#কুয়াশায়_ঘেরা
#পর্ব_০৮+০৯+শেষ পর্ব
#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা
আকাশ দেখে বোঝার উপায় নেই সকাল নাকি সন্ধ্যা। ঘন কৃষ্ণ আবর পুরো আকাশ দখলে নিয়েছে। খোলা জানালায় মৃদু বাতাসের ছাঁট এসে ঝুলন্ত পর্দা দুলিয়ে দিচ্ছে।
অফিসে বসেই একে একে চার্ট তৈরি করলো ইলান। কে'স কতটা এগিয়েছে? কোনটা কোনটার সাথে সম্পৃক্ত?
প্রথমত তুর্শির খু'ন। এরপর তার বান্ধবী মনি উধাও। প্রভাতির জঙ্গলে যাওয়া, মনিকে খু'ন হতে দেখা। তুর্শি, মনি দুজনের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে খু'নি একজন ব্যক্তি বলে ধারণা করা হলেও তুর্শি নন-ভার্জিন। মানে দাঁড়ায় এটা খু'নির কাজ নয়। এটা তার কাজ হলে দুজন মেয়েকেই সে ইউজ করতো।
তুর্শির রুমে প্রোটেকশন পাওয়া, বিন্দু বিন্দু র'ক্ত। স্বপন মির্জা তুর্শির চাচা, তাহলে ফরহাদ তার চাচাতো ভাই। যেহেতু শারিরীকভাবে অপদস্ত করা মা'র্ডারারের কাজ নয় এবং জাকিয়ার কথায় এটাই প্রমাণ হয় যে, ফরহাদই তুর্শির সাথে ফিজিক্যাল রিলেশনে ছিলো। এরমধ্যে একজন কালপ্রিট পাওয়া গেলো, সে হচ্ছে ফরহাদ।
দ্বিতীয়ত মিহানের হুট করেই বাড়ি ফেরা, প্রভাতিকে নিজ থেকেই অফিসে নিয়ে আসতে চাওয়া, শপিংমলে প্রভাতির ওপর আক্র'মণ। মিহানের ঘরে পাসপোর্ট পাওয়া। ভিসা,পাসপোর্টের জন্য এতটাকা পরিবার ছাড়া সে কোথায় পেয়েছে? তার ফোনে "F" অক্ষরে সেইভ করা নাম্বার থেকে কল আসা। সেদিন ইলান ফোন রিসিভ করার পর অপর পাশ থেকে শব্দগুচ্ছ ভেসে আসলো।
-"প্রভাতি মেয়েটার কাজ ক্লোজ। আমাদের সবার ইন্ডিয়া যাওয়ার সব ঠিকঠাক। সবাই মিলে পূর্বের জায়গায় একত্র হবো। তারপর বিডি টু ইন্ডিয়া। ততদিনে কে'স ক্লোজ হয়ে যাবে। এরপর দেশে ফিরবো। আমি সিমটা এখনই ফেলে দেবো। আমাদের বাড়ির সারভেন্ট জাকিয়া মেয়েটাকে বিশ্বাস নেই। যখন-তখন আমার নাম বলে দিতে পারে।"
-"জাকিয়ার আগে তুমিই আমাকে সব ইনফরমেশন দিয়ে দিলে?"
ইলানের কন্ঠস্বর ঠিক চিনে উঠতে পারলোনা ফরহাদ। ফিরতি প্রশ্ন করলো,
-"এই কে আপনি? মিহানের ফোন আপনার কাছে কেনো?"
