পার্ট ২+৩+৪

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না—কিন্তু তার কণ্ঠে এমন এক দৃঢ়তা ছিল, যা পুরো ঘরটাকে জমিয়ে দিল।

“আমি অপেক্ষা করছি, রায়ান,” সে আবার বলল।

“নাহলে আমি নিজেই কথা শুরু করব।”

রায়ানের আঙুলের চাপ হঠাৎ ঢিলে হয়ে গেল।

“আপনি কে?”—তার গলায় এবার আর আগের মতো আত্মবিশ্বাস নেই।

“আমি সেই মানুষ,” শান্ত গলায় উত্তর এল,

“যাকে আপনার স্ত্রী বেছে নিয়েছিলেন… ঠিক যেদিন তিনি বুঝেছিলেন, তার জীবন বিপদে।”

আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

মিস পার্কার।

ইথান… তুমি সত্যিই তাকে ফোন করেছ!

ক্লেয়ার এগিয়ে এল, কণ্ঠে বিরক্তি—

“এই সময় হাসপাতালে ঢুকে এমন নাটক করার অধিকার আপনার নেই।”

“অধিকার?”—মিস পার্কার হালকা হেসে বললেন,

“আমি আদালতের অর্ডার নিয়ে এসেছি।”

কাগজের খসখস শব্দ শোনা গেল।

“এমিলি এখনো জীবিত। আর তিনি অচেতন থাকলেও—তার সম্পত্তি, তার চিকিৎসা, এমনকি তার সন্তানের বিষয়ে—কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনারা রাখেন না।”

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এল।

রায়ান এবার গলা চড়িয়ে বলল—

“ডাক্তার বলেছেন, সে ব্রেইন ডেড প্রায়! আমরা শুধু—”

“চুপ,” মিস পার্কার থামিয়ে দিলেন।

“আমি ডাক্তারদের রিপোর্ট দেখেছি। আর আমি পুলিশকেও ডেকেছি।”

ক্লেয়ারের নিশ্বাস আটকে গেল।

“পুলিশ?”

“হ্যাঁ,” মিস পার্কার বললেন,

“কারণ দুর্ঘটনা বলে যা দেখানো হচ্ছে… সেটা আসলে প্রচেষ্টা করা হত্যা হতে পারে।”

আমার হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজতে লাগল।

রায়ান হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসিতে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট—

“এটা হাস্যকর। আপনি কি প্রমাণ করতে পারবেন?”

“পারব,” তিনি শান্তভাবে বললেন।

“গাড়ির ব্রেক লাইনে কাটা দাগ, গ্যারেজের সিসিটিভি ফুটেজ… আর—”

তিনি একটু থামলেন।

“একজন প্রত্যক্ষদর্শী।”

ইথান আমার হাতটা আবার শক্ত করে ধরল।

“কে?”—রায়ান ফিসফিস করে বলল।

“আপনার নিজের ছেলে,” মিস পার্কার বললেন।

ঘরটা যেন মুহূর্তেই জমে গেল।

“সে দেখেছে, দুর্ঘটনার আগের রাতে আপনি গ্যারেজে কী করছিলেন।”

“মিথ্যে!”—রায়ান চেঁচিয়ে উঠল।

“একটা বাচ্চার কথা বিশ্বাস করবেন?”

“যখন সেই বাচ্চা ভয় পেয়ে তার মায়ের আইনজীবীকে ফোন করে…”

মিস পার্কারের গলা আরও কঠিন হয়ে উঠল,

“তখন সেটাকে আমি গুরুত্ব দিই।”

ক্লেয়ার এবার ভেঙে পড়ার মতো গলায় বলল—

“রায়ান… তুমি আমাকে বলোনি—”

“চুপ করো!”—রায়ান ফোঁস করে উঠল।

ঠিক তখনই করিডোরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।

দরজা আবার খুলল।

দুজন পুলিশ অফিসার ঢুকল।

“মিস্টার রায়ান ক্লার্ক?”

