​স্মৃতির অন্তরালে

​পর্ব: ০২+০৩+০৪

​স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সেই রক্তাক্ত আর ক্ষতবিক্ষত মুখটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরী—দুজনই পাথরের মূর্তির মতো জমে গেছে। মনিটরের নীলচে আলোয় কবিরের সেই মার্জিত, শান্ত মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে উঠল।

​"আরোহী... আমার মা..." স্ক্রিনের ওপাশ থেকে মহিলাটি ফুঁপিয়ে উঠলেন। তার গলার আওয়াজ কাঁপছিল, কিন্তু সেই কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত মায়া, যা আমার চেনা অনন্যা রহমানের চেনা পৃথিবীর বাইরের কিছু। আমার অবশ হয়ে থাকা শরীরের প্রতিটি শিরায় যেন হঠাৎ করে গরম রক্ত ছুটে চলল।

​"ইম্পসিবল!" দেলোয়ারা চৌধুরী চিৎকার করে উঠলেন। তার হাতের নথিপত্রের ব্যাগটা মেঝেতে পড়ে গেল। "কবির! এই মহিলা তো মরোমরো অবস্থায় আইসিইউতে ছিল! ও আমাদের এই গোপন সার্ভারের লাইভ ফিড কীভাবে হ্যাক করল?!"

​কবির দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। তার সেই চেনা ঠান্ডা, পেশাদার রূপটা ফিরে এল সেকেন্ডের মধ্যে। সে ল্যাপটপের দিকে ছুটে গিয়ে মনিটরটা বন্ধ করার চেষ্টা করল, কিন্তু কি-বোর্ডে আঙুল ছোঁয়াতেই স্ক্রিনে লাল অক্ষরে একটা লেখা ভেসে উঠল—"ACCESS DENIED" (প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ)।

​"কবির চৌধুরী," ওপাশ থেকে মহিলার কণ্ঠস্বর এবার শক্ত শোনাল। "তুমি ভেবেছিলে সিলেটের সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর তুমি আর তোমার মা আরোহীকে পুরোপুরি মুছে ফেলেছ? ওর কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ওকে ড্রাগ দিয়ে 'অনন্যা রহমান' বানিয়ে রেখেছ? কিন্তু তুমি ভুলে গেছ, নিউরোলজির ডাক্তার তুমি একা নও। তোমার এই গোপন ল্যাবের আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করা খুব বেশি কঠিন ছিল না।"

​আমি মেটালের বিছানাটায় উঠে বসলাম। আমার হাতের আঙুলের ফাঁকে কবির যে কলমটা গুঁজে দিয়েছিল, সেটা আমি শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরলাম।

​কবির আমার দিকে ঘুরল। তার চোখে এবার আর সেই ছদ্মবেশী ভালোবাসা নেই, সেখানে এখন এক হিংস্র পশুর চাউনি। "অনন্যা... থুক্কু, আরোহী! শুয়ে থাকো বলছি! তোমার মাথা কাজ করছে না। এটা একটা হ্যালুসিনেশন!"

​"আর মিথ্যা বোলো না, কবির," আমার গলা দিয়ে যে আওয়াজটা বের হলো, তা অনন্যা রহমানের সেই মৃদু, ভয় পাওয়া কণ্ঠস্বর ছিল না। এটা ছিল আরোহীর কণ্ঠ। "আমি ওষুধটা গিলিনি। তোশকের নিচে আছে। তোমার প্রতিটি কথা, তোমার এই গোপন সুড়ঙ্গ, এই ল্যাব—সব আমি নিজের চোখে দেখেছি।"

​দেলোয়াড়া চৌধুরী হিসহিসিয়ে উঠলেন, "কবির! আর সময় নেই। ও সব জেনে গেছে। ওই কাগজে ওর টিপসই নাও, নয়তো জোর করে হাত ধরে সই করাও! আজ রাতের মধ্যেই একে শেষ করতে হবে!"

