#হৃদয়জুড়ে_তুমি

#পর্বঃ৪+০৫

#লেখিকাঃদিশা_মনি


সিমা ডাইনিং টেবিলে অপেক্ষা করছে সবার জন্য। আজ বৌভাত উপলক্ষে সবার জন্য নিজের হাতে বিভিন্ন রকম রান্না করেছে। এখন তার উদ্দ্যেশ্য সবাইকে খাওয়ানো। একটু পরেই মান্নাত বেগম, ইনায়া, ইহান, রায়হান খান সবাই এসে খেতে বসেছে।


সিমা সবার সামনে তার রান্না করা খাবার নিয়ে আসলে মান্নাত বেগম মুখ বিকৃত করে বলেন,

'এসব রান্না কি তুমি করেছ?'


সিমা মুচকি হেসে বলে,

'হ্যা আমিই করেছি। কেন আমার হাতের রান্না কি খাওয়া যাবে না নাকি?'


সাথে সাথেই মান্নাত বেগম, ইনায়া ও ইহান উঠে যায় খাবার টেবিল। শুধুমাত্র রায়হান খানই বসে থাকেন। ইনায়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলে, 

'তুমি ভাবলে কি করে তোমার হাতের রান্না করা খাবার আমরা খাবো। আমরা কেউ এই খাবার খাবো না।'


সিমা কিছু বলতে যাবে তার আগেই রায়হান খান বলেন,

'রোজ রোজ এত অশান্তি আমার ভালো লাগে না। সিমা তোমার কাউকে জোরাজোরি করতে হবে না মা। তুমি আমাকে খেতে দাও আর তুমি নিজেও খেতে বসো। খাবার যদি বেচে যায় পথশিশুদের খাওয়াবো তাও লাভ। তবুও এদের দিতে হবে না।'


মান্নাত বেগম গলা খাকারি দিয়ে বলেন,

'তুমি আমাদের কে পথশিশুদের সাথে তুলনা করছ! একেই নিজের ছেলের জীবন নষ্ট করেছ এই মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে তার উপরে,,, '


'আমি কারো জীবন নষ্ট করিনি মান্নাত৷ তুমি নিজের ছেলেকে ভুল বোঝাচ্ছ। যাইহোক এখন এই প্রসঙ্গে কথা বলতে চাইনা। তোমার খেতে হলে খাও আর নাহলে যাও। তোমাদের সেধে সেধে খেতে বসানোর শখ সিমার নেই।'


সিমাকে রায়হান খান খেতে বসতে বলেন। সিমাও খেতে বসে। দুজনে মিলে খাওয়াও শুরু করে। ইহান বলে, 

'আম্মু তুমি চিন্তা করো না। আমি এক্ষুনি খাবার অর্ডার করছি। এই মেয়ের হাতের খাবার তোমাদের কাউকে খেতে হবে না।'


মান্নাত বেগম নিজের ছেলের কথা শুনে মৃদু হেসে বলেন,

'হ্যা ইহান তুই তাই কর। আমার তো বাইরের খাবার খুব ভালো লাগে। এই মেয়ের হাতের খাবার খাওয়ার থেকে বাইরের খাবার খাবো সেটাই ভালো। বিরিয়ানি অর্ডার করিস তো। আমার তো বিরিয়ানি খুব ভালো লাগে।'


সিমার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। সে রায়হান খানের সাথে একটি বিষয় আলোচনা করতে থাকে। বলে, 

'শুনলাম আজকাল একটা জিনিসের বেশ চর্চা চলছে। কোন একটা রেস্টুরেন্টে নাকি খাসির মাংসের নাম করে কুকুর খাওয়ানো হচ্ছে। '


রায়হান খান বুঝতে পারেন সিমার উদ্দেশ্য। তাই তিনিও তাল মিলিয়ে বলেন,

'হুম এটা আর নতুন কি। আজকাল তো এমনই চলে। কুকুর, বিড়ালের মাংস খাওয়ানো হচ্ছে এসব রেস্টুরেন্টে।'


এসব কথা শুনে মান্নাত বেগমের বাইরের খাবার খাওয়ার শখ মিটে যায়। তিনি বলেন,

'বাইরের খাবার খেতে হবে না। তোরা সবাই এখানে খেতে বস। একদিন ওর হাতে রান্না খেলে কোন অসুবিধা হবে না।'


অগত্যা সবাই খেতে বসে। সিমা বিজয়ীর হাসি হাসে।


৭.