-"দুনিয়াকে অল্প সময়ের জন্য ভালোভাবে দেখে নাও।"
ইলানের কথায় কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে ফরহাদ। হুট করে কল ডিসকানেক্ট করে দিলো।
ফরহাদ সিমটি যে তখনি ফেলে দিয়েছে তাতে ইলানের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। জাকিয়া মেয়েটাকেও কল করবেনা। এখন একমাত্র মিহানই ফরহাদের খোঁজ দিতে পারবে।
তাই মিহানকেই কব্জা করলো। কলেজ থাকাকালীন একটা ইভটিজিং কে'সে জড়িয়ে পড়ায় ইলান কোনোভাবে মিহানকে বাঁচিয়ে তার ভার্সিটির উছিলায় দূরে পাঠিয়েছে। দূরে পাঠিয়ে লাভ হয়নি, বরং ক্ষতিই হয়েছে। যা এখন সচক্ষে দেখতেও পাচ্ছে ইলান।
বর্তমান কে'সটিতে মনে হচ্ছে মিহান, ফরহাদ ছাড়াও অন্যকেউ জড়িত আছে।
মিহানের ব্যাপারে ইলান ছাড়া এখনো কেউ অবগত হয়নি। ব্যাপারটা একা হাতে হ্যান্ডেল করতে হচ্ছে বাবা মায়ের কথা চিন্তা করে। সবাই জানে মিহান একেবারেই ইন্ডিয়া চলে গিয়েছে। ছেলে অপ'কর্মের সাথে জড়িত জানলে মা নিশ্চিত হার্ট অ্যাটাক করে মা'রা যাবে। বাবা হয়তো লজ্জায় বের হতেও ভ'য় পাবে। অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লো ইলান। যেখানে মিহানকে রেখেছে সেখানে উপস্থিত হলো। গতকাল থেকে খাবার দূরে থাক, একফোঁটা পানিও দেয়নি মিহানকে। যে পর্যন্ত মুখ না খুলবে সে পর্যন্ত কিছুই দেবেনা। মিহানকে চোখ বুজে থাকতে দেখে বোঝা গেলো ঘুমোচ্ছে। যেহেতু মিহানের কাছ থেকে কথা বের করতে সময় লাগবে তাই কফির ব্যবস্হা করেছে ইলান। হাতের গরম কফি ছুঁ'ড়ে মারলো মিহানের পিঠে। ধড়ফড় করে উঠতে চাইলো মিহান, কিন্তু পারলোনা। উপুড় করে তাকে বেঁ'ধে রাখা হয়েছে। পিঠ জ্বলে ছাঁই হয়ে যাচ্ছে। ইলান পাশ থেকে রড হাতে নিলো। একনাগাড়ে রডের আ'ঘাতে আ'ঘা'তে র'ক্তাক্ত করে নিলো। মিহানের চিৎকারে কান ভারী হলো ইলানের। ভাইকে মা'রছে বলে কষ্ট তার হচ্ছেনা এমন নয়। কিন্তু অন্যায়ের সাথে আপোস সে করবেনা।
মিহান এবার নিজের জান ভিক্ষা চাইলো,
-"তোমার পায়ে পড়ি ভাই। আমি সারাজীবন তোমার গোলামি করতে রাজি আছি। আমি বাঁচতে চাই। বলছি আমি ফরহাদ কোথায় আছে।"
হাত থেমে গেলো ইলানের। চেয়ার টে'নে বসলো। মিহানকে মা'রতে গিয়ে তার শরীরের ঘাম ছুটেছে। ঘাম ঝেড়ে মিহানের মুখোমুখি হলো। মিহান বলা শুরু করলো,
-"বিশ্বাস করো ভাই, মেয়েটার খু'ন আমি করিনি। খু'নের ব্যাপারে ফরহাদ জানে। আমাকে পাঠানো হয়েছে প্রভাতিকে হ্যান্ডেল করার জন্য। আমার কাজ ছিলো প্রভাতিকে নিয়ে যাওয়া, আর তারা আক্রমণ করবে। ঠিক হলোও তাই। প্রভাতি যাতে কোনো ধরনের স্টেটমেন্ট দিতে না পারে সেজন্য ওর গলায় আ'ঘাত করা হয়। ফরহাদ আর আমার সাথের আরেকজন ছিলো তুলন। তারা দুজন সব জানে। খু'নের ব্যাপারে কথা বলতে আমি কিছু কথা শুনে ফেলি। সেখান থেকেই আমি তাদের সাথে ঝামেলায় জড়িয়ে যাই। আমার ইন্ডিয়া যাওয়ার শখ অনেকদিনের, সেটা তুমি জানো। তারা আমাকে বলেছে আমি যাতে তাদের ব্যাপারে মাথা না ঘামাই আর প্রভাতিকে হ্যান্ডেল করি। আমাকে ইন্ডিয়া যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দেবে। এর বেশি আমি কিছুই জানিনা।"
ইলান সবকিছু শুনে শান্ত রইলো। কিছু একটা মনে পড়তেই বলল,
-"ফরহাদ এখন কোথায় আছে? আর কোথায় একত্র হওয়ার কথা বলেছে?"
