​স্মৃতির অন্তরালে

​পর্ব: ০৮+০৯+১০+শেষ পর্ব

​পিস্তলের নলের সেই কালো অন্ধকার গর্তটা সরাসরি আমার বুকের দিকে তাক করা। আমার চেনা মায়ের ছদ্মবেশে থাকা এই নারী যে আসলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু, রেহানা চৌধুরী—তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

​ল্যাপটপের স্ক্রিনে কবিরের সেই ভিডিওটা তখনো থমকে আছে। এখন আমার কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর আমার শরীরের সেই কালশিটে দাগ, হাসপাতালের গন্ধ... ওগুলো কবিরের দেওয়া কোনো আঘাত ছিল না। রেহানা চৌধুরীর লোকেরা যখনই ধানমন্ডির বাড়ির আশেপাশে আমাকে খোঁজার চেষ্টা করত, কবির তখনই আমাকে ড্রাগ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিজের ক্লিনিকে নিয়ে লুকিয়ে রাখত। আর আমি বোকা মেয়ে, আমার একমাত্র রক্ষাকর্তাকেই পিশাচ ভেবে জেলে পাঠালাম!

​"কী হলো আরোহী? বড্ড বেশি শক পেয়েছ, তাই না?" রেহানা চৌধুরী উনার সেই বিকৃত গলায় হাসলেন। "কবির ভেবেছিল তোকে 'অনন্যা' বানিয়ে রাখলে আমাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু ও জানত না, ধানমন্ডির বাড়ির ওই স্মোক ডিটেক্টরের ক্যামেরাটা কবির লাগায়নি, ওটা আমি লাগিয়েছিলাম তোর ওপর নজর রাখার জন্য!"

​আমার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই জল ভয়ের ছিল না, ছিল নিজের ভুলের জন্য তীব্র অনুশোচনার। কবির... তুমি আমাকে বাঁচানোর জন্য নিজের ক্যারিয়ার, নিজের জীবন বাজি ধরলে, আর আমি তোমারই সর্বনাশ করলাম!

​"এখন শেষবারের মতো অনন্যা রহমানের ফাইলে একটা সই কর," রেহানা চৌধুরী টেবিল থেকে সেই আমমোক্তারনামার কাগজটা আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। "তাহলে অন্তত গুলশানের জমিটা আমাদের হয়ে যাবে, আর তোকে আমি খুব বেশি কষ্ট না দিয়ে এক গুলিতেই শান্ত করে দেব।"

​আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা টেনে নিলাম। কিন্তু আমার চোখ তখন খুঁজছিল ডিবির ইন্সপেক্টর তানভীর আহমেদকে। উনি তো এই রুমেই ছিলেন! উনি কেন কিছু করছেন না?

​আমি তানভীর সাহেবের দিকে তাকাতেই আমার বুকটা হিম হয়ে গেল। তানভীর সাহেব ল্যাপটপের সামনে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, উনার কপালে একটা ঠান্ডা পিস্তল ঠেকিয়ে রেখেছে উনারই পেছনের একজন পুলিশ কনস্টেবল!

​"তানভীর সাহেবকে দেখে লাভ নেই আরোহী," রেহানা চৌধুরী ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলেন। "ডিপার্টমেন্টের সবাই তো আর সৎ হয় না। এই কনস্টেবল রফিক আমাদের বহু পুরোনো লোক। এবার চুপচাপ সই কর!"

​আমি কলমটা হাতে নিলাম। আমার মাথায় তখনো কবিরের শেষ কথাটা ঘুরছিল—‘খেলা এত সহজে শেষ হয় না।’ কবির যদি এতই দূরদর্শী হয়, তবে সে জেলে যাওয়ার আগে আমার জন্য কোনো না কোনো সুরক্ষাকবচ নিশ্চয়ই রেখে গেছে।

​আমি কাগজের ওপর কলমটা ছোঁয়াতেই হঠাৎ করি হাসপাতালের পুরো করিডোর জুড়ে ফায়ার অ্যালার্ম (Fire Alarm) বিকট শব্দে বেজে উঠল!

​একই সাথে কেবিনের ওপরের সিলিং থেকে তীব্র বেগে পানি পড়তে শুরু করল। স্প্রিঙ্কলারগুলো চালু হয়ে গেছে! মুহূর্তের মধ্যে পুরো রুম পানিতে ভেসে গেল, আর ল্যাপটপটা শর্ট সার্কিট হয়ে বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ ঘটল।

​হঠাৎ এই আলো আর পানির তাণ্ডবে রেহানা চৌধুরী আর কনস্টেবল রফিক মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে গেলেন। উনাদের চোখ থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার এই এক সেকেন্ড সময়টাই ছিল আমার জন্য শেষ সুযোগ।

​আমি বিছানা থেকে ছিটকে নিচে নেমে রেহানা চৌধুরীর পা লক্ষ্য করে লাথি মারলাম। মেঝের পানিতে পা পিছলে উনি ধপাস করে পড়ে গেলেন, আর উনার হাতের পিস্তলটা ছিটকে চলে গেল ডক্টর আহমেদের পায়ের কাছে।

​ডক্টর আহমেদ এক মুহূর্তও নষ্ট না করে পিস্তলটা কুড়িয়ে নিলেন এবং সোজা কনস্টেবল রফিকের হাত লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লেন!