রাতে ডিনারের আয়োজন করা হয়। রাতের রান্নাও করেছে সিমা। ইহান সবেমাত্র অফিসের সব কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরেছে। সিমা ইহানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে,

'চলুন নিচে খেতে চলুন।'


'রান্না কি তুমি করেছ?'


'হুম।'


'তাহলে আমি খাবো না।'


সিমা এবার রেগে যায়। নিজে দৌড়ে নিচে যায়। অতঃপর খাবার বেড়ে নিয়ে আসে। ইহানের মুখের সামনে খাবার ধরে বলে, 

'বেশি কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে নিন। নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।'


ইহান খাবারের প্লেট ফেলে দিতে চাইলে সিমা বলে, 

'এই ভুলটা করবেন না।'


ইহান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিমা নিজের হাতে জোরপূর্বক খাইয়ে দেয় তাকে। ইহান শুধু অবাক হয়ে ছিল। সিমা ভাতের প্লেটটা ইহানের হাতে তুলে দিয়ে বলে, 

'এখন ভালো বাচ্চার মতো খেয়ে নিন। নাহলে আমি আবার খাইয়ে দেব।'


ইহান বাধ্য ছেলের মতো নিজের হাত দিয়ে খেতে থাকে।


ইহানের খাওয়া শেষ হলে সিমা নিচে যায় বাড়ির অন্য সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য। রায়হান খানের সাথে বাকিরাও খেতে বসেছে দেখে অনেকটাই আশ্বস্ত হয় সিমা। রায়হান খানকে খাবার দিয়ে মান্নাত বেগমের প্লেটে খাবার দিতে যাবে তখনই মান্নাত বলে ওঠেন,

'তোমাকে খাবার দিতে হবে না। আমাদের খাবার আসছে।'


সিমা কিছু বুঝতে পারে না এই কথার মানে। ইনায়া আচমকা বলে ওঠে,

'নেহা আপু চলে এসেছে আম্মু।'


মান্নাত বেগম খুশি মুখ করে নেহার দিকে তাকান। নেহা হলো মান্নাত বেগমের বোনের মেয়ে। এই নেহার সাথেই মান্নাত বেগম তার ছেলে ইহানের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। 


মান্নাত বেগম বলেন, 

'আয় নেহা আমার পাশে বস।'


নেহা এসে মান্নাত বেগমের পাশে বসে। তার হাতে একটি টিফিন বক্স ছিল। সেটা ডাইনিং টেবিলে রেখে বলে, 

'আম্মু বিরিয়ানি রান্না করে পাঠিয়েছে। তুমি নাকি খেতে চেয়েছ।'


'হুম দে। এই তো আমাদের খাবার এসে গেছে।'


নেহা রায়হান খানের সাথে কুশল বিনিময় করে বলে, 

'আআসসালামু আলাইকুম খালু। কেমন আছেন আপনি?'

  

'আলহামদুলিল্লাহ৷ ভালো। তোমরা সবাই কেমন আছ?'


'জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। '


রায়হান খান সিমার দিকে ইশারা করে বলে, 

'তোমরা তো কেউ ইহানের বিয়েতে আসলে না। যাইহোক এই হলো সিমা। ইহানের বউ, আমার পুত্রবধূ।'


নেহা সিমার সাথে কুশল বিনিময় করে বলে,

'কেমন আছেন ভাবি? আপনার সাথে মনে হয় আমার পরিচয় নেই। আমি নেহা। আমিও আপনার একপ্রকার ননদ। '


সিমা মৃদু হেসে নেহার সাথে কিছু কথা বলে। 


৮.