মিহান বলল,
-"আমি জানিনা ওরা এখন কোথায় আছে? শুধু সবাই ইন্ডিয়া যাওয়ার আগে ধানমন্ডি একত্র হওয়ার কথা।"
ইলান বলল,
-"ঠিক আছে। ফরহাদ আর তুলনকে না পাওয়া পর্যন্ত তুই এখানেই থাকবি।"
করুন চাহনিতে তাকিয়ে রইলো মিহান। এতে ইলানের বেশ একটা ভাবাবেগ হলোনা। বেরিয়ে পড়লো নিজ গন্তব্যে। টার্গেট ফরহাদ আর তুলন।
—————————
পড়ন্ত বিকেলের সোনারঙা রোদ্দুরে আটপৌরে শাড়ি শরীরে জড়িয়ে ছাদের এককোণে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলো প্রভাতি। লালাভ আভায় আকাশের সৌন্দর্য নজর কাড়লো। হুট করেই আজ একটা শাড়ি পড়তে মন চাইলো। ইচ্ছেকে কোনো কালেই দমিয়ে রাখার মেয়ে না ও। মনটা ভার ভার লাগছে। ভাইয়া ইলানের উপর অযাচিত কারণে রে'গে আছে। কথা বলতে পারছেনা বলে ভাইয়াকে বোঝাতেও পারছেনা। আজ নিজেকে সত্যিই ভীষণ অসহায় লাগছে। যারা জন্ম থেকেই কথা বলতে পারেনা, তাদের জীবনটা আজ উপলব্ধি করতে পারছে প্রভাতি। মায়ের মাথা ঠান্ডা হয়েছে। ভাইয়া আজই ভাবীকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে। নিজের অসুস্থতা আর ভুলের জন্য মা নিজ থেকেই অনুতপ্ত। মাঝে একবার কেঁদে ফেলে বললেন,
-"আমার মতো ঝা'মেলাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসলেই হয়। শুধু আমার মেয়েটাকে দেখে রাখিস।"
আশরাফুল তখন একহাতে প্রভাতিকে অপর হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
-" তুমি যেমনই হও, তুমি আমার মা। আমাকে জন্ম দিয়েছো। আর এই প্রভা বুড়িটা আমার কলিজার একাংশ। ওর কথা তোমায় বলতে হবেনা।"
এসব কথা মনে করেই প্রভাতির মনটা উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। সত্যি সে ভীষণ সৌভাগ্য নিয়ে জন্ম নিয়েছে। নয়তো ভাই-ভাবীর এমন ভালোবাসা ক'জনে পায়?
প্রভাতির ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে পাশে শব্দ করে দাঁড়ালো ইলান। মলিন হেসে জিজ্ঞেস করলো,
-"কেমন আছো?"
প্রভাতি মসৃণ হাসলো। মাথা দুপাশে দুলিয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো। মানে সে ভালো আছে।
-"আমি দুঃখিত। আমার জন্যই হয়তো তোমার সাথে এমন হয়েছে। এরপর আর তুমি না চাইলে কখনোই আমি তোমাকে সঙ্গ দেবোনা।"
ইলানের কথায় হাসিহাসি মুখটি মলিন হয়ে গেলো প্রভাতির। সেদিনের দু'র্ঘটনার পর থেকেই ইলান তাদের বাসায় কম আসছে, কথা কম বলছে। অভিমান থেকেই কি তার কথাগুলো দীর্ঘশ্বাসে রূপ নিয়েছে? প্রভাতি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফেলে হাত নাড়িয়ে বোঝাতে চাইলো "কেনো সঙ্গ দেবেননা?"
