​অপমানের শোধ

​পর্ব: ০৩

​ফোনের ওপাশে ভেন্যু ম্যানেজারের অস্থিরতা আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি। আমি শান্ত গলায় বললাম, "ম্যানেজার সাহেব, কন্ট্রাক্ট পেপারে কার সই আছে?"

​"জি ম্যাম, আপনার।" ওপাশ থেকে উত্তর এল।

​"তাহলে নিয়ম অনুযায়ী আমি যদি পেমেন্ট ক্লিয়ার না করি, তবে আপনি অনুষ্ঠান বন্ধ করার পূর্ণ অধিকার রাখেন। আর শুনুন, আমার নাম যেহেতু বুকিংয়ে আছে, সেখানে আমার অনুমতি ছাড়া অন্য কারো কার্ড থেকে পেমেন্ট নেওয়ারও দরকার নেই।"

​আমি ফোনটা কেটে দিলাম। আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে এক ভ্রু উঁচু করে হাসল। "নিলা, তুমি কি সত্যিই ওর বিয়েটা আজই ভেঙে দিতে চাও?"

​"না আকাশ," আমি গাড়িতে উঠতে উঠতে বললাম, "বিয়েটা ভাঙলে তো ও নিজেকে ভিকটিম হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ পাবে। আমি চাই ও বুঝুক, অন্যের দয়ায় কেনা আভিজাত্য তাসের ঘরের মতো—একটু বাতাস দিলেই ভেঙে পড়ে।"

​এদিকে ভেন্যুর ভেতর তখন রণক্ষেত্র। রিমি বারবার ওর হবু বর রাজীবকে ফোন দিচ্ছে। রাজীব প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে, কিন্তু তার একটা নীতি আছে—সে কোনো 'বিগ বাজেট' ঝামেলায় জড়াতে চায় না। বিশেষ করে যখন সে জানবে বিয়ের পেমেন্ট নিয়ে রিমি তার সাথে মিথ্যা বলেছে।

​মিনিট দশেক পর রিমির ফোন থেকে কল এল। আমি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রিমির কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেল। "নিলা, প্লিজ ফিরে আয়! রাজীবের বাবা-মা গেটে চলে এসেছেন। ক্যাটারিং সার্ভিস খাবার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তুই যা চাস আমি তাই করব, সবার সামনে ক্ষমা চাইব। শুধু টাকাটা দিয়ে দে!"

​"রিমি," আমি খুব ধীরস্থিরভাবে বললাম, "তোর মেকআপ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কাঁদিস না। পারফেক্ট ব্রাইড হতে হলে চোখের কাজল লেপটে যাওয়া ঠিক না। আর ক্ষমার কথা বলছিস? তোর ক্ষমা কি আমার ছিঁড়ে ফেলা চেকের টুকরোগুলো জোড়া দিতে পারবে?"

​"তুই কি চাস আমি রাজীবের সামনে ছোট হই?" ওর গলায় এখন আর অহংকার নেই, কেবল বাঁচার আকুতি।

​"তুই অলরেডি ছোট হয়ে আছিস রিমি। তুই যখন আমার ওজন আর চেহারা নিয়ে তোর বান্ধবীদের সামনে বিদ্রূপ করছিলি, তখনই তুই নিজের মানসিকতাকে নর্দমায় নামিয়ে ফেলেছিস। এখন রাজীবকে সত্যিটা বল। বল যে তোর বোনের টাকা ছাড়া তোর রাজকীয় বিয়ের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা নেই।"

​আমি ফোনটা স্পিকারে দিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশ ড্রাইভ করতে করতে বলল, "নিলা, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?"

​"রিমির শ্বশুরবাড়ির সেই ফটোগ্রাফারের কাছে, যাকে ও অনেক টাকা দিয়ে হায়ার করেছে শুধু আমাকে এডিট করে বাদ দেওয়ার জন্য।"

​আমি যখন স্টুডিওতে পৌঁছালাম, দেখলাম রিমি আমাকে কয়েকশ মেসেজ পাঠিয়ে ফেলেছে। সে এখন বাবাকে দিয়ে ফোন করাচ্ছে। বাবা ধরা গলায় বললেন, "মা নিলা, যা হয়েছে ভুলে যা। রিমির শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানলে আমাদের মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না।"

​আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "বাবা, আপনাদের মুখ রিমির আচরণের কারণে অনেক আগেই নিচু হয়ে গেছে। আমি শুধু আজ আয়নাটা আপনাদের সামনে ধরলাম।"

​আমি স্টুডিওর ভেতরে ঢুকে ফটোগ্রাফারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সে আমাকে দেখে একটু অবাক হলো। আমি একটা খাম তার সামনে রাখলাম।

​"আপনার সব পেমেন্ট ক্লিয়ার করা আছে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।"

​ফটোগ্রাফার উৎসুক হয়ে তাকাল, "কী শর্ত ম্যাম?"

​আমি মুচকি হেসে বললাম, "আজকের রাতের কোনো ছবি এডিট হবে না। প্রত্যেকটা ছবি যেমন, ঠিক তেমনই থাকবে। রিমির কান্নামাখা মুখ, ওর ছড়ানো ছিটানো মেকআপ আর মাঝপথে আটকে যাওয়া বিয়ের ভেন্যুর ছবিগুলো—আমি সব হাই-রেজোলিউশনে চাই।"

​হঠাৎ আমার ফোন আবার বেজে উঠল। এবার রাজীবের কল। রিমির হবু বর। গেমটা এখন অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করেছে।

​চলবে...

​#অপমানের_শোধ

#Choto_Dairy_01

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url