সিমা রুমে এসেই ওয়াশরুমে চলে গেছিল ফ্রেশ হতে। ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে নেহাকে রুমে দেখে চমকে যায় সিমা। নেহাকে স্বাভাবিক লাগছিল। সিমাকে দেখে নেহা বলে, 

'আপনার সাথে পরিচিত হতে আসলাম।'


দু'জন মিলে অনেকক্ষণ গল্প করে। অতঃপর নেহা সিমাকে এমন কিছু কথা বলে যা তার ধারণার বাইরে ছিল। নেহা বলে,

'আপনি জানেন কিনা জানিনা ভাবি, আপনার শাশুড়ী মানে আমার খালা ইহান ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমার পরিবার থেকেও ইতিবাচক সাড়া ছিল। কিন্তু খালু এরমাঝে আপনার সাথে ইহান ভাইয়ার বিয়ে ঠিক করায় এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হয় আমাদের মাঝে৷ খালার সাথে আমার মায়েরও অনেক কথা কাটাকাটি হয়। এই নিয়ে অনেক কিছু হয়ে গেছে। এখন যখন বিয়ের পর ইহান ভাইয়া বিয়েটা মানছে না তখন খালা আমার সাথে আবার ইহান ভাইয়ার বিয়ে দিতে চাইছে। আমার মায়েরও সেটাই ইচ্ছে।'


সিমার মোটেই ভালো লাগে না কথাগুলো শুনে। তবুও সে বলে, 

'আপনার কি ইচ্ছে নেহা? আপনিও কি চান ইহানকে বিয়ে করতে?'


নেহা প্রায় হেসেই দেয় এহেন কথা শুনে। হাসি থামিয়ে বলে, 

'একদম না। আমার তো অন্য কাউকে পছন্দ। মানে আমার একজন বয়ফ্রেন্ড আছে। আমি তো মাঝখানে খুব চিন্তায় ছিলাম যে আম্মু না আবার ইহান ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ে দেয়। তাই তো তোমার সাথে ইহান ভাইয়ার বিয়ে হওয়ায় সবথেকে বেশি খুশি আমিই হয়েছি।'


সিমা নিশ্চিত হয়। নেহাকে নিয়ে তাহলে আর কোন অসুবিধা নেই। নেহা সিমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুম থেকে চলে যায়।


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

#হৃদয়জুড়ে_তুমি

#পর্বঃ৫

#লেখিকাঃদিশা_মনি


সিমা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ইহানের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু ইহানের আসার কোন নামগন্ধ ছিল না। অনেক সময় অপেক্ষায় থাকতে থাকতে সিমার চোখ লেগে যায়। একটু চোখজোড়া বন্ধ করে যখনই ঘুমাতে যাবে তখনই একটা বিশ্রী গন্ধ তার নাকে এলো।


সিমার বমি চলে আসল। তাই সে উঠে বসল। চোখ খুলতেই ইহানকে নিজের চোখের সামনে দেখতে পেলো সিমা। ইহানকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল সে স্বাভাবিক নয়। সম্ভবত মদ খেয়ে নেশা করে এসেছে। রাগে ক্ষোভে সিমা বলে, 

'আপনি ড্রিংক করে এসেছেন কেন? সরুন এখান থেকে। আপনার মুখ থেকে খুব বাজে গন্ধ আসছে।'


সিমার কথা শুনে ইহান হাসে। তার হাসিও ভয়ানক দেখাচ্ছিল। হাসতে হাসতেই সিমার কোলে ঢোলে পড়ে ইহান। অতঃপর সিমার গালে হাত দিয়ে বলে, 

'তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অন্ধকারের রাণী। কি কালো তুমি। এই কালো মেয়েটাকে আমায় বিয়ে করতে হয়েছে ভেবে আমারও বমি আসে। আই জাস্ট হেট ইউ।'