“আপনাকে কিছু প্রশ্নের জন্য আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।”

রায়ান এক পা পিছিয়ে গেল।

তার চোখে প্রথমবারের মতো ভয় দেখলাম—যদিও আমি চোখ খুলিনি।

“আপনারা কিছুই প্রমাণ করতে পারবেন না…” সে বিড়বিড় করল।

কিন্তু তার কণ্ঠে আর সেই শক্তি ছিল না।

ক্লেয়ার নিঃশব্দে চেয়ারে বসে পড়ল।

তার মুখ ফ্যাকাশে।

“এটা… এটা আমাদের প্ল্যান ছিল না…” সে ফিসফিস করল।

মিস পার্কার এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন।

তার কণ্ঠ এবার নরম।

“এমিলি… আমি জানি তুমি শুনতে পাচ্ছো। তুমি লড়াই করেছ। এখনো করছ।”

ইথান কাঁদতে কাঁদতে বলল—

“মা… সব ঠিক হয়ে যাবে, তাই না?”

আমি আবার চেষ্টা করলাম।

আমার সমস্ত শক্তি জড়ো করে…

একটা ছোট্ট চাপ দিলাম তার হাতে।

ইথান হাঁপ ছেড়ে কেঁদে উঠল—

“সে নড়েছে! মা নড়েছে!”

ঘরের ভেতর হঠাৎ বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেল।

ডাক্তাররা দৌড়ে এল।

পুলিশ রায়ানকে ধরে বাইরে নিয়ে গেল।

ক্লেয়ার মাথা নিচু করে বসে রইল—ভেঙে পড়া, নিঃস্ব।

আর আমি…

অন্ধকারের ভেতর থেকেও বুঝতে পারলাম—

আমি ফিরে আসছি।

কিন্তু এটা শেষ না।

কারণ আমি জানি—

এটা শুধু একটা দুর্ঘটনা না…

এটা ছিল একটা বিশ্বাসঘাতকতার শুরু।

আর আমি…

সব সত্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত থামব না।

পার্ট ৩

প্রথমে আলোটা এল…

ধীরে ধীরে, চোখের পাতার ফাঁক গলে।

সবকিছু ঝাপসা।

শব্দগুলো ভাঙা ভাঙা।

“পালস স্টেবল…”

“সে রেসপন্ড করছে…”

“এমিলি, আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?”

আমি চোখ খুললাম।

আলোটা তীক্ষ্ণ লাগছিল, কিন্তু তার মাঝেই আমি একটা মুখ খুঁজছিলাম—

“ইথান…”

“মা!”

সে দৌড়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। তার চোখ লাল, কিন্তু ভরা আশায়।

আমি দুর্বল গলায় বললাম—

“তুমি… আমাকে বাঁচিয়েছ…”

সে মাথা নাড়ল, কাঁদতে কাঁদতে—

“আমি ভয় পেয়েছিলাম… কিন্তু আমি জানতাম তুমি ফিরবে।”

আমার চোখের কোণে জল জমে উঠল।

ঠিক তখনই আরেকটা পরিচিত কণ্ঠ—

“ওয়েলকাম ব্যাক, এমিলি।”

মিস পার্কার।

তিনি এগিয়ে এলেন, চোখে এক ধরনের নিশ্চিন্ততা।

“আপনি ঠিক সময়ে জেগেছেন,” তিনি বললেন।

“কারণ খেলা এখন শুরু হচ্ছে।”

দুই দিন পর…

আমি এখন পুরোপুরি জেগে উঠেছি।

দুর্বল—হ্যাঁ।

কিন্তু ভাঙা—না।

হাসপাতালের কেবিনে বসে আমি প্রথমবার সব শুনলাম।

রায়ান গ্রেপ্তার হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে হত্যার চেষ্টা, প্রতারণা, এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ক্লেয়ার…

সে প্রথমে সব অস্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরে—চাপের মুখে—সব স্বীকার করেছে।

“ও আমাকে বলেছিল, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে…”

সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছে।

“আমি শুধু… ওকে ভালোবাসতাম…”

ভালোবাসা?

