#জনৈক_প্রেমিক
পর্ব- ০২
বিয়ের রাতেই আমার স্বামী আমাকে তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে যদি একঘরে দেখে তবে তার ফলাফল কতটা ভয়ানক এবং অসম্মানজনক হবে তা ভাবতেই শিউরে উঠলাম। আসল ঘটনাটা কী ছিল সেটা হয়তো কেউই বুঝতে চাইবে না! সম্মানহানি তো হবেই। ওয়াহাব নিশ্চয়ই আমাকে ডিভোর্সই দিয়ে দেবে! কিন্তু সেটা আমি এই মুহূর্তে অবশ্যই চাইছি না।
ডাকটা আরেকবার কানে এলো। 'মা! দরজা খুলছো না কেন?'
আমি কী করব কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। প্রত্নও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও নিজেও হয়তো বুঝে উঠতে পারেনি এমন কিছু হবে! আমি ওকে জোরেসোরে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশরুমে পাঠিয়ে দিলাম। তারপর দরজা ভিজিয়ে রেখে বললাম, 'আমি না বলা পর্যন্ত বের হবে না। বাই চান্স, তুমি যদি বের হয়েছো তোমার বড় ভাইয়ের সামনেই তোমায় খুন করবো আমি!'
ও কোনো প্রতুত্তর করলো না।
আমি দরজা খুলে দিলাম। ওয়াহাবের মুখভঙ্গি দেখে কিছু বোঝা গেল না। উনি কি আমাকে দেখে অবাক হলেন না কি বিরক্ত?
মা হাতে একটা প্লেট ভর্তি খাবার নিয়ে ফেরত এলেন। ওয়াহাবকে দরজার সামনে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী ব্যাপার তুই এখানে? কিছু লাগবে?'
ওয়াহাব খানিক আমতাআমতা করলেন। 'না, আসলে, তোমার সঙ্গে কিছু কথা ছিল!'
'হ্যা, বল!'
'ওহ হো কী যেন বলতে এসেছিলাম! মনে পড়ছে না!' বলেই ওয়াহাব দ্রুত পায়ে চলে গেলেন এখান থেকে।
মা ওনার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রহস্যজনক মুচকি হাসলেন। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এ কি! এখনো শাড়িটা বদলাসনি কেন মা?'
আমি বললাম, 'এখনি বদলে নিচ্ছি!'
'খাবারটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। জলদি হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নে!'
আমি মাথা ঝাঁকালাম। মা সামান্য হেসে চলে গেলেন। যাবার সময় বললেন দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে নিতে।
মা চলে যাওয়া মাত্রই প্রত্ন ওয়াশরুম থেকে বের হলো। এসেই আমার হাত চেপে ধরল, 'আমাকে এভাবে ঠকালি কেন হৃদি?'
আমি ব্যঙ্গাত্মক হেসে বললাম, ' আমি তোকে ঠকিয়েছি না কি তুই আমাকে ঠকিয়েছিস? '
প্রত্ন জবাব না দিয়ে অদ্ভূত চোখে চেয়ে রইল।
আমি আবার বললাম, 'আমি কী জানতাম দেখতে এসেই ওনারা বিয়ে ঠিক করে যাবেন? আমি তো এটাও জানতাম না, ওনারা যে আমাকে দেখতে আসবে! তারা চলে যাবার পরপরই এক মুহুর্ত দেরি না করেই আমি তোকে ফোন করেছি। তখনই তোকে সব খুলে বলেছি। অথচ তুই কী করলি? আমার সঙ্গে এমন বিহেভ করলি যেন সব দোষ আমার! যেন আমিই এসব কিছুর জন্য দায়ী!
সেদিনের পর আমি তোকে কতবার ফোন করেছি তোর কোনো ধারণা আছে? প্রত্যেকবারই সুইচড অফ ছিল। গত সাত দিনে তুই আমাকে একটা বারও ফোন করিসনি। একটাবার যোগাযোগ করারও চেষ্টা করিসনি আমার সঙ্গে। আমার ওপর দিয়ে কী পরিমাণ ঝড় গেছে এ'কদিন তোর কোনো ধারণা আছে? একদিকে বিয়ের টেনশন, একদিকে পরিবারের টেনশন, আরেকদিকে তোর টেনশন! আমি একা একা কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিকে তুই আমার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিস। বাবাকে যে তোর কথা বলবো সে সুযোগটাও তো তুই আমাকে দিসনি। তো আমার আর কী করার ছিল? কী করতাম আমি? উত্তর দে!'
প্রত্ন আরো শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরল। 'তাই বলে তুই বিয়েই করে নিবি? '
'নয়তো কী করতাম আমি? তুই কেন একটাবারও আমার খোঁজ নিলি না?'
প্রত্ন হুট করে রেগে গেল। 'তুই আমাকে বলিসনি কেন এক সপ্তাহ পরই বিয়ের ডেট? কেন এক মাস বলেছিলি?"