সিমার আজ অনেক দিন পর মন আবার খারাপ হয়ে যায়। কলেজের একটি বাজে ঘটনা ঘটার পর থেকে সিমা ঠিক করেছে আর কোনদিন নিজের রূপ নিয়ে ভাববে না। সৃষ্টিকর্তা যেভাবে সৃষ্টি করেছে সেভাবেই সন্তুষ্ট থাকার প্রত্যাশা নিয়ে ছিল সে। মন দিয়েছে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার। অতঃপর বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছে৷ কয়েকদিন পর ইঞ্জিনিয়ারও হয়ে যাবে। 


তবে আজ অনেক দিন পর আবার সিমার মনে নিজেকে নিয়ে সামান্য বিতৃষ্ণার জন্ম হলো। মনে হলো, গায়ের রং কালো হওয়ার সত্যিই সে বোধহয় সে ইহানের যোগ্য নয়। যাইহোক নিজের এই অহেতুক ভাবনাকে আর খুব বেশি গুরুত্ব দিল না সিমা।


ইহান ততক্ষণে জ্ঞান হারিয়েছে। ইহানকে বিছানায় ভালো করে শুইয়ে দিল। নিজে বিছানা থেকে উঠে গেল। নিজের সব ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিল। আজই এই বাড়ি থেকে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল সিমা।


এত অপমানিত হওয়ার পর আর এখানে থাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই সিমার। সে তো এখানে এসেছিল গায়ের রং যে কিছু নয়--এই কথাটা ইহান ও তার মাকে বোঝাতে। দূর্ভাগ্য, তারা বুঝল না। কিছু মানুষকে বোঝাতে যাওয়াও এক ধরনের মূর্খতা সেটা আজ অনুধাবন করতে পারল সিমা। তাই সিমা ভাবল,

'কে কি ভাবলো, সেটা নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাবো না। আমি তো নিজের গুণ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে পেরেছি। এখন তাহলে আমার কি প্রয়োজন সামান্য দুজন মানুষের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার? আমি কি এতটাই নগণ্য? নিজের পায়ে দাড়িয়েছি আমি। এখন বাকি জীবনটাও নিজের মতো করে কা*টাতে পারব।'


এমন ভাবনা করেই খান ভিলা থেকে বিদায় নিল সিমা। যাওয়ার আগে রায়হান খানকে বলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন জন্য আর বিরক্ত করল না। কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে এলো।


৯.

সিমাকে এত রাতে বাড়ি ফিরতে দেখে অবাক হয়ে যান সাজ্জাদ চৌধুরী। নিজের মেয়েকে তিনি জিজ্ঞেস করেন,

'সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো সিমা? তুই এভাবে এত রাতে,,'


সিমা নিজের বাবাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সবসময় নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সিমা কান্নারত অবস্থায় বলে, 

'তোমার মেয়ে যে কালো হয়েছে এটাই তার অপরাধ। তাই তো কারো ভালোবাসা পাবে না সে, তাকে দেখলে নাকি মানুষের বমি পায়।'


সাজ্জাদ চৌধুরী নিজের মেয়ের কষ্টটা বুঝতে পারেন। সিমাকে গভীর ভাবে আলিঙ্গন করে বলেন, 

'আমাকে ক্ষমা করে দিস সিমা। আমারই ভুল ছিল এভাবে তোকে বিয়ে দেওয়া। তবে তুই যেটা ভাবছিস সেটা একদম ভুল। তোর আম্মুর গায়ের রংও তোর মতোই ছিল। যৌবনকালে আমি ছিলাম অনেক বেশি সুদর্শন। তবুও যে সেই কৃষ্ণাঙ্গী তরুণী মানে তোর মায়ের মায়ায় জড়িয়ে পড়ি। বিয়ে করে আনি তাকে। জানিস আমার আম্মু-আব্বু, আত্মীয়-স্বজন সবাই নাখোশ ছিল এই বিয়েতে। শুধুমাত্র তোর মায়ের গায়ের রং কালো ছিল জন্য। কিন্তু আমি সবাইকে অগ্রাহ্য করে তোর মায়ের সাথে সংসার করতে থাকি। আমার বাড়িতে তোর মাকে অপমানিত হতে হতো জন্য আমি আলাদা একটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানে থাকতে শুরু করি। আর তারপর,,,,'


