#কুয়াশায়_ঘেরা

#পর্ব_০৫+০৬+০৭

#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা


সকাল হতেই ব্যস্ততা চেপে বসেছে। দু'দন্ড শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার সময় নেই, কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় নেই। সকালে একটু নাস্তা মুখে তুলেই ইলানকে অফিসে ছুটতে হয়েছে। 


-"স্যার! মনি মেয়েটার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছে।"


ইলান জিজ্ঞেস করলো,

-"কি এসেছে রিপোর্টে? নিশ্চয়ই সেও নন-ভার্জিন।"


শিহাব ডানে বাঁয়ে মাথা নেড়ে বলল,

-"না স্যার, মনি ভার্জিন। তার সাথে এরকম কিছুই হয়নি। তবে দুটো খু'নের বিবরণ বলছে খু'নি একই ব্যক্তি।"


আশ্চর্য হলো ইলান। চোখদুটো ছোট করে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,

-"তবে কি মনি তুর্শির মা'র্ডারের ব্যাপারে সব জানতো? আর সেইজন্যেই কি মনিকে মা'র্ডার করা হয়েছে?"


-"হতে পারে স্যার।"

শিহাবের কথা শেষ হতেই ইলান প্রশ্ন করলো,

-"গতকাল যে তোমাদের তুর্শির বাড়িতে পাঠিয়েছি। কিছু বলাতে পেরেছো সারভেন্টের মুখ দিয়ে?"


তনুশ্রী বলল,

-"না স্যার, মেয়েটা কিছুই বলছেনা। সে নাকি তুর্শির সাথে মাঝেমধ্যে গল্প করতো। এর বেশি তুর্শির সাথে তার ভাব ছিলোনা। কিন্তু মেয়েটাকে আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয়েছে স্যার। আমার মনে হচ্ছে মেয়েটা কিছুতো একটা জানে।"


ইলান বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। মুনিরকে বলল,

-"গাড়ি বের করো। সোজা তুর্শির বাড়ি।"


ইলান সহ বাঁকি চারজন তুর্শির বাড়িতে পৌঁছে গেলো। স্বপন মির্জা ইলানকে দেখেই বসতে বললেন। মেয়ের কথা তুলে দুঃখী দুঃখী ভাবে বসে রইলেন।


ইলান বলল,

-"আমরা তুর্শির ঘর সার্চ করবো। মুনির, নাজমুল, শিহাব, তনুশ্রী কুইক।"


স্বপন মির্জা ভড়কে গেলেন। 

-"তুর্শির ঘর কেনো সার্চ করবেন? খু'ন কি বাড়িতে হয়েছে? নাকি আপনারা বাড়ির লোককে সন্দেহ করছেন?"


ইলান ঈগল চোখে তাকালো। ধারালো নজরে স্বপন মির্জাকে পরোখ করে বলল,

-"আপনারতো নিজের মেয়ের খু'নিকে পাওয়া দরকার। এখন সে তো আপনার বাড়িতেও লুকিয়ে থাকতে পারে। এমনকি সে ব্যক্তি আপনিও হতে পারেন।"


হিং'স্র বাঘের মতো গর্জে উঠলেন স্বপন মির্জা। 

-"আপনারা এখানে তদন্ত করতে এসেছেন, নাকি তামাশা? আমি কেনো নিজের মেয়েকে খু'ন করতে যাবো?"


ইলান শান্ত রইলো। বিশেষ প্রতিক্রিয়া তার মাঝে দেখা গেলোনা। স্বচ্ছ, পরিষ্কার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

-"রে'গে গেলেন তো হেরে গেলেন। আমাদের কাজই হলো অনুমান করে সঠিক তথ্য বের করা।"


-"তাই বলে আমাকেই নিজের মেয়ের খু'নি বানিয়ে দেবেন? এতে আমার ফায়দা কি? তার সম্পত্তি আমি মে'রে খাবো?"


ইলান বলল,

-"আপনার মেয়েকে আপনি দিলে তবেই সে সম্পত্তি পাবে। তাই এখানে সম্পত্তি মে'রে খাওয়ার প্রশ্ন আসছেনা।"


স্বপ্ন মির্জা নিজেকে শান্ত রাখার যথেষ্ট চেষ্টা করে বললেন,

-"কিন্তু আপনার কথাতে তো এটাই প্রমাণ হয় মিস্টার ইলান মুনতাসীর।"


———————


হাতে গ্লাভস পরে চারজনে ত'ল্লাশিতে নেমে পড়লো। ওয়ারড্রব, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, বুক শেল্ফ সব কিছু ওলট পালট করা হয়ে গেলো। সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া গেলোনা। বেডরুমের ভেতরেই আরও একটা রুম আছে। সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ড্রয়িং এর জন্য রুমটা করা হয়েছে। চারদিকে রং এর ছড়া'ছড়ি, বিভিন্ন আর্ট।

নাজমুল ওয়াশরুমের ভেতর চেইক করলো। হঠাৎ ওয়াশরুম থেকে নাজমুলের ডাকে মুনির, শিহাব দৌঁড়ে সেদিকে আসলো। নাজমুল তর্জনী তাক করে দেখিয়ে দিলো দেয়ালে র'ক্তের ফোঁটা। একটা নয়, দুইটা নয় চারফোঁটা র'ক্তের দাগ দেয়ালে লেপ্টে শুকিয়ে আছে ওয়াশরমের এককোনায়। হঠাৎ করেই কারো নজরে পড়ার কথা নয়।


তনুশ্রী বিছানার চাদর, বালিশ, জাজিম সব ওলটপালট করে একটা জিনিস দেখতে পেলো। যা এখানে থাকা একটা অভাবনীয় ব্যাপার। জিনিস দেখতেই ঝটপট হাতে নিলো তনুশ্রী। 


-"স্যার!"


