহানের কেবিনের দিকে। সিমা দরজার কাছে দাড়িয়ে থাকে। মান্নাত বেগম কেবিনে ঢুকে ইহানের সামনে গিয়ে বলেন,

'তুই কেমন আছিস ইহান?'


সবেমাত্র ইহানের জ্ঞান ফিরেছে। সে মলিন চোখে মান্নাত বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে,

'আপনি কে? আর আমাকে ইহান বলে ডাকছেন কেন? আমার নাম কি ইহান?'


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨#হৃদয়জুড়ে_তুমি

#পর্বঃ৭

#লেখিকাঃদিশা_মনি


ইহানের কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন মান্নাত বেগম। ইহান নিজের মাকে চিনতে পারছে না! এমনকি নিজের নামটাও চিনতে পারছে না, মান্নাত বেগম অস্থির হয়ে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেন,

'আমার ছেলের কি হয়েছে? ও এমন করছে কেন?'


ডাক্তার ইহানকে জিজ্ঞেস করে,

'আপনি কি সত্যি কিছু মনে করতে পারছেন না মিস্টার ইহান খান? উনি আপনার মা।'


ইহান বোকার মতো তাকিয়ে রয় কিছু সময়। অতঃপর বলে ওঠে, 

'আমি কিছু মনে করতে পারছি না। আমি কে? কি আমার পরিচয়?'


ডাক্তার ইহানের ভাবগতিক দেখে আন্দাজ করতে পারে তার সমস্যা। তিনি বলেন,

'আই থিংক, যে মাথায় আঘাত লাগার কারণে ওনার স্মৃতিশক্তি চলে গেছে।'


মান্নাত বেগমের মুখটা ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করে। তিনি এমন কিছু আশা করেন নি। বিপরীত দিকে রায়হান খানও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন,

'আপনি ঠিক বলছেন তো ডক্টর? মানে আমার ছেলে সত্যিই স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। তাহলে ওর স্মৃতি ফেরানোর উপায় কি?'


'ওনার অবস্থা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। আমি কিছু পরীক্ষা করতে দিচ্ছি শিওর হওয়ার জন্য। তারপর এই ব্যাপারে কি করা যায় সেটা বলতে পারব।'


সিমাও অন্য সবার সাথে এসেছিল ইহানের কেবিনে। এককোনায় চুপ করে ছিল সে। আচমকা ইহান সিমাকে বলে ওঠে, 

'তোমাকে কেন জানি আমার চেনা চেনা লাগছে। তুমি কি আমার কেউ হও?'


সবাই অবাক হয় ইহানের কথা শুনে। বিশেষ করে সিমা। সবাইকে আরো অবাক করে ইহান সিমাকে বলে, 

'তুমি আমার কাছে একটু আসবে?।'


সিমা কোন কিছু না ভেবে চলে আসে ইহানের কাছে। ইহান সিমার হাত ধরে বলে, 

'আমার কাছেই থাকো তুমি। আমার তোমাকে প্রয়োজন।'


মান্নাত বেগম নিজের ছেলের এমন ব্যবহার দেখে রেগে যান। একেই তিনি সিমাকে সহ্য করতে পারেন না, তার উপর যা সব হচ্ছে। তাই তিনি বলেন, 

'এই মেয়ে তুমি একদম আমার ছেলের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করবে না। দূর হও বলছি।'


ইহান সিমার হাত শক্ত করে ধরে বলে, 

'না ও আমার থেকে দূরে যেতে পারে না। আমি ওকে দূরে যেতে দেবো না।'


অবস্থা বেগতিক দেখে ডাক্তার বলেন,

'পেশেন্টের কান্ডিশন বেশি ভালো না। এই অবস্থায় ওনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে ওনার ক্ষতি হতে পারে। তাই আপনারা কেউ ওনাকে কোন বিষয়ে জোরাজোরি করবেন না প্লিজ।'


মান্নাত বেগম কিছু বলতে যাবেন তখন রায়হান খান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, 

'অন্তত নিজের ছেলের ভালোটা বোঝার চেষ্টা করো। ডক্টর কি বললেন শুনলেই তো।'


মান্নাত বেগম আর কিছু বলতে পারেন না। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া এখন তার আর কিছুই করার নেই।


১৩.

