স্মৃতির অন্তরালে
পর্ব: ০৫+০৬+০৭
কবিরের হাতটা যখন প্রতিষেধকের বোতলটা মেঝের দিকে ছুঁড়ে মারার জন্য ওপরে উঠল, আমার চোখের সামনে যেন পুরো পৃথিবীটা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। ওই ছোট্ট কাঁচের বোতলটার ওপর নির্ভর করছে আমার বেঁচে থাকা। ওটা ভেঙে যাওয়া মানে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে আমার শরীরের সমস্ত স্নায়ু চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
"তাহলে তুইও বাঁচবি না আরোহী!" কবিরের সেই মার্জিত কণ্ঠস্বর এখন এক উন্মাদ পশুর গর্জনে রূপ নিয়েছে।
সে বোতলটা ছাড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, আমার শরীরে পুশ করা সেই নীল ইনজেকশনটার শেষ শক্তিটুকু আমি এক জায়গায় করলাম। আমার ব্রেন তখন তীব্র গতিতে কাজ করছে। আমি এক চুলও না ভেবে সোজা কবিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
পুলিশের ‘গুলি করবেন না’ চিৎকার আর দেলোয়ারা চৌধুরীর আর্তনাদের মাঝেই আমি আর কবির একসাথে শক্ত মেঝের ওপর আছড়ে পড়লাম। কবিরের হাত থেকে ফসকে বোতলটা মেঝেতে গড়িয়ে গেল। জং ধরা একটা লোহার মেশিনের নিচে গিয়ে ওটা আটকে রইল। ভাঙেনি, কিন্তু আমাদের থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে!
"হারামজাদী!" কবির দাঁতে দাঁত চেপে আমার গলা টিপে ধরার চেষ্টা করল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে লাল হয়ে গেছে।
কিন্তু ততক্ষণে সোয়াট টিম আর পুলিশ আমাদের ওপর এসে পড়েছে। তিনজন জোয়ান পুলিশ অফিসার কবিরকে জোর করে আমার ওপর থেকে টেনে তুলল। কবির লাথি-ঝাঁটা মেরে ছিটকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু চারপাশ থেকে লোহার হাতকড়া ওর কবজিতে আটকে গেল।
"আমাকে ছাড়ো! তোমরা জানো না আমি কে? আমি ডক্টর কবির চৌধুরী!" কবির চিল চিৎকার করতে লাগল।
অন্য একদল পুলিশ অফিসার দেলোয়ারা চৌধুরীকে ধরে ফেলেছে। উনার হাতের সেই কালো ব্রিফকেস আর আমমোক্তারনামার ফাইল এখন পুলিশের জিম্মায়। দেলোয়ারা চৌধুরী মেঝেতে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, উনার সেই চন্দন আর পারফিউমের অহংকার এখন কারখানার ধুলোয় মিশে গেছে।
আমি কোনোমতে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঠিক তখনই, আমার শরীরের ভেতর একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল। নীল ইনজেকশনটার চার ঘণ্টার মেয়াদ ঠিক এই মুহূর্তেই শেষ হলো!
হঠাৎ করেই আমার হাতের আঙুলগুলো অবশ হতে শুরু করল। চোখের সামনে চারপাশটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে, একটা দুটো করে আলো নিভে যাওয়ার মতো অন্ধকার নেমে আসছে আমার দৃষ্টিতে। কবিরের সেই বিষাক্ত নিউরো-টক্সিনের রিঅ্যাকশন দ্বিগুণ শক্তিতে আমার ওপর আঘাত হেনেছে।
"আরোহী! আরোহী!" মায়ের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। মা হুইলচেয়ার থেকে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। উনার পেছনে ডক্টর আহমেদ—বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বড় ভাইয়া এবং কয়েকজন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছুটে এলেন।
"জলদি! প্রতিষেধকের বোতলটা কোথায়?!" ডক্টর আহমেদ চিৎকার করে উঠলেন।
আমি কাঁপতে কাঁপতে হাত উঁচিয়ে সেই জং ধরা মেশিনের নিচে ইশারা করলাম। একজন পুলিশ অফিসার দ্রুত নিচু হয়ে বোতলটা কুড়িয়ে এনে ডক্টর আহমেদের হাতে দিলেন।
"ভাইয়া... ওটা... ওটাই প্রতিষেধক..." আমার মুখ থেকে কথাগুলো জড়িয়ে বের হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমার নিজের জিভটাই যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে।
ডক্টর আহমেদ দ্রুত বোতলটা পরীক্ষা করলেন। কিন্তু উনার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল। উনার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
"কী হয়েছে আহমেদ বাবা? আমার মেয়েকে ইনজেকশনটা দাও!" মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
ডক্টর আহমেদ বোতলটা নাড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "কবির অত্যন্ত ধূর্ত। এই বোতলের ওপর কোনো লেবেল নেই। আর এটা তরল অবস্থায় আছে। কবিরের ল্যাবের ফর্মুলা না জেনে আমি যদি সরাসরি এটা আরোহীর শরীরে পুশ করি, আর এটা যদি প্রতিষেধক না হয়ে অন্য কোনো মারাত্মক বিষ হয়—তবে আরোহী অন স্পট মারা যাবে!"