ইলান ব্যথিত হৃদয়ে হাসলো।
-"কারণ তুমি আমার সঙ্গ চাও না।"
মাথানিচু করে নিলো প্রভাতি। এবার আর নিজের অনুভূতিগুলো হাতের ইশারায় ব্যক্ত করতে পারলোনা। শুধু চেয়ে রইলো ফ্যালফ্যাল করে। ইলান তার চোখের ভাষা কতটা বুঝতে পেরেছে জানা নেই। এর বেশি বোঝানোর সাধ্য আপাতত তার নেই।
———————
হসপিটাল থেকে ফোন পেয়ে ইলানের বাসায় ছুটে আসলো প্রভাতি। চোখদুটো পানিতে টইটম্বুর। হসপিটাল থেকে ফোন পেয়ে ফিরতি কোনো উত্তর দিতে পারেনি। মাকে ব্যাপারটা জানানোর ক্ষমতা এই মুহূর্তে তার নেই। সেজন্য বাকশক্তি প্রয়োজন। ইলান বাসাতেই ছিলো। বিকেলের পর এখন বের হওয়ার উদ্দেশ্যে দরজা পর্যন্ত এগিয়েছে। প্রভাতিকে হাঁপাতে দেখে ইলান বিচলিত হলো। তীব্র উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-"কি হয়েছে তোমার?"
প্রভাতি কান্নার দমকে কিছু বোঝাতেও পারছেনা। শেষে নোটপ্যাডে টাইপ করে কিছু একটা লিখে ইলানকে দেখালো। চমকে উঠলো ইলান। তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পড়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছন থেকে প্রভাতি ওর শার্ট আঁকড়ে ধরলো। বোঝালো আমিও যাবো। ইলান দ্বিমত করলোনা। প্রভাতির নরম হাতখানা নিজের শক্ত হাতের ভাঁজে নিয়ে ছুটলো। উদ্দেশ্য হসপিটাল।
পথ যেনো শেষ হওয়ার নয়। বি'পদের সময় কাছের পথও দূরে মনে হয়। প্রভাতি পুরোটা রাস্তা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে গিয়েছে।
হসপিটালে পৌঁছে রিসিপশন ডেস্কে বসা লোকটি থেকে রুম নাম্বার জিজ্ঞেস করে প্রভাতিকে সেদিকে নিয়ে গেলো ইলান। কাঙ্ক্ষিত কেবিনের সামনে এসে পা জোড়া থমকে গেলো। হতবিহ্বল চাহনিতে দুর্বল চিত্তে তাকিয়ে রইলো প্রভাতি।
কপালে, হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো আশরাফুল। দাঁড়িয়ে রইলো বললে ভুল হবে। প্রচন্ড অস্থিরতা নিয়ে পায়চারি করছে। শরীরের কিছু অংশ ছিলে গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি আ'ঘাত পেয়েছে সাইফা। তার অবস্থা ক্রিটিকাল। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এক্সি'ডেন্ট। এখন পর্যন্ত তার চিকিৎসা চলছে। ভেতরে কি হচ্ছে কিছুই জানা নেই আশরাফুলের। আল্লাহর কাছে এই মুহূর্তে একটাই প্রার্থনা, 'এই যাত্রায় যেনো তার স্ত্রী-সন্তান বেঁচে যায়'।
#চলবে......#কুয়াশায়_ঘেরা
#অন্তিম_পাতা
#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা
বাড়িতে শোকের ছায়া বিরাজমান। সাইফা মুখে খাবার তুলছেনা। সারাদিন তার সময় কা'টে চোখের পানি ফে'লে। মিসক্যারেজ হওয়ায় বাচ্চাটা বাঁচানো গেলোনা। কারো মুখে হাসি নেই। সাইফার মুখ শুকিয়ে চোখদুটো যেনো তিনহাত ডেবে গিয়েছে। এই বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য আশরাফুল মা আর স্ত্রীকে আলাদা রেখেছিলো। পারলোনা সে, সে একজন দায়িত্ববান বাবা হতে পারলোনা। সাইফার সামনে সে শক্ত থাকে। নয়তো মেয়েটাকে বাঁচানো যাবেনা। প্রভাতি কাকে সামলাবে? ভাই নাকি ভাবিকে? দুজনই যে ভেতর থেকে ভে'ঙে চুরমার হয়ে আছে। আনোয়ারা জাহান একসময় অসুস্থতার দরুন যেই বউকে অপ'বাদ দিয়েছে, আজ তাকে বুকে আগলে শান্তনা দিচ্ছে।