আমি ঠাণ্ডা হাসলাম।

“ওরা শুধু আমার সম্পত্তি চেয়েছিল,” আমি বললাম।

মিস পার্কার মাথা নাড়লেন—

“হ্যাঁ। আর আপনি সাইন না করায়—ওরা শর্টকাট নিয়েছিল।”

আমি জানালার দিকে তাকালাম।

“কিন্তু আমি ওদের থেকেও এক ধাপ এগিয়ে ছিলাম।”

এক সপ্তাহ আগে… (ফ্ল্যাশব্যাক)

আমি সেই দিনটা স্পষ্ট মনে করতে পারি।

রায়ান কাগজগুলো আমার সামনে রেখেছিল।

তার চোখে ছিল চাপা রাগ।

“এগুলো সাইন করো।”

আমি বলেছিলাম—

“না।”

সেই রাতেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

আমি মিস পার্কারের অফিসে গিয়েছিলাম।

“আমি আমার উইল বদলাতে চাই,” আমি বলেছিলাম।

তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—

“আপনি কি নিশ্চিত?”

আমি মাথা নাড়লাম।

“সবকিছু—আমার ছেলে ইথানের নামে।

আর যদি আমার কিছু হয়…”

আমি একটু থেমেছিলাম।

“সব প্রমাণ যেন প্রকাশ পায়।”

বর্তমান

মিস পার্কার আমার দিকে তাকালেন—

“আপনার সেই ক্লজটাই সব বদলে দিয়েছে।”

“কোন ক্লজ?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।

তিনি হালকা হাসলেন।

“যদি আপনার মৃত্যু ‘দুর্ঘটনা’ না হয়ে থাকে—তাহলে পুরো সম্পত্তি ফ্রিজ হয়ে যাবে, এবং তদন্ত শুরু হবে।”

আমি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লাম।

“তাই ওরা আমাকে দ্রুত শেষ করতে চেয়েছিল…”

আরেক দিন পর…

কোর্টরুম।

আমি হুইলচেয়ারে বসে আছি।

আমার পাশে ইথান।

সামনে—রায়ান।

তার চোখে এখন আর অহংকার নেই।

শুধু ভয়।

বিচারক কাগজপত্র দেখছিলেন।

“প্রমাণ অনুযায়ী…”

তিনি বললেন,

“এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা।”

রায়ান হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল—

“সে আমাকে ধ্বংস করেছে! সবকিছু তার ছিল!”

আমি তার দিকে তাকালাম।

শান্তভাবে।

“না,” আমি বললাম,

“সবকিছু আমার ছিল।

আর তুমি সেটা নিতে চেয়েছিলে।”

ক্লেয়ার মাথা নিচু করে কাঁদছিল।

কিন্তু আমার কোনো সহানুভূতি ছিল না।

কারণ—

যে আমাকে বোন বলে ডাকত,

সে-ই আমার মৃত্যু কামনা করেছিল।

শেষ দৃশ্য

বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম।

ইথান আমার পাশে এসে দাঁড়াল।

“মা… এখন কি সব শেষ?”

আমি তার মাথায় হাত রাখলাম।

“না,” আমি নরম গলায় বললাম।

“এটা শেষ না…”

সে আমার দিকে তাকাল।

“তাহলে?”

আমি আকাশের দিকে তাকালাম।

“এটা একটা নতুন শুরু।”

কারণ আমি মরিনি।

আমি ফিরে এসেছি।

আর এবার—

আমি আমার জীবন, আমার ছেলে, আর আমার সত্য—সবকিছু রক্ষা করব।


পার্ট ৪

বাড়িটা আগের মতোই ছিল…

কিন্তু সবকিছু বদলে গেছে।

দরজা খুলতেই একসময়কার পরিচিত গন্ধটা নাকে এল—কফি, ল্যাভেন্ডার, আর পুরোনো স্মৃতির মিশ্রণ।

আমি থেমে গেলাম।

এই ঘরেই…

আমার জীবন ভেঙে গিয়েছিল।

“মা?”