তনুশ্রীর ডাকে ওয়াশরুম থেকে তিনজনই বেরিয়ে এলো। তনুশ্রী হাতে থাকা জিনিসটি উপরে তুলে ধরতেই বিস্ময়ে সবার চোখ বড় হয়ে এলো। নাজমুল অস্পষ্ট সুরে উচ্চারণ করলো,

-"প্রোটেকশন?"


তনুশ্রী মাথা নেড়ে সায় জানাতেই মুনির বলল,

-"১৬ বছরের একজন কিশোরীর রুমে জন্ম নিরোধক? তারমানে মেয়েটা মা'র্ডারের পূর্বেই ভার্জিনিটি হারিয়েছে?"


শিহাব বলল,

-"হতে পারে। এটা যদি মা'র্ডারের কাজ হতো তাহলে মনিকেও ছেড়ে দিতোনা। মনি মেয়েটাও কম সুন্দরী নয়। হয়তো তুর্শির এফেয়ার ছিলো।"


সবকিছু একসাথে জটলা পাকিয়ে আছে। 

তনুশ্রী, মুনির, শিহাব, নাজমুল নিচে নেমে যা যা তথ্য পেলো সবই ইলানকে জানালো। স্বপন মির্জা চমকে উঠলেন সব শুনে। উনার মেয়ের ঘরে প্রোটেকশন কোথা থেকে আসবে?


ইলান স্বপন মির্জাকে বলল,

-"ওয়াশরুমের দেয়ালে এগুলো কিসের র'ক্ত?"


স্বপন মির্জা জানালেন,

-"এ ব্যাপারে তিনি কিছুই বলতে পারছেননা।"


-"মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। অথচ তার খোঁজ খবরে বিশেষ খেয়াল নেই। হতেও তো পারে কেউ আপনার মেয়েকে ট'র্চার করতো।"


ইলানের কথায় মাথা নিচু করে রাখলেন স্বপন মির্জা। শুধু টাকা দিলেই বাবার দায়িত্ব পালন হয়ে যায়না। সন্তানের খোঁজ ও নিতে হয়। 


মুনির বলল,

-"দেখলাম ঘরে পেইন্টিং এর যাবতীয় জিনিস রয়েছে। তুর্শি কি পেইন্টিং জানে?"


স্বপন মির্জা সায় জানিয়ে বললেন,

-"হ্যাঁ! অনেক ভালো পেইন্টিং করতো তুর্শি। পুরস্কার ও পেয়েছে।"


তনুশ্রী বলল,

-"তুর্শির কি কোনো এফেয়ার ছিলো?"


-"এটা তো জাকিয়া বলতে পারবে।"


-"কে? তুর্শির সারভেন্ট?"

তনুশ্রীর প্রশ্নে স্বপন মির্জা হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো।

তনুশ্রী ইলানের দিকে তাকিয়ে বলল,

-"দেখেছেন স্যার! বলেছিলাম না মেয়েটাকে স'ন্দেহজনক মনে হয়, কিন্তু সে গতকাল বলল কিছুই জানেনা।"


ইলান স্বপন মির্জাকে সরাসরি বলল,

-"মিস জাকিয়াকে ডাকুন।"


-"সে একটা কাজে বাইরে গিয়েছে। কাজ সারতে দেরি হবে।"


আমরা প্রয়োজনে আবার আসবো বলে ইলান উঠে পড়লো। 


——————


দুপুরের উত্তপ্ত দাবানলের তেজ কমে আসতেই আশরাফুল অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে। সাইফাকে দেখতে ওর বাবার বাড়ি যায়। প্রভাতির ব্যাপার উঠতেই সাইফা প্রভাতিকে দেখতে আসার জন্য আবদার করে বসে। আশরাফুলের কোনো বারণ সে শুনতে রাজি নয়। প্রভাতি, তার একমাত্র আদুরে ননদ অসুস্থ, আর সে কিনা দেখতে যাবেনা? 

আশরাফুল বলল,

-"মা এখনো পুরোপুরি শান্ত হননি। তোমাকে দেখলে রিয়েক্ট করতে পারে। শান্ত হলে আমি নিজেই তোমাকে বাসায় নিয়ে যাবো। এভাবে থাকতে আমার ও ভালোলাগছেনা। তুমি বরং প্রভার সাথে ভিডিয়ো কলে কথা বলো।"


সাইফা জে'দ ধরে বলল,

-"আমি বোরকা পরে দেখতে যাবো। বলবো আমি প্রভার বান্ধুবী।"


আশরাফুল রাম ধমক দিলো। আচমকা ধমকে কেঁপে ওঠে সাইফা। যথেষ্ট ভ'য় পেয়েছে। শরীরের কম্পন সামনে দাঁড়িয়ে ঠিকই দেখতে পাচ্ছে আশরাফুল। 

একহাতে সাইফাকে বুকের সাথে আগলে নিয়ে আদুরে স্বরে বলল,

-"অবুঝের মতো কাজ করলে হয়? আমি সরি! আর ধমক দেবোনা।"


ভ'য় আর অতিরিক্ত আহ্লাদে আশরাফুলকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো সাইফা। আশরাফুল কোনোভাবে তাকে বুঝিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।


———


ঘড়ির কা'টা যখন দশ ঘরে অতিক্রম করে মিনিটের কা'টায় আটাশের ঘরে তখন বাসায় ফিরলো ইলান। সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো। গোসল দেওয়া জরুরি। এতে ক্লান্তি কিছুটা হলেও কমবে। 

গোসল সেরে বের হয়ে ডাইনিং এ আসতেই ইরতিজা বললেন,

-"প্রভাতির প্রচন্ড জ্বর এসেছে। খেয়ে একবার দেখে আসিস। একদিনেই মুখটা একটুখানি হয়ে গিয়েছে। সুস্থ থাকলে আমার সাথে এসে গল্প করতো।"