আশরাফুলের মানসপটে ভেসে উঠলো সেই বীভ'ৎস দৃশ্য।
ড্রাইভার ছিলোনা আজ। নিজে ড্রাইভ করে সাইফাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলো। সাইফার চোখেমুখে খুশির ফোয়ারা। এতদিন পর শশুর বাড়ী যাচ্ছে, আবার সেই পুরোনো শাশুড়ীর ভালোবাসা পাবে। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেলো? একটা ট্রাক আসলো সামনে। আশরাফুল তৎক্ষনাৎ গাড়ি পাশ কা'টিয়ে নিতে গেলো। সজোরে শব্দ হলো আর সব শেষ।
হসপিটালে ইলানের সাথে কথা বলতে চাইছিলোনা আশরাফুল। কিন্তু বন্ধুত্বের কাছে তার রা'গ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলোনা। ইলান সব শুনে যতটুকু বুঝতে পারলো এটা আকস্মিক দু'র্ঘটনা নয়, এটা একটা চ'ক্রান্ত।
—————
ক্লু অনুযায়ী এগোতে হলে মিহানের ব্যাপারটা সামনে আনতেই হবে। সব অফিসারদের সাথে নিয়ে মিহানের বলা ধানমন্ডির ঠিকানায় পৌঁছে গেলো সবাই। সাথে মিহান ও ছিলো।
চারপাশ থেকে আড়াল হয়ে অফিসাররা ট্রহল দিচ্ছে। মিহান ঠিক জায়গা মতো দাঁড়িয়ে রইলো। আগামীকাল তাদের ফ্লাইট। কথা ছিলো ফ্লাইটের আগের রাতে তারা এখানে মিলিত হবে। দূর থেকে কালো পোশাকে আবৃত দুজন যুবককে এদিকে আসতে দেখা গেলো। দুজন এগিয়ে এসে মিহানের সাথে কোলাকুলি সেরে গন্তব্যে পা বাড়াবে এমন সময় চারদিক থেকে অফিসাররা সবাইকে ঘিরে ধরলো। ফরহাদ আর তুলন দুজনেই বিস্ফোরিত নেত্রে মিহানের দিকে চাইলো। মিহানের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। ইলান তাকে অফার করেছিলো যদি সে ফরহাদ আর তুলনকে ধরতে সাহায্য করে তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে সাথে ইন্ডিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। নয়তো সবার মতো তাকেও ফাঁ'সির দড়িতে ঝুলতে হবে।
মিহান একবাক্যে লুফে নিলো লোভনীয় অফারটি। বিশ্বাসঘা'তকতা করলো মিহান। ফরহাদ আর তুলনের চোখে অবিশ্বাস।
মিহান একপাশে সরে যেতে চাইলেই অফিসাররা তাকে সহ একযোগে ঘিরে ধরলো। মিহানের চোখে আতঙ্ক। ইলানের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো ভাইয়ের অধরে সূক্ষ্ম হাসি। তার মানে সে ইলানের পাতানো ফাঁদে পা দিয়েছে।
সাথে সাথে ফরহাদ আর তুলনের ঠোঁটে ও হাসি ফুটলো।
—————
তুলন, মিহান, ফরহাদ তিনজনকেই স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো,
-"তুর্শির কী দোষ ছিলো? মেয়েটাকে কেনো মা'রলে? সাথে তার বান্ধবী মনি'র কি দোষ ছিলো। নিষ্পাপ দুটো মেয়েকে কেনো জীবনের স্বাদ নেওয়া থেকে বঞ্চিত করলে?"