ইথানের কণ্ঠে দ্বিধা।

আমি তাকালাম, হালকা হাসলাম—

“চল, ভেতরে যাই।”

সেই রাত

সবাই চলে গেছে।

বাড়ি নিঃশব্দ।

আমি একা বসে আছি লিভিং রুমে।

হাতে একটা পুরোনো ফাইল।

রায়ানের ফাইল।

মিস পার্কার আমাকে এটা দিয়েছেন—

“তুমি সত্য জানতে চাইলে, সব পড়ো।”

আমি পড়তে শুরু করলাম।

প্রথমে শুধু হিসাব—ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ট্রান্সফার, অদ্ভুত লেনদেন।

তারপর—

একটা ছবি।

আমি, রায়ান… আর ক্লেয়ার।

হাসছে আমরা।

কিন্তু ছবির পেছনে লেখা—

“Soon.”

আমার হাত কেঁপে উঠল।

আরও গভীরে…

ফাইলের ভেতরে একটা ইউএসবি ড্রাইভ ছিল।

আমি ল্যাপটপে লাগালাম।

ভিডিও চালু হলো।

স্ক্রিনে—গ্যারেজ।

রাত।

রায়ান গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে।

তার পাশে—

ক্লেয়ার।

“তুমি নিশ্চিত এটা কাজ করবে?”—ক্লেয়ার জিজ্ঞেস করল।

রায়ান নিচু হয়ে ব্রেক লাইনে কিছু করছিল।

“ও সাইন করেনি,” সে ঠান্ডা গলায় বলল।

“তাই ওকে আর দরকার নেই।”

আমার বুক হিম হয়ে গেল।

ক্লেয়ার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—

“আর ইথান?”

রায়ান থামল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল—

“ও আমাদের সাথে যাবে… অথবা কোথাও যাবে না।”

ভিডিওটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

বর্তমান

আমি চেয়ারে বসে রইলাম।

চোখে পানি নেই।

শুধু… শূন্যতা।

“তারা শুধু আমাকে না…”

আমি ফিসফিস করে বললাম,

“ওরা আমার ছেলেকেও মেরে ফেলতে পারত।”

আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেল।

পরের দিন

মিস পার্কার আবার এলেন।

“তুমি ভিডিওটা দেখেছো?”—তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

আমি মাথা নাড়লাম।

“এটা যথেষ্ট?”—আমি বললাম।

তিনি বললেন—

“হ্যাঁ। এটা কেসকে আরও শক্ত করবে।”

আমি কিছুক্ষণ চুপ থাকলাম।

তারপর বললাম—

“আমি শুধু শাস্তি চাই না।”

তিনি ভ্রু তুললেন—

“তাহলে?”

আমি ধীরে ধীরে বললাম—

“আমি চাই… ওরা সব হারাক।

যেভাবে ওরা আমাকে হারাতে চেয়েছিল।”

মিস পার্কার হালকা হাসলেন।

“তাহলে আমরা ঠিক পথেই আছি।”

এক সপ্তাহ পর

কোর্টরুম আবার ভরা।

এইবার—সব প্রমাণ সামনে।

ভিডিও চালানো হলো।

সবাই দেখল।

রায়ান মাথা নিচু করে বসে আছে।

ক্লেয়ার কাঁদছে।

বিচারক কঠিন গলায় বললেন—

“এই আদালত আপনাদের দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করছে।”

রায়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়াল—

“এমিলি! তুমি এটা করেছো!”

আমি শান্তভাবে বললাম—

“না। তুমি নিজেই করেছো।”

শেষ অংশ

কয়েক দিন পর…

আমি আবার সেই পাহাড়ি রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

যেখানে আমার জীবন প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

ইথান আমার হাত ধরে আছে।

“মা… তুমি এখানে কেন এলে?”

আমি নিচের দিকে তাকালাম—

গভীর খাদ।

তারপর বললাম—

“কারণ আমি ভয় পেতে চাই না আর।”

আমি তার হাত শক্ত করে ধরলাম।

“আমরা ভয়কে এখানেই রেখে যাচ্ছি।”

সে মাথা নাড়ল।

আমরা দুজন ধীরে ধীরে ফিরে হাঁটলাম।

সূর্যের আলো আমাদের পেছন থেকে ছায়া ফেলছিল—

লম্বা, কিন্তু ভাঙা না।

কারণ আমি আর সেই আগের এমিলি নই।

আমি বেঁচে ফিরেছি—আর এবার আমি শক্ত।

চলবে,,,,,

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url