​"উফ!" শব্দে রফিকের হাতের পিস্তলটা মেঝেতে পড়ে গেল। ইন্সপেক্টর তানভীর এই সুযোগে রফিককে একটা জুডো থ্রো মেরে মেঝের সাথে লেপ্টে দিলেন।

​করিডোর দিয়ে হুড়মুড় করে একদল নতুন পুলিশ ফোর্স কেবিনের ভেতরে ঢুকল। তাদের সবার আগে যিনি হেঁটে আসছিলেন, উনাকে দেখে আমার চোখ দুটো বিশ্বাসে আর অবিশ্বাসে বড় বড় হয়ে গেল।

​পরনে সেই চিরচেনা সাদা অ্যাপ্রন। চকচকে জুতো। দামী ঘড়ি। আর মুখে সেই শান্ত, মার্জিত হাসি।

​ডক্টর কবির চৌধুরী!

​কবিরের পেছনে হাতকড়া ছিল না। সে খুব স্বাভাবিকভাবে রুমে ঢুকে রেহানা চৌধুরীর দিকে তাকাল।

​"রেহানা চৌধুরী, আপনি ভেবেছিলেন ডিবির সব পুলিশকে আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন?" কবির উনার সামনে এসে নিচু হয়ে বসল। "ইন্সপেক্টর তানভীর ডিবিতে যোগ দেওয়ার আগে আমার ল্যাবের একজন পেসেন্ট ছিলেন। আপনি যেদিন তানভীরের টেবিলে ওই হার্ডডিস্ক পাঠিয়েছিলেন, আমরা তখনই বুঝে গিয়েছিলাম আপনার পরবর্তী চাল কী হবে। তাই তানভীর সাহেবের সাথে প্ল্যান করেই আমি কাল রাতে আত্মসমর্পণ করেছিলাম, যাতে আপনি নিজে হেঁটে এই ফাঁদে পা দেন।"

​রেহানা চৌধুরী মেঝেতে পড়ে থেকে হিসহিসিয়ে উঠলেন, "কবির! তুই..."

​"আইন নিজের গতিতে চলবে রেহানা চৌধুরী," কবির উঠে দাঁড়িয়ে পুলিশ অফিসারদের ইশারা করল। পুলিশ রেহানা চৌধুরী আর রফিককে টেনে-হিঁচড়ে রুম থেকে বের করে নিয়ে গেল।

​রুমটা এখন একদম নীরব। শুধু সিলিং থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার শব্দ হচ্ছে।

​আমি মেঝের পানিতে ভিজেই কবিরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছিল। আমি যে মানুষকে খুনি ভেবেছিলাম, সে-ই আজ আমার জীবন আর সম্পত্তি দুটোই রক্ষা করল।

​"কবির..." আমার গলা বুজে এল। "আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমাকে..."

​কবির আমার দিকে এগিয়ে এল। সে নিজের পকেট থেকে একটা শুকনো রুমাল বের করে আমার কপালটা আলতো করে মুছে দিল। উনার সেই মৃদু, মার্জিত কণ্ঠস্বর আমার কানে আবার মধু বর্ষণ করল।

​"আমি তো আগেই বলেছিলাম অনন্যা... দুঃখিত, আরোহী। এখানে ডাক্তার আমি, তুমি নও। তোমার এই অতিরিক্ত চিন্তা করার অভ্যাসটা এখনো গেল না।"

​আমি কবিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। গত দুই বছর ধরে যে জড়িয়ে ধরাটাকে আমি একটা বন্দিদশা ভাবতাম, আজ মনে হলো—এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

​কিন্তু কবির যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার চুলে হাত বোলাচ্ছিল, ঠিক তখনই উনার কোটের পকেট থেকে একটা ছোট অডিও রেকর্ডার অন হয়ে গেল। আর সেখান থেকে একটা অত্যন্ত পরিচিত কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলে উঠল—

​"কাজটা চমৎকার করেছ কবির। রেহানা চৌধুরীকে তো আমরা সরিয়ে দিলাম। এবার আরোহীর ওই বাকি সম্পত্তিটুকু আমাদের নামে লিখে নিতে আর কোনো বাধা রইল না..."

​কণ্ঠস্বরটি আর কারও নয়, কবিরের মা—দেলোয়ারা চৌধুরীর! যিনি এখনো জেলেই আছেন!

​আমার পুরো শরীরটা আবার শক্ত হয়ে গেল। কবিরের বুকের ভেতর জড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই আমি বুঝতে পারলাম—কবিরের হার্টবিট একদম শান্ত, একদম স্বাভাবিক। কোনো উত্তেজনা নেই।

​সে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "আমার চিকিৎসা এখনো অসমাপ্ত, আরোহী। খেলা তো কেবল শুরু হলো।"

​চলবে,,,,,,কবিরের এই দ্বৈত চরিত্রের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে এক হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। যে বুকটাকে এক সেকেন্ড আগেও পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে হচ্ছিল, মুহূর্তে তা যেন একটা জলজ্যান্ত কসাইখানায় পরিণত হলো।

​কবির আমার চুলে হাত বোলাচ্ছে—খুব আলতো, খুব মায়াময় স্পর্শ। কিন্তু উনার কোটের পকেটের ওই অডিও ক্লিপটা আমার কানের ভেতর তখনো লাভার মতো ফুটছে।

​‘এবার আরোহীর ওই বাকি সম্পত্তিটুকু আমাদের নামে লিখে নিতে আর কোনো বাধা রইল না...’

​তার মানে, কবির রেহানা চৌধুরীকে সরাতে চেয়েছিল নিজের মায়ের পথ পরিষ্কার করার জন্য! এখানে কেউ ভালো নয়। একদল শকুনের হাত থেকে বাঁচিয়ে কবির আমাকে নিজের খাঁচায় আটকে রেখেছে, যাতে অন্য কোনো শিকারী ভাগ না বসাতে পারে!