ইলান খাওয়া শেষ করে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল,

-"তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা। প্রভাকে দেখে আসছি আমি।"


ইরতিজা দরজা চেপে ঘুমোতে চলে গেলেন। খাটের একপাশে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে ইলানের বাবা। অপর পাশে তিনি শুয়ে পড়লেন। 


শরীরের তাপমাত্রা এখন অনেকটাই কম। তবে মুখটা তেঁতো হয়ে আছে। কিছুই মুখে তোলা যাচ্ছেনা। আনোয়ারা বেগম লাগাতার মাথায় পানি দিয়ে গিয়েছেন। বিকেলে যখন আশরাফুল বলল,

-"এভাবে কেনো আমাকে জ্বালিয়ে মা'রছিস? আমার একটুও কথা শুনিসনা।"


প্রভাতি ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী স্বরে বলল,

-"আর কে আছে তোমাকে জ্বালানোর মতো?"


এই কথার বিপরীতে আশরাফুল সূঁচালো চোখে তাকিয়ে হেসে দিলো।

-"আমাকে জব্দ করার ট্রিকস ভালোই রপ্ত করেছিস।"


কারো পায়ের শব্দ কর্ণধারে পৌঁছাতেই ভাবনার ঘোর থেকে বের হলো প্রভাতি। 

রুমে আশরাফুল প্রবেশ করেছে। তার পিছু পিছু ইলান প্রবেশ করলো। প্রভাতি বালিশের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসলো। ইলান বলল,

-"এখন কেমন আছো?"


-"ভালো"


-"আমি তো দেখতে পাচ্ছি একদিনের জ্বরে তোমাকে ভঙ্গুর দেখাচ্ছে। চোখ দুটো বিলের জলে ডুবি ডুবি।"


প্রভাতি ইলানের কথায় পাত্তা দিলোনা। 

আশরাফুলকে ইশারা করে ইলান বলল,

-"কফি নিয়ে আয়।"


আশরাফুল উঠে চলে গেলো। 

ইলান ঝট করে প্রভাতির কপালে হাত দিয়ে জ্বর চেইক করলো।

-"এখনো তো জ্বর কমেনি।"


প্রভাতির নড়চড় দেখা গেলোনা। তবে মুখ চললো,

-"ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা বাদ দাও। আমি তোমার বউ লাগি,যে যখন তখন এভাবে ছুঁয়ে দাও?"


ইলান চোখ ছোট করে বলল,

-" আমার বউ হওয়ার শখ বলে দিলেই পারো। ইনিয়েবিনিয়ে বলার কি আছে? অবশ্য আমার এখন আর ইন্টারেস্ট নেই?"


প্রভাতি নেত্রপল্লব ছোট করে বাঁকা চোখে তাকালো।

-"আমি কি কোনো ইন্টারেস্টের বস্তু? আমার প্রতি কিছুদিন ইন্টারেস্ট থাকবে আবার ইন্টারেস্ট হারিয়ে যাবে?"


ইলানের অধর কোনে বক্র হাসির রেখা। উপর ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে বলল,

-"তুমি চাইছো তোমার প্রতি আমার ইন্টারেস্ট সারাজীবন থাকুক? ভেবে দেখো, তাহলে কিন্তু তোমারই বি'পদ। এমন হুটহাট ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে পারি।"


প্রচন্ড লজ্জা আর রাগের সংমিশ্রণে প্রভাতি এক বেফাঁস কথা বলে ফেললো।

-"এমন অ'সভ্য কথা বলার জন্য কখন তোমাকে কা'মড়ে দেই।"


ইলান যেনো আরও সুযোগ পেলো। মিটিমিটি হেসে বলল,

-"উমম! কোথায় কামড়াতে চাও?"

নিচের ঠোঁটে হাত বুলিয়ে ইশারা করে বোঝালে 'এখানে?'


প্রভাতি দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,

-"সত্যিই তুমি একটা হাই লেভেলের অস'ভ্য।"


ইলান হো হো করে হেসে উঠলো।

আশরাফুল তিন মগ কফি নিয়ে এসে বলল,

-"এমন গরুর মতো হাসছিস কেনো?"


ইলান বাঁ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

-"গরু হাসতে জানে? তুই শুনেছিস? তাহলে নিশ্চয়ই তুই গরুদের সঙ্গী সাথী।"


আশরাফুল কফির কাপে টুকরো চুমুক বসিয়ে ইলানকে ইশারায় বলল 'এখনই প্রভাতিকে গতকালের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করবে কিনা?'


ইলান না করে বোঝালো 'আপাতত না। প্রভাতি আরেকটু সুস্থ হোক। হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে মস্তিস্কে চাপ দিলে মেয়েটা আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে।'


কফি শেষ করতে করতেই তিনজনে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলো। হাতঘড়িতে সময় দেখে বাসায় ফিরলো ইলান।


সকাল সকাল অফিসের জন্য বেরোনোর সময়ই শুনতে পেলো মা বলছে তার ভাই মিহান আজ বাসায় ফিরবে।


ইলান ভেবে পেলোনা হুট করে আজ কেনো মিহান বাসায় আসছে? মিহানের তো এখন আসার কথা নয়! তবে কি কোনো গুরুতর কারণ আছে?


#চলবে.......


