#খোঁপার_ওই_গোলাপকাঁটা
#৪র্থ_পর্ব
[কপি করা নিষিদ্ধ❌]
সাহেবের রুদ্র কণ্ঠ ঘর কাঁপাচ্ছে। সেই সাথে আমার ছোট্ট মন। সাহেব আমাকে অপছন্দ করেন। বিষয়টা এতোকাল শুধু আন্দাজ করেছিলাম এখন নিশ্চিত হলাম। চোখ জ্বলছে আমার। অকারণেই বুক ভার হয়ে গেলো। মাত্র তের দিনের বরের এমন বিরুপ মনোভাব সহ্য হলো না যেন। আমিও বোধ হয় আর পাঁচটা মেয়ের মতোই। বদরাগী হলেও স্বামীর উপেক্ষা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। সাহেবের ভারী গলা এখনো কানে আসছে। মা তাকে বার বার বোঝাচ্ছেন,
"আস্তে বল, বউ শুনবে।"
সাহেব তীব্র স্বরে বললো,
"দোষটা কার মা? তোমরা আমাকে বিয়ে দিয়ে হাত পা ছড়িয়ে আরামসে দিন কাটাচ্ছো। আর আমার ঘাড়ে আরোও একটা দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছো। একটা বাচ্চা মেয়েকে এখন আমার মানুষ করতে হবে। সব কাজ ফেলে ছুটে বউয়ের সামনে এসে বসে থাকবো আমি? একদিন এই মেয়েকে দেখে রাখতে পারো নি তোমরা? আমি মিষ্টিকে পই পই করে বলে গিয়েছিলাম, ভাবির কাঁধছাড়া হবি না। আমি কি শান্তি মত নিজের কাজও করতে পারবো না?"
"এজন্যই তো বলেছিলাম, বউকে বাপের বাড়ি দিয়ে আয়! মিষ্টি একা হাতে কত সামলাবে। আর বউয়ের নিজের সতর্ক থাকা উচিত ছিলো!"
"আমার বউয়ের যত্ন আমার বাড়িতে হবে না কেন? আমি যখন ছিলাম তখন তো ঠিক হয়েছিলো, এখন হবে না কেনো! আর ওকে বলছো তুমি অসতর্ক! ওর বয়স ছোট তুমি জানতে না? পই পই করে বলেছিলাম, এতো ছোট মেয়ে এনো না! একটা সাতারো পেরিয়ে আঠারোতে পা রাখা মেয়ের থেকে তুমি কি আশা কর? ও কি বুঝে সংসারের কিছু? না ও আমাকে বুঝে?"
"আঠারো বছরে আমার কোলে তুই ছিলি! বউ এতোও ছোট না!"
"সবাই এক হয় না মা। তোমার দেখে শুনে তাহলে নিজের মতো সর্বগুণ সম্পূর্ণ মেয়ে আনা উচিত ছিলো। তুমি একটা ঢেলা নিয়ে এসেছো। এখন যখন এনেই ফেলেছো, ফেলতে তো পারবো না। এখন শিখিয়ে পড়িয়ে নাও। কাঁদা থেকেই কলস হয়। সেটাকে বানাতে হয়!"