দুই দিন পরেই কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ইহানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইহান এখন সিমা ছাড়া আর কিছুই বোঝেনা। তার মতে, এখন তার সিমাকে ছাড়া সবাইকে অচেনা লাগে। তাই অন্য কারো সাথে থাকতে চায় না ইহান। ইহানের এই সমস্যার কারণে সিমা সর্বক্ষণ তার পাশাপাশিই থাকছে। যা মান্নাত বেগম ও ইনায়ার বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে।


সবকিছুকে ছাপিয়ে সিমা লেগে আছে ইহানের খেয়াল রাখার কাজে। হাসপাতালে অবস্থানকালীনও ইহানের দেখাশোনা সেই করেছে। কারণ ইহান তাকে ছাড়া কিছু বুঝছে না। এক মুহুর্তের জন্যেও সিমাকে চোখের বাইরে যেতে দিতে চায় না ইহান।


তার সব আবদার সিমার কাছে। আজও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরেই ইহান সিমার কাছে আবদার করেছে তাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। সিমা তো প্রথমে কিছুতেই রাজি হয় না। কিন্তু ইহানও কোন কথা শুনতে রাজি নয়৷ তার একটাই কথা সে ঘুরতে যাবে ব্যাস। অবশেষে সিমাকে হার মানতে হয় ইহানের জেদের কাছে। 


ইহানকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরতে যায়। ইহান সিমাকে সারা রাস্তায় বিভিন্ন প্রশ্ন করে বিরক্ত করে তবে সিমা ধৈর্য সহকারে সবকিছু সামলায়। সারাদিন বিভিন্ন যায়গায় ঘুরে তারা দুজনে মিলে। সিমা গাড়ি ড্রাইভ করতে পারত। ইহান অসুস্থ থাকায় তাই সিমাই গাড়ি ড্রাইভ করছিল।


অতঃপর ফিরে আসার সময় ইহান হঠাৎ করে বায়না করে সে আইসক্রিম খাবে। ইহান একটি আইসক্রিমের দোকান দেখিয়ে বলে, 

'আমি ওটা খাবো আমাকে এনে দাও।'


সিমা তখন কিছু একটা ভেবে বলে,

'এখন তো অনেক রাত হয়েছে। আমাদের ফিরতে হবে। এত রাতে আইসক্রিম খাওয়া ঠিক হবে না। আপনার ঠান্ডা লাগতে পারে।'


ইহান তখন মুখটা বেজার করে বলে,

'আমাকে এনে দাও প্লিজ। আমার ওটা খেতে খুব ইচ্ছা করছে।'


সিমা ইহানের নিঃসংকোচ এই আবেদন ফেলতে পারে না৷ তাই বলে, 

'আচ্ছা বেশ, আমি আইসক্রিম নিয়ে আসছি। তবে আপনি কিন্তু এখান থেকে এক পাও নড়বেন না। আমি এক্ষুনি যাবো আর এক্ষুনি আসব।'


ইহান খুশিতে একপ্রকার লাফিয়ে উঠল। ইহানের খুশি খুশি মুখ দেখে সিমাও অনেক আনন্দ পায়। ইহানকে বসিয়ে রেখে চলে যায় আইসক্রিম নিতে।


আইসক্রিম দোকানের সামনে গিয়ে সিমা বলে, 

'আমাকে দুটো চকলেট ফ্লেভারের আইসক্রিম দিন।'


দোকানদার সিমার হাতে দুটো আইসক্রিম দিয়ে দেয়। সিমা আইসক্রিম গুলো নিয়ে বিল মিটিয়ে চলে আসে গাড়ির কাছে। গাড়িতে এসে ইহানকে না দেখে সিমা ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ভয় এসে জমা হয় তার মনে। সিমা ইহানের নাম ধরে ডাকতে থাকে। কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যায়না। দিশেহারা হয়ে আশেপাশে খুজতেও থাকে ইহানকে। কিন্তু ইহানের কোন খোজই সে পায়না।


১৪.