(মন্তব্য করে আপনাদের অনুভূতি জানানোর অনুরোধ রইলো। নয়তো আমি বুঝতে পারবোনা গল্পটি কিভাবে এগোচ্ছে? হ্যাপি রিডিং।)#কুয়াশায়_ঘেরা

#পর্ব_০৬

#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা


জীবনকে আমরা যতটা সহজভাবে নিই, জীবন ততটা সহজ নয়। স্ট্রাগল করা ছাড়া কেউ বেঁচে নেই। জীবন যুদ্ধে সবাই একেকটা সৈনিক।

তুর্শি মেয়েটাও হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্তে বাঁচার জন্য একজন সৈনিকের মতো লড়াই করে গিয়েছে।


প্রভাতির কাছ থেকে তেমন কোনো ইনফরমেশন পাওয়া যায়নি, যা কে'সটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অন্ধকারে প্রভাতি অজ্ঞাত ব্যক্তির মুখ স্পষ্ট দেখেনি, তারউপর মুখের একপাশ দেখা গিয়েছে। তবুও ইলান বলল,

-"তুমি অন্ধকারে যতটুকু তার শরীরের গঠন দেখেছো তার একটা বর্ণনা দেবে। আমরা তার একটা স্কেচ তৈরি করবো।"


ইলানের কথায় দ্বিমত করেনি প্রভাতি। 


-"তোমাকে বিকেলে এসে নিয়ে যাবো। তৈরি থেকো।"

বলে ইলান উঠে পড়লো আশরাফুলকে সাথে নিয়ে।

দুজনই আশরাফুলের রুমে স্থান নিলো। দরজা চাপিয়ে বারান্দার খোলা হওয়ায় গিয়ে দাঁড়ালো দুজন। আশরাফুল চিন্তিত গলায় বলল,

-"প্রভাকে নিয়ে আমার প্রচুর ভ'য় হচ্ছে। মা এসব ব্যাপারে কিছুই জানেনা। তাকে জানাইনি।"


ইলান শান্তনা দিলো আশরাফুলকে। পিঠে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল,

-"রিল্যাক্স, আমি আছি তো।"


আশরাফুল ইলানের চোখে চোখ রাখলো। তার কন্ঠে দৃঢ়তা, চোয়াল জানান দিচ্ছে কঠোর ব্যক্তিত্ব। বন্ধু বলেও কোনো ইনিয়েবিনিয়ে কথা বললনা। সোজাসুজি কাঠকাঠ গলায় বলল,

-"কতটা আছিস আমি জানি। কিন্তু তোর এই থাকা না থাকা সম্পূর্ণ প্রভার উপর নির্ভর করে। প্রভা না চাইলে কিছুই সম্ভব নয়। আমার বোন সে। তার পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব আছে আমার কাছে। তাছাড়া প্রভা এখন আর বাচ্চা নেই, এডাল্ট পারসোন। নিজের লাইফ নিয়ে যেকোনো রকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আর ক্ষমতা দুটোই তার হয়েছে। অন্ধের মতো তার উপর আমি নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারিনা।"


ইলানের চোয়াল জোড়া ও শক্ত হয়ে এলো ক্ষোভে, অপমানে। তার দোষ কতটুকু সে জানেনা। একজন মানুষকে কতটা চাইলে তাকে পাওয়া যায় সে ধারণা টুকুও নেই ইলানের। তার রাগ আশরাফুলের উপর নয়। তার সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, ঘৃ'ণা, ভালোবাসা, অভিমান প্রভাতির ওপর। খুব অহংকারবোধ নিয়ে চলে মেয়েটা। ইলান শান্ত অথচ গমগমে স্বরে জানান দিলো,

-"আমি আমাদের টিম থেকে সিকিউরিটি দেওয়ার ব্যবস্থা করবো। নিজের ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আয়।"


মাঝখানে বাঁধ সাধলো আশরাফুল।

-"প্রভাকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেবো। যতদিন না কে'সটা সলভ হচ্ছে, ততদিন সে ইন্ডিয়ায় থাকবে।"


বিস্ফোরিত নেত্রে চাইলো ইলান। কপালের রগ দপদপ করে ফুলে উঠলো। দাঁতে দাঁত লেগে শক্ত চোয়ালে লালিমা ছড়ানো একজোড়া চোখ ধপ করে জ্বলে উঠলো। মেয়েটাকে কিছুতেই দূরে সরানো যাবেনা। এখন আছে, দৃষ্টি সীমানায় আছে। দূরে গেলে চোখের তৃষ্ণা, একবুক হাহাকার নিয়ে তলিয়ে যাবে সে। আশরাফুলকে ধমকে উঠলো ইলান,

-"না বুঝে বোকার মতো কথা বলিসনা। প্রভা বাংলাদেশে থাকবে। আর তার সেইফটির জন্য আমাদের টিম রয়েছে। একবার ভেবে দেখ, যে ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করছে সে কিন্তু ইন্ডিয়াতেও যেতে পারে। তাই ইন্ডিয়া ও ওর জন্য সেইফ না। কাছাকাছি থাকলে টেনশন ফ্রী থাকতে পারবি। আশা করি বুঝতে পেরেছিস।"


আশরাফুলকে চিন্তিত দেখা গেলো, তবে তার চোখ দেখে বোঝার উপায় নেই অন্তরের অভিব্যক্তি।

দেরি করলোনা ইলান। তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পড়লো। গায়ে অফিসের জ্যাকেট চাপিয়ে ফোন করলো শিহাব কে।


তুর্শির বাড়িতে গিয়ে জাকিয়া মেয়েটার সম্মুখীন হলো। মেয়েটার চোখদুটো নির্ভ'য়ে তাকিয়ে আছে। তার স্বচ্ছ দৃষ্টি বলছে মেয়েটা মিথ্যে বলছেনা।

"তুর্শির কোনো এফেয়ার ছিলোনা। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।"


মেয়েটির কথা শুনে আশাহত হলো ইলান।

সব কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোনোভাবেই কোনো ক্লু পাওয়া যাচ্ছেনা। 