'ওনারা প্রথমে এক মাস পর বলেছিল তাই। বাসায় ফেরার পর তারা জানায় সামনের শুক্রবারই তারা বিয়ে পড়িয়ে ফেলতে চায়।'
প্রত্ন নিজের মাথার চুল টেনে ধরল। 'আমার সঙ্গেই কেন এমন হলো হৃদি?'
'কারন তুই নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারিস না।'
প্রত্ন ব্যঙ্গ করে বলল, 'আর আপনি?'
আমি জবাব দিলাম, 'আমিও তোর মতোই!'
'এখন আমরা কী করবো হৃদি?'
আমি বললাম, 'কেন এতক্ষণ যেটা করছিলি সেটাই! এতক্ষণ যেভাবে "ভাবি", " ভাবি' করছিলি, ফাজলামো করছিলি তেমনটাই করবি। তবে সারাজীবন! '
প্রত্ন চেঁচিয়ে উঠল, 'হৃদি!'
আমি বললাম, 'আমার ওপর চেঁচিয়ে কোনো লাভ নেই। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য তুই নিজেই দায়ী।'
প্রত্ন চুপ করে তাকিয়ে আছে। আমি আবার বললাম, 'তোর জন্য আমি সবার সামনে অপমানিত হয়েছি। শুধুমাত্র তোর কারনে তোর ভাই আমাকে বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে চড় মেরেছে।'
প্রত্ন আমার গালের বাম পাশে হাত বুলাতে লাগল, 'স্যরি! আমার জন্যই...!'
আমি ওর হাত আমার গালের ওপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বললাম, 'হ্যা। তোর জন্যই। এখন দয়া করে এ রুম থেকে বের হ।'
প্রত্ন রাগ দেখিয়ে রুম থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেল। আমার হাসি পেল। আমি নিজেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আবার আমার জীবনে যারা আসে তারা আমার চাইতে আরো এক ডিগ্রি এগিয়ে থাকে এ ব্যাপারে।
হাত-মুখ ধোয়ার পরিবর্তে একবারে গোসলই করে নিলাম। গাড়িতে জার্নি করে গোসল না করলে আমার ভালো লাগে না। শান্তি লাগছে এখন।
ভেজা চুল টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে খেতে বসলাম। খাওয়ার মাঝেই কেউ একজন দরজায় নক করল। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখলাম বাইরে শ্রেয়া দাঁড়িয়ে। শ্রেয়া আমার ননদ। রিহার বয়সী। দুজনেই ইন্টারে পড়ছে।
আমাকে বাম হাত দিয়ে দরজা খুলতে দেখে শ্রেয়া বলল, 'স্যরি ভাবি, খাওয়ার সময় ডিস্টার্ব করলাম!'
আমি মৃদু হেসে বললাম, 'মোটেও না! ভেতরে এসো।'
শ্রেয়া ভেতরে ঢুকে বলল, 'ভাবি, ভাইয়া এসেছিল?'
'হ্যা, কিছুক্ষণ আগেই। কেন বলো তো!'
শ্রেয়া বলল, 'তোমাকে ভাইয়া খুঁজছিল কেন যেন! আমাকে জিজ্ঞেস করল তুমি কোথায়।'
আমাকে খুঁজছিল! আমি বললাম, 'কখন শ্রেয়া?'
'এই তো আধ ঘন্টা হবে।'
ও এর মানে তখন তিনি আমার শ্বাশুড়ি মা'কে নয় আমাকে খুঁজতেই এ ঘরে এসেছিলেন! তবে মা'কে খোঁজার অভিনয়টা কেন করলেন!
কেনই-বা খুঁজছিলেন উনি আমাকে? পুনরায় মারার জন্য? আবার কী ভুল করলাম কে জানে!
আমাকে কিছু একটা ভাবতে দেখেই হয়তো শ্রেয়া বলল, 'ভাবি, তুমি আসলে ভাইয়াকে যেমন ভাবছো সে তেমন নয়।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কীভাবে বুঝলে আমি তোমার ভাইয়াকে কেমন ভাবছি!'
ও বলল, 'আসলে তোমার এখন ভাইয়াকে খারাপ মনে হবারই কথা। তখন তোমাকে যেভাবে চড়..!'
শ্রেয়া হঠাৎ থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'ভাইয়া আসলে ওমন নয়। তখন যে কেন এমন করল! আমার মনে হয় ভাইয়া তোমার ওপর কোনো কারনে রেগে ছিল। সে আবার নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না। তাই হয়তো! '
আমাকে চুপ থাকতে দেখে শ্রেয়া আবার বলল, 'কষ্ট পেয়ো না ভাবি! তোমাকে মন খারাপ করে থাকতে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। তুমি আমার খুব পছন্দের! ভাইয়ারও!'
