​অপমানের শোধ

​পর্ব: ০২

​পুরো ঘরজুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা। মেঝের ওপর ছড়িয়ে থাকা ২০ লাখ টাকার চেকের টুকরোগুলো যেন রিমির অহংকারকে বিদ্রূপ করছিল। রিমির বান্ধবীদের হাতের শরবতের গ্লাসগুলো তখনো স্থির। মা থরথর করে কাঁপছেন, আর বাবা এতক্ষণে ফোন থেকে চোখ তুলে চশমাটা ঠিক করলেন।

​"নিলা! তুই এটা কী করলি?" রিমির চিৎকারটা কান্নার মতো শোনাল। "আমার বিয়ে আজ! ভেন্যুর মালিক আর ক্যাটারিং সার্ভিস এখনই টাকা চাইবে। তুই পাগল হয়ে গেছিস?"

​আমি শান্তভাবে আমার পার্সটা বন্ধ করলাম। আকাশের হাতটা শক্ত করে ধরে বললাম, "পাগল আমি তিন মাস আগে ছিলাম রিমি, যখন তোর মিথ্যে চোখের জল দেখে নিজের জমানো সব টাকা তোকে দিয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমি একদম সুস্থ।"

​আমি দরজার দিকে পা বাড়াতেই রিমি দৌড়ে এসে আমার সামনে দাঁড়াল। সেই ধারালো হাসিটা এখন উধাও, সেখানে কেবল রাজ্যের আতঙ্ক। "নিলা, শোন... আমি মজা করছিলাম। তুই তো জানিস আমি মাঝে মাঝে একটু বেশি বলে ফেলি। তুই আমার একমাত্র বোন না?"

​"বোন?" আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। "একটু আগে তো বললি আমি এই ছবির জন্য 'পারফেক্ট' নই। যেহেতু তোর ছবিগুলো নষ্ট করার মতো কোনো মোটা মানুষ তুই চাস না, তাই ভেন্যুতে আমার উপস্থিত থাকাটাই তো ভুল। আর ভেন্যু যেহেতু আমার নামে বুক করা, তাই আমি চলে যাওয়ার সাথে সাথে বুকিংটাও ক্যানসেল হয়ে যাবে।"

​মায়ের গলা শোনা গেল, "নিলা, অনেক হয়েছে। ও তোর বড় বোন। একটা ভুল কথা বলেছে বলে তুই ওর বিয়েটা এভাবে ভেঙে দিবি? লোকে কী বলবে?"

​আমি মায়ের দিকে ফিরলাম। "মা, রিমি যখন সবার সামনে আমাকে অপমান করছিল, তখন 'লোকে কী বলবে' সেই চিন্তাটা কি আপনার মাথায় একবারও আসেনি? ও যখন আমাকে ফটো সেশন থেকে বাদ দিচ্ছিল, তখন কি আপনার মনে হয়েছিল যে আমারও কষ্ট হতে পারে? আপনারা সবাই চুপ ছিলেন কারণ আপনাদের কাছে রিমির আভিজাত্য আমার আত্মসম্মানের চেয়ে দামী ছিল।"

​আকাশ এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিল। সে এবার শান্ত গলায় বলল, "চলো নিলা। এখানে আমাদের আর কোনো কাজ নেই। যারা মানুষের শরীরের গঠন দিয়ে তার যোগ্যতা বিচার করে, তাদের সাথে এক টেবিলে বসাটাও রুচির অভাব।"

​আমরা যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে আসছি, তখন পেছন থেকে রিমির আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল। সে বাবাকে বলছে সাপ্লায়ারদের টাকা ম্যানেজ করতে। কিন্তু আমি জানি, বাবার রিটায়ারমেন্টের সামান্য টাকা দিয়ে এই রাজকীয় আয়োজনের এক দশমাংশও মেটানো সম্ভব নয়।

​পার্কিং লটে এসে আমি লম্বা একটা শ্বাস নিলাম। রাতের হিমেল হাওয়াটা আমার তপ্ত গালে প্রশান্তি দিচ্ছে।

​আকাশ আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। "মন খারাপ লাগছে?"

​"না আকাশ," আমি মাথা নাড়লাম। "বরং অনেক হালকা লাগছে। এতদিন ওদের বোঝা বইছিলাম, আজ সব নামিয়ে দিয়ে এলাম।"

​হঠাৎ আমার ফোনে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এল। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেন্যুর ম্যানেজারের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, "ম্যাম, আপনার বোন তো এখানে লঙ্কাকাণ্ড বাধাচ্ছেন। উনি বলছেন উনিই সব পেমেন্ট করবেন, কিন্তু ওনার কার্ড তো ডিক্লাইন দেখাচ্ছে। আমরা কি ডেকোরেশন খুলে ফেলব?"

​আমি আকাশের দিকে তাকালাম। আগামীর পরিকল্পনাটা আমার মাথায় ততক্ষণে ছক কাটা হয়ে গেছে।

​চলবে...

​#অপমানের_শোধ

#Choto_Dairy_01

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url