​কবির পকেট থেকে একটা সিরিঞ্জ বের করল। তাতে একটা স্বচ্ছ তরল ওষুধ ভরা। সে আমার দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগল।

​"আমি তোমাকে ভালোবাসতাম আরোহী," কবির বলল, তার গলায় এখনো সেই মার্জিত সুর আনার চেষ্টা। "কিন্তু তুমি বড্ড বেশি বুদ্ধিমান। আর বুদ্ধিমান রোগীরা ডাক্তারের জন্য বিপজ্জনক হয়। এই শেষ ইনজেকশনটা তোমাকে চিরদিনের জন্য শান্ত করে দেবে।"

​"খবরদার, কবির! ওর গায়ে হাত দেবে না!" স্ক্রিন থেকে মহিলাটি চিৎকার করে উঠলেন।

​কবির সিরিঞ্জটা উঁচিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করতেই আমি বিছানা থেকে চট করে নিচে নেমে গেলাম। গত দু বছর ধরে যে দুর্বলতার ভান আমি করছিলাম, আজ তা আমার শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়াল। কবিরের হাত থেকে সিরিঞ্জটা কেড়ে নেওয়ার জন্য আমি ওর ওপর চড়াও হলাম। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে কবির আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝের ওপড় ফেলে দিল। আমার মাথাটা গিয়ে লাগল একটা স্টিলের লকারের কোণায়।

​চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। কপাল বেয়ে গরম রক্ত নেমে আসছে।

​কিন্তু এই আঘাতটাই যেন আমার মস্তিষ্কের সেই বন্ধ দরজাটা পুরোপুরি ভেঙে দিল। তীব্র একটা আলোর ঝলকানির মতো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরোনো সব স্মৃতি—

​সিলেটের সেই পাহাড়ি রাস্তা...

​একটা দ্রুতগতির ট্রাকের ধাক্কা...

​আমার আসল মায়ের রক্তাক্ত হাত, যিনি আমাকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে বাঁচিয়েছিলেন...

​আর তারপর হাসপাতালের কেবিনে কবিরের সেই চিল শকুনের মতো চাউনি!

​কবির আমার দিকে এগিয়ে আসছে, সিরিঞ্জটা তার হাতে চকচক করছে। মেঝেতে পড়ে থাকা আমি আর অনন্যা রহমান নই। আমি আরোহী চৌধুরী। এবং আমি আমার মায়ের খুনিদের এভাবে ছেড়ে দিতে পারি না।

​ঠিক তখনই, গোপন ল্যাবের মূল দরজার বাইরে বিকট শব্দে কিছু একটা ভেঙে পড়ার আওয়াজ হলো। দেলোয়ারা চৌধুরী ভয়ে দরজার দিকে তাকালেন। ল্যাবের লাল ইমার্জেন্সি লাইটগুলো দপদপ করে জ্বলতে শুরু করল।

​মনিটরের ওপাশ থেকে আমার মা শেষবারের মতো বললেন, "পুলিশ নিচে দাঁড়িয়ে আছে কবির। খেলা শেষ।"

​কবিরের মুখের চোয়াল মুহূর্তের জন্য ঝুলে পড়ল, কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখে এক অদ্ভুত, পিশাচের মতো হাসি ফুটে উঠল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "খেলা এত সহজে শেষ হয় না, আরোহী।"

​সে ছিটকে গিয়ে দেয়ালের একটা লাল সুইচে চাপ দিল। সাথে সাথে পুরো ল্যাবের লাইট নিভে সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল! অন্ধকারের মধ্যেই আমি দেলোয়ারা চৌধুরীর চিৎকার আর ভারী কিছু টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম।

​আমি চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু কপালে লাগা আঘাতের কারণে আমার শরীর আর সায় দিল না। আমি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম।

​যখন আমার জ্ঞান ফিরল, তখন চারপাশ ফর্সা হয়ে গেছে। আমি কোনো ল্যাবে নেই, শুয়ে আছি একটা হাসপাতালের চেনা কেবিনে। আমার পাশে ইউনিফর্ম পরা একজন পুলিশ অফিসার এবং সেই স্ক্রিনে দেখা ক্ষতবিক্ষত মুখের মহিলা—আমার মা দাঁড়িয়ে আছেন।

​মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কিন্তু আমার চোখ তখনো খুঁজছিল অন্য কাউকে।

​"মা... কবির কোথায়?" আমি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

​পুলিশ অফিসারটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে এলেন। "আমরা যখন ধানমন্ডির ওই বাড়ির গোপন ল্যাব ভেঙে ভেতরে ঢুকি, তখন সেখানে শুধু আপনাকে অচেতন অবস্থায় পেয়েছি। ডক্টর কবির চৌধুরী আর তার মা দেলোয়ারা চৌধুরী ওই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে আগেই পালিয়ে গেছে। তবে..."