আমি জোরে হেসে দিলাম, ' তোমার ভাইয়ার পছন্দের কি না জানিনা। কিন্তু তোমার বেশ পছন্দের সেটা বুঝতে পারছি। মন খারাপ করেছিলাম। কিন্তু এখন আর নেই। তোমার সঙ্গে কথা বলে মন ভালো হয়ে গেছে।'
শ্রেয়া হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আরো নানান কথা বার্তা হলো আমাদের মাঝে। এই কয়েক মুহূর্তেই ও খুব ফ্রি হয়ে গেল আমার সঙ্গে। ও ওর স্বমন্ধে অনেক কথাই বলল। আমিও মনোযোগ দিয়ে শুনলাম।
.
রাত এগারোটার দিকে আমাকে ওয়াহাবের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। ঘরটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বিছানাটাকেও। বিছানার মাঝখানে লাভ আকৃতিতে গোলাপের পাপড়ি সাজানো। ফুলের গন্ধে ঘরটা মঁ মঁ করছে।
আমি বিছানার এক কোনে গিয়ে বসে রইলাম। ওয়াহাব ঘরে এলো ঠিক দশ মিনিট পর। ঘরে ঢুকেই ঠাস করে দরজা লাগিয়ে বারান্দায় চলে গেল। আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখি সিগারেট খাচ্ছে। যতসব বদঅভ্যাস! সিগারেট আমি দু'চোখে সহ্য করতে পারি না। অথচ আমার কপালে একজন সিগারেটখোর এসে জুটেছে।
এখানটায় সিগারেটের গন্ধ এসে পৌঁছাচ্ছে না। তবুও খুব ধোঁয়া আসছে এমন ভান ধরে কাশতে লাগলাম। উনি পেছন ফিরে একবার আমার দিকে তাকালেন। এরপর পিষে সিগারেটটা নিভিয়ে ফেললেন।
বারান্দায় দাঁড়িয়েই ওয়াহাব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। আমার অস্বস্তি লাগতে লাগল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য বললাম, 'আপনি না কি আমাকে খুঁজছিলেন? '
আমার কথা বোধহয় ওনার কান অব্দি পৌঁছালো না। উনি ঘোরগ্রস্তের মতো বললেন, 'তোমাকে এতো সুন্দর লাগছে কেন?'
আমি খানিক মেজাজ খারাপ করে বললাম, 'এখন তো আমাকে সুন্দর লাগবেই। সব পুরুষদেরই...!'
আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই উনি লাইট নিভিয়ে দিলেন। তারপর আমার পাশে শুয়ে পড়ে বললেন, 'ঘুমিয়ে পরো। অনেক রাত হয়েছে।'
আমি বাধ্য মেয়ের মতো একদম কিনার ঘেষে শুয়ে পরলাম। উনি মৃদু স্বরে বললেন, 'স্যরি, হৃদি!'
চলবে...
লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা#জনৈক_প্রেমিক
পর্ব- ০৩
স্যরি! স্যরি কেন বলছেন উনি? বিয়ের দিনই সবার সামনে আমাকে চড় মেরে অপমানিত করার জন্য? আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই আবার বললেন, 'তোমার প্ল্যান সফল হতে দিলাম না, তাই স্যরি!'
আমি অবাক হলাম। আবোলতাবোল এসব কী বলছেন উনি! জিজ্ঞেস করলাম, 'প্ল্যান? কীসের প্ল্যান?'
উনি জবাব না দিয়ে ওপাশ ফিরে শুয়ে রইলেন। ওদিক ফিরেই আবার বললেন, 'আমাদের পরিবারের একটা সম্মান আছে। আর এখন তুমি এ পরিবারের একটা অংশ। তাই এমন কিছু করো না যাতে এ বাড়ির সম্মান নষ্ট হয়। তাহলে কিন্তু আমি তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দেবো না!'
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। দুপুরে অতো বড়ো অপমানের পর একটাবার ক্ষমাও চাইলেন না উনি। আবার এখন এমন সব কথা বলছেন যেন আমি বিশাল কোনো অপরাধ করে ফেলেছি। আর আমার কারনে ভবিষ্যতে তাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে।
আমি বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে দাঁড়ালাম। তারপর চেঁচিয়ে উঠলাম, 'বিয়ে হতে না হতেই সবার সামনে শুধু শুধু আমাকে চড় মারলেন আবার এখন বলছেন আমার জন্য ভবিষ্যতে আপনাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে! কেন কী করেছি আমি? কী এমন ক্ষতি করেছি আমি আপনাদের যে আমার কারনে আপনাদের পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে?'
উনি উঠে বসে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, 'আস্তে কথা বলো! সবাই শুনবে!'
আমি পরোয়াই করি না এমন ভাব করে বললাম, 'শুনুক! তাতে আমার কী যায় আসে? তখন সবাই আপনার আসল রূপটা তো দেখলোই। এখন আবার দেখুক!'