​"কী হলো আরোহী? কাঁপছ কেন?" কবির আমাকে বুক থেকে একটু সরিয়ে আমার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এখন আর কোনো ছদ্মবেশী বিষাদ নেই, সেখানে এখন এক চরম বিজয়ী পিশাচের উল্লাস।

​আমি চট করে ইন্সপেক্টর তানভীরের দিকে তাকালাম। কিন্তু তানভীর সাহেব তখন ঘরের এক কোণায় অন্য পুলিশ অফিসারদের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। উনি কিংবা ডক্টর আহমেদ—কেউই এই ফিসফিসানি শুনতে পাননি। আর আমি যদি এখন চিৎকার করে কবিরের আসল রূপ ফাঁসের চেষ্টা করি, তবে এই ধূর্ত নিউরোলজিস্ট প্রমাণ করে দেবে যে এটা আমার ‘ইনডিউসড উইথড্রয়াল সিন্ড্রোম’-এর কারণে হওয়া নতুন কোনো হ্যালুসিনেশন বা মানসিক বিভ্রম!

​আমি আমার ভেতরের তীব্র আতঙ্কটাকে জোর করে চেপে রাখলাম। অনন্যা রহমানের সেই বোকা আর অবুঝ শিশুর অভিনয়টা আমাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এটাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র চাবিকাঠি।

​"আমি... আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম কবির," আমি একটু কেঁপে উঠে উনার শার্টের হাতাটা খামচে ধরলাম। "রেহানা চৌধুরী যে আমার এত বড় শত্রু, আমি বুঝতে পারিনি। তুমি না থাকলে আজ আমি মরেই যেতাম।"

​কবিরের ঠোঁটের কোণায় সেই মার্জিত, আত্মবিশ্বাসী হাসিটা আবার ফিরে এল। সে আমার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। "আমি তো তোমাকে শুরু থেকেই বলছি অনন্যা... নিজের ওই ছোট্ট মাথায় এত চাপ নিও না। তোমার দেখভাল করার জন্য আমি আছি তো।"

​অনন্যা! সে আমাকে আবার ‘অনন্যা’ নামে ডাকল। তার মানে সে চায় আমি আরোহী চৌধুরীকে ভুলে আবার সেই খাঁচার অনন্যা হয়েই বেঁচে থাকি।

​"ইন্সপেক্টর তানভীর," কবির ঘুরে দাঁড়িয়ে তানভীর সাহেবের দিকে তাকাল। "আরোহীর মানসিক অবস্থা এখন বড্ড নাজুক। ও যে শক পেয়েছে, তাতে ওকে হাসপাতালে রাখা আর নিরাপদ নয়। আমি ওকে আমাদের ধানমন্ডির বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই। সেখানে আমার পার্সোনাল কেয়ারে ও দ্রুত রিকভার করবে।"

​ইন্সপেক্টর তানভীর একটু ভেবে মাথা নাড়লেন। "ঠিক আছে ডক্টর কবির। রেহানা চৌধুরী আর ওর লোক তো ধরা পড়েছে, তাই এখন আর কোনো থ্রেট নেই। আপনি ওকে নিয়ে যেতে পারেন। তবে আইনি কাগজপত্রের জন্য আমাদের ল্যাবে কিছু সই লাগবে, ওটা আমরা পরে সেরে নেব।"

​"অবশ্যই," কবির মৃদু হাসল।

​বিকেলের দিকে কবির আমাকে ধানমন্ডির সেই বিলাসবহুল বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে এল। বাড়িটা এখন একদম থমথমে। সেই গোপন সুড়ঙ্গ আর ল্যাব পুলিশ সিলগালা করে দিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু ওপরের তলার আমাদের সেই চেনা শয়নকক্ষটা একদম আগের মতোই গোছানো।

​বিছানার ওপর থাকা স্মোক ডিটেক্টরটা এখন হা করে খোলা, ওখানকার ক্যামেরাটা পুলিশ নিয়ে গেছে। কিন্তু এই ঘরের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি আসবাবে যেন কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরীর অদৃশ্য চোখ লুকিয়ে আছে।

​"তুমি একটু ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসছি," কবির আমার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

​সে দরজাটা বাইরে থেকে লক করেনি, কিন্তু আমি জানি—এই বাড়ি থেকে পালানো অসম্ভব।

​আমি দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের সামনে গেলাম। আমার কপালে সেই রাতের কাটার দাগটা এখনো দগদগে। আমি আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকালাম। এই চোখে এখন আর অনন্যা রহমানের অসহায়ত্ব নেই। এই চোখে এখন আরোহী চৌধুরীর প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে।

​কবির যদি নিজেকে দাবার মাঠের কিং বা রাজা মনে করে, তবে সে ভুলে গেছে—রাজাকে এক চালের মাত দেওয়ার জন্য একটা বোড়ের চালই যথেষ্ট।

​আমি ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারটা খুঁজলাম। সেখানে আমার সেই পুরনো গবেষণার বইটা এখনো রাখা আছে, যেখান থেকে আমি প্রথম চিরকুটটা পেয়েছিলাম। আমি বইটা খুললাম। চিরকুটটা পুলিশ আলামত হিসেবে নিয়ে গেছে, কিন্তু বইয়ের একদম শেষ পাতায় একটা ছোট্ট পেনড্রাইভ স্কচটেপ দিয়ে আটকানো ছিল!