সিমা এখন বসে আছে পুলিশ স্টেশনে। রায়হান খান, মান্নাত বেগমও উপস্থিত সেখানে। ইতিমধ্যে তাদের কানেও ইহানের নিরুদ্দেশ হওয়ার খবরটা গেছে।


সিমা পুলিশ অফিসারকে বলে, 

'আমার হাজবেন্ড ইহান খান, উনি বর্তমানে তার স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। আজ আমি তাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে ছিলাম। ফেরার সময় উনি আইসক্রিম খেতে চাইলেন তখন আমি আইসক্রিম আনতে যাই। বাট ফিরে আসার পর তাকে আর খুজে পাইনা। অনেক খুজেছি কিন্তু কোথাও তাকে পাইনি। তাই নিরূপায় হয়ে আপনাদের কাছে আসলাম।'


পুলিশ সিমাকে আরো অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে। বিভিন্ন তথ্য নেয়। মান্নাত বেগম থানাতেই চটে যান সিমার উপর। সিমাকে দোষারোপ করে বলেন,

'আমি জানি এই মেয়েই আমার ছেলের সাথে কিছু একটা করেছে। অপয়া মেয়ে একটা যবে থেকে আমার ছেলের জীবনে এসেছে তখন থেকেই আমার ছেলের জীবনে সর্বনাশ ডেকে এনেছে। অফিসার আপনি এই মেয়েটাকে জেলে ঢোকান। আমি জানি ঐ মেয়েই আমার ছেলেকে লুকিয়ে রেখেছে।'


রায়হান খান বিরক্ত হয়ে বলেন,

'আহ, মান্নাত। এসব কথা বাদ দাও। ওনাদেরকে ওনাদের কাজটা করতে দাও। আর সিমা তোমার থেকে এটা আমি আশা করিনি। যদি আমার ছেলেকে সামলাতেই না পারো তাহলে তার দায়িত্ব নিয়েছিলে কেন? এত কেয়ারলেস কেন তুমি? এখন তো আমারও এটা মনে হচ্ছে যে তুমি আমার ছেলের যোগ্য নও। তোমার সাথে আমার ছেলের বিয়ে দেওয়া আমার জীবনের বড় একটা ভুল ডিশিসন।'


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨#হৃদয়জুড়ে_তুমি

#পর্বঃ৮

#লেখিকাঃদিশা_মনি


সিমা বলার মতো কোন ভাষা খুজে পায়না। আজ সবাই তাকে ভুল বুঝছে। কিন্তু আসলে সে তো কিছুই করেনি। মান্নাত বেগম সিমার হাত শক্ত করে ধরে বলেন,

'আমি কিছু জানতে চাইনা। তোমাকে ২৪ ঘন্টা সময় দিলাম। এরমধ্যে যে করেই হোক আমার ছেলেকে আমার সামনে নিয়ে এসো।'


সিমা আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, 

'আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আপনার ছেলেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই আপনার সামনে হাজির করব। যদি সেটা না পারি তাহলে সারাজীবনের মতো বিদায় নেবো আপনার ছেলের জীবন থেকে।'


মান্নাত বেগম কিছুটা দমে যান সিমার কথা শুনে। রায়হান খান সিমাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলেন,

'ঠিক আছে তোমাকে আমি ২৪ ঘন্টা সময় দিলাম। যদি পারো এর মধ্যে আমার ছেলেকে আমার সামনে নিয়ে এসো।'


সিমা আর বিলম্ব না করে থানা থেকে বেরিয়ে যায়। এখন তার লক্ষ্য একটাই যে করেই হোক ইহানকে খুজে আনা।


আরাম কেদারায় বসে নিশ্চিন্তে পা দোলাচ্ছে ইহান। আজ তার অনেক শান্তি অনুভব করছে। এতদিনে সিমাকে জব্দ করতে সক্ষম হলো সে। তাই তার মধ্যে একরকম পৈশাচিক আনন্দ কাজ করছে। ইহান নিজেই নিজের প্রশংসা করে বলে, 

'বাহ কত সুন্দর পরিকল্পনা করলাম আমি। এবার এমন ভাবে সবকিছু সাজিয়েছি যাতে সাপও ম'রে আবার লাঠিও না ভাঙে। ঐ সিমা নামের বিপদ আমার জীবন থেকে দূর হবে আমি আব্বুও আমাকে কিছু বলতে পারবে না।'


অতঃপর অট্টহাসিতে মেতে ওঠে ইহান। মনে করে সে কিভাবে স্মৃতি হারানোর মিথ্যা নাটক করে সিমাকে বোকা বানিয়েছে এবং সুযোগ বুঝে সেই সময় সিমাকে আইসক্রিম আনতে পাঠিয়ে নিজে গোপনে পালিয়ে চলে এসেছে।


ইহান এসবই ভাবছিল এমন সময় তার ফোনে তার মায়ের কল আসে। ইহান ফোনটা রিসিভ করামাত্রই মান্নাত বেগম বলেন,

'হ্যালো, ইহান এটা কি তোর নতুন ফোন নাম্বার?'