​অফিসারটি থামলেন। তার পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের পাউচ বের করলেন, যার ভেতরে একটা ছোট চিরকুট রাখা।

​"পালানোর আগে কবির আপনার বুকের ওপর এই চিরকুটটা রেখে গেছে।"

​আমি কাঁপতে কাঁপতে চিরকুটটা হাতে নিলাম। কবিরের সেই চেনা মার্জিত, নিখুঁত হাতের লেখায় লেখা—

​‘অনন্যা বা আরোহী—নাম যাই হোক, আমার চিকিৎসা এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। সম্পত্তি তো আমি নেবোই, আর তোমার মস্তিষ্কের শূন্যস্থানটা আমি নিজের হাতে পূরণ করব। খুব শীঘ্রই দেখা হচ্ছে, আমার ভালোবাসা।’

​আমার হাত থেকে চিরকুটটা পড়ে গেল। কবির পালায়নি, সে আসলে একটা নতুন চাল চালার জন্য আড়ালে গেছে। এক তীব্র আতঙ্ক আর প্রতিশোধের আগুন একসাথে আমার বুকে জ্বলে উঠল।

​চলবে,,,,,,:

​স্মৃতির অন্তরালে

​পর্ব: ০৩

​কবিরের চিরকুটটা যখন আমার হাতের মুঠোয় কাঁপছিল, তখন হাসপাতালের কেবিনের এসি-র ঠান্ডা বাতাসটাও আমার কাছে আগুনের মতো গরম মনে হচ্ছিল।

​‘খুব শীঘ্রই দেখা হচ্ছে, আমার ভালোবাসা।’

​এই একটা বাক্য আমার ভেতরে অনন্যা রহমানের রেখে যাওয়া শেষ ভয়টুকুকেও পুড়িয়ে ছাই করে দিল। আমি বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। পাশে বসা আমার মা—যার আসল নাম সুরাইয়া চৌধুরী—আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। উনার চোখের জল তখনো শুকায়নি।

​"মা," আমি সোজা হয়ে বসলাম। কপালে জড়ানো ব্যান্ডেজটায় তখনো মৃদু একটা ব্যথা ছিল। "সিলেটের সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর আসলে কী হয়েছিল? কবির কীভাবে আমাদের লাইফে এল?"

​মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবিনের দরজাটা ভালো করে আটকে এলেন। তারপর আমার বিছানার পাশে এসে বসলেন।

​"তুই তখন সিলেট সরকারি কলেজের অনার্সের ছাত্রী," মা বলতে শুরু করলেন। "তোর বাবা মারা যাওয়ার পর গুলশানের ওই বিশাল জমি আর সিলেটের চা-বাগানসহ সব সম্পত্তি তোর নামে লিখে দিয়ে যান। এটা সহ্য করতে পারেনি তোর বাবার সৎ ভাই। সেই আমাদের গাড়িটার পেছনে ট্রাক লেলিয়ে দিয়েছিল। অ্যাক্সিডেন্টের পর আমি ছিটকে খাদে পড়ে যাই, সবাই ভেবেছিল আমি মারা গেছি। কিন্তু আমি কোনোমতে বেঁচে ফিরলেও আমার মুখটা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।"

​মা একটু থামলেন, উনার চোখ দুটো হিংস্রতায় ছোট হয়ে এল। "আর তুই? তুই মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়ে স্মৃতি হারিয়ে কোমার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলি। তোকে যখন ঢাকার একটা বড় হাসপাতালে আনা হয়, তখন তোর কেসটা নেন ডক্টর কবির চৌধুরী। সে আর তার মা দেলোয়ারা চৌধুরী খুব দ্রুতই বুঝে ফেলে যে তোর পেছনে খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই, অথচ তোর নামে আছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। কবির তোর চিকিৎসার নামে তোকে নিজের ড্রাগের জালে বন্দি করে ফেলে। তোকে বিশ্বাস করায় যে তোর নাম অনন্যা রহমান, তোর মা ছোটবেলায় মারা গেছে, আর সে তোকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে!"

​"আর সম্পত্তি হস্তান্তর?" আমার গলার স্বর এবার কঠিন শোনাল।

​"ওরা গত দুই বছর ধরে তোকে এমন কিছু ড্রাগ দিচ্ছিল, যা তোর ব্রেনের সেলগুলোকে আস্তে আস্তে মেরে ফেলছিল। তুই যাতে কোনোদিন পুরোনো কিছু মনে করতে না পারিস। আর আইনিভাবে সেই সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তোর একটা সই দরকার ছিল, যা ওরা কাল রাতেই পেয়ে যেত..."

​মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার ফোনটা আচমকা বেজে উঠল। হাসপাতালের টেবিলে রাখা ফোনটার স্ক্রিনে কোনো নাম্বার নেই, লেখা উঠেছে—"UNKNOWN NUMBER"।

​আমার বুকটা ধক করে উঠল। আমি মায়ের দিকে তাকালাম। মা মাথা নেড়ে ইশারা করলেন ফোনটা ধরতে।

​আমি কাঁপতে কাঁপতে রিসিভ বাটনটা সোয়াইপ করে কানে তুললাম। ওপাশ থেকে সেই অতি পরিচিত, মার্জিত আর মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

​"কেমন আছো আরোহী? কপালে দাগটা বেশি লাগেনি তো?" কবিরের গলা। পেছনে ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো একটা ট্রেনের হুইসেলের শব্দ পাচ্ছিলাম আমি।

​"কবির!" আমি দাঁতে দাঁত চাপলাম। "তুমি যেখানেই লুকিয়ে থাকো না কেন, পুলিশ তোমাকে ঠিকই খুঁজে বের করবে।"

​ওপাশ থেকে কবির হালকা করে হাসল। সেই হাসিতে কোনো ভয় ছিল না, ছিল এক চরম আত্মবিশ্বাস। "পুলিশ? ওই বোকা মানুষগুলো ধানমন্ডির সুড়ঙ্গে আমার ফেলে যাওয়া জাল ক্লু নিয়ে এখন মাওয়া ঘাটে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু আমি জানি তুমি আমার চিরকুটটা পেয়েছ। আরোহী, তুমি তো অনন্যা নও, তুমি অনেক বুদ্ধিমান। তুমি নিশ্চয়ই জানো, যে ড্রাগটা আমি তোমাকে গত দুই বছর ধরে দিয়েছি, তার একটা মারাত্মক সাইড-ইফেক্ট আছে।"

​আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। "কী সাইড-ইফেক্ট?"

​"প্রতি রাতে ঠিক ২:৪৭ মিনিটে ওই ক্যাপসুলটা তোমার শরীরে না পৌঁছালে, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তোমার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো একে একে অকেজো হতে শুরু করবে। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'ইনডিউসড উইথড্রয়াল সিন্ড্রোম'। সহজ কথায়, আগামী তিন দিনের মধ্যে যদি তুমি আমার দেওয়া প্রতিষেধক না নাও, তবে তুমি চিরদিনের জন্য অন্ধ এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে যাবে।"

​আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। কবির ফোনের ওপাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, "আমার সাথে দেখা করো আরোহী। একা আসবে। ঠিকানাটা তোমার ফোনের মেসেজে চলে যাবে। সম্পত্তি আর তোমার জীবন—সিদ্ধান্ত তোমার।"

​লাইনটা কেটে গেল।

​পরের সেকেন্ডেই আমার ফোনে একটা মেসেজ এল। সেখানে ঢাকার একটা পরিত্যক্ত সুতা কারখানার লোকেশন দেওয়া।

​আমি মায়ের দিকে তাকালাম। আমার চোখের সামনে তখন অন্ধকার নেমে আসছিল। কবির আমাকে শুধু বন্দি করেনি, সে আমার শরীরের ভেতরেই একটা টাইম-বোমা ফিট করে দিয়ে গেছে। আমার হাতে সময় মাত্র ৭২ ঘণ্টা।

​হয় আমাকে কবিরের শর্ত মেনে ওর খাঁচায় আবার ফিরে যেতে হবে, না হলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। কিন্তু আমি এবার আর পালাব না। অনন্যা রহমান হয়তো ভয় পেয়ে হার মেনে নিত, কিন্তু আরোহী চৌধুরী শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়বে।

​চলবে,,,,,,:

​স্মৃতির অন্তরালে

​পর্ব: ০৪

​মাথার ভেতরটা যেন একটা জীবন্ত টাইম-বোমার মতো টিকটিক করে বাজছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম—দুপুর ২:৪৬। ঠিক এক মিনিট পর, রাত ২:৪৭-এর সেই চেনা সময়টার ঠিক বারো ঘণ্টা পূর্ণ হবে। আর কবিরের কথা যদি সত্যি হয়, তবে আমার শরীরের ভেতরের স্নায়ুগুলো ইতিমধ্যেই অকেজো হতে শুরু করেছে।