​পেনড্রাইভটা কবিরের নয়। ওটার ওপর ছোট করে লেখা ছিল—'S.C' (সুরাইয়া চৌধুরী)।

​আমার আসল মা! মা তাহলে মারা যাওয়ার আগে বা নিখোঁজ হওয়ার আগে এই বাড়িতে নিজের কোনো শেষ প্রমাণ রেখে গিয়েছিলেন, যা কবির কোনোদিন খুঁজে পায়নি!

​আমি কাঁপতে কাঁপতে পেনড্রাইভটা আমার ওড়নার ভেতর লুকিয়ে ফেললাম। ঠিক তখনই দরজার লক খোলার আওয়াজ হলো। কবির হাতে চায়ের কাপ আর সেই চেনা সাদা রঙের ক্যাপসুলটা নিয়ে ঘরে ঢুকল।

​"অতিরিক্ত চিন্তা বন্ধ করার ওষুধ, অনন্যা," কবির চায়ের কাপটা টেবিলের পাশে রাখতে রাখতে বলল। "আমার সামনেই এটা গিলে খাও।"

​আমি কবিরের দিকে তাকালাম। উনার মুখের চোয়াল আবার শক্ত হয়ে উঠেছে। সেই পুরোনো খেলা, সেই পুরোনো আদেশ।

​আমি ক্যাপসুলটা হাতে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম, কবির... তুমি আমাকে যে অনন্যা রহমান বানিয়ে রাখতে চাও, সেই অনন্যা রহমানই এবার তোমার এই সাজানো সাম্রাজ্য ধ্বংস করবে।

​আমি ক্যাপসুলটা মুখের ভেতর পুরে নিলাম।

​পর্ব: ১০

​কবিরের সেই তীক্ষ্ণ, বাজপাখির মতো চাউনি সরাসরি আমার মুখের ওপর স্থির হয়ে ছিল। আমি অনন্যা রহমানের মতো বাধ্য মেয়ের মতো হাসলাম, গ্লাসের পানিটা মুখে দিয়ে ক্যাপসুলটা এক ঢোকে গিলে ফেলার ভান করলাম।

​কবিরের মুখের চোয়ালটা আস্তে আস্তে শিথিল হয়ে এল। সে তৃপ্তির একটা হাসি দিয়ে আমার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। "গুড গার্ল। এবার বাধ্য মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়ো। আগামীকাল তোমার ব্রেনের নতুন কিছু টেস্ট করতে হবে।"

​সে লাইটটা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজায় ডাবল লকের চেনা ‘ক্লিক’ শব্দটা হলো।

​অন্ধকার ঘরে আমি আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করলাম না। বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে জিহ্বার নিচে চেপে রাখা সেই সাদা ক্যাপসুলটা থুতু দিয়ে বেসিনে ফেলে দিলাম। পানি দিয়ে মুখটা ভালো করে ধুয়ে নেওয়ার সময় আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। আমার হাতে সময় খুব কম। কবিরের ড্রাগের অ্যাকশন শুরু হওয়ার ছদ্মবেশ আমাকে আর বড়জোর এক ঘণ্টা ধরে রাখতে হবে, তারপরই সে রুমে এসে চেক করবে।

​আমি ওড়নার নিচে লুকিয়ে রাখা সেই মায়ের 'S.C' লেখা পেনড্রাইভটা বের করলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, ঘরে কোনো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নেই। কবির তার হোম-অফিসের ল্যাপটপটা নিজের সাথে করে নিয়ে ঘোরে।

​হঠাৎ আমার মনে পড়ল কবিরের স্টাডি রুমের কথা। ওখানকার দেয়াল আলমারির পেছনে একটা ছোট সিক্রেট লকার ছিল, যা আমি অনন্যা থাকা অবস্থায় একবার কবিরকে খুলতে দেখেছিলাম।

​আমি খুব সাবধানে, বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পা ফেলে শয়নকক্ষের জানালার কার্নিশ দিয়ে পাশের স্টাডি রুমের ব্যালকনিতে গিয়ে নামলাম। চারপাশটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। স্টাডি রুমের আলমারিটা সরিয়ে সেই দেয়াল লকারটার সামনে দাঁড়ালাম।

​লকারটার পাসওয়ার্ড কী হতে পারে? কবিরের সাইকোলজি অনুযায়ী সে বড্ড বেশি আত্মবিশ্বাসী। সে নিশ্চয়ই আমার কোনো অতীত বা বর্তমানের তারিখ ব্যবহার করেছে। আমি কাঁপতে কাঁপতে টাইপ করলাম—১২০৫২৪ (১২ মে, ২০২৪—যেদিন আমার তথাকথিত অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল)।

​‘ক্লিক!’

​লকারটা খুলে গেল! আর ভেতরে কোনো টাকা বা গয়না ছিল না, সেখানে ছিল একটা ছোট নোটবুক ট্যাবলেট, যা কবিরের পার্সোনাল ডাটা ব্যাকআপ হিসেবে রাখা। আমি দ্রুত পেনড্রাইভটা ওই ট্যাবলেটে প্লাগ-ইন করলাম।

​স্ক্রিনে একটা ফোল্ডার ওপেন হলো। ফোল্ডারের নাম—"The Real Blueprint" (আসল নীল নকশা)।

​আমি প্রথম ভিডিও ফাইলটা প্লে করতেই স্পিকারে আমার আসল মা, সুরাইয়া চৌধুরীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কিন্তু উনার গলার আওয়াজটা ছিল ভীষণ আতঙ্কিত।

​"আরোহী... মা আমার... তুই যদি কোনোদিন এই ভিডিওটা দেখতে পারিস, তবে জানবি তোর মা তোকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনটা বাজি রেখে গেছে। কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরী তোর সৎ মা রেহানার চেয়েও বড় পিশাচ। ওরা রেহানাকে ব্যবহার করেছে তোকে আমাদের সিলেটের বাড়ি থেকে বের করার জন্য। কিন্তু আসল সত্যটা অন্য জায়গায়..."