মা আর কথা বললেন না। সাহেবের রোষের মুখে উত্তর খুঁজে পেলেন না বুঝি। সাহেব এবার শান্ত হয়ে গেলেন। খুব স্থির স্বরে বললেন,
"আমি ক্লান্ত। আমি দায়িত্বের ভারে পিষে যাচ্ছি। সাহায্য না করতে পারো, দায় বাড়িও না। একটু কৃপা কর! তোমারই ছেলে।"
সাহেবের বলা একটি কথাও ভুল নয়। আমি অকর্মণ্য। তার সাথে হয়তো আমি সত্যি যাই না। সাহেবের বয়স তখন বত্রিশ। আমার থেকে চৌদ্দ বছর বড়। চৌদ্দ বছর খাতাকলমে যতটা বেশি মনে হয়, বাস্তবে তার থেকেও বেশি। তার চিন্তাধারা কখনোই আমার চিন্তাধারার সাথে মিলে নি। সমস্যার সময় তিনি যতটা ধীর-স্থির, আমি ততটাই অস্থির। আমার ছোট মস্তিষ্ক কখনই তার গভীর চিন্তাধারাগুলো বুঝে উঠতে পারে নি। আমাদের মধ্যে আজীবন এই চৌদ্দ বছরের বিশাল তফাৎটা থেকেই গেছে। এই কথাগুলো এখন শুনলে আমার ততটা খারাপ লাগতো না যতটা তখন লেগেছিলো। সেই সময়ে আমার হৃদয় কাঁচের মতো ভেঙ্গে গিয়েছিলো। ইচ্ছে করছিলো এই পোড়া পা নিয়েই লাফাতে লাফাতে বাড়ি চলে যাই। থাকবোই না এই লোকের কাছে। যার হৃদয়ে আমি নেই, তার ঘরে থাকার কি মানে? এই প্রথম আমি ফুঁপিয়ে উঠলাম। নিঃশব্দ কান্নার কথা ভুলে গেলাম। সশব্দে হাউমাউ করে কাঁদলাম। হৃদয়ের অসহনীয় যন্ত্রণা আমার মস্তিষ্ক ঝাপসা করে তুললো। সাহেব যখন শান্ত হয়ে ঘরে ফিরলেন আমাকে কাঁদতে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন। হতভম্ব চোখে কিছুসময় তাকিয়ে রইলেন। বোঝার চেষ্টা করলেন। অতঃপর টাইটা খুলে শার্ট খুলতে খুলতে ত্যাড়ছা গলায় বললেন,
"কে বলেছিলো ফড়িং এর মতো তিড়িংবিড়িং করতে? বলেছিলাম শান্ত হয়ে থাকতে। আমার কথা শোনার তো প্রয়োজন নেই। আমি কে! নিজে তো শেখ হাসিনা। সব পারে, সব বুঝে। এখন কান্না হচ্ছে কেনো শুনি!"
তার কথায় আমার হৃদয়ের জ্বালা আরোও বাড়লো। মনে হলো আমার হৃদয়ের জ্বলন্ত আগুণে এক মগ ঘি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। চোখ জ্বালা করতে লাগলো। কাঁদতে কাঁদতে নাক আমার বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও ধপ করে শান্ত আমি জ্বলে উঠলাম। যে আমি সাহেবের রাগী চোখের দিতে তাকাতেও ভয় পেতাম, হাত পা অসাড় হয়ে আসতো; সেই আমি বিদ্রোহ করে বলে উঠলাম,
"আমি ব্যথায় কাঁদছি না। সবসময় শরীরের ব্যথায় মানুষ কাঁদে না। কিছু ব্যথা মনে হয়। আপনার মতো কৃপাধারী হুতুমের সাথে যার বিয়ে হয়েছে তাকে মনে ব্যথাতেই কাঁদতে হবে।"
আমার কথা শুনে সাহেবের হাত থেমে গেলো। সরু, শীতল চোখে তাকালেন তিনি আমার দিকে। তার চোখের দৃষ্টিতে আমার এতো সময়ে চুপসে বাতাসা হয়ে যাবার কথা। অথচ আমি তার চোখে চোখ রেখে বসে রইলাম। এতোটা সাহস কই থেকে পেলাম কে জানে? তিনি শার্টটা মাটিতে আঁছাড় দিয়ে হিমশীতল স্বরে বললেন,
"আমার সাথে বিয়ে হয়ে বুঝি কাঁদতে হচ্ছে! তা আমি কি কোনো দায়িত্ব পালনে ফাঁকিবাজি করেছি? নাকি অবহেলা করেছি? অফিস কামাই নিয়ে বাচ্চা পালছি; কই আমি তো অভিযোগ করি নি!"
