:

​২য় পর্ব: অজানার উদ্দেশ্যে

​সঞ্জয় মেহতার চিঠির সেই শেষ লাইনটি ছিল— “কবিতা কখনো জানত না যে মীরা আসলে এক বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ছিলেন, যা আমি তোমার জন্য আগলে রেখেছি। লকারের চাবিটি এই কোটের পকেটেই আছে।”

​আশা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। যে মানুষটিকে সে মা বলে জানত, যাকে ভালোবেসেছিল, সে আসলে এক নিপুণ অভিনয় শিল্পী ছিল। শুধু সম্পত্তির লোভে বা আশ্রয়ের জন্য সে তার বাবার জীবনে এসেছিল। আশার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু এবার সেই জল দুঃখের নয়, বরং প্রতিশোধের আগুনের মতো জ্বলতে লাগল।

​পরদিন সকালেই আশা ন্যাশনাল ব্যাংকে পৌঁছাল। লকার খোলার পর সে যা দেখল, তাতে তার চোখ কপালে উঠল। সেখানে শুধু মীরার বাড়ির দলিল নয়, বরং মীরার কিছু গয়না এবং বেশ কিছু জমানো টাকাও ছিল। আর ছিল একটি ডায়েরি। সেই ডায়েরিতে লেখা ছিল তার নানা-নানির ঠিকানা— সিলেটের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের জমিদার বাড়ি।

​আশা ঠিক করল, সে কবিতা বা অনন্যাকে কিচ্ছু জানাবে না। সে তার হোস্টেল থেকে বিদায় নিয়ে সরাসরি সেই ঠিকানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

​এদিকে, সঞ্জয় মেহতার বাড়িতে কবিতা তখন উদযাপনে ব্যস্ত। সে মনে করেছে আশাকে বের করে দিয়ে সে এখন পুরো বাড়ির মালিক। অনন্যাকেও সে আশার বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলেছে।

​“মা, বাবার ওই ড্রয়ারের চাবিটা পাচ্ছি না কেন?” অনন্যা জিজ্ঞেস করল।

কবিতা বাঁকা হাসল, “দরকার নেই। সব তো আমাদেরই। ওই মেয়েটা এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে, আমাদের শান্তি আর কেউ নষ্ট করতে পারবে না।”

​কিন্তু কবিতার শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন উকিল।

“মিসেস কবিতা? আমি সঞ্জয় সাহেবের ব্যক্তিগত উকিল। ওনার উইলের ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।”

​কবিতা হাসি মুখে ভেতরে ডাকল। সে ভেবেছিল উইলটা হয়তো তার পক্ষেই হবে। কিন্তু উকিল সাহেব একটি ফাইল বের করে বললেন, “সঞ্জয় সাহেব মারা যাওয়ার এক মাস আগে একটি বিশেষ ক্লজ (শর্ত) যোগ করেছিলেন। এই বাড়ির মালিকানা আপনার নয়, বরং এটি একটি ট্রাস্টের অধীনে থাকবে যতক্ষণ না আশা মেহতা তার পড়াশোনা শেষ করছে। আর যদি আশা বাড়ি থেকে স্বেচ্ছায় চলে যায় বা তাকে বের করে দেওয়া হয়, তবে এই বাড়িটি চ্যারিটিতে দান করা হবে।”

​কবিতার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। “কী বলছেন আপনি? আমি ওর মা!”

“উইলে স্পষ্ট লেখা আছে, আপনি যদি আশাকে আশ্রয় না দেন, তবে আপনারও এই বাড়িতে থাকার অধিকার থাকবে না। এখন প্রশ্ন হলো, আশা কোথায়?”

​এদিকে, আশা তখন সিলেটের সেই পুরোনো জমিদার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। বিশাল লোহার গেট, চারদিকে আগাছার জঙ্গল। সে ভয়ে ভয়ে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকল। এক বৃদ্ধ মানুষ লাঠি হাতে বেরিয়ে এলেন।

​“কে তুমি মা? কাকে চাই?”

​আশা কাঁপাকাঁপা হাতে মীরার সেই পুরনো ছবিটি বের করল। “আমি মীরার মেয়ে। আমার নাম আশা।”

​বৃদ্ধের হাতের লাঠিটা খসে পড়ল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “মীরা? আমার মীরা ফিরে এসেছে?”

​আশা বুঝল, তার মা এই বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন বলে তার নানা-নানি তাকে ত্যাজ্য করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পর আজ সেই অভিমান কান্নায় রূপ নিল। আশাকে তারা পরম মমতায় বুকে টেনে নিলেন।

​আশা বুঝতে পারল, তার লড়াই এখন কেবল শুরু। তাকে তার বাবার অপমানের শোধ নিতে হবে এবং কবিতার সেই মুখোশ সবার সামনে খুলে দিতে হবে।

​সে রাতে সে তার নানাকে সব কথা খুলে বলল। তার নানা গম্ভীর হয়ে বললেন, “আমার নাতনিকে কেউ রাস্তায় বের করে দেবে, এত সাহস কার? কালই আমরা শহরে ফিরব, তবে অতিথি হিসেবে নয়—মালিক হিসেবে।”

​৩য় পর্বে থাকছে: আশা কীভাবে তার নানাকে নিয়ে শহরে ফিরবে এবং কবিতার ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত জবাব দেবে।

​#সৎ_মায়ের_ষড়যন্ত্র

পর্ব: ০২

#Choto_Dairy_01

​বাকি অংশ চাইলে জানাবেন!

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url