এখন একমাত্র ভরসা প্রভাতি। তার দেওয়া বর্ণনায় যতটুকু মানুষটিকে চেনা যায়। 


———————


ইলানের ভাই মাহিন কালই বাসায় ফিরেছে। এখন হুট করেই বাসায় এসে আনোয়ারা জাহানের সাথে কুশল বিনিময় করলো। আনোয়ারা জাহানকে কেমন তিরিক্ষি মেজাজে কথা বলতে দেখা গেলো। মাহিন ধারণা করে নিলো উনার মানসিক সমস্যাটি পূনরায় চড়ে গিয়েছে। মাহিন এতদিন ভার্সিটির কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাটে থাকতো। প্রয়োজ ছাড়া তাকে বাসায় দেখা যায়না। 

আনোয়ারা জাহানের মেজাজের কাছে হার মেনে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো সে। প্রভাতির সাথে দেখা করা হলোনা। 


বিকেলেই ছাদে দেখা হয়ে গেলো প্রভাতির সাথে। অবাক হলেও মিষ্টি হেসে প্রভাতি জিজ্ঞেস করলো,

-"তুমি বাসায় কখন এলে?"


মিটিমিটি হেসে ছাদের দরজা থেকে সরে এলো মাহিন।

-"এসেছি গতকাল। সকালে তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েও পারিনি। আন্টি হাইপার হয়ে আছেন।

বাই দ্যা ওয়ে, তুমি কিন্তু দিনদিন সুন্দরী হয়ে যাচ্ছো।"


ঘন ঘন চোখের পলক ঝাপটিয়ে মৃদু শব্দে হাসলো প্রভাতি।

-"তুমি ও কিন্তু দিনদিন ফ্লার্ট করতে অতিরিক্ত অব্যস্ত হয়ে যাচ্ছো।"


মাহিন অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

-"এই যাহ! আমি ভাবলাম প্রশংসার বদলে প্রশংসা পাবো। কিন্তু এ তো দেখছি অপ'মান করতে ছাড়ছেনা।"


প্রভা বলল,

-"ওভার অক্টিং করা বাদ দাও। আমি নিচে যাচ্ছি। পরে দেখা হলে কথা বলবো।"


-"সেকি! কোথায় যাচ্ছো তুমি?"


মাহিনের কথার প্রতিত্তোরে জবাব দিয়েই সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিলো প্রভাতি।

-"তেমার ভাইয়ের সাথে তার অফিস যেতে হবে। কিছু কাজ আছে।"


মাহিন বলল,

-"ভাইয়াকে কষ্ট করে আসতে হবেনা। চলো আমিই তোমাকে দিয়ে আসছি।"


-"তোমার কষ্ট করতে হবেনা। তাছাড়া আমার কিছু শপিং করা দরকার আছে।"


মাহিন আশ্বস্ত করে বলল,

-"ডোন্ট ওরি! আমার কোনো প্রবলেম নেই। তুমি রেডি হয়ে নাও। আমি নিচে আছি।"


আর না করতে পারলোনা প্রভাতি। মাহিন ইলানকে কল করে জানিয়ে দিলো প্রভাতিকে সে নিয়ে আসছে। 


"শিট" বলে চেয়ারে লাথি মে'রে বসে ইলান। মাহিন এই কে'স সম্পর্কে অবগত নয়। চারদিকে প্রভাতির জন্য বিপ'দের আশংকা। কিন্তু এই মুহূর্তে মাহিনকে সব খুলে বলা সম্ভব নয়। ইলান নিজে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। যেকোনো দিক থেকে অ্যাটাক হতে পারে।


গাড়ি শপিংমলের সামনে এসে দাঁড়ালো। মাহিন নেমে পড়ে প্রভাতির সাইডের দরজা খুলে দিলো। গাড়ি থেকে নেমে দুজনই ভেতরে ঢুকলো। কিছু ড্রেস দেখতে দেখতে একটা পছন্দ হলো। প্রভাতি ঠিক করলো ট্রায়াল দিয়ে দেখবে। এরমাঝে মাহিনের একটা ইমার্জেন্সি কল আসায় সে প্রভাতির কাছ থেকে পাঁচ মিনিট সময় চেয়ে সাইডে গিয়ে দাঁড়ায়।


কথা শেষ করে এসে দেখলো প্রভাতি এখনো বের হয়নি। দরজার সামনে যেতেই দেখতে পেলো দরজা খোলা। বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো। ভ'য়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। জিহবা দিয়ে শুকনো ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেলো প্রভাতির দিকে। মেয়েটা গলা কা'টা মুরগী, না না গলা কা'টা মানুষ হয়ে ছটফট করছে। র'ক্তে ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। কিছু বলতে চাইছে হাত উঁচু করে। মাহিন চিৎকার করে ডাকলো প্রভাতিকে। প্রভাতি গলায় হাত রেখেই ছটফট করে যাচ্ছে। কন্ঠনালিতে শব্দ ধারণ করতে পারছেনা। 

মাহিনের চিৎকারে মানুষ জড়ো হলো। বুদ্ধি করে ইলানের নাম্বারে কল দিয়ে হাঁপানো গলায় বলল,

-"ভাই, ভাই প্লিজ রঙনাতে চলে আয়। কে বা কারা প্রভাতির গলা কে'টে দিয়েছে।"


ওপাশে কি হচ্ছে আর কিছুই জানতে পারলোনা মাহিন। 

রঙনা শপিংমলের কাছাকাছিই ছিলো ইলান। দ্রুত ভেতরে এসেই পাঁজা কোলে তুলে নিলো প্রভাতিকে। আশেপাশে তাকানোর প্রয়োজন মনে করলোনা। ইলানের শক্ত মুখশ্রী দেখে বোঝার উপায় নেই আদৌ তার ভেতরটা পুড়ছে কিনা?