​"কী বলেছে ও?" মা আমার ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

​আমি মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরলাম। "মা, কবির আমাকে একটা পরিত্যক্ত সুতা কারখানায় একা যেতে বলেছে। ও আমার শরীরে যে ড্রাগটা পুশ করেছে, তার অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক শুধু ওর কাছেই আছে। তিন দিনের মধ্যে ওটা না পেলে আমি চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাব।"

​মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন, তারপরই উনার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। "না আরোহী! ও তোকে ওখানে ডেকে একবারে মেরে ফেলবে। আমরা পুলিশকে জানাব। পুলিশ ওই জায়গা ঘিরে ফেলবে।"

​"পুলিশকে জানালে কবির কোনোদিন সামনে আসবে না মা," আমি শক্ত গলায় বললাম। "ও বড্ড বেশি চতুর। ও দূর থেকে পুলিশ দেখলেই ওখান থেকে হাওয়া হয়ে যাবে, আর আমার বাঁচার শেষ সুযোগটাও শেষ হয়ে যাবে। আমাকে একাই যেতে হবে।"

​কিন্তু আমি একা গেলেও, একদম খালি হাতে যাব না। অনন্যা রহমান হয়তো কবিরের আদেশের সামনে মাথা নত করত, কিন্তু আরোহী চৌধুরী নিজের চাল নিজে চালতে জানে।

​আমি হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ নিয়ে সোজা চলে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক চেনা বড় ভাইয়ের কাছে, যিনি কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবে রিসার্চ করেন। কবিরের দেওয়া সেই তোশকের নিচে লুকিয়ে রাখা সাদা ক্যাপসুলটা আমি সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম।

​ল্যাবের টেস্ট টিউবে ওষুধটা পরীক্ষা করার পর বড় ভাই গম্ভীর মুখে আমার দিকে তাকালেন। "আকাশী (আমার ডাকনাম), এই ড্রাগটা সাধারণ কোনো ঘুমের ওষুধ নয়। এটা একটা বিশেষ ধরণের নিউরো-টক্সিন। কবির তোমাকে মিথ্যা বলেনি। এটা নিয়মিত খাওয়ার পর হঠাৎ বন্ধ করে দিলে ব্রেনের স্নায়ুগুলো ব্লক হতে শুরু করে। তবে..."

​বড় ভাই একটু থামলেন, উনার চোখে একটা আশার আলো দেখা গেল। "তবে এর অ্যান্টিডোট তৈরি করা অসম্ভব কিছু না। কিন্তু আমার ল্যাবে এই ফর্মুলা তৈরি করতে অন্তত চার দিন সময় লাগবে।"

​চার দিন! কিন্তু আমার কাছে সময় আছে মাত্র তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

​"ভাইয়া, আমাকে এই ড্রাগটার একটা কাউন্টার-ইফেক্ট ড্রাগ দিতে পারবেন? যেটা খেলে সাময়িকভাবে আমার ব্রেন সচল থাকবে? মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য?" আমি মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

​বড় ভাই কিছুক্ষণ ভেবে একটা নীল রঙের তরল ইনজেকশন আমার হাতে দিলেন। "এটা তোমার ব্রেনকে সচল রাখবে ঠিকই, কিন্তু মাত্র ৪ ঘণ্টার জন্য। এরপর তোমার শরীরের ওপর এর ডাবল রিঅ্যাকশন হবে। ভেবে দেখো আরোহী!"

​"আমার আর ভাবার সময় নেই ভাইয়া," ইনজেকশনটা আমি আমার হাতব্যাগে লুকিয়ে ফেললাম।

​পরদিন সকাল ১০টা।

ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত সেই পরিত্যক্ত সুতা কারখানা। চারপাশটা একদম জনমানবহীন, ভাঙা দেয়াল আর বড় বড় জং ধরা মেশিনের আড়ালে কেবল চামচিকের দল উড়ছে। বাতাসে এক অদ্ভুত স্যাঁতসেঁতে আর পোড়া গন্ধ।

​আমি একা, পায়ে হেঁটে কারখানার বিশাল ভাঙা গেটটা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। আমার কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছি। চারপাশটা এত নীরব যে নিজের পায়ের আওয়াজটাই নিজের কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

​"আমি এসে গেছি কবির! কোথায় তুমি?" আমি চিৎকার করে বললাম।

​কারখানার ওপরের তলার একটা ভাঙা বারান্দা থেকে একটা চেনা হাততালির শব্দ ভেসে এল।

​"ব্রাভো, আরোহী! ব্রাভো!"

