#তিনটি_উত্তর পর্ব ২
#গল্প_ঘর
দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকার মুহূর্তে যেন পুরো হলঘরটা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
আলো ঝলমলে স্টেজ, ফুলে সাজানো মঞ্চ, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে—হিশাম।
তার পাশে শিরিন—হাসছে, ঠিক যেমনটা সবাই বলে, কৃত্রিম আর নিখুঁতভাবে।
কিন্তু হিশামের চোখ…
ওটা থেমে গেল আমার ওপর।
তারপর ধীরে ধীরে নামল আমার হাতের দিকে— যেখানে শক্ত করে ধরে আছে তিনটা ছোট্ট হাত।
সাইফ। হামজা। তালিয়া।
আমি দেখলাম—তার মুখের রঙ এক মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
শিরিন প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি। সে এখনও হাসছিল, অতিথিদের দিকে হাত নাড়ছিল। কিন্তু হিশামের স্থির হয়ে থাকা শরীরটা লক্ষ্য করে সে কপাল কুঁচকালো।
“হিশাম? কী হয়েছে?”
হিশাম উত্তর দিল না।
তার চোখ আটকে আছে শুধু এক জায়গায়।
আমার দিকে।
আমি ধীরে ধীরে সামনে এগোতে লাগলাম। প্রতিটা পা ফেলার সাথে সাথে যেন হলঘরের শব্দগুলো মুছে যাচ্ছিল। শুধু আমার হিলের শব্দ—টক… টক… টক…
মানুষজন ফিসফিস শুরু করল।
“ও কে?” “ওই বাচ্চাগুলো…” “একদম হিশামের মতো না?”
আমি থামলাম স্টেজের ঠিক সামনে।
হালকা হেসে বললাম— “বিয়ে মোবারক, হিশাম।”
আমার কণ্ঠ শান্ত। কিন্তু ভিতরে আগুন জ্বলছে।
হিশাম যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। “নূর… তুমি…?”
আমি একটু মাথা কাত করলাম। “তুমিই তো ডাকলে। না আসাটা অভদ্রতা হতো, তাই না?”
শিরিন এবার পুরোপুরি ঘুরে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি, তারপর কৌতূহল— আর শেষে… সন্দেহ।
“হিশাম, এই মহিলা কে?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর আমি নিজেই উত্তর দিলাম।
“আমি? আমি ওর অতীত…” একটু থামলাম, বাচ্চাদের দিকে তাকালাম। “…আর ওর ভবিষ্যৎও, হয়তো।”
শিরিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “এক্সকিউজ মি?”
ঠিক তখনই তালিয়া আমার শাড়ি টেনে ধরল— “মাম্মি… আমরা কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব?”
“মাম্মি…”
শব্দটা যেন বজ্রপাতের মতো পড়ল পুরো হলে।
শিরিনের চোখ বড় হয়ে গেল। ধীরে ধীরে সে তাকাল বাচ্চাদের দিকে… তারপর আবার হিশামের দিকে।
“হিশাম… এরা…?”
হিশাম এবার কাঁপা গলায় বলল— “নূর… এরা কারা?”
আমি হেসে ফেললাম। খুব আস্তে।
“সিরিয়াসলি? এখনো বুঝতে পারছো না?”
আমি সাইফের মাথায় হাত রাখলাম। “এইটা তোমার মতো জেদি…”
হামজার দিকে ইশারা করলাম— “এইটা তোমার মতো চুপচাপ…”
তারপর তালিয়াকে কোলে তুলে নিলাম— “আর এইটা… একদম তোমার চোখ।”
পুরো হলঘর নিস্তব্ধ।
শিরিন এক পা পিছিয়ে গেল। “না… না, এটা সম্ভব না… হিশাম, তুমি আমাকে বলোনি—”
“কারণ ও জানতোই না।”
আমি এবার সরাসরি হিশামের চোখে তাকালাম।
“ডিভোর্সের এক মাস পর… আমি জানতে পারি। তিনজন। একসাথে।”
হিশামের ঠোঁট কাঁপছে। “তুমি… আমাকে জানাওনি কেন?”
এই প্রশ্নটা শুনে আমার ভিতরের জমে থাকা সবকিছু এক মুহূর্তে মাথা তুলল।
আমি ধীরে ধীরে বললাম— “কারণ তুমি তখন ব্যস্ত ছিলে… আমাকে ‘অপূর্ণ’ প্রমাণ করতে।”
কিছু মানুষ মাথা নিচু করে ফেলল।
আমি এগিয়ে গেলাম আরও এক ধাপ।
“আর আমি চাইনি… তুমি দয়া করে ফিরে আসো। বা আরও খারাপ—ওদের কেড়ে নিতে চাও।”
হিশাম কিছু বলতে যাচ্ছিল— কিন্তু শিরিন তার হাতটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল।
“তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছো…”
তার কণ্ঠ ঠান্ডা।
“তোমার তিনটা বাচ্চা আছে… আর তুমি আমাকে কিছুই বলোনি?”
হিশাম হতভম্ব। “আমি… আমি জানতাম না—”
“স্টপ।”
শিরিন হাত তুলে থামাল।
তারপর আমার দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল— “তুমি শক্ত মেয়ে, নূর। আমি সেটা স্বীকার করি।”
আমি কিছু বললাম না।
সে হালকা হেসে বলল— “কিন্তু এই বিয়ে… এখন আর হবে না।”
পুরো হলঘরে একটা শোরগোল উঠল।
হিশাম চমকে উঠল— “শিরিন, ওয়েট—”
“না, তুমি ওয়েট করো।”
সে মাইক্রোফোনটা নামিয়ে রাখল। তার চোখে এখন আর সেই কৃত্রিম হাসি নেই।
“আমি এমন একজন মানুষকে বিয়ে করতে পারি না… যে নিজের সন্তানদের অস্তিত্বই জানে না… বা জানতে চায়নি।”
তারপর সে ঘুরে চলে গেল।
হলঘর ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা।
আর আমি?
আমি দাঁড়িয়ে আছি… তিনটা ছোট্ট হাত ধরে।
হিশাম ধীরে ধীরে স্টেজ থেকে নামল। আমার সামনে এসে থামল।
তার চোখে অপরাধবোধ… বিস্ময়… আর এক ধরনের ভাঙা অহংকার।
“নূর… আমি—”
আমি মাথা নাড়লাম।
“না। আজ কোনো ব্যাখ্যা না।”
আমি বাচ্চাদের হাত শক্ত করে ধরলাম।
“আজ শুধু একটা জিনিস দেখাতে এসেছিলাম।”
আমি একটু হাসলাম।
“তুমি যেটাকে ‘অপূর্ণ’ বলেছিলে… সেটা আসলে কতটা পূর্ণ হতে পারে।”
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।
সাইফ বলল— “মাম্মি, আমরা কি এখন বাড়ি যাব?”
আমি নিচু হয়ে তার কপালে চুমু খেলাম।
“হ্যাঁ, সোনা… আমরা বাড়ি যাচ্ছি।”
পেছনে হিশাম দাঁড়িয়ে রইল।
নীরব।
ভাঙা।
আর প্রথমবারের মতো—একদম একা।
চলবে…