সিমার খুব আগ্রহ ছিল তার বাবা-মায়ের ব্যাপারে জানার জন্য। সিমা তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে, 

'আব্বু বলো না আম্মুর আর তোমার ব্যাপারে আরো কিছু। আমি তোমাদের ব্যাপারে জানতে চাই।'


সাজ্জাদ চৌধুরী অতীতের কথা ভেবে বলেন,

'তোর আম্মুর ব্যাপারে যতই বলি কম হয়ে যাবে। সে যে আমার হৃদয়হরিণী। প্রথম দেখাতেই যে স্থান করে নিয়েছিল আমার হৃদয়জুড়ে।'


অতঃপর সাজ্জাদ চৌধুরী সিমাকে তার অতীতের ব্যাপারে বলা শুরু করেন।


১০.

অতীত সমাচার~~

সাজ্জাদ চৌধুরীর জন্য তার পরিবার থেকে মেয়ে দেখতে এসেছে। সবাই বেশ আগ্রহী ছিল বউ দেখার জন্য। এমন সময় একটি মেয়ে মাথা অব্দি ঘোমটা দিয়ে সবার সামনে উপস্থিত হয়। সাজ্জাদ চৌধুরীর চাচি মেয়েটিকে ঘোমটা তুলতে বলেন। মেয়েটি কিছুতেই ঘোমটা তুলছিল না। লজ্জা পাচ্ছিল। তবে কিছু সময় পর সবার জোড়াজুড়িতে ঘোমটা তোলেন। সাজ্জাদ চৌধুরীর নজরে তখনই পড়ে সুমাইয়া নামের মেয়েটিকে। যার গায়ের রং ছিল নিকষ কালো। তবে সেই কালো চেহারাতেও কেমন যেন একটা মায়া মায়া ভাব ছিল যা সাজ্জাদ চৌধুরীকে আকর্ষিত করে।


সাজ্জাদ চৌধুরীর বাবা-মা সবাই প্রচণ্ড অপমান করে ঘটককে। তারা সুমাইয়ার সামনেই বলে, 

'মেয়েটা এমন জানলে কখনো দেখতে আসতাম না। এমন কালো মেয়েকে আমাদের ছেলের পাশে মানায় না। আমাদের ছেলের কি কোন কমতি আছে যে এই মেয়েকে বিয়ে করবে?'


সবার সামনে এভাবে অপমানিত হয়ে সুমাইয়া কেদেই দেয়। সুমাইয়ার সেই ক্রন্দনরত মুখশ্রী দেখে খুব কষ্ট পায় সাজ্জাদ চৌধুরী। কিছুতেই ভুলতে পারছিল না সেই মুখ। অতঃপর বাড়িতে ফিরেই নিজের মা-বাবাকে সাফ জানিয়ে দেয় বিয়ে করলে ঐ মেয়েকেই করবে নাহলে নয়। সাজ্জাদ চৌধুরীর মা-বাবা রাজি ছিল না। সাজ্জাদ চৌধুরীও জেদ করে ছিলেন।অবশেষে তার জেদের কাছে হেরে গিয়ে সুমাইয়ার সাথেই তার বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের পর সুমাইয়াকে নিয়ে সুখেই ছিলেন সাজ্জাদ চৌধুরী। সুমাইয়া দেখতে যেমনই হোক তার গুণের অভাব ছিল না। অনেক ভালো রান্না করতে পারত,পড়াশোনাতেও ভালো ছিল। সুমাইয়ার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। সাজ্জাদ চৌধুরী এই কথাটা জানতে পেরে তাকে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ করে দেয়। সুমাইয়া মেডিকেলে চান্সও পায়। সংসার সামলেই পড়াশোনা করছিল সুমাইয়া। কিন্তু সাজ্জাদ চৌধুরীর মা-বাবা সুমাইয়ার পড়াশোনা মেনে নিতে পারে না। নানাভাবে তারা কথা শোনাতে থাকে। শেষে বাধ্য হয়ে সাজ্জাদ চৌধুরী স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। 