​ওপর থেকে কবির নিচে নেমে এল। পরনে সিল্কের কালো শার্ট, চোখে সেই চিরচেনা ঠান্ডা চাউনি। তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন দেলোয়ারা চৌধুরী, উনার হাতে একটা কালো ব্রিফকেস আর সেই সম্পত্তির আমমোক্তারনামার কাগজ। উনার মুখে এক পিশাচের মতো তৃপ্তির হাসি।

​কবির আমার থেকে মাত্র দশ হাত দূরে এসে দাঁড়াল। তার হাতে একটা ছোট কাঁচের ভায়াল, যার ভেতরে একটা স্বচ্ছ তরল জ্বলজ্বল করছে—আমার বেঁচে থাকার প্রতিষেধক।

​"ঠিক সময়েই এসেছ। তোমার হাতের আঙুলগুলো কাঁপতে শুরু করেছে, তাই না?" কবির মৃদু হেসে বলল। "আর দেরি করো না। এই কাগজে সই করো, আর তোমার প্রতিষেধক নিয়ে মায়ের কোলে ফিরে যাও। আর হ্যাঁ, ব্যাগটা মেঝেতে ফেলে দাও। আমি জানি তুমি কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবে।"

​আমি শান্ত মুখে ব্যাগটা নিচে ফেলে দিলাম। কিন্তু কবির জানত না, ব্যাগের ভেতরে কোনো অস্ত্র নেই, সেখানে আছে শুধু কেমিকেল ল্যাবের সেই নীল ইনজেকশনটা, যা আমি কারখানায় ঢোকার ঠিক ১০ মিনিট আগে নিজের শরীরে পুশ করে এসেছি। আমার ব্রেন এখন কবিরের ধারণার চেয়েও দশগুণ বেশি সচল।

​আমি কাগজের দিকে এক পা এগোলাম। দেলোয়ারা চৌধুরী টেবিলের ওপর কলমটা রাখলেন।

​আমি কলমটা হাতে নিলাম। কিন্তু সই করার ঠিক আগের মুহূর্তে, আমি কবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

​"কবির, তুমি নিউরোলজির খুব বড় ডাক্তার হতে পারো, কিন্তু ক্রিমিনাল হিসেবে তুমি বড্ড কাঁচা," আমি বললাম।

​কবিরের মুখের হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। "মানে?"

​"তুমি ভাবলে কী করে যে আমি এখানে একা এসেছি? তুমি কি সত্যিই ভেবেছ আমি পুলিশ নিয়ে আসিনি?"

​কবির হো হো করে হেসে উঠল। "পুলিশ? এই কারখানার এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো পুলিশ নেই আরোহী। আমার লোক চারপাশে পাহারা দিচ্ছে।"

​"পুলিশ তো রাস্তায় থাকে কবির," আমি চট করে আমার ওড়নার নিচে লুকিয়ে রাখা একটা ছোট ব্লুটুথ ডিভাইস অন করে দিলাম। "পুলিশ তো অলরেডি এই কারখানার ভেতরেই আছে। ড্রোন ক্যামেরার নাম শুনেছ তো ডক্টর কবির চৌধুরী? ঠিক আমাদের মাথার ওপরে থাকা ওই ভাঙা ভেন্টিলেটরটার দিকে তাকাও।"

​কবির আর দেলোয়ারা চৌধুরী চমকে উঠে ওপরের দিকে তাকালেন। ঠিক তখনই ভেন্টিলেটরের ফাঁক গলে একটা ছোট ড্রোন ক্যামেরা ড্রোন ড্রোন শব্দ করে সরাসরি আমাদের সামনে এসে স্থির হলো। আর একই সাথে কারখানার চারপাশের অন্ধকার কোণাগুলো থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল সোয়াট (SWAT) টিম আর সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী!

​"হ্যান্ডস আপ কবির চৌধুরী! ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!" পুলিশের লাউডস্পিকারের আওয়াজে পুরো কারখানা কেঁপে উঠল।

​দেলোয়ারা চৌধুরী আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন। কবিরের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল সে এবার পুরোপুরি ফেঁসে গেছে। সে প্রতিষেধকের বোতলটা মেঝের দিকে ছুঁড়ে মারার জন্য হাত তুলল—

​"তাহলে তুইও বাঁচবি না আরোহী!" কবির চিৎকার করে উঠল।

​চলবে,,,,,,

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url