ইহান উত্তর দেয়,

'হুম। আমি আজই নতুন সিম কার্ড কিনলাম। যাইহোক বলো আমি কেমন চাল দিলাম?'


মান্নাত বেগম খুশিতে গদগদ হয়ে বলেন,

'তোর বুদ্ধি দেখে আমি নিজেও অবাক। কি সুন্দর স্মৃতি হারানোর অভিনয় করলি। আমি তোর মা হয়েও বাকি সবার মতো সত্য ভেবে নিয়েছিলাম। ভাগ্যিস কাল তুই আমাকে সব সত্য বললি। এবার ঐ সিমার শিক্ষা হয়েছে। জানিস তোর বাবাও নিজের ভুল স্বীকার করে ঐ মেয়েটাকে অপমান করেছে।'


ইহান আত্মতৃপ্তি অনুভব করে বলে, 

'এমনটা তো হওয়ারই ছিল। সিমা ভেবেছিল ও খুব চালাক। কিন্তু আমার বুদ্ধি যে কতোটা ভয়ানক সেটা ও এবার বুঝবে।'


'ঐ মেয়েটা বলেছে ২৪ ঘন্টার মধ্যে হয় তোকে খুজে বের করবে আর নাহয় চির জীবনের মতো তোর জীবন থেকে বিদায় নেবে।'


মান্নাত বেগমের মুখে এই কথাটা শুনে ইহান বাকা হেসে বলে, 

'তাহলে তো ভালোই হয়। আমি ২৪ ঘন্টা আত্মগোপনেই থাকি।'


১৫.

সিমা উদ্দেশ্যহীন ভাবে খুজে চলেছে ইহানকে। কিন্তু কোথাও তাকে খুজে পাচ্ছে না। সিমার এখন দিশেহারা লাগছে। কি করবে সেটাই বুঝতে পারছিল না সে। এমন সময় তার ফোনে একটি কল আসে। ফোনটা রিসিভ করামাত্রই বিপরীত দিক থেকে কেউ বলে ওঠে, 

'আপনি কি ইহান খানের স্ত্রী বলছেন?'


সিমা উত্তর দেয়,

'হ্যা আমি ইহানের স্ত্রী। আপনি কে? আর আমাকে কেন ফোন করেছেন?'


'আমি সিটি হসপিটাল থেকে বলছি। আপনার হাজবেন্ডের যে কিছু টেস্ট করতে দিয়েছিলেন তার রেজাল্ট এসেছে।'


সিমা আগ্রহের সাথে জানতে চায়,

'রিপোর্টে কি এসেছে? ইহানের স্মৃতিশক্তি কি সত্যিই হারিয়ে গেছে?'


'জ্বি, না। রিপোর্ট অনুযায়ী ইহান খানের মাথায় এমন গুরুতর কোন আঘাত আসে নি যার কারণে তার মেমোরি লস হওয়ার কোন চান্স থাকবে। আমাদের মনে হচ্ছে ওনার অবস্থা ঠিকই আছে।'


সিমা চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সে ডাক্তারকে কৃতজ্ঞতার সাথে জানায়,

'আমি এমন কিছুই সন্দেহ করেছিলাম। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ডক্টর।'


অতঃপর সিমা কল কে'টে দিয়ে বলে, 

'আমি জানি আমাকে এখন কি করতে হবে। আপনি অনেক সুন্দর চাল চেলেছেন মিস্টার ইহান খান। কিন্তু আমাকে হয়তো আপনি এখনো পুরোপুরি চিনে উঠতে পারেন নি। আমি যে কি করতে পারি সেটা এবার আপনার কাছে প্রমাণ করে দেবো।'


সিমা নিজের ফোন থেকে ইনায়াকে ফোন করে। ইনায়া ফোন রিসিভ করামাত্রই বলে, 

'কে বলছেন?'