মুখ খুললোনা একজনও। দ্বিতীয়বার রডের আ'ঘাতে জর্জরিত হয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হলো ফরহাদ।
-"তুর্শি আমার আপন বোন নয়, ওকে আমার ছোট থেকেই ভালোলাগতো। আমি ওর সঙ্গ চাইতাম, কিন্তু সে আমাকে ভাইয়ের নজরে রাখতো। পরবর্তীতে তাকে আমি সরাসরি বুঝিয়ে বললাম তুই আমার বোন না। আমরা চাইলে নিজেদের মধ্যে সম্পর্কে জড়াতে পারি। কিন্তু সে আমাকে চ'ড় মেরে দিলো? টগবগে যুবকের শরীরের র'ক্ত গরম থাকে। সেদিন আমার মাথায় র'ক্ত চড়ে যায়। পরিকল্পনা সাজিয়ে নিই মস্তিষ্কে। আমাদের বাড়ির সারভেন্ট জাকিয়া তুর্শির সব রকম কাজের দায়িত্বে ছিলো। তাকে দিয়ে তুর্শির খাবারে ঘুমের ঔষধ মেশাতাম। রাতের আঁধারে নিজের হিং'স্রতা ঢেলে দিতাম তুর্শির ওপর। রাত হলেই মত্ত হয়ে যেতাম ওর শরীরে।
সকাল হলেই হয়তো তুর্শি বুঝতে পারতো তার সাথে কি হচ্ছে? কিন্তু মানুষটিকে চিহ্নিত করতে পারতোনা। পরে একদিন তুর্শি রাতে খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। আমি টের পাইনি। সেই রাতে তুর্শির ঘরে গিয়ে ওর শরীর স্পর্শ করতেই চোখ খুলে তাকালো তুর্শি। প্রচন্ড অবিশ্বাস আর ঘৃ'ণা নিয়ে তাকিয়ে ছিলো। চেঁচিয়ে সবাইকে ডাকার আগেই ওকে ওয়াশরুমে টে'নে নিয়ে যাই। দেয়ালের সাথে সজোরে মাথায় আ'ঘাত করি। ভ'য় দেখিয়েছিলাম যদি আমার নাম কাউকে বলে তাহলে ওর সাথে সাথে পরিবারের সাবাইকে শেষ করে দেবো।
সেদিন ওয়াশরুমের র'ক্তে পানি ঢেলে দিলেও কোনায় কয়েক ফোঁটা র'ক্ত থেকে যায়। পরদিন তুর্শি সবাইকে বলে ছাদ থেকে নামতে গিয়ে সিঁড়িতে পড়ে মাথায় আ'ঘাত পায়।"
ফরহাদ থামলো। ইলান পূনরায় প্রশ্ন করলো,
-"তাহলে মেয়েটাকে মা'রলে কেনো? আর ওর বিছানার নিচে প্রটেকশন কোথা থেকে আসলো?"
ফরহাদ আবার ও বলা শুরু করলে,
-"প্রটেকশন আমিই রেখেছিলাম। তুর্শি কখনো বিছানার নিচ দেখতে যাবেনা। জিনিসটা প্রতিদিন না নিয়ে এসে নিজের সুবিধার্থে ওর বিছানার নিচেই রেখেছিলাম।
এরপর তুলন একদিন আমাদের বাড়িতে আসে। একদিনেই সবার সাথে বন্ধুত্ব করে নেয়। তুর্শি খুব ভালো আর্ট জানে। ওর পেইন্টিং রুমে একটা ছবিতে চোখ আটকে যায় তুলনের। সে তুর্শির কাছ থেকে পেইন্টিং টি কিনতে চায়। তুর্শি কিছুতেই পেইন্টিং টি দেবেনা। এটা ওর সবচেয়ে প্রিয় পেইন্টিং। শুধু তুলননা আর অনেকেই তুর্শির পেইন্টিং টি পছন্দ করে। পেইন্টিং টির বিশেষত্ব ছিলো এটি চারকোন থেকে আর কোনাকুনি দৃষ্টি রাখলে একবার একটি মেয়ের ছবি ভেসে ওঠে। তুলন আমাকে জানালো পেইন্টিং টি তার লাগবে। এটা বিদেশে বিক্রি করলে প্রচুর টাকা পাবে।