পুলিশের গাড়িতে তোলার সময় কবির এই কথাটি শুনতে পেল। সে মাঝরাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। অন্ধকার হতে থাকা আমার ঝাপসা দৃষ্টিতেও আমি দেখতে পেলাম কবিরের ঠোঁটের কোণায় সেই চিরপরিচিত, পিশাচের মতো মার্জিত হাসি।
"আমি আগেই বলেছিলাম আরোহী, খেলা এত সহজে শেষ হয় না," কবির দূর থেকে ফিসফিসিয়ে বলল। "আমার ল্যাবের পাসওয়ার্ড আর এই প্রতিষেধকের সঠিক ডোজ শুধু আমি আর আমার মা জানি। তোমরা পুলিশ দিয়ে আমাকে জেল খাটাতে পারো, কিন্তু আমার ফাঁসি হওয়ার আগেই আরোহী কবরে চলে যাবে। চয়েস ইজ ইয়োরস, অফিসার!"
পুলিশ অফিসাররা কবিরকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে তুলে নিল। কারখানার বাইরে পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ বাজছে।
আমার চোখের পাতা দুটো অসম্ভব ভারী হয়ে এল। আমি আর চোখ খুলে রাখতে পারছি না। ডক্টর আহমেদ আমার হাতটা ধরে পালস দেখছিলেন। "ওর পালস রেট দ্রুত নামছে! একে এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। আমাদের কাছে আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় আছে কবিরের মুখ থেকে সত্যিটা বের করার।"
আমি যখন পুরোপুরি অন্ধকারের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিলাম, আমার মনের ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—কবির জেলে গিয়েও জিতে গেল? আমি কি তবে আরোহী চৌধুরী হয়েও নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আগেই হেরে যাব?
চলবে,,,,,,:
স্মৃতির অন্তরালে
পর্ব: ০৬
হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (ICU) মনিটরটা একটানা ‘বিপ... বিপ...’ শব্দ করে চলেছে। আমার শরীরটা বিছানার সাথে যেন পাথর হয়ে মিশে আছে। আমি চোখ মেলতে পারছি না, কিন্তু চারপাশের আওয়াজগুলো খুব আবছাভাবে আমার কানে আসছে। আমার হাতের আঙুলগুলো এখন পুরোপুরি অবশ। ডক্টর আহমেদের সেই কথাটা আমার ব্রেনের ভেতর হাতুড়ির মতো পিটছে—আমাদের হাতে আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় আছে।
আইসিইউ-এর কাঁচের দেয়ালের ওপাশে তখন এক তুমুল ঝড় বইছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়ের ইন্টারোগেশন সেল। টেবিলের একপাশে হাতকড়া পরা অবস্থায় বসে আছে ডক্টর কবির চৌধুরী। তার চুলগুলো একটু উসকোখুসকো, কিন্তু তার চোখে-মুখে ভয়ের কোনো লেশমাত্র নেই। সে খুব শান্তভাবে ধীরেসুস্থে এক চুমুক চা খেল, যেন সে কোনো অপরাধী নয়, বরং নিজের চেম্বারে বসে কোনো রোগীর কেস স্টাডি করছে।
তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ডিবির ইন্সপেক্টর তানভীর আহমেদ। উনার কপালে চিন্তার ভাঁজ, টেবিলে রাখা ঘড়ির কাঁটাটা টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যেই ১২ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, কিন্তু কবির একটা শব্দও মুখ থেকে বের করেনি।