ওয়াহাব ক্রুদ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আমি তাতে একটুও টললাম না। এমনিতে আমি শান্ত মানুষ। তবে রেগে গেলে কোনো কিছুরই পরোয়া করি না। আমি আবার বললাম, 'আসলে তখন আমি ভুল বলেছিলাম। প্রত্ন না! আসল জানোয়ার তো আপনি!'
ওয়াহাব যেন বিস্ময়ের সপ্তম চূড়ায় পৌঁছে গেল। 'আমি জানোয়ার?'
' হ্যা, আপনি-ই! নয়তো কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ তার সদ্য বিয়ে করা বউকে মারে?'
উনি রেগে ওনার পাশের টেবিলের ওপর থেকে ফুলদানিটা মেঝেতে ছুড়ে মারলেন। তাতে যেন আমার মেজাজের আগুনে ঘি ঢালা হল। আমার কী হলো জানি না। পাশের ওয়ারড্রবের ওপর একটা ছোটো টেবিল ক্লক রাখা ছিল সেটা তুলে একদম ওনার বরাবর ছুড়ে মারলাম। ভাগ্যিস ওনার গায়ে লাগেনি! লাগলে একটা কুরুক্ষেত্র বেধে যেত নিশ্চিত।
ওয়াহাব হয়তো ভাবতেও পারেনি আমি এমনটা করতে পারি! বিস্ময়ে ওনার চোখ কোঠর থেকে বেরিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। উনি মিনমিন করে বললেন, 'আমি ভাবতাম আমিই পৃথিবীর সবচাইতে বেশি রাগী মানুষ! '
বেশি রাগ হলে আমি ধরে রাখতে পারি না। কেঁদে ফেলি। এখনো বোকার মতো তাই-ই করলাম। উনি হঠাৎ আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। আমি নিশ্চিত উনি আমাকে মারধোর করতেই আসছেন। আমি দৌঁড়ে গিয়ে ভাঙ্গা ফুলদানিটা তুলে উঁচিয়ে ধরলাম। 'খবরদার! আমার কাছে এসেছেন তো! '
ওয়াহাব স্থির হয়ে গেলেন। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ওখানেই। আমি আবার বললাম, 'আপনি এ ঘর থেকে বের হন! জলদি!'
উনি এক পাও নড়লেন না। ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে উনি বুঝতেই পারছেন না আমি কী করছি! আমার হাসি পেল। একটা মোক্ষম সুযোগ পেয়েছি প্রতিশোধ নেবার। এটাকে তো হাতছাড়া করা যায় না!
'আপনি না বের হলে আমি কিন্তু সত্যি সত্যি আপনার মাথা ফাটিয়ে ফেলব! '
ওয়াহাব ঘোরগ্রস্তের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলাম। এরপর ফুলদানিটা ফেলে এগিয়ে গেলাম দরজা লাগাতে। তখনই ওয়াহাব দরজার বাইরে থেকে উঁকি মারলেন।
'আমি তোমাকে মারতে আসছিলাম না হৃদি!'
'তাহলে কেন আসছিলেন? '
উনি আচমকা ভেজা বেড়াল বনে গেল। 'তোমাকে জড়িয়ে ধরতে! তুমি কাঁদছিলে তাই..!'
আমি বললাম, 'আপনার লজ্জা করে না? মেরে, অপমান করে আবার দরদ দেখাতে আসেন!'
'দুপুরের ওই ঘটনার জন্য তোমারও কিন্তু দোষ ছিল হৃদি!'
ওনার বকবকানি আমার আর সহ্য হলো না। আমি ঠাস করে ওনার মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিলাম।
উনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'কেউ দেখে ফেললে তাকে আমি কী বলব হৃদি?'
আমি বললাম, 'বলবেন বিয়ের দিনই আমি বউয়ের গায়ে হাত তুলেছি তাই সে আমাকে বাসর ঘর থেকে বের করে দিয়েছে!'
বাইরে থেকে আর কোন কথা ফেরত এলো না। উনি বোধহয় চলে গেছেন! এবার আমি শান্তিতে ঘুমোবো। হঠাৎই ফ্লোরটা নজরে এলো। ফুলদানি, ঘড়ি দুটোই ভেঙে চৌচির। এমন ভাঙাচোরার শব্দে বাড়ির কেউ এলো না কেন খবর নিতে! বাড়ি ভর্তি মেহমান। সবাই এখনো ঘুমোয়নি। তাদের মধ্যে বাচ্চাকাচ্চাও অনেকগুলো। ওদের চেঁচামেচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে এ ঘর থেকেও। তারা হয়তো ভাবছেন বাচ্চারাই জিনিসপত্র ছোড়াছুড়ি করছে!