মাহিন ড্রাইভ করছে। পেছনের সিটে মৃ'ত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা প্রভাতিকে বুকের সাথে মিশিয়ে সামনে চোখ রাখলো ইলান। ব্যথা, অস্থিরতায় বারবার ইলানের শার্টের বুকের দিকটায় খা'মছে ধরছে প্রভাতি। দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস ওঠানামা করছে। অক্ষি কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নিঃশব্দ নোনাজল। ইলান প্রভাতিকে নিজের সাথে আরেকটু মিশিয়ে নিলো। বিড়বিড় করে বলল, "কিছু হবেনা তোমার। সব ঠিক হয়ে যাবে।"


একবার বাইরে চোখ রেখে গাড়ির গতিবেগ লক্ষ্য করে দাঁতে দাঁত চেপে মাহিনকে বলল,

-"ডু ফাস্ট ইডিয়ট"


গাড়ির গতি আরও খানিক বাড়িয়ে দিয়েছে মাহিন। 

দ্রুত ইমার্জেন্সিতে নেওয়া হলো প্রভাতিকে। যেহেতু ক্রাইম ব্রাঞ্চ এর অফিসার ইলান মুনতাসীর ছিলো, তাই আপাতত পুলিশকে জানানোর জন্য কোনো প্রেশার পড়েনি। 


অপারেশনের পর কেবিনে শিফট করা হলো প্রভাতিকে। ডক্টরের সাথে কথা বলে ইলান জানতে পারলো অন্তত দু'মাস প্রভাতি কথা বলতে পারবেনা। গলার ক্ষ'তটি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিলো কন্ঠনালি অকেজো করে দেওয়া। তবে পুরোপুরি সফল হয়নি তাদের উদ্দেশ্য। কন্ঠনালিতে প্রেশার পড়েছে। আপাতত দু'মাস সবকিছু মেনে চলতে হবে। নয়তো পরবর্তীতে সমস্যা হতে পারে।

ইলানের কাছে সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো। আজ প্রভাতির বর্ণনায় স্কেচ করার কথা ছিলো। যাতে সে বর্ণনা দিতে না পারে সেই জন্যই এরকম একটা কৌশল অবলম্বন করলো শ'ত্রুপক্ষ।


আপাতত ইলানের চিন্তা আশরাফুলকে নিয়ে। সে যখন জানতে পারবে প্রভাতি হাসপাতালে আর হাসপাতালে থাকার কারণ, তখন কি করবে? প্রভাতিকে কি তার থেকে দূরে সরিয়ে দেবে? তাদের বন্ধুত্বে কি কোনো আঁচ আসতে শুরু করেছে?


————


আজ বিকেল থেকেই সিভিল ড্রেসে তুর্শির বাড়ির আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিলো মুনির। দোকানে বসে চায়ের আড্ডায় দারুণ এক ইনফরমেশন পেলো সে। 


এক প্রবীণ লোক অপরজনের সাথে চায়ের সঙ্গে আলাপ ঝুড়েছেন। তাদের আলাপের মূল বিষয়বস্তু তুর্শি। প্রথম প্রবীণ লোকটি বলল,

-"ইশরে! স্বপন সাহেবের একটা মেয়ের শখ আছিলো। ভাই ম'রার পর ভাতিজিরে দিয়া মেয়ের শখ মিটাইছিলো। এখন সেই মেয়েটার ও আকস্মিক মৃ'ত্যু?"


মুনির পেছন থেকেই জিজ্ঞেস করলো,

-"আপনি কি স্বপন মির্জার কথা বলছেন? মানে যে মেয়েটি মা'রা গিয়েছে তার নাম কি তুর্শি?"


দ্বিতীয় প্রবীণ লোকটি বলল,

-"হ, তয় তুমি কে? এগুলো জেনে তোমার কি কাম?"


মুনির বলল,

-"এমনি জিজ্ঞেস করলাম চাচা। মেয়েটার মৃ'ত্যুর খবর লোকমুখে শোনা যায়। তাই কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম। কিছু মনে করবেননা চাচা।"


দুই প্রবীণ আর মাথা ঘামালেননা। মনযোগ দিলেন তাদের চায়ের আড্ডায়।

মুনির রাস্তায় নেমে পড়লো। মুঠোফোনে সেইভ করা একটি পরিচিত নাম্বারে ডায়াল করে বলল,

-"স্যার! কে'সটা মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি সলভ হতে চলেছে।"


#চলবে........#কুয়াশায়_ঘেরা

#পর্ব_০৭

#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা


হসপিটালে পৌঁছে ইলানের সাথে একটি কথাও বললনা আশরাফুল। ভীষণ রাগ হচ্ছে তার। কেনো জানেনা বারবার মনে হচ্ছে প্রভাতির এই অবস্থার জন্য ইলান দায়ী। অথচ এসবে ইলানের কোনো হাত নেই। প্রভাতিই অকারণে জড়িয়ে গিয়েছে কে'সটিতে। যদি না সে জঙ্গলে যেতো, আর না মা'র্ডারারের অবয়ব দেখতো। তাহলে এতকিছু হতোনা। এই পর্যায়ে এসে মাকে কিছু না জানিয়ে থাকতে পারলোনা আশরাফুল। আনোয়ারা জাহান মেয়ের জন্য হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। স্বামীর চিহ্ন হিসেবে এই দুটো ছেলেমেয়ে উনার কাছে আছে। 


ইলান মুনিরের ফোন কলে বেরিয়ে পড়ে।

মুখোমুখি বসে আছে স্বপন মির্জা আর ইলান মুনতাসীর। ইলান গলা পরিষ্কার করে প্রশ্ন করলো,

-"তুর্শি তো আপনার মেয়ে না। এটা কি সত্যি?"