"ডক্টর কবির চৌধুরী," ইন্সপেক্টর তানভীর টেবিলে জোরালো চাপ দিয়ে বললেন। "আপনার ধানমন্ডির আস্তানা থেকে আমরা যে পরিমাণ নিষিদ্ধ ড্রাগ আর অবৈধ ল্যাবের প্রমাণ পেয়েছি, তাতে আপনার যাবজ্জীবন নিশ্চিত। আপনি যদি আরোহীর প্রতিষেধকের সঠিক ডোজটা আমাদের বলেন, তবে আইনগতভাবে আপনার শাস্তি কিছুটা কমানোর সুপারিশ আমরা করতে পারি।"
কবির চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। তারপর তার সেই পরিচিত, মৃদু আর মার্জিত কণ্ঠে হাসল।
"ইন্সপেক্টর তানভীর, আপনি পুলিশ ভালো হতে পারেন, কিন্তু সাইকোলজি বোঝেন না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড? ওসব দিয়ে কবির চৌধুরীকে ভয় দেখানো যায় না। আরোহী আমার দুই বছরের সৃষ্টি। অনন্যা রহমান হয়ে সে আমার হাতের পুতুল ছিল। আজ রাত ২:৪৭ মিনিটের মধ্যে যদি ওই বোতলের কেমিক্যাল কম্পোজিশন আর সঠিক সিসি (cc) ডোজ ওর শরীরে পুশ করা না হয়, তবে ওর ব্রেন ডেথ হবে। আমার শাস্তি কমানোর লোভ দেখিয়ে লাভ নেই, আমি দেখতে চাই—আইন জেতে, নাকি একজন নিউরোলজিস্টের তৈরি করা টক্সিন জেতে!"
কবিরের এই চরম অহংকার আর পিশাচসুলভ জেদ দেখে ইন্সপেক্টর তানভীরের ইচ্ছে করছিল ওর চোয়ালটা ভেঙে দিতে। কিন্তু মারধর করে এই ঠান্ডা মাথার অপরাধীর কাছ থেকে কথা আদায় করা অসম্ভব।
ঠিক তখনই ইন্টারোগেশন সেলের দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে ঢুকলেন একজন বয়স্কা নারী, যার পুরো শরীর একটা কালো শালে ঢাকা, আর মুখটা ওড়না দিয়ে আংশিক ঢাকা।
সুরাইয়া চৌধুরী—আমার আসল মা।
উনাকে দেখে কবিরের মা দেলোয়ারা চৌধুরী, যিনি পাশের একটা চেয়ারে বসে কাঁদছিলেন, চট করে সোজা হয়ে বসলেন।
"ইন্সপেক্টর বাবু, আমাকে এই নরপশুর সাথে পাঁচ মিনিট একান্তে কথা বলতে দিন," মায়ের গলার স্বর কাঁপছিল না, সেখানে ছিল এক হিমশীতল নীরবতা।
ইন্সপেক্টর তানভীর প্রথমে ইতস্তত করলেন, তারপর কবিরের দিকে একবার তাকিয়ে রুম থেকে পুলিশ ফোর্স নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ওয়ান-ওয়ে গ্লাসের ওপাশ থেকে তারা নজর রাখছিলেন।
রুমে এখন শুধু কবির, দেলোয়ারা চৌধুরী আর আমার মা।
কবির আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। "কী সুরাইয়া চৌধুরী? মেয়ের মৃত্যুর পরোয়ানা দেখতে এসেছেন? লাভ নেই, আমি মুখ খুলব না।"
মা কোনো কথা না বলে কবিরের ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালেন। উনার ওড়নাটা সরিয়ে নিজের সেই রক্তাক্ত, কাটা দাগে ভরা মুখটা কবিরের চোখের সামনে মেলে ধরলেন। তারপর উনার সাথে আনা ব্যাগ থেকে একটা ছোট কাঁচের শিশি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। শিশিটার ভেতরে একটা লাল রঙের তরল।