যাই হোক, আমি ভাবছি কেউ আবার ওয়াহাবকে বাইরে দেখে ফেললো না তো! তখন যদি ওয়াহাব সম্পূর্ণ আমার দোষ দিয়ে দেয়! দিলে দেবে তাতে আমার কীইবা হবে। আমি কালই চলে যাবো এ বাড়ি ছেড়ে। এখানে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব আর একদিন থাকলেও।
নিজের ওপর প্রচন্ড রাগ হতে লাগল আমার। কেন যে মায়ের ওপর রাগ করে ওনার সঙ্গে চলে এলাম! অপমানিত তো হলামই সেই সঙ্গে বদনাম ফ্রি!
ফ্লোরের আবর্জনা পরিষ্কার করে ঘরের কোনে রাখা ঝুড়িতে ফেলে এলাম। নয়তো কাল সকালে যদি আমার শ্বাশুড়ি মা দেখে জিজ্ঞেস করেন, ঘরের এ অবস্থা কেন? তখন আমি আবার কী উত্তর দেবো!
★
সকালে ঘুম ভাঙ্গলো আমার ননদের ডাকাডাকিতে। উঠে দরজা খুলে দিলাম। শ্রেয়া আমাকে দেখে বলল, 'গুড মর্নিং, ভাবি!'
'গুড মর্নিং! ঘরে এসো।'
শ্রেয়া বলল, 'না না ভাবি, আমি বাইরেই ঠিক আছি!'
আমি ওর হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে এলাম, 'কে বলেছে তুমি বাইরেই ঠিক আছো!'
শ্রেয়া ভেতরে ঢুকেই বলল, 'ভাইয়া কোথায় ভাবি?'
আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ওয়াহাবের কথা! কাল রাতের পর তো আর উনি এ ঘরে আসেননি। উনি এখন কোথায় কে জানে!
শ্রেয়াকে বললাম, 'এইতো কিছুক্ষণ আগে কোথায় যেন বেরোলো।'
'ও আচ্ছা। ভাবি চলো, মা তোমাকে খেতে ডাকছে।'
আমি হাত-মুখ ধুয়ে শ্রেয়ার সঙ্গে খেতে গেলাম। গিয়ে দেখি ওয়াহাব টেবিলে বসা। আমার চোখে চোখ পড়তেই চোখ ফিরিয়ে নিল। ওয়াহাবকে দেখে শ্রেয়া বলল, 'এত সকালে কোথায় গেছিলে ভাইয়া? ভাবি বলল তুমি নাকি কোথায় বেরিয়েছো!'
ওয়াহাব আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে শ্রেয়াকে বললেন, 'হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। ওই যে "মর্নিং ওয়াক"!
'ওহ।'
খাবার টেবিলে আর তেমন কথা বার্তা হলো না। খাওয়া শেষ হলে টেবিল গোছাতে আমার শ্বাশুড়ি মা'কে সাহায্য করতে গেলে তিনি আমাকে নিষেধ করলেন। 'নতুন বউ! কোনো কাজ করার দরকার নেই। তুই এখন ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নে।'
আমি জোর করে কাজ করতে গেলে আমাকে ধমক দিলেন। ধমক খেয়ে আমি ঘরে চলে এলাম। ঘরে ঢুকতেই কোত্থেকে প্রত্ন দৌড়ে এসে একটা কাগজ ছুড়ে মারল। কাগজটা ওঠানোর সময় দেখলাম ওয়াহাব বড় বড় কদম ফেলে এ ঘরেই আসছে। আমি দ্রুত কাগজটা উঠিয়ে আমার শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে ফেললাম। ওয়াহাব ঘরে ঢুকে ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে কী যেন খুঁজতে লাগলেন। তারপর না পেয়ে চলে যেতে লাগলেন। যেতে যেতে অকস্মাৎই পেছন ফিরে তাকিয়ে আমার ওপর অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। আমার বুঝতে বাকি রইল না কেন! আমি ওনার ওপর থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
উনি চলে যাওয়ার পর দরজা আটকিয়ে কাগজটা খুললাম। সেখানে লেখা,
''হৃদি, শ্রাবণ ভাই আমাদের ব্যাপারে সব জেনে গেছে। গতকালকে এজন্যেই তোকে চড় মেরেছিল। আমাকে জানোয়ার বলেছিস বলে নয়। শ্রাবণ ভাইয়ের এংগার ইস্যু আছে। আর তাই তার সদ্য বিয়ে করা বউ তারই চাচাতো ভাইয়ের প্রেমিকা সেটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। আমাদের দুজনের ওপরই অনেক রেগে ছিল। আর সেই রাগটা তোর ওপর ঝেড়েছে। তুই নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস শ্রাবণ ভাই কেমন প্রকৃতির? এমন লোকের সঙ্গে তুই কখনোই ভালো থাকতে পারবি না।
আমাকে ক্ষমা করে দে হৃদি! আমি জানি তুই আমাকে ভুলতে পারিস নি! তুই আমাকে এখনো ভালোবাসিস! তুই চাইলে আমি তোর পায়ে ধরেও ক্ষমা চাইতে রাজি! তবুও প্লিজ চল আমরা দুজন অনেক দূরে কোথাও চলে যাই! আমরা অনেক ভালো থাকবো দেখিস! আর কেউ কখনো আমাদের আলাদা করতে পারবে না।
আমি তোর অপেক্ষায় থাকবো!"
