#মেয়ের_বাড়ি
পর্ব ০২
লেখক #The_Story_Haven
ভোর পাঁচটা। আব্দুল করিম দেখলেন, মেহজাবিন অসুস্থ শরীর নিয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে রান্নাঘরে যাচ্ছে। বাইরের কলতলায় থালাবাসনের স্তূপ জমে আছে। এই কনকনে ঠাণ্ডায় মেয়েটা যখন এঁটো বাসনে হাত দিল, আব্দুল করিম আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে সোজা কলতলায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
“মেহু, সরে দাঁড়া। আমি মাজছি।”
মেহজাবিন আঁতকে উঠল। “ছিঃ বাবা! তুমি এসব কী বলছ? মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে বাবা কাজ করবে, এটা দেখলে লোকে কী বলবে?”
“লোকে কী বলবে সেটা বড় কথা নয় রে মা, তোর এই ফ্যাকাশে মুখটা আমি আর দেখতে পারছি না।” আব্দুল করিমের কণ্ঠস্বর থরথর করে কাঁপছিল অভিমানে।
ঠিক তখনই শারমিন ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল, “আঙ্কেল, ওকে করতে দিন। অভ্যেস না থাকলে বাচ্চার জন্মের পর সামলাতে পারবে না। শরীর সচল রাখাই তো ভালো, তাই না?”
আব্দুল করিম এবার আর চুপ থাকলেন না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “মা শারমিন, শরীর সচল রাখা আর শরীর নিংড়ে র*ক্ত বের করে নেওয়া এক কথা নয়। আমার মেয়েটা কি এ বাড়ির বউ, নাকি কেনা গো*লাম?”
কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিঁধল শারমিনের গায়ে। সে গটগট করে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর রাশেদ চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল। তার চেহারায় বিরক্তি স্পষ্ট। “আব্বা, আপনি অকারণে বাড়িতে অশান্তি করছেন। মেহজাবিন তো কোনো অভিযোগ করেনি, তাহলে আপনার এত সমস্যা কেন?”
মেহজাবিন মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করল। “বাবা, তুমি প্লিজ চুপ করো। রাশেদ, তুমি ওনার কথার ওপর কথা বলো না।”
আব্দুল করিম বুঝলেন, এখানে তার মেয়ের কোনো সম্মান নেই, আছে শুধু হাড়ভাঙা খাটুনি আর গঞ্জনা। দুপুরে খাওয়ার টেবিলে গিয়ে দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হলো। বড় জা আর ভাইদের পাতে বড় মাছের টুকরো পড়ল, আর মেহজাবিন নিজের পাতে শুধু ঝোল নিয়ে বসেছে। রাশেদ একবারও নিজের পাত থেকে একটা টুকরো তুলে তার স্ত্রীর পাতে দিল না।
আব্দুল করিম নিজের পাতের মাছটা তুলে মেহজাবিনের পাতে দিলেন। মেহজাবিন মাথা নিচু করে নীরবে চোখের জল ফেলল। সেই চোখের জলে মিশে ছিল একরাশ অপমা*ন আর বঞ্চনা।
বিকেলের দিকে মেহজাবিন মাথা ঘুরে বারান্দায় পড়ে গেল। আব্দুল করিম চিৎকার করে উঠলেন, “রাশেদ! ডাক্তার ডাক!”
রাশেদ মোবাইল ফোনটা পকেটে ভরতে ভরতে বলল, “আরে ও কিছু না, গ্যাস্ট্রিকের ব্য*থা। একটু জল দাও ঠিক হয়ে যাবে। আমার এখন জরুরি কাজ আছে, বেরোতে হবে।”
শারমিনও নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “আমি এখন ডিস্টার্ব ফিল করতে পারব না, অফিসে একটা ইমেইল পাঠাতে হবে।”
আব্দুল করিম একা হাতে মেয়েকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে দেখলেন জ্বরে শরীরটা পু*ড়ে যাচ্ছে। তিনি বুঝলেন, এই পরিবারে মায়া নেই, মমতা নেই। মেহজাবিন এখানে একা—একেবারে একা।
তিনি মেহজাবিনের স্যুটকেসটা আলমারি থেকে বের করলেন। মেহজাবিন ঘোরের মধ্যে বলল, “বাবা, কী করছ?”
আব্দুল করিম তার চোখের জল মুছে দিয়ে খুব দৃঢ় স্বরে বললেন, “যেখানে তোকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না, সেখানে বউ হিসেবে তোর অধিকার কেউ রক্ষা করবে না। আমি ১১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এখানে মেহজাবিনকে দেখতে আসিনি, আমি এসেছি আমার কলিজার টুকরোকে উদ্ধার করতে।”
রাশেদ ঘরে ঢুকে বাধা দিতে এল। “আব্বা, আপনি ওকে নিয়ে যেতে পারেন না!”
আব্দুল করিম এবার রাশেদের চোখের দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, “সাবধান রাশেদ! মাত্র কয়েক বছর আগে তোকে একটা সোনার পুতুল দিয়েছিলাম। আজ দেখছি সেটাকে তুই ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস।
লেখকের পেইজের নাম The Story Haven
আমার মেয়েটা যদি আজ ম*রেও যায়, তবুও তোদের এই পাথরের প্রাসাদে তাকে এক মুহূর্তের জন্য রাখব না।”
মেহজাবিন ফ্যালফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। সে কি পারবে এই সংসার ছেড়ে যেতে? নাকি সমাজের ভয়ে আবারও নিজেকে সঁপে দেবে এই ন*রকে?
আব্দুল করিম মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। সেই হাত ধরার মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি ছিল। মেহজাবিন উঠে দাঁড়াল। সে দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা শারমিন আর রাশেদের চোখে মায়া নেই, আছে শুধু দম্ভ।
মেহজাবিন কাঁপা গলায় বলল, “চলো বাবা... আমাকে নিয়ে চলো।”
আব্দুল করিম মেহজাবিনকে নিয়ে যখন গেট দিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন সূর্যটা ডুবুডুবু। তিনি একবারও পেছন ফিরে তাকালেন না। কিন্তু বড় একটা প্রশ্ন রয়ে গেল—এই সমাজ কি তাকে শান্তিতে থাকতে দেবে? নাকি রাশেদ আবারও কোনো নতুন চাল চালবে?
চলবে...
কেমন লাগলো এই পর্ব? আশা করি কমেন্ট করবেন।