তারা দুজনে যথেষ্ট খুশি ছিলেন। এরমাঝেই তারা জানতে পারে তাদের সংসারে নতুন অতিথি আসতে চলেছে। এতে তাদের সুখের আর সীমা ছিল না৷ তবে কথায় আছে না বেশি সুখ কপালে সয়না, এক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছিল। সুমাইয়ার কথায় সাজ্জাদ চৌধুরী নিজের মা-বাবার সাথে সব ঝামেলা মিটিয়ে নেয় এবং সুমাইয়াকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে।


এটাই ছিল তার জীবনের সবথেকে বড় ভুল। সুমাইয়ার তখন প্রেগ্ন্যাসির নয় মাস চলছিল। সাজ্জাদ চৌধুরী অফিস চলে যাওয়ার পর হঠাৎ সুমাইয়ার লেবার পেইন শুরু হয়। সুমাইয়া চিৎকার করে তার শ্বশুর শাশুড়িকে ডাকতে থাকে কিন্তু তারা কেউ এগিয়ে আসে না। সেই সময় মুঠোফোন ফোন ছিল না, টেলিফোন ছিল। তবে সুমাইয়ার অবস্থা এতটাই বেদনাদায়ক ছিল যে সে টেলিফোন অব্দি যাওয়ার অবস্থায় ছিল না। সাজ্জাদ চৌধুরীর মন কেমন করায় তিনি অফিস থেকে তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে আসেন। এসে এই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী হন। ততক্ষণে সুমাইয়ার অবস্থা অনেক বেঈ খারাপ হয়ে গেছিল৷ সাজ্জাদ চৌধুরী তাকে নিয়ে দ্রুত ছুটে হাসপাতালে যায়। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছিল৷ ডাক্তার বলেছিল,

'ওনার গর্ভে যমজ বাচ্চা আছে। একটা বাচ্চা থাকলে হয়তো কোন অসুবিধা হতো না কিন্তু দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়ই ওনার মৃত্যু হয়েছে।'


সাজ্জাদ চৌধুরী নির্বাক হয়ে যান। নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে এভাবে হারিয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে যান। নিজের বাবা-মার প্রতি তার রাগ হয়৷ নিজেদের রাগ আর ক্রোধে তারা এতটাই অন্ধ ছিল যে এমন অমানবিক কাজ করল৷ তখন থেকেই সাজ্জাদ চৌধুরী তার বাবা-মায়ের সাথে সব সম্পর্ক ত্যাগ করে। নিজের ছোট মেয়ের প্রতিও তার রাগ ছিল। কারণ তার মনে হয়েছিল তাকে জন্ম দিতে গিয়েই সুমাইয়া মারা গেছে। তাই তিনি নিজের ছোট মেয়েকে সুমাইয়ার ভাইয়ের কাছে দিয়ে আসেন। সুমাইয়ার ভাইয়া-ভাবি বিয়ের অনেক বছর পরেও বাবা-মা হতে পারেনি। তাই বাচ্চাটিকে নিজের মেয়ের মতোই মানুষ করতে থাকেন তারা। সাজ্জাদ চৌধুরী কখনো সেই মেয়ের কোন খোজ নেন নি।

-------

বর্তমান,

সিমার কান্নার গতি আরো বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সে এতো কিছু আগে জানতো না, এটাও জানত না যে তার একটা যমজ বোনও আছে। আজ যেন একসাথে অনেক গুলো ধাক্কা খেল সে।


চলবে ইনশাআল্লাহ ✨

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url