চলবে...
লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা#জনৈক_প্রেমিক
পর্ব- ০৪
ওয়াহাবকে কী ওরা শ্রাবণ বলে ডাকে? হবে হয়তো ডাকনাম! সেটা মোটেও এখন আমার কাছে মুখ্য বিষয় নয়। আমি দুঃশ্চিন্তা করছি প্রত্নকে নিয়ে। সেদিন নিষেধ করার পরও ও এমন কেন করছে? আমি ওর ভাইকে মানি আর না-ই মানি। ও কোন আক্কেলে নিজের চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পালানোর প্ল্যান করছে!
নাহ জলদি ওর সাথে আমার কথা বলা দরকার। কিন্তু এখন ওকে আমি কোথায় খুঁজব!
.
আজ বৌভাত। বিধায় পার্লার থেকে লোক এসেছে আমাকে সাজাতে। প্রথমে আমি চাইনি সাজতে। আমার শ্বাশুড়ি মা এসে জোর করলেন। ' এই ক'টা দিনই তো একটু সাজগোজ করবি ! '
আমি আর নিষেধ করিনি। আজকের দিনটাই তো। এরপর তো আমি চলেই যাব! একটা ভুলকে প্রশ্রয় দিয়ে সারাজীবন থেকে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি নিজে যা ভুল করার করেছি। ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ভুলের পরিমাণটাকে আর বাড়াতে চাই না। এখান থেকে বিদায় হয়ে আমি ক্যারিয়ার গড়ায় মনোযোগ দেবো। বর্তমানে আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। পড়াটা শেষ করি প্রথমে। এরপরে ক্যারিয়ারের দিকে এগোবো।
সেই কখন থেকে বসে বসে এটা সেটা ভাবছি। সাজানো শেষ হচ্ছেই না। এখন ভদ্রমহিলা আমার চোখে আইশ্যাডো পরাচ্ছেন। আমি বারবার করে বলেছি, হালকা সাজাতে। কি জানি কেমন সাজাচ্ছে! আমি চোখ বন্ধ রেখেই জিজ্ঞেস করলাম, 'আর কতক্ষণ লাগবে আপু?'
'এইতো হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট! '
এই নিয়ে তিনবার জিজ্ঞেস করলাম। তিনবারই তিনি 'পাঁচ মিনিট' জবাব দিলেন। আমি তপ্ত নিশ্বাস ফেলে ভাবতে লাগলাম, প্রত্নর সঙ্গে অতি দ্রুত দেখা করা দরকার। অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর জানতে হবে ওর কাছ থেকে। ওকে সাবধানও করতে হবে, ও যেন আর কখনো আমার সঙ্গে কোনোভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করে!
অবশেষে সাজানো শেষ হলো। আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছিলাম। শ্রেয়া ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, 'ওয়াও ভাবি তোমাকে নীল জামদানিতে কি মানিয়েছে!'
আমি মুচকি হাসলাম। শ্রেয়া আবার বলল, 'ভাবি ঘোমটা দাও!'
'কেন?'
' অবিবাহিত, অবিবাহিত লাগছে।'
আমি শব্দ করে হাসলাম। 'ঘোমটা দিলে বিবাহিত, বিবাহিত লাগবে?'
শ্রেয়া মাথা নাড়াল। 'দাও না, ভাবি!'
আমি ঘোমটা টেনে নিয়ে বললাম, 'হয়েছে?'
শ্রেয়া গাল ভরে হাসলো। 'হ্যা! এবার বউ বউ লাগছে!'
.
এখন বাড়িতে যেসব মেহমান আছেন সবাই শ্রেয়াদের নিকটাত্মীয়। দূরের আত্নীয়-স্বজনেরা একজন দুজন করে আসতে শুরু করেছেন। ছাদে খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানেই বর-বউয়ের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর কিছুক্ষণ বাদেই আমাকে ওখানে নিয়ে যাওয়া হবে বোধহয়। সময় তো বেশি নেই।
চিঠি দিয়ে প্রত্ন কোথায় হাওয়া হলো কে জানে! দরকারের সময় ও সবসময় উধাও হয়ে যায়।
বলতে না বলতেই শ্রেয়া এসে গেল। 'ভাবি, মা তোমাকে ডাকছে!'