​মা ভিডিওতে কাঁপতে কাঁপতে একটা কাগজের তাড়া ক্যামেরার সামনে ধরলেন। "তোর বাবা মরার আগে গুলশানের জমি বা সিলেটের চা-বাগান তোর নামে লিখে যাননি আরোহী! তোর বাবা আসলে ঢাকা ও সিলেটের দুটি বড় ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির আসল মালিক ছিলেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং আন্ডারগ্রাউন্ড বিজনেস! আর কবির চৌধুরী কোনো বড় নিউরোলজিস্ট নয়, সে ছিল তোর বাবার ল্যাবের প্রধান ড্রাগ মেকার! তোর বাবা যখন এই ব্যবসা বন্ধ করতে চাইলেন, তখন কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরী মিলে তোর বাবাকে স্লো-পয়জন দিয়ে মেরে ফেলে! আর তুই যাতে কোনোদিন তোর বাবার সেই গোপন ল্যাব আর কোটি কোটি টাকার ড্রাগের ফর্মুলার খোঁজ না পাস, সেজন্যই তোকে অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে স্মৃতিভ্রম করানো হয়েছে!"

​আমার মাথার ভেতর যেন একটা আস্ত আকাশ ভেঙে পড়ল।

​আমার বাবা... ডক্টর কবির... আমার পুরো অতীতটাই একটা মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে! কবির আমাকে সম্পত্তি পাওয়ার জন্য বাঁচিয়ে রাখেনি, সে আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে কারণ আমার বাবার সেই আসল ড্রাগ ব্যবসার ব্ল্যাকবক্সের পাসওয়ার্ডটা আমার সাবকনশাস মাইন্ড বা অবচেতন মনের কোথাও লুকিয়ে আছে, যা কবির প্রতি রাতে ড্রাগ দিয়ে খোঁজার চেষ্টা করত!

​"সত্যটা জেনে কেমন লাগল, অনন্যা?"

​হঠাৎ স্টাডি রুমের মূল লাইটটা জ্বলে উঠল। তীব্র আলোয় আমার চোখ দুটো ধাঁধিয়ে গেল।

​দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর কবির চৌধুরী। তার হাতে একটা রিভলভার, আর তার পেছনে হুইলচেয়ারে বসে আছেন উনার মা দেলোয়ারা চৌধুরী—যিনি জেল থেকে প্যারোলে বা কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে অলরেডি খালাস পেয়ে গেছেন! উনার মুখের সেই পোড়া দাগটা একটা ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢাকা।

​"কবির..." আমি ট্যাবলেটটা শক্ত করে বুকে চেপে ধরলাম।

​"তুমি ক্যাপসুলটা ফেলোনি, আমি জানি আরোহী," কবির আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে এল। "আমি তোমার বেসিনের পাইপে একটা সেন্সর ফিট করে রেখেছি। লিকুইড ছাড়া অন্য কিছু গেলেই আমার ফোনে অ্যালার্ট আসে। তুমি বড্ড বেশি চালাক। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তোমার বাবার সেই বিলিয়ন ডলারের ড্রাগ সাম্রাজ্যের শেষ কোডটা আজ রাতেই আমাকে তোমার মাথা থেকে বের করতে হবে। আর সেজন্য কোনো ক্যাপসুল নয়..."

​কবির পকেট থেকে একটা বড় ইলেকট্রনিক ডিভাইস বের করল, যার মাথায় অনেকগুলো তার আর সিরিঞ্জ লাগানো। "আজ রাতে আমরা 'ফেজ ৪' বা ফাইনাল স্টেজ ট্রায়াল করব। এই মেশিনের শক তোমার ব্রেনের সব স্মৃতি এক সেকেন্ডে বের করে আনবে, কিন্তু তার পরমুহূর্তেই তোমার ব্রেনটা চিরদিনের জন্য ডেড হয়ে যাবে।"

​দেলোয়ারা চৌধুরী পিশাচের মতো হেসে উঠলেন, "কবির, আর দেরি করিস না! পুলিশ আসার আগেই ওর মাথা থেকে কোডটা বের কর, তারপর একে পুড়িয়ে ছাই করে দে!"

​কবির রিভলভারটা টেবিলের ওপর রেখে সেই ভয়ংকর মেশিনটা নিয়ে আমার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু তার আগেই সে আমার মুখটা চেপে ধরল। ইলেকট্রনিক তারগুলো আমার কপালে ছোঁয়াতেই আমার পুরো শরীরে এক তীব্র বৈদ্যুতিক শক লাগলো—

​আমার চোখের সামনে চারপাশটা লাল হয়ে আসতে লাগল, আমার বাবার শেষ কথাগুলো আমার ব্রেনের ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে লাগল...

​চলবে,,,,,,


​পর্ব: শেষ 


​তীব্র একটা বৈদ্যুতিক কারেন্ট আমার শিরদাঁড়া বেয়ে সরাসরি মাথার মগজে গিয়ে আঘাত করল। আমার মনে হচ্ছিল আমার মাথার খুলিটা বুঝি এখনই ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। হাত-পা ছটফট করতে লাগল, কিন্তু কবিরের সেই দানবীয় শক্তি আমার মুখটাকে এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে একটা গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই বের হচ্ছিল না।

​"কবির, ভোল্টেজ আরও বাড়া!" হুইলচেয়ারে বসে দেলোয়ারা চৌধুরী উন্মাদের মতো চিৎকার করছিলেন। "ওর চোখের মণি দেখ, কাঁপছে! পুরোনো মেমোরি সারফেসে চলে আসছে!"