'আমি সিমা।'


'কেন কল করেছ তুমি? তোমার জন্য আমার ভাই হারিয়ে গেছে। তোমাকে তো আমি,,'


'তোমাকে আর এত নাটক করতে হবে না। আমি সব জানি।'


'কি,,কি জানো তুমি?'


'তোমার ভাই যে স্মৃতি হারানোর নাটক করেছে সেটা আমি জেনে গেছি। আর তুমি এবং তোমার মাও যে এসবে জড়িত সেটাও আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি।'


'ও আমি বুঝতে পারছি এখন তুমি নিজের দোষ ঢাকতে আমাদের উপর দোষ দিচ্ছ!'


সিমার সব ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে। সে এক প্রকার হুংকার দিয়ে বলে,

 'চুপ, আর কোন মিথ্যা কথা নয়। আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। ইহানের রিপোর্ট বলছে ও একদম সুস্থ। ভালোয় ভালোয় তোমার ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেও। নাহলে কিন্তু তোমার বাবা মিস্টার রায়হান খানের কানে সব কথা তুলব।'


ইনায়া খুব ভয় পেয়ে যায়। কারণ তার বাবার কানে সব কথা উঠলে অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে। তাই ইনায়া বাধ্য হয়ে সিমাকে বলে দেয় ইহান এখন কোথায় লুকিয়ে আছে।


১৬.

বিছানায় আরামসে ঘুমিয়ে ছিল ইহান। আচমকা চোখে পানির ছিটকা অনুভব করতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে ইহান। ভালো ভাবে সামনে তাকাতেই দেখতে পায় সিমাকে। প্রথমে মনের ভুল মনে করে। তবে বারকয়েক চোখ ডলেও সিমাকেই নিজের সামনে কা'টে। অতঃপর স্বপ্ন মনে করে নিজের হাতে চিমটিও কা'টে। কিন্তু ফলাফল একই।


ইহানের এমন কাণ্ডে সিমা হেসেই দেয়। বলে, 

'আমি আপনার মনের ভুল বা স্বপ্ন নই, আমি বাস্তব।'


ইহান হতবাক হয়ে যায়। সিমাকে প্রশ্ন করে, 

'তুমি এখানে এলে কিভাবে? আমার ঠিকানা তো তোমার জানার কথা নয়।'


'বলছি বলছি সব বলছি। আগে একটু ওয়েট করুন। আপনি কি ভেবেছিলেন আপনি আমার সাথে স্মৃতি হারানোর অভিনয় করবেন, আমি কিছু বুঝবোও না আর সেই সুযোগে আপনি হারিয়ে যাওয়ার নাটক করে আমাকে আপনার জীবন থেকে বের করে দেবেন? সবটা কি এতোই সহজ? আমি সিমা। আমাকে হারানো এত সহজ নয়। ভালোয় ভালোয় আমার সাথে ফিরে চলুন। নাহলে আপনার বাবার কাছে সব সত্য প্রকাশিত করে দেবো।'


ইহান বিরক্ত হয়ে বলে, 

'যা করার করো তুমি। কিন্তু আমি তোমার সাথে সংসার করতে মোটেই ইচ্ছুক নই। তোমাকে দেখলেই আমার ঘৃণা লাগে। আমি সবসময় নিজের জন্য সুন্দরী বউ চেয়েছি। সবসময় স্বপ্ন দেখেছি আমার বউ হবে পরির মতো সুন্দরী। সেখানে তোমার মতো একটা কালো ভূতকে বিয়ে করতে হয়েছে ছি!'


কথার আঘাত এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আঘাত। যা মুহুর্তেই ভেঙে চূড়ে শেষ করে দেয় মানুষকে। ইহানের অবজ্ঞামূলক কথা শুনে সিমাও অনেক বেশি আঘাত পায়। বলে, 

'ঠিক আছে আমাকে আপনার মানতেও হবে না। চলুন কালই আমরা ডিভোর্সের আবেদন করব। তারপর আদালত হয়তো আমাদের কিছু দিন সময় দেবে। সেই ক'টা মাস একসাথে থেকে নাহয় আমরা চিরকালের আলাদা হয়ে যাবো। তখন আপনি একটা ডানা কা'টা পরিকে বিয়ে করে আনবেন।'


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨  সব পর্বের লিংক এক সাথে 👉 লিংক

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url