"কবির, তুই ভাবিস তুই একাই ডাক্তার? তুই একাই নিউরোলজিস্ট?" মায়ের কণ্ঠস্বর পুরো রুমে প্রতিধ্বনিত হলো। "তুই ভুলে গেছিস, তোর বাবা যখন সিলেটের চা-বাগানের ল্যাবে বিষাক্ত কীটনাশক নিয়ে গবেষণা করত, তখন আমি তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম। তুই যে ড্রাগটা আরোহীকে দিয়েছিস, ওটার মূল উপাদান ডাই-মিথাইল টক্সিন, যা তোর বাবার ডায়েরি থেকে চুরি করা।"
কবিরের মুখের সেই মার্জিত হাসিটা এবার একটু কেঁপে উঠল। সে টেবিলের লাল বোতলটার দিকে তাকাল।
"এই বোতলে কী আছে জানেন ডক্টর কবির?" মা দেলোয়ারা চৌধুরীর দিকে এগিয়ে গেলেন। দেলোয়ারা চৌধুরী ভয়ে চেয়ারের পেছনে সেঁটে গেলেন।
মা দেলোয়ারা চৌধুরীর চুলগুলো মুচড়ে ধরে উনার মাথাটা টেবিলের ওপর চেপে ধরলেন। উনার গলার কাছে সেই লাল বোতলের তরলটা এক ফোঁটা ঢেলে দিলেন। চামড়াটা ছ্যাঁক করে পুড়ে কালো হয়ে গেল, আর দেলোয়ারা চৌধুরী ব্যথায় চিৎকার করে উঠলেন।
"এই বোতলে আছে ওই টক্সিনেরই কনসেন্ট্রেটেড এসিড রূপ," মা পিশাচের মতো হাসলেন। "কবির, তুই যদি আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে আরোহীর প্রতিষেধকের ফর্মুলা আর ডোজ এই কাগজে না লিখিস, তবে আমি পুলিশের সামনেই এই পুরো এসিডটা তোর মায়ের মুখে ঢেলে দেব। তোর মা ঠিক সেভাবেই জ্বলবে, যেভাবে সিলেটের রাস্তায় আমি আর আমার মেয়ে পুড়েছিলাম! পুলিশ আমাকে অ্যারেস্ট করবে করুক, কিন্তু তোর মাকে বাঁচানোর কোনো প্রতিষেধক এই পৃথিবীতে নেই!"
"কবির! বাঁচা আমাকে! ও উন্মাদ হয়ে গেছে! কবির, লিখে দে!" দেলোয়ারা চৌধুরী টেবিলের ওপর ছটফট করতে করতে চিৎকার করতে লাগলেন।
কবির এবার পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। তার সেই পাথরের মতো ঠান্ডা চোখ দুটোয় প্রথমবারের মতো মৃত্যুর ভয় দেখা গেল। নিজের মায়ের এই বীভৎস দশা সে সহ্য করতে পারল না। তার হাত কাঁপতে শুরু করল।
সে টেবিলের ওপর রাখা কলম আর কাগজটা টেনে নিল। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে সে লিখতে শুরু করল—"Formula: ANT-92, Dose: 2.5 cc, exact at 02:47 AM."
মা কাগজটা টেনে নিয়ে ইন্সপেক্টর তানভীরকে ডাকলেন। পুলিশ দ্রুত রুমে ঢুকে কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরীকে আলাদা করল। ডক্টর আহমেদ কাগজটা হাতে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন।
রাত ২:৪৬ মিনিট।
হাসপাতালের আইসিইউতে আমার হার্ট রেট একদম নিচে নেমে এসেছে। মনিটরের সোজা দাগটা প্রায় স্থির হতে চলেছে। ডক্টর আহমেদ সিরিঞ্জে করে সেই ২.৫ সিসি প্রতিষেধকটা নিয়ে আমার কেবিনে ঢুকলেন।
ঠিক ২:৪৭ মিনিটে সুইটা আমার রগে প্রবেশ করল।
এক সেকেন্ড... দুই সেকেন্ড... তিন সেকেন্ড...
হঠাৎ করেই আমার পুরো শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে উঠল। আইসিইউ-এর মনিটরটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। আমার চোখ দুটো এক ঝটকায় পুরোপুরি খুলে গেল!
