:

​অপমানের শোধ

​পর্ব: ০৪ (শেষ পর্ব)

​রাজীবের ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ওর গম্ভীর গলা ভেসে এল, "নিলা, ভেন্যুতে এসব কী হচ্ছে? রিমি বলছে তুমি নাকি ভুল করে পেমেন্ট মেথড বন্ধ করে দিয়েছ। কিন্তু ম্যানেজার অন্য কথা বলছে।"

​আমি আয়নায় নিজের শান্ত প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বললাম, "রাজীব ভাই, ভুল আমি করিনি, ভুলটা রিমি করেছে। ও হয়তো আপনাকে বলেনি যে এই বিয়ের পুরো খরচ আমার জমানো টাকা থেকে হচ্ছে। আর সেই আমিই নাকি ওর ছবির জন্য 'পারফেক্ট' নই। তাই নিজের টাকা এবং শরীর—দুটোকেই আমি ওখান থেকে সরিয়ে নিয়েছি।"

​ওপাশে দীর্ঘ নিস্তব্ধতা। রাজীব বুদ্ধিমান ছেলে। সে বুঝতে পারল রিমি এতদিন তাকে বড়লোক বাবার মেয়ে হিসেবে যে পরিচয় দিয়েছে, তার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে। রাজীব শুধু বলল, "আমি আসছি।"

​আমি আর আকাশ যখন আবার ভেন্যুর সামনে পৌঁছালাম, তখন গেটের সামনে রাজীবের পরিবার আর রিমির পরিবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। রিমি তখনো সেই সাদা জোব্বা পরে আছে, কিন্তু এখন তাকে কোনো রাজকীয় রাজকুমারী নয়, বরং এক বিধ্বস্ত অপরাধীর মতো লাগছে।

​রাজীব আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "নিলা, তুমি কি চাও আমি এই বিয়েটা ভেঙে দিই?"

​সবাই রুদ্ধশ্বাসে আমার উত্তরের অপেক্ষা করছিল। রিমি আমার পায়ের কাছে বসে পড়ার উপক্রম করল। মা-বাবা অপমানে মাথা নিচু করে আছেন। আমি রিমির দিকে তাকালাম। ওর চোখের সেই 'কাঁচের মতো ধারালো' হাসিটা এখন ভয়ের অশ্রুতে পরিণত হয়েছে।

​আমি শান্ত গলায় বললাম, "না রাজীব ভাই। বিয়ে ভাঙার দরকার নেই। বিয়েটা হোক। কিন্তু রিমির জানা উচিত, মানুষের আসল সৌন্দর্য তার মেদহীন শরীরে নয়, তার কৃতজ্ঞতাবোধে। রিমি আজ থেকে বুঝবে, সে যে গয়না আর পোশাক পরে স্টেজে বসবে, তার প্রতিটা সুতো আমার দয়ায় কেনা।"

​আমি ম্যানেজারের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং নতুন একটা চেক সই করে তার হাতে দিলাম। "সব পেমেন্ট ক্লিয়ার। অনুষ্ঠান শুরু করুন।"

​রিমি উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হাত বাড়াতে চাইল, হয়তো কৃতজ্ঞতা জানাতে। কিন্তু আমি পিছিয়ে এলাম।

​"ধন্যবাদ দিতে হবে না রিমি। এই ২০ লাখ টাকা তোর বিয়ের উপহার নয়, বরং তোদের সাথে আমার সব সম্পর্কের শেষ কিস্তি। আজ থেকে আমার চেকবই আর আমার ভালোবাসা—দুটোর ওপরই তোর অধিকার শেষ হলো।"

​আমি আকাশের দিকে ফিরলাম। আকাশ গর্বিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি বললাম, "চলো আকাশ। এখানে বাতাসটা খুব ভারী হয়ে গেছে।"

​পেছনে সানাই বাজতে শুরু করল। ভেন্যুর লাইটগুলো জ্বলে উঠল। রিমি হয়তো আজ রাজীবের গলায় মালা দেবে, কিন্তু সারা জীবন তাকে এই অপমানের স্মৃতি বয়ে বেড়াতে হবে যে, সে যাকে 'মোটা' বলে তাচ্ছিল্য করেছিল, তার দয়া ছাড়া সে আজ বউ সাজতেও পারত না।

​ফটোগ্রাফারকে দেওয়া আমার শর্ত অনুযায়ী, কাল সকালে রিমির কাছে সেই এডিট ছাড়া আসল ছবিগুলো পৌঁছে যাবে। যেখানে তার মেকআপ ঢাকা পড়বে তার ভেতরের কুৎসিত অহংকারে।

​আমি আর আকাশ গাড়িতে উঠে বসলাম। আজ আমি কোনো দামী পোশাকের জন্য নয়, বরং নিজের আত্মসম্মানের জন্য নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ মনে করছি।

​সমাপ্ত

​#অপমানের_শোধ

#Choto_Dairy_01

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url