​কবির দাঁতে দাঁত চেপে মেশিনের নবটা আরও ঘুরিয়ে দিল। "আরোহী, তোমার বাবার সেই আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবের মেইন সার্ভার কোডটা মনে করো! ওটা কোথায়?! তোমার বাবা মরার আগে ওটা তোমার ব্রেনের কোন ফোল্ডারে সেভ করে গেছে?!"

​তীব্র ব্যথার সেই নরককুণ্ডে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই আমার চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ভেসে উঠতে লাগল আমার পনেরো বছর বয়সের সেই পুরোনো দিনগুলো। সিলেটের চা-বাগানের বাংলো বাড়ি... বাবার সেই বিশাল লাইব্রেরি ঘর... আর বাবা মরার ঠিক দুই দিন আগে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদছেন—

‘মা আরোহী, এই ডায়েরির শেষ পাতাটা তুই মুখস্থ করে পুড়িয়ে ফেল। এই দুনিয়াটা বড্ড খারাপ। যদি কোনোদিন আমি না থাকি, এই কোডটাই তোকে বাঁচাবে, আবার এটাই তোকে মারবে...’

​কোডটা আমার মনে পড়ে গেল! সাতটা অক্ষরের একটা আলফা-নিউমেরিক পাসওয়ার্ড।

​কিন্তু আমি যদি এখন কোডটা কবিরকে বলে দিই, তবে এই পিশাচটা কোড পাওয়ার পরমুহূর্তেই আমাকে খুন করে লাশ গুম করে দেবে। আমাকে বাঁচতে হবে, বাবার খুনিদের শেষ করতে হবে।

​আমার শরীরে তখন ড্রাগ আর ইলেকট্রনিক শকের কারণে এক অলৌকিক শক্তি ভর করল। আমি আমার ডান হাতটা অন্ধের মতো হাতড়ে টেবিলের ওপর রাখা কবিরের সেই রিভলভারটা ছোঁয়ালাম। কবির তখন উন্মাদের মতো মেশিনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।

​আমি রিভলভারটা শক্ত করে মুঠোয় নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই সরাসরি কবিরের উরুতে ঠেকিয়ে ট্রিগার চেপে দিলাম—

​‘ডিশুম!’

​এক তীব্র গুলির শব্দে পুরো স্টাডি রুম কেঁপে উঠল। কবির একটা আর্তনাদ করে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। আমার কপাল থেকে মেশিনের তারগুলো খুলে গেল। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে মেঝের ওপর পড়ে গেলাম, বুক ভরে বাতাস নেওয়ার চেষ্টা করলাম।

​"কবির!" দেলোয়ারা চৌধুরী চিৎকার করে উনার হুইলচেয়ার থেকে প্রায় দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করলেন। কবির উরুতে হাত দিয়ে মেঝেতে গোঙাচ্ছিল, সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।

​আমি কোনোমতে দেয়াল ধরে উঠে দাঁড়ালাম। রিভলভারটা এবার সরাসরি কবিরের কপাল লক্ষ্য করে তাক করলাম। আমার হাত কাঁপছিল না।

​"খবরদার কবির! এক পা-ও নড়বে না!" আমার গলার আওয়াজে আরোহী চৌধুরীর সেই আসল সিংহের মতো গর্জন ছিল।

​কবির ব্যথায় নীল হয়ে গিয়েও আমার দিকে তাকিয়ে পিশাচের মতো হাসল। "গুলি করবি? কর! আমি মরে গেলে তোর ওই ড্রাগের ব্যবসার আসল কোড কোনোদিন সচল হবে না। আর তুইও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির ওপর বসে অনাহারে মরবি। কারণ তোর বাবা ওই ল্যাবে যে পরিমাণ অবৈধ ড্রাগ রেখে গেছে, তার একটা চাবিও তুই পাবি না!"

​"আমার ওই নোংরা অবৈধ সম্পত্তির কোনো লোভ নেই কবির," আমি শান্ত গলায় বললাম। "আমার বাবা যা ভুল করেছে, তার শাস্তি উনি পেয়েছেন। কিন্তু তোমরা উনাকে খুন করেছ, আমাকে দুই বছর ধরে একটা পুতুল বানিয়ে রেখেছ। তার শাস্তি তোমরা আজ পাবে।"

​আমি বাম হাত দিয়ে সেই নোটবুক ট্যাবলেটটা তুলে নিলাম, যেখানে আমার মায়ের আসল ভিডিওটা চলছিল। আমি ওখান থেকে সরাসরি ডিবির ইন্সপেক্টর তানভীরের পার্সোনাল নাম্বারে লাইভ স্ট্রিম অন করে দিলাম!