আমার মনে মনে তুর্শিকে নিয়ে ভ'য় ছিলো। যখন তখন ও আমার নাম সবার সামনে বলে দিতে পারে। তাই তুলনের সাথে পরিকল্পনা করলাম। তুলনের লাগবে পেইন্টিং আর আমার লাগবে তুর্শির মৃ'ত্যু। সেটাই করলাম আমরা। কিন্তু তুর্শি যে কথাগুলো তার বান্ধবী মনি'কে পূর্বেই বলে রেখেছিলো আমি জানতামনা। মনি মেয়েটা একটা বড় বোকামি করে বসলো। বাসা থেকে আমার নাম্বার নিয়ে আমাকে কল করলো। থ্রেট করে বললো তুর্শির খু'ন যে আপনি করেছেন সেটা আমি শতভাগ নিশ্চিত। আমি সবাইকে সবটা বলে দেবো, এমনকি পুলিশকে ও বলবো।
ব্যস মনির বোকামির শাস্তি হিসেবে সে উধাও হলো। তাকেই তুর্শির মতো জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি সব কিছুর পরিকল্পনা করলেও খু'ন আমি করিনি। খু'নের দায়িত্ব নিয়েছিলো তুলন। তুর্শি আর মনি দুজনকেই ও কু'পিয়ে মেরেছে।
ওদের খু'নের ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে মিহান সব শুনে ফেলে। ওকে বিস্তারিত কিছুই জানাইনি। আমরা জানতাম মিহান ইন্ডিয়া যাওয়ার জন্য কতটা উদগ্রীব। তাই ওকে সেটারই লো'ভ দেখালাম। বিনিময়ে মুখ বন্ধ রাখতে হবে।
পরে জানতে পারলাম প্রভাতি মেয়েটার বর্ণনা অনুযায়ী স্কেচ তৈরি করা হবে। তখন তো তুলন ধরা পড়তো সাথে আমিও। তাই মিহানকে পাঠালাম বাড়িতে। প্রভাতি মেয়েটাকে নিয়ে বের হলো আর আমরা ও ঝোপ বুঝে কো'প মারলাম। যাতে প্রভাতি বর্ণনা দিতে না পারে, তাই ওর গলায় আ'ঘাত করলাম। সেদিন ছদ্মবেশ নিয়েই শপিংমলে প্রবেশ করেছিলাম আমরা।
মিহান আপনার কাছে ধরা পড়ার আগেই বলেছিলো আপনার কাছে ধরা পড়লে ওকে বাঁচিয়ে রাখবেননা। তাই প্রতিশোধ হিসেবে সে চাইলো প্রভাতির ভাই যাতে আপনাকে আরও খা'রাপ ভাবে। সব কিছুর জন্য আপনাকে দায়ী করে,আপনাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করে দেয়। সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করলাম। মিহান বলে দিয়েছিলো প্রভাতির ভাবিকে আক্র'মণ করতে হবে। বোন আর স্ত্রী-সন্তানের ক্ষ'তি হলে মিঃ আশরাফুল সবকিছুর জন্য কে'সটাকে আর আপনাকে দায়ী করবে। আমরা মিহানকে বাঁচানোর জন্য সব করলাম। কিন্তু সে আপনার দেওয়া অফার লুফে বিশ্বাসঘা'তকতা করে। "
সব শুনে স্থির হয়ে রইলো ইলান। মিহান এতবড় চাল চাললো? তারমানে আশরাফুল আর সাইফার এক্সি'ডেন্ট, বেবি মিসক্যারেজ সব মিহানের চাল?