শ্রেয়াকে অনুসরণ করে ডাইনিংরুমে যেতেই দেখলাম মা টেবিলে খাবার সামনে নিয়ে বসে আছেন। আমাকে দেখে মা হেসে বললেন, 'বাহ কি সুন্দর লাগছে আমার মেয়েকে!'
অকস্মাৎ আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা আমার শ্বাশুড়ি মা কি জানেন বিয়ের দিনই তার ছেলে আমাকে সবার সামনে চড় মেরেছে?
মা আবার বললেন, 'আয় আয় জলদি বোস তোদের খাইয়ে আমি আবার ওদিকটায় যাবো। অনেক কাজ বাকি এখনো!'
আমি, শ্রেয়া দুজনে দুটো চেয়ার টেনে নিয়ে বসলাম। মা আমাকে খাইয়ে দিতে নিলেন। আমি বললাম, ' আপনার কষ্ট করে খাইয়ে দিতে হবে না মা। আমি নিজে খেয়ে নেব!'
মা ভ্রু কুঁচকালেন। 'কষ্ট কীসের? এই ভারী গয়না-গাটি নিয়ে তুই নিজে খাবি কীভাবে?'
তাও তো ঠিক। তাই আর কথা বাড়ালাম না।
মা আমাকে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন, 'শ্রেয়া, তোর ভাবীকে একা ছাড়িস না। সাথে সাথে থাকিস। বাড়ি ভর্তি লোকজন। নতুন জায়গা কাউকে চেনে না মেয়েটা। '
শ্রেয়া বলল, 'আচ্ছা, মা।'
মা আবার বললেন, ' শ্রাবণ কোথায় রে? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি না!'
শ্রেয়া উত্তর দিল, 'জানিনা, মা! ভাইয়াকে তো লাস্ট ব্রেকফাস্টের সময় দেখেছিলাম। '
মা'র কপালে চিন্তার ভাজ পরল।
খাওয়া শেষ হলে মা আমাকে বললেন, 'কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শ্রেয়ার সঙ্গে ছাদে যাস, কেমন?'
আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালাম।
শ্রেয়া বলল, 'ভাবি তুমি তোমার ঘরে গিয়ে বসো। আমি এখনি আসছি!'
'কোথায় যাচ্ছো?'
শ্রেয়া জবাব দিল, 'ভাইয়া কোথায় দেখতে। ভাইয়াকেও তো তোমার সাথে বসতে হবে!'
'ওহ। আচ্ছা শ্রেয়া একটা কথা জানার ছিল!'
'কী ভাবি?'
আমি বললাম, 'তোমার ভাইয়ার নাম কি শ্রাবণ? '
শ্রেয়া উচ্চস্বরে হাসতে লাগল। যেন এর চেয়ে মজার কিছু ও কখনো শোনেনি। আমি বললাম, 'হাসছো কেন?'
শ্রেয়া বলল, ' ভাবি তুমি তোমার হাসবেন্ডেরই নাম জানো না!'
আমি বললাম, 'বলো না!'
শ্রেয়া হাসি থামিয়ে বলল, 'হ্যা।'
'তাহলে যে আমাদের বলা হয়েছিল ওনার নাম ওয়াহাব আহমেদ! '
শ্রেয়া আবার হাসল, 'ওটা তো ভালো নাম। ওসব নাম সার্টিফিকেটে থাকে। আর শ্রাবণ ডাক নাম। আচ্ছা ভাবি জানো আমার ভালো নাম কী?'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী?'
'ওয়াসিয়া আহমেদ!'
'বাহ! সুন্দর নাম।'
শ্রেয়া হেসে বলল, 'ভাবি তোমার ভালো নাম কী?'
আমি বললাম, 'আমার কোনো ভালো নাম নেই। আমার একটাই নাম সবখানে। হৃদি শেখ!'
'এটাই ভালো!' বলে শ্রেয়া আবার উচ্চস্বরে হাসতে আরম্ভ করল। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, 'নয়তো দেখা যেতো ভাইয়াও তার বউয়ের নাম জানে না!'
.
এখানে এসে বসেছি আধ ঘন্টা হলো। ছাদে বেশ বড়ো করেই আয়োজন করা হয়েছে। একপাশে খাওয়ার ব্যবস্থা। আরেকপাশে বর-বউয়ের বসার। আত্নীয় স্বজনরা যারা এসেছেন তারা বউ দেখার পর নিজেদের মধ্যে মন্তব্য করছেন। আমার ব্যাপারে তারা ঠিক কী মন্তব্য করছেন তা বোঝা যাচ্ছে না। ওয়াহাব ওরফে শ্রাবণ এসে বসেছেন পাঁচ মিনিট হল। এতক্ষণ কোথায় ছিলেন তিনি কে জানে।
হঠাৎ কোত্থেকে শ্রেয়া এসে ফিসফিসিয়ে বলল, 'ভাইয়া, প্রত্ন ভাইয়াকে কারা যেন মেরে হাত পা ভেঙে দিয়েছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি! '
আমার ভয় ভয় করতে লাগল! কারা মারল প্রত্নকে!