​"ইন্সপেক্টর তানভীর, আপনি নিশ্চয়ই সবকিছু লাইভ দেখছেন?" আমি ট্যাবলেটের ক্যামেরার সামনে কবিরের রক্তাক্ত মুখটা ধরলাম। "ডক্টর কবির চৌধুরী আর উনার মা দেলোয়ারা চৌধুরী জেলের লোকজনকে ঘুষ দিয়ে পালিয়ে এসে আমাকে খুন করার চেষ্টা করছিল। আর কবির নিজেই স্বীকার করেছে যে সে আমার বাবাকে খুন করেছে।"

​ট্যাবলেটের ওপাশ থেকে ইন্সপেক্টর তানভীরের উত্তেজিত গলা ভেসে এল, "আরোহী! তুমি নিজেকে হোল্ড করো। আমরা ধানমন্ডির বাড়ির ঠিক বাইরেই আছি। কবিরের জেলের পালানোর খবর পেয়ে আমরা অলরেডি ব্যাকআপ নিয়ে আসছিলাম। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে আমরা ভেতরে ঢুকছি!"

​কবির বুঝতে পারল এবার তার খেলা সত্যিই শেষ। সে উরুর ব্যথা চেপে মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে টেবিলের নিচে রাখা একটা ছোট লাল রিমোটের দিকে হাত বাড়াল।

​"তাহলে সবকিছু একবারে ধ্বংস হয়ে যাক!" কবির চিৎকার করে উঠল।

​সে রিমোটের বোতামে চাপ দেওয়ার আগেই, স্টাডি রুমের মেইন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল সোয়াট টিম। কিন্তু কবির বোতামটা টিপে দিয়েছিল।

​পরমুহূর্তেই, পুরো ধানমন্ডির বাড়ির নিচ তলার সেই গোপন ল্যাব থেকে একটা বিকট বিস্ফোরণের আওয়াজ হলো! পুরো বাড়িটা ভূমিকম্পের মতো কাঁপতে শুরু করল। নিচের ল্যাবে কবির আগে থেকেই ডিনামাইট সেট করে রেখেছিল, যাতে ধরা পড়লে সব প্রমাণ একবারে উড়িয়ে দিতে পারে।

​চারপাশে আগুন ধরে গেল। কালো ধোঁয়ায় পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে আসছে। পুলিশ অফিসাররা কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরীকে টেনে তোলার চেষ্টা করছিল, আর ডক্টর আহমেদ ধোঁয়ার মধ্যে চিৎকার করছিলেন—"আরোহী! জলদি বাইরে চলো! পুরো বাড়ি ভেঙে পড়বে!"

​আমি ট্যাবের পেনড্রাইভটা পকেটে পুরে দরজার দিকে দৌড় দেব, ঠিক তখনই মেঝেতে পড়ে থাকা কবির আমার গোড়ালিটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখ দুটো আগুনের আলোয় জ্বলজ্বল করছিল।

​"কোডটা না দিয়ে তুইও যেতে পারবি না আরোহী..." কবিরের শেষ অট্টহাসি ধোঁয়ার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

​চারপাশে আগুনের লেলিহান শিখা তখন ঘরের সিলিং ছুঁয়ে ফেলেছে। নিচের তলার কেমিক্যাল ল্যাব বিস্ফোরণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুরো স্টাডি রুম অন্ধকার হয়ে আসছিল। চোখ মেলা যাচ্ছিল না, ফুসফুস যেন আগুনে পুড়ছিল।

​তার ওপর মেঝের ওপর পড়ে থাকা অর্ধমৃত কবির আমার গোড়ালিটা এমনভাবে চেপে ধরেছে, যেন সে নরকে গেলেও আমাকে সাথে নিয়েই যাবে।

​"কোডটা না দিয়ে তুইও যেতে পারবি না আরোহী..." কবিরের গলার আওয়াজ ধোঁয়ার কাশির মাঝেও এক পিশাচের অট্টহাসির মতো শোনাল।

​"কবির! হাত ছাড়ো!" আমি আমার অন্য পা দিয়ে কবিরের রক্তাক্ত উরুতে গায়ের সব শক্তি দিয়ে লাথি মারলাম।

​ব্যথায় কবিরের হাতের বাঁধন আলগা হতেই আমি ছিটকে বেরিয়ে এলাম। ঠিক তখনই আমাদের মাথার ওপরের জ্বলন্ত কাঠের সিলিংয়ের একটা বিশাল অংশ বিকট শব্দে কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরীর মাঝখানে ভেঙে পড়ল। আগুনের প্রাচীর আমাদের আলাদা করে দিল। দেলোয়ারা চৌধুরীর শেষ চিৎকার ধোঁয়ার চাদরে মিলিয়ে গেল।

​"আরোহী! কোথায় তুমি? হাত বাড়াও!" ধোঁয়ার ওপাশ থেকে ডক্টর আহমেদের গলা শুনতে পেলাম।

​আমি অন্ধের মতো হাতড়ে সামনের দিকে এগোলাম। ডক্টর আহমেদ আর একজন সোয়াট অফিসার আমার হাত ধরে টেনে একরকম শূন্যে তুলে নিলেন। সিঁড়িঘর দিয়ে নিচে নামার সময় চারপাশের দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল।

​যখন আমরা ধানমন্ডির সেই বিলাসবহুল বাড়ির মেইন গেট দিয়ে বাইরে ছিটকে বেরোলাম, ঠিক তখনই পেছনের পুরো তিন তলা বাড়িটা এক তিল তিল করে ধসে মাটির সাথে মিশে গেল। এক বিশাল আগুনের গোলক রাতের আকাশকে লাল করে তুলল।

​আমি লনের ঘাসের ওপর হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়লাম। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো সাইরেন বাজিয়ে ভেতরে ঢুকছিল। ডিবির ইন্সপেক্টর তানভীর আহমেদ আমার মাথায় একটা চাদর জড়িয়ে দিলেন।

​"আরোহী... ইউ আর সেফ নাও," তানভীর সাহেব বললেন। "কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরী ওই আগুনের ভেতর থেকে বের হতে পারেনি। ওদের অধ্যায় শেষ।"