বাকি অফিসাররা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। অবশেষে কে'স নিষ্পত্তি হলো।
মিহান বা তুলন কেউই রা করলোনা।
হাই কোর্টে তোলা হলো তিনজনকেই। খু'ন ও তার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে তিনজনকেই ফাঁ'সির রায় দিলো। আগামীকালই পৃথিবীতে তাদের শেষ দিন।
————
তুর্শি ও মনি'র খু'নের অপরাধে তিনজন আসামির মধ্যে মিহান নামের আসামি পলাতক।
মিহান দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একটা গাড়ির সামনে পড়লো। তার ডেড বডি সিটকে পড়লো দূরে। গাড়ির লুকিং মিররে একজোড়া চোখ দৃশ্যমান।মাথায় আর বামহাতে ব্যান্ডেজ, ডান হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা। চোখদুটো শান্ত। মনে আত্মতৃপ্তি।
পরেরদিনই নিউজ হলো মিহান নামক পলাতক আসামির কার দু'র্ঘটনায় মৃ'ত্যু। কে'সটি এখানেই শেষ।
———
মাস তিনেক পরের ঘটনা। প্রভাতি ইলানের দিকে কিছুটা ঝুঁকলেও এবার আশরাফুল কিছুতেই বোনকে ইলানের হাতে তুলে দিতে রাজি নয়। তার ধারণা ইলানের জীবনে জড়ালে প্রভাতির জীবন রিস্কে পড়বে। একমাত্র আদরের বোনকে সে কিছুতেই বি'পদের মুখে ঠে'লে দিতে পারেনা।
আশরাফুলের আপত্তি শুনে ইলান প্রভাতিকে একবার জিজ্ঞেস করলো,
-"বাকি জীবনটা আমার সাথে কা'টাতে চাও?"
প্রভাতির চোখে আজ কোনো জড়তা নেই। সে জানে তার মন এখন কী চায়? ইলানের চোখে চোখ রেখে বলল,
-"নাকফুলের ব্যবস্থা করুন।"
ইলানের অধর কোনে হাসি ফুটলো।
পরদিন আশরাফুল পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও প্রভাতিকে পেলোনা। ইলান ও বাসায় নেই। সাইফা কেমন ভেজা বেড়ালের মতো চুপটি করে আছে।
আশরাফুল চোয়াল শক্ত করে নিলো। রা'গে হাতের পাতা মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। সাইফার দিকে ক্রুর দৃষ্টি ফেলে বলল,
-"তুমিই প্রভাকে সাহায্য করেছো?"
সেদিন খবর আসলো ঢাকা থেকে কুমিল্লার পথে দুটি বাসে সংঘর্ষ হয়। অনেকের চেহারা থে'তলে গিয়েছে। টিকিট দেখে জানানো হয় বাস যাত্রীদের পরিচয়। ইলান মুনতাসীর আর প্রভাতি জামান নাম দুটি শুনে কলিজা মুচড়ে আসে আশরাফুলের। পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে যায় বাড়ী থেকে। মাঝপথে যেতেই তার ফোনের মেসেজ টিউন বেজে ওঠে। ওপেন করতেই লিখাগুলো দৃষ্টিগোচর হলো,
"ফিরবো কোনো এক নতুন ভোরে, যে ভোরে ঘন কুয়াশা কে'টে আকাশে রোদ্দুরের দেখা মিলবে।"
আশরাফুল দুর্বোধ্য হাসলো। ফিরতি মেসেজ করলো,"কুয়াশা কে'টে রোদ ওঠা উচিত, অপেক্ষায় আছি আমি। কিন্তু সকল রোদ সুফল বয়ে আনেনা। বাঁচার তাগিদে কিছুকাল কুয়াশায় থেকে যেতে হয়।"
#সমাপ্ত
(শেষটাতেও কিছু কুয়াশা রয়ে গিয়েছে তাইনা? এন্ডিং আমি এভাবেই ভেবেছি আর নিজের মতো করে দিয়েছি। গল্পটিতে অনেক ত্রুটি রয়েছে। কোনো মানুষ যেমন পারফেক্ট হয়না, তেমনি তার সব লেখনী ও পারফেক্ট হয়না। তাই ভুল গুলো ক্ষ'মা করবেন। যারা যারা গল্পটি পড়েছেন তাদেরকে অসীম ভালোবাসা। অবশেষে গল্পটি নিয়ে আজ নিজের অনুভূতি গুলো ব্যক্ত করবেন। ভালো-খারাপ দুটো দিকই বলবেন। আর আমি ব'কা শোনার জন্যেও প্রস্তুত। হ্যাপি রিডিং।)