চমকে উঠলেন স্বপন মির্জা। ভড়কানো গলায় বললেন,

-"ক কি যাতা বলছেন? তুর্শি আমার মেয়ে।"


ইলানের তীক্ষ্ণ চোখজোড়ার নড়চড় হলোনা। একইভাবে তাকিয়ে রইলো স্বপন মির্জার দিকে। 

-"মি'থ্যে বলার চেষ্টা করবেননা। যথেষ্ট প্রমাণ আছে আমাদের কাছে।"


তুর্শির নিবন্ধন কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে ইলান বলল,

-"এখানে তুর্শির বাবার নাম সারোয়ার মির্জা। তাছাড়া এই নামটা ও আপনার স্ত্রীর নয়, তুর্শির মায়ের নাম। ভুল হোক বা অজানাতে তুর্শির নতুন নিবন্ধন হয়নি। সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ার পর ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির সময় আপনার চোখে পড়ে বাবার জায়গায় আপনার ভাইয়ের নাম। এখন ঝামেলা,পরে ঠিক করবেন বলে আর ঠিক করা হয়নি। আমি ঠিক বলছি তো?"


মাথা নিচু করে রইলেন স্বপন মির্জা। ইলান যা যা বলছে সব সত্যি। একটা মেয়ের শখ ছিলো তার। ভাই মা'রা যাওয়ার পর মেয়েটাকে নিজের মেয়ে বলে বড় করে। মানুষের মুখ টাকা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। লোকের কথা শুনে বড় হয়ে মেয়েটা যদি চলে যায়? তাকে আর বাবা না ডাকে?"


নিরবতা সম্মতির লক্ষণ। ইলান দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো,

-"আপনার ছেলে কোথায়? খু'ন হওয়ার পর থেকে তার দেখা নেই। বোনের প্রতি দরদ নেই নাকি? নাকি চাচাতো বোন বলে।"


স্বপন মির্জা বললেন,

-"তুর্শির মৃ'ত্যুর পর একবার এসেছিলো। ও নাকি বন্ধুদের সাথে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে আছে।"


ইলান লক্ষ্য করলো পাশে দাঁড়ানো জাকিয়া মেয়েটি অনবরত ঘামছে। এসি অন করার পরও ঘামবে কেনো? 


স্বপন মির্জার সাথে আলাপ শেষে সরাসরি জাকিয়ার দিকে প্রশ্ন তাক করলো ইলান।

-"আপনি ঘামছেন কেনো? আমার জানামতে এখানে আমি বা কেউই কোনো অস্বাভাবিক কথা বলেনি। কি লুকোচ্ছেন আপনি?"


জাকিয়া ওড়না দিয়ে কপাল, গলার ঘাম মুছে নিয়ে হাসার চেষ্টা করলো,

-"কোথায় ঘামছি?"


ইলান হালকা হেসে বলল,

-"ঘাম মুছে বলছেন কোথায় ঘামছেন? ম'রার ভ'য় নেই নাকি?"


কেঁদে ফেললো জাকিয়া। 

-"স্যার প্লিজ স্যার আমি কিছু জানিনা।"


ইলান মেয়েটির দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল,

-"আগে পানি পান করুন।"


জাকিয়া সময় নিলোনা। বাচবিচার ভুলে এক ঢোকেই পানি পান করলো।


ইলান শান্ত ভঙ্গিতে বলল,

-"এবার বলুন।"


-"আমি একটা সত্য গোপন করেছি। বড় স্যার মানে স্বপন মির্জার ছেলে ফরহাদ স্যার আমাকে নির্দেশ দিতেন তুর্শির খাবারে ঘুমের ঔষধ দিতে। ওর নাকি রাতে ঘুম হয়না।

প্রথমে আমি সেটাই করতাম। পরে কয়েকদিন লক্ষ্য করলাম উনি রাত হলে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তখন তুর্শির ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দেন। 

একদিন আমার মুখোমুখি হয়ে যাওয়ায় বললেন,

-"এ কথা কেউ জানলে জানে মে'রে দেবো।"


সেই ভ'য়ে আমি কিছুই বলিনি।"


ইলান সোজা স্বপন মির্জার দিকে তাকালো।

-"আপনি তো বলেছিলেন তুর্শি প্রায়ই ঘুমের ঔষধ নিতো ডাক্তারের পরামর্শে। 

মি'থ্যে কেনো বলেছিলেন?"


স্বপন মির্জা কসম কে'টে বললেন,

-"তুর্শিকে ডাক্তার ঘুমের ঔষধ দিয়েছিলো। ও নিয়মিত নিতোনা, কিন্তু মাঝেমাঝেই ঔষধ নিতো। আপনি ডাক্তারের সাথে কথা বলে দেখুন।"


-"ফরহাদ এই মুহূর্তে কোথায় আছে? সাবধান তাকে পূর্বেই সতর্ক করে দিলে হাজত বাস হবে আপনার।"


স্বপন মির্জা জানালেন বন্ধুদের সাথে আছে, কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় আছে সেটা জানেননা।


ইলান বলল,

-"ফোন, ম্যাসেজ কিছু করে?"


জাকিয়া বলল,

-"মাঝেমধ্যে আমার কাছ থেকে কে'সের তথ্য নেওয়ার জন্য ফোন করে।"


ইলানের ইচ্ছে করছে জাকিয়া মেয়েটাকে ঠা'টিয়ে দুটো চ'ড় মারতে। তনুশ্রী সাথে থাকলে নিশ্চিত তাকে দিয়েই চ'ড় মা'রতো। সমস্ত ইনফরমেশন লুকিয়ে রেখে এখন জানান দিচ্ছে। ইলান নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,

-"নিশ্চয়ই আবার ও ফোন করবে? কোনো ইনফরমেশন দেবেননা।"


জাকিয়া মাথা দুলিয়ে সায় জানালো। ইলান বেরিয়ে পড়লো। মুনিরের উদ্দেশ্য বলল,

-"জাকিয়া মেয়েটার ফোন ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করো।"