এমন একটা সংবাদ শুনেও শ্রাবণের মুখভঙ্গির কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। শুধু ছোট্ট করে বললেন, 'তাই নাকি!'
বলে আচমকা আমার দিকে তাকালেন। ওই দৃষ্টিতে কী ছিল জানিনা, ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল।
শ্রেয়া বলল, 'ভাইয়া, তুমি জানো প্রত্ন ভাইয়াকে কারা মেরেছে?'
শ্রাবণ বললেন, 'আমি কী করে জানবো!'
শ্রেয়া বলল, 'ছোট চাচী অনেক কান্নাকাটি করছে। চাচ্চুও আমাদের ফ্ল্যাটে এসে চেঁচামেচি করছে আর বলছে যে বা যারা তার ছেলেকে মেরেছে তাদের সবাইকে জেলের ভাত খাওয়াবে।'
শ্রাবণ বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকালেন, 'এসব কথা আমাদের ফ্ল্যাটে এসে বলার মানে কী?'
'জানিনা ভাইয়া।'
প্রত্নকে কে বা কারা মেরেছে তা আর কেউ না বুঝলেও আমার বুঝতে বাকি নেই। নিশ্চিত হবার জন্য আমাকে নিচে শ্রাবণের ঘরে যেতে হবে। শ্রেয়া পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। ওকে ডেকে কানে কানে বললাম, 'শ্রেয়া, আমাকে ওয়াশরুমে যেতে হবে!'
'চলো ভাবি, ছাদের ও পাশের ঘরটাতেই একটা টয়লেট আছে।'
'না, নিচে যেতে হবে। আমার শাড়ির কুঁচি খুলে গেছে। ঠিক করতে হবে।'
শ্রেয়া বলল, 'ঠিকাছে, চলো।'
আমাকে উঠতে দেখে শ্রাবণ শ্রেয়াকে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখলাম।
শ্রেয়া মুখে বলল, 'ভাবি ওয়াশরুমে যাবে।'
বাহানা দিয়ে নিচে নেমে এলাম ঠিকই। কিন্তু শ্রেয়ার সামনে কীভাবে খুঁজবো! শুধুমাত্র ওকে রুম থেকে বের করার উদ্দেশ্যেই বললাম, ' তোমার কাছে একটা নাপা এক্সট্রা হবে? মাথা ব্যাথা করছে খুব!'
'মায়ের কাছে আছে বোধহয়। দাঁড়াও আমি গিয়ে দেখছি!'
শ্রেয়া যাওয়ার পর চট করে দরজা লাগিয়ে জিনিসটাকে খুঁজতে লাগলাম। না! কোত্থাও নেই! অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি চিঠিটাকে বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলাম। এ ঘরে তেমন কেউই আসেনি আজ। সারাদিনে আমার শ্বাশুড়ি মাও আসেননি। শ্রেয়া এসেছিল দু'তিন বার। তাও আমাকে ডাকতে। শ্রাবণকে তো আমি একবারই আসতে দেখেছিলাম! পরে কি উনি আর এসেছিলেন! কোনোভাবে কি চিঠিটা ওনার হাতে লেগে গেছে আর উনি প্রত্নকে!
ব্যাপারটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের আগে প্রেম ছিল বলে যে নিজের সদ্য বিয়ে করা বউকে চড় মারতে পারে তার মতো লোকের পক্ষে ওই চিঠিটা পড়ার পর প্রত্নকে মারা একদমই স্বাভাবিক বিষয়। নাহ আর ভাবতে পারছি না! বাবা কেন আসছে না! সেই বারোটার সময় রিহা কল করেছিল, ওরা আসছে। এতক্ষণে তো এসে পরার কথা! যেভাবেই হোক বাবাকে আজ আমি সব জানিয়ে দেবো। জানিনা বাবা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে! বিয়ের দিনই কেন জানাইনি হয়তো সেজন্য বকবেও! বকলে বকুক! আজ না বললে আর কোনোদিনই বলা হবে না আমার! শ্রাবণ নামক বদরাগী, মানসিক রোগীর সঙ্গেই হয়তো সারাজীবন কাটাতে হবে!
চলবে...
লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা
(N, নেক্সট, next, f, following দয়া করে এগুলো লিখবেন না। আমি এতো সময় ব্যয় করে আপনাদের জন্য গল্প লিখি আর আপনারা মাত্র দু'মিনিট ব্যয় করে আমার জন্য দু লাইন মন্তব্য করতে পারবেন না! দ্যাটস নট ফেয়ার!
আপনারা গল্প স্বমন্ধে নিজেদের মনের কথা ব্যক্ত না করলে আমি কীভাবে বুঝব!)
