নিজের নামে ফেরা
পর্ব: ০৬+শেষ পর্ব
জাহিদকে যখন পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন সে শেষবারের মতো মিমের দিকে তাকাল। সেই চোখে বিষ ছিল, কিন্তু মিমের চোখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মিম জানত, এই দিনটি তার জীবনে আসার কথা ছিল অনেক আগেই, কিন্তু মায়া তাকে আটকে রেখেছিল। আজ সেই মায়ার আগল পুরোপুরি ছিঁড়ে গেছে।
এক মাস পর।
ঢাকার একটি অভিজাত কনফারেন্স সেন্টারে আজ ‘বিজনেস উইমেন অফ দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান। মিমের পরনে আজ একটি ধবধবে সাদা জামদানি শাড়ি, যা তার আভিজাত্য আর আত্মবিশ্বাসকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুরস্কার হাতে নিয়ে মিম যখন পোডিয়ামে দাঁড়াল, পুরো হলরুম করতালিতে ফেটে পড়ল। মিম মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলতে শুরু করল:
“অনেকে ভেবেছিলেন আমি হয়তো ধ্বংস হয়ে গেছি। অনেকে ভেবেছিলেন আমার পরিচয় আমার স্বামীর নামের সাথে মিশে গেছে। কিন্তু আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেবল একজন নারী হিসেবে নয়, একজন যোদ্ধা হিসেবে। আমি শিখেছি যে, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো তত উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়। আমার এই যাত্রা ছিল নিজের নামে ফেরার যাত্রা।”
পুরস্কার বিতরণী শেষে মিম যখন বের হয়ে আসছিল, তখন তাকে জানানো হলো রেহানা বেগম বাইরে তার জন্য অপেক্ষা করছেন। মিম একটু ইতস্তত করলেও দেখা করতে রাজি হলো।
রেহানা বেগমকে দেখে মিম অবাক হলো। যে মহিলাটি সবসময় অহংকারে মাথা উঁচু করে চলতেন, আজ তিনি জরাজীর্ণ অবস্থায় একটি কোণে দাঁড়িয়ে আছেন। মিমকে দেখেই তিনি এগিয়ে এসে মিমের হাত ধরতে চাইলেন।
“মিম মা, আমাকে মাফ করে দে। জাহিদের জেল হয়েছে, ও এখন তিলে তিলে মরছে। আমাদের থাকার জায়গা নেই। তুই তো আমাদের পর নোস...” রেহানা বেগম কাঁদতে লাগলেন।
মিম তার হাত সরিয়ে নিল। তার স্বরে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল এক ধরণের নিঃস্পৃহতা। “মা, আপনি ঠিক বলেছেন, আমি আপনাদের পর নই। কিন্তু আমি আপনাদের সেই আপনও নই যাকে আপনারা দিনের পর দিন ব্যবহার করেছেন। জাহিদের কর্মফল ও ভোগ করছে। আর আপনার জন্য... আমি একটি বৃদ্ধাশ্রমে আপনার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এর বাইরে আমার কাছে আর কোনো দাবি করবেন না।”
রেহানা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মিম আর কথা না বাড়িয়ে তার গাড়িতে গিয়ে বসল।
গাড়িতে বসে মিম তার ডায়েরিটা বের করল। যেখানে প্রথম পাতায় লেখা ছিল ‘ছোটে ডায়েরি ০১’। সে কলম দিয়ে সেই পাতায় নতুন করে লিখল—‘নিজের নামে ফেরা: সমাপ্ত’।
মাইলখানের পর মাইল পার হয়ে গাড়ি ছুটছে। মিম জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, আকাশের বুক চিরে এক নতুন সূর্য উঠছে। আজ আর কেউ তাকে ‘জাহিদের স্ত্রী’ বলে ডাকবে না। আজ থেকে সে শুধুই মিম।
নিজের পরিশ্রমে গড়া সাম্রাজ্য, নিজের নামে কেনা বাড়ি আর নিজের অর্জিত সম্মান—সব নিয়ে মিম আজ সার্থক। সে প্রমাণ করে দিয়েছে, কোনো মানুষের পরিচয় অন্য কারো অধীনে থাকে না, তা থাকে নিজের সাহসের গভীরে।
(সমাপ্ত)
গল্পটি কেমন লাগলো জানাবেন! মিমের এই লড়াকু মানসিকতা আশা করি পাঠকদের অনুপ্রাণিত করবে।