চলবে,,,,,,
স্মৃতির অন্তরালে
পর্ব: ০৭
আমার চোখ দুটো যখন এক ঝটকায় খুলে গেল, তখন আইসিইউ-এর সাদা সিলিংয়ের আলোটা আমার চোখে তীরের মতো বিঁধল। বুকের ভেতর আটকে থাকা দমটা এক তীব্র দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এল।
মনিটরের সেই একটানা মরণ-সুর বদলে গিয়ে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ‘টুং... টুং...’ শব্দ করতে শুরু করেছে। আমার অবশ হয়ে যাওয়া আঙুলগুলোতে প্রাণ ফিরে আসছিল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ডক্টর আহমেদ কপাল থেকে ঘাম মুছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মা আমার হাতটা ধরে উনার চোখের জল দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিলেন।
"আরোহী... মা আমার..." উনার গলা কাঁপছিল।
আমি দুর্বল কণ্ঠে বললাম, "মা... আমি ঠিক আছি।"
পরের দুটো দিন হাসপাতালের কড়া পাহারায় আমার চিকিৎসা চলল। কবিরের দেওয়া সেই বিষাক্ত টক্সিন আমার শরীর থেকে পুরোপুরি বের করে দেওয়া হলো। ডিবির ইন্সপেক্টর তানভীর আহমেদ প্রতিদিন এসে খোঁজ নিয়ে যাচ্ছিলেন। কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরী এখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সম্পত্তি আত্মসাৎ, হত্যাচেষ্টা এবং অবৈধ ড্রাগ ট্রায়ালের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। আমার মনে হচ্ছিল, দীর্ঘ দুই বছর পর আমি অনন্যা রহমানের সেই কাল্পনিক খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে আরোহী চৌধুরী হিসেবে নিজের আকাশ ফিরে পেয়েছি।
কিন্তু নিয়তি বোধহয় পর্দার আড়ালে অন্য কোনো নীল নকশা তৈরি করছিল।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন সকালে ইন্সপেক্টর তানভীর একটা ফাইল হাতে আমার কেবিনে ঢুকলেন। উনার মুখটা ভীষণ গম্ভীর, চোখে এক অদ্ভুত দ্বিধা।
"আরোহী, আপনাকে একটা বিশেষ জিনিস দেখানোর জন্য এসেছি," তানভীর সাহেব ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন।
আমি সোজা হয়ে বসলাম। "কী হয়েছে ইন্সপেক্টর? কবির কি নতুন কোনো ঝামেলা করছে?"
"কবির জেলে আছে ঠিকই, কিন্তু আমরা গত রাতে ওর ধানমন্ডির সেই গোপন ল্যাব থেকে একটা সেন্ট্রাল হার্ডডিস্ক উদ্ধার করেছি। ওটার এনক্রিপশন ভাঙার পর আমরা কবিরের একটা গোপন ডায়েরি আর কিছু ভিডিও রেকর্ডিং পেয়েছি। আপনি কি এই ভিডিওটা দেখার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত?"
আমি মাথা নাড়লাম। তানভীর সাহেব উনার ল্যাপটপটা অন করে একটা ভিডিও ফাইল প্লে করলেন।
ভিডিওর তারিখটা ছিল—১২ মে, ২০২৪। আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগের কথা, যখন আমার সেই তথাকথিত রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কবির একটা অন্ধকার রুমে বসে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। তার পরনে ডাক্তারদের সাদা অ্যাপ্রন নয়, একটা সাধারণ শার্ট। তার চোখে কোনো হিংস্রতা নেই, বরং এক গভীর বিষাদ।
"আজ আরোহী চৌধুরীর অপারেশন সফল হলো," ভিডিওতে কবিরকে বলতে শোনা গেল। "সিলেটের সেই অ্যাক্সিডেন্টে ওর ব্রেনের হিপোক্যাম্পাস অংশটা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে, ও কোনোদিনই ওর পুরোনো স্মৃতি ফিরে পাবে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটা পার্মানেন্ট রেট্রোগ্রেড অ্যামনেসিয়া। কিন্তু আজ ওর মা সুরাইয়া চৌধুরী আমার কাছে এসে হাত জোড় করে একটা অদ্ভুত অনুরোধ করলেন।"
কবিরের মুখের এই কথাটি শুনে আমার পুরো শরীর বরফ হয়ে গেল। আমি চট করে পাশে বসা মায়ের দিকে তাকালাম। মায়ের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, উনার চোখ দুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে উঠেছে।
ভিডিওতে কবির বলতে লাগল, "সুরাইয়া চৌধুরী আমাকে বললেন, উনার সৎ ভাই আরোহীকে মেরে ফেলার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে। আরোহী যদি আরোহী হিসেবে বেঁচে থাকে, তবে ও যেকোনো সময় খুন হয়ে যাবে। তাই উনি চান, আরোহী যেন নিজের পরিচয় পুরোপুরি ভুলে যায়। উনি আমাকে প্রচুর টাকা আর গুলশানের জমির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিতে চাইলেন, যাতে আমি আরোহীকে নিজের কাছে লুকিয়ে রাখি। একটা নতুন নাম দিই—অনন্যা রহমান। আমি রাজী হলাম। আরোহীকে বাঁচানোর জন্য ওর স্মৃতিকে ড্রাগ দিয়ে বন্দি করে রাখার এই বিপজ্জনক খেলায় আমি ওর মায়ের সাথেই পার্টনার হলাম..."
ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
ভিডিওর কবির মিথ্যা বলছিল না। কারণ ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার মা—সুরাইয়া চৌধুরী! উনার মুখে তখন কোনো কাটা দাগ ছিল না!
আমি আস্তে আস্তে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে আমার পাশে বসা মহিলার দিকে তাকালাম। উনার পুরো শরীর তখন কাঁপছে।
"মা..." আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছিল না। "তাহলে... তাহলে গত দুই বছর ধরে কবির আমাকে যে ড্রাগ দিচ্ছিল... ওটা আমাকে মারার জন্য নয়, ওটা আমার স্মৃতিকে জোর করে চেপে রাখার জন্য ছিল? যাতে আমি নিজেকে আরোহী ভেবে বাইরে বের না হই? আর কবিরের মা দেলোয়ারা চৌধুরী... উনি কেন আমাকে কাল রাতে মারতে চাইলেন?"
মহিলাটি এবার উনার মুখের ওড়নাটা পুরোপুরি সরিয়ে নিলেন। উনার চোখের সেই মায়া মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে এক নিষ্ঠুর চিল শকুনের চাউনি ফুটে উঠল।
"কারণ কবির বড্ড বেশি বোকা ছিল আরোহী," মহিলাটি এক অদ্ভুত চড়া গলায় হাসলেন, যা আমার চেনা মায়ের মিষ্টি গলার আওয়াজ একদমই নয়! "কবির ভেবেছিল সে তোকে অনন্যা বানিয়ে বাঁচিয়ে রাখছে। কিন্তু ও জানত না, তোর মায়ের সেই সৎ ভাই... যে তোকে মারার জন্য সিলেটের রাস্তায় ট্রাক পাঠিয়েছিল... সেই সৎ ভাই তোকে খোঁজার জন্য উনার নিজের আপন বোনকে তোর মায়ের ছদ্মবেশে পাঠাতে পারে!"
আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
"তুমি... তুমি আমার মা নও?" আমি চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না।
"আমি তোর মায়ের সৎ বোন, রেহানা চৌধুরী," মহিলাটি উনার ব্যাগ থেকে একটা ছোট সাইলেন্সর লাগানো পিস্তল বের করে সরাসরি আমার বুকের ওপর তাক করলেন। কেবিনের দরজার বাইরে থাকা পুলিশের গার্ডরা ততক্ষণে মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে!
"কবির তোকে দুই বছর ধরে খাঁচায় আটকে রেখেছিল। কিন্তু যখনই তুই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করলি, তোর স্মৃতি ফিরতে শুরু করল, তখন কবির ভয় পেয়ে তোকে ল্যাবে নিয়ে লুকিয়ে ফেলেছিল যাতে আমার হাত থেকে তোকে বাঁচাতে পারে! কিন্তু তুই তো নিজেকে বড্ড চালাক ভাবিস আরোহী! তুই নিজেই পুলিশ ডেকে তোর একমাত্র রক্ষাকর্তা কবিরকে জেলে পাঠালি, আর আমাকে সোজা তোর বেডের পাশে ডেকে নিয়ে এলি!"
রেহানা চৌধুরী পিস্তলের সেফটি লকটা ‘ক্লিক’ শব্দে খুলে ফেললেন।
"কবিরের ড্রাগ তোকে মারেনি আরোহী, কিন্তু তোর এই অতিরিক্ত বুদ্ধি তোকে আজ রাতে কবর দেবে।"
চলবে,,,,,,