———————


আজ একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরলো ইলান। মাহিনের সাথে তেমন কথা হয়নি তার। গোসল সেরেই মিহানের ঘরে গেলো। কিন্তু মিহান নেই। ওয়াশরুম থেকে জোরেসোরে পানি পড়ার শব্দ আসছে। মিহান নিশ্চিত ওয়াশরুমে আছে ভেবে ইলান বেরিয়ে যেতে নিলো। যেতে নিয়েও পা জোড়া থামিয়ে ফেললো। বেডসাইড টেবিলের পাশে কিছু একটা দেখলো। শিওর হওয়ার জন্য চটপট জিনিসটি হাতে নিয়ে খুলে দেখলো। শিওর হলো এটা মিহানের পাসপোর্ট।

এমন সময় মিহানের ফোন বেজে উঠলো। ''F" দ্বারা সেইভ করা নাম্বারটি। হাতের জিনিসটির সাথে ফোন সম্পর্কিত হতে পারে ভেবে রিসিভ করলো ইলান। ইলানের ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্য মাখানো বাঁকা হাসি। দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে পড়লো। 


খাবার টেবিলে বাবা মায়ের সাথে একসঙ্গে খেতে বসলো দুই ছেলে ইলান, মিহান। খাওয়ার এক পর্যায়ে ইলান কেশে উঠে বলল,

-"তোমাদের ছোট ছেলে ইন্ডিয়াতে স্যাটেল হওয়ার প্ল্যান করছে।"


ইলানের বাবা আর মা বিস্মিত হলেন। চমকে উঠলো মিহান ও। খাবার প্লেটেই হাত থেমে রইলো। আর হাত চললোনা। 

মা বাবার জেরার মুখে পড়ে কোনো ভাবে পাশ কা'টিয়ে উঠলো মিহান। 


রাতের অন্ধকারে মুখোমুখি দাঁড়ালো দুটি পুরুষ অবয়ব। কারো চোখে জলন্ত আগুনের লাভা, আর কারো ঠোঁটের কোনে এক টুকরো হাসির ঝলক। 


-"ইন্ডিয়াতে স্যাটেল হচ্ছিস?"


ইলানের প্রশ্নের প্রতিত্তোরে মিহান ক্ষোভ মেশানো গলায় বলল,

-"তুমি যে পরিকল্পনা আঁটছো, সেটাতে সফল হতে পারবেনা।"


ব্যাগ পত্র নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলো মাহিন। মাঝরাস্তায় পথ আটকে দাঁড়ায় ইলান। মাহিনের কথায় কেবল হাসলো ইলান। 

-"তুই যেভাবে আমাকে নিচ্ছিস। আমি কিন্তু এতটাও সোজা নই। আমার পরিকল্পনা তোর ভাবনার চেয়ে দুকাঠি উপরে।"


মিহান হুট করেই আ'ঘাত করে বসলো ইলানকে। আ'ঘাত পাওয়ার পূর্বেই শ'ত্রু মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত ছিলো ইলান। মিহানের হাতের চা'কু নিয়ে উল্টো তাকেই আ'ঘাত করে বসলো। টে'নে'হিঁ'চড়ে নিয়ে গেলো গাড়ির দিকে। 


ইলান গুপ্তচর দিয়ে খোঁজ নিলো মিহানের বন্ধুদের মধ্যে কতজন সদস্য আছে? এবং তাদের ডিটেইলস। 

ফরহাদ নামটি দেখে থমকালোনা ইলান। যেনো এমন কিছু হবে সে আগেই টের পেয়েছিলো। মিহানকে নিজের টিমের হাতে তুলে না দিয়ে তাকে আলাদা ট্রিট করার জন্য নিজের কাছে রাখলো। থেরাপি দেওয়ার সকল সরঞ্জাম রেডি। এখন শুধু স্পেশাল থেরাপি আর মুখ দিয়ে কথা বের করানো বাকি। 


-"ফরহাদ কোথায় আছে?"


মিহান জেদ বজায় রেখে বলল,

-"বলবোনা।"


ইলানের ভেতরের হিং'স্র সত্তা জেগে উঠলো। চোখের সামনো ভেসে উঠলো নিষ্পাপ তিনটি মুখ। দুজন মৃ'ত, একজন অর্ধমৃ'ত তার ভালোবাসা। রডের আ'ঘাত আরও তীব্র হলো। মিহান চিৎকার করছে তবুও সত্য বলতে নারাজ। 


ইলান ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,

-"এর আগের বার ও তোকে আমি বাঁচিয়ে দিয়েছি। ভেবেছি শুধরে গিয়েছিস। বেআইনি কাজে আর জড়াবিনা। কিন্তু না, আমি ভুল ছিলাম। কুকুরের লেজ বারো বছর টে'নে রাখলেও সোজা হয়না।"


কথা শেষ করে প্রচন্ড জোরে মিহানের পিঠে আ'ঘাত করলো ইলান। শেষবার মা উচ্চারণ করে অচেতন হয়ে পড়ে মিহান। ইলান হাতের রড ছুড়ে ফেলে দিলো। মিহানের হাত পায়ের বাঁধন খুললেনা। মিহানকে উপুড় করে তার হাত পা বেঁধে রাখা হয়েছে।


রাতে বাড়ি ফিরে গেলো।

সকালে মায়ের আতঙ্কিত চেহারা নজরে পড়লো। আতঙ্ক, ভালোবাসা, ভ'য়, কষ্ট সবকিছুর সংমিশ্রণে মায়ের চোখে ছলছল করা পানির দেখা মিললো।

-"মিহান সত্যি সত্যিই ইন্ডিয়া চলে গিয়েছে। ঘরে ওর কোনো জিনিসপত্র নেই।"


ইলান দুঃখী চেহারার আড়ালে দুর্বোধ্য হাসলো। 

#চলবে......

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url