​আমি ধসে পড়া বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। যে বাড়িটা গত দুই বছর ধরে আমার চেনা পৃথিবী ছিল, যেখানে আমি অনন্যা রহমান হিসেবে বেঁচে ছিলাম—তা আজ ছাই হয়ে গেছে। আমার পকেটে হাত দিতেই মায়ের সেই পেনড্রাইভটা আর বাবার রেখে যাওয়া নোটবুক ট্যাবলেটটা হাতের ছোঁয়ায় অনুভব করলাম।

​এক সপ্তাহ পর।

ডিবির হেডকোয়ার্টার্সের কনফারেন্স রুম।

​টেবিলের চারপাশে বসে আছেন ইন্সপেক্টর তানভীর, ডক্টর আহমেদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সবার চোখ আমার দিকে। আমি শান্তভাবে টেবিলের ওপর সেই নোটবুক ট্যাবলেটটা রাখলাম।

​"আরোহী চৌধুরী," একজন কর্মকর্তা গম্ভীর গলায় বললেন। "আপনার বাবার সেই আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রাগ বিজনেসের নেটওয়ার্কটা এখনো সচল আছে। কবির মারা গেছে ঠিকই, কিন্তু ডার্ক ওয়েবে ওই ড্রাগের ফর্মুলার মূল্য প্রায় শত কোটি টাকা। ওটার মেইন সার্ভার কোডটা শুধু আপনার মাথাতেই আছে। আপনি কি কোডটা আমাদের দেবেন? সরকার এই অবৈধ ড্রাগের চেইনটা চিরদিনের জন্য ধ্বংস করতে চায়।"

​আমি ডক্টর আহমেদের দিকে তাকালাম। উনি আমাকে মৃদু মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করলেন।

​আমি ট্যাবলেটের কি-বোর্ডটা টেনে নিলাম। তারপর আমার অবচেতন মন থেকে উঠে আসা সেই সাত অক্ষরের পাসওয়ার্ডটা টাইপ করলাম—"A-R-O-H-I-0-1"।

​‘এন্টার!’

​স্ক্রিনে একটা সাকসেস মেসেজ ভেসে উঠল। আর একই সাথে ডক্টর আহমেদ উনার ল্যাপটপ থেকে একটা বিশেষ কমান্ড রান করলেন। এক সেকেন্ডের মধ্যে সিলেট এবং ঢাকার সেই আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাবের সমস্ত ডেটাবেজ, ড্রাগের ফর্মুলা আর সার্ভার চিরদিনের জন্য ডিলিট হয়ে গেল। পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেল আরোহীর বাবার সেই অন্ধকার অতীত।

​"ধন্যবাদ আরোহী চৌধুরী। আপনি আজ এক বিরাট বিপর্যয় থেকে দেশকে বাঁচালেন," কর্মকর্তারা হ্যান্ডশেক করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

​কনফারেন্স রুমে এখন শুধু আমি আর ডক্টর আহমেদ।

​"এখন তোমার প্ল্যান কী আরোহী?" আহমেদ ভাইয়া মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন।

​"আমি সিলেটে আমার মায়ের কাছে ফিরে যাব ভাইয়া," আমি জানালার বাইরে মেঘলা আকাশের দিকে তাকালাম। "সেখানে রেহানা চৌধুরীর মামলার ট্রায়াল চলছে। আমি আমার মায়ের পাশে দাঁড়াব। আর অনন্যা রহমানকে আমি এই ঢাকাতেই কবর দিয়ে যাচ্ছি।"

​বিকেলের দিকে আমি যখন ডিবির অফিস থেকে বের হয়ে একটা ট্যাক্সি ক্যাবে উঠলাম, তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার কাঁচ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক যেভাবে দুই বছর ধরে আমার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছিল।

​ট্যাক্সিটা যখন কাঁচপুর ব্রিজের দিকে এগোচ্ছিল, আমার ফোনটা আচমকা ভাইব্রেট করে উঠল।

​কোনো নাম্বার নেই। স্ক্রিনে লেখা—"PRIVATE NUMBER"।

​আমার বুকটা কেমন যেন চড়কগাছ হয়ে উঠল। এই নাম্বারটা তো ব্লক থাকার কথা! আমি ধকধক করতে থাকা বুকে ফোনটা রিসিভ করে কানে তুললাম।

​ওপাশ থেকে কোনো কথা শোনা গেল না। শুধু একটা অত্যন্ত পরিচিত, মৃদু, মার্জিত কণ্ঠস্বরের হালকা করে হাসার শব্দ ভেসে এল। আর তার পরপরই একটা চিরচেনা সুরের ফিসফিসানি—

​"অনন্যা... তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে, একজন নিউরোলজিস্ট নিজের তৈরি করা গোলকধাঁধায় নিজে পুড়ে মরবে? খুব শীঘ্রই দেখা হচ্ছে, আমার ভালোবাসা।"

​লাইনটা কেটে গেল।

​আমি স্তব্ধ হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ট্যাক্সির লুকিং গ্লাসে আমার চোখ পড়তেই আমি দেখতে পেলাম, পেছনের সিটের গ্লাসে বৃষ্টিভেজা অবয়বে একটা কালো গাড়ি আমাদের ট্যাক্সিটাকে ধীর গতিতে অনুসরণ করে আসছে...

​কবির মরেনি। খেলা আসলে কোনোদিন শেষ হয় না।


​[সমাপ্ত? আপনারা চাইলে সিজন ২ দেবো?


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url