"তা কে মাথার দিব্যি দিয়েছে! আমি বলেছি আমাকে পালুন? আমাকে মার বাড়ি পাঠালেই হত। নিজেও বাঁচতেন আমিও বাঁচতাম।"
এবার সাহেব ধমকে উঠলেন। কি প্রতাপী হুংকার। আমার অন্তরাত্মাও কেঁপে উঠলো সেই এক ধমকে,
"এই! লায় দিয়েছি বলে বিয়ের পর থেকে মাথায় বসে নৃত্য করা হচ্ছে যতসব! কোনো বাপের বাড়ি যাওয়া হবে না। একবার আমার হাত ধরে আসা হয়েছে মানে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সাথেই থাকতে হবে। বাপের বাড়ি যদি যাওয়া হয় তা হবে ঘুরতে। তাও আমার সাথে। নয়তো একেবারে পুটলি বেঁধে পাঠিয়ে দিবো। যতসব, যন্ত্রণা। আর একবার যেন বাপের বাড়ি যাওয়ার কথা না শুনি।"
"আমি যাব। আমার বাড়ি আমি যাব। আপনি একটা খবিস, আপনার সাথে থাকবোই না। শুধু বকেন আপনি। এটা আমার বাড়ি না। আমার বাড়ি আমি যাব।"
বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম আমি। আমার তীব্র বিষাদের জোয়ারে একটুও নড়লেন না সাহেব। তিনি কিছুসময় চেয়ে রইলেন। অতঃপর একটা পাঞ্জাবি গায়ে গলিয়েই বেরিয়ে গেলেন। সেই যে বড় বড় পায়ে হনহন করে বেড়িয়ে গেলেন, আর ফিরলেন রাত দশটার পর। রাতে খেলেনও না। না আমার সাথে কথা বললেন। রাতে ঘুমানোর সময় আমাকে কোলে তুলে বাথরুম করালেন। ঔষধ খুলে পিরিচে করে দিলেন। কিন্তু কথা বললেন না। ঘুমানোর সময় আমার দিকে পিঠ করে শুয়ে পরলেন। আমার এতো কান্না পেলো। তার ভারী, রাগী কণ্ঠ শোনা যেন আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। তার নীরবতা তার ধমকের থেকে তিক্ত লাগলো। অকারণেই আমি ছটফট করতে লাগলাম। তার উন্মুক্ত পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকটা সময়। একটি বার সে কৃপাও চাইলেন না। ইচ্ছে করলো বলতে,
"আপনি বকুন তাও ভালো, কিন্তু এভাবে নিশ্চুপ থাকবেন না। আপনার ধমক আপনার নীরবতা থেকে বেশি মিষ্টি। আপনাকে কৃপা না করতে পারা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, আপনি নিজেও জানেন না।"
****
সাহেবের রাগ পরতে সময় লাগলো। আমার পা সারতে আরোও সপ্তাহখানেক লাগলো। এই সপ্তাহ খানেক সাহেব হাফ ডে করে চলে আসতেন। মিষ্টি আপু অত্যধিক সতর্ক হয়ে গেলেন আমার প্রতি।
সাহেব বাসার সবার সাথে ধমকাধমকি করলেও তিনি আমার উপর ধমকাধমকি করলেন না। আমি এই কয়দিনে আরোও অধৈর্য্য হয়ে উঠলাম। কাঁটার খোঁচা খাওয়া আমার অভ্যাসে পরিনত হয়েছিলো যে। আমি আর না পেরে এক রাতে তার হাত টেনে ধরলাম। আমার হাত টেনে ধরা দেখে সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। হালকা গলায় শুধালেন,
"কি?"
"আপনি আমার উপর রেগে আছেন?"
তিনি উত্তর দিলেন না। শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন। হাতটা ছাড়াতেই যাবেন আমি আরোও শক্ত করে ধরে বসলাম। লজ্জা, শরম সব গিলে বসলাম। আমি তার চোখে চোখ রেখে বললাম,
"সেদিনের জন্য ক্ষমা করে দিন। আমার ভুল হয়েছে। সেদিন ওভাবে বলা উচিত হয় নি।"
মা বিয়ের আগে আমাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলেছেন,
"স্বামীর কাছে ক্ষমা চাইতে কার্পন্য করবি না। মনে রাখবি, সে তোর অভিভাবক।"
তিনি আমার দিকে আগের মতো তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলেন। একটা ফোঁশ করে নিঃশ্বাস ফেলে নিরুৎসাহিত স্বরে বললেন,
"ভুল বুঝলে ভালো। অবশ্য ভুল তো আমার। লায় দিয়ে বাঁদর মাথায় তুললে সে তো লাফাবেই!"
ব্যাস! আবার আগের ফর্ম। ক্ষমা চাইতে দেরি নেই লোকটা তাচ্ছিল্যভরা বুলি গুলির বেগে চলে এলো। সে নাকি আমাকে লায় দেয়। এও বিশ্বাসযোগ্য! তবুও আমি অসহায় মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিনি আমার পাশে বসলেন। তিনি গাম্ভীর্য অটুট রেখে বললেন,
"বিয়ের পর মেয়েদের বাপের বাড়ি যাওয়ার হিরিক আমার অপছন্দ। এই বাড়ি পছন্দ না হলেও এই বাড়িকেই আপন করতে হবে। বাপের বাড়ি যাওয়া হবে কালেভাদ্রে। কিন্তু পা পুড়েছে, জ্বর হয়েছে বলে বাপের বাড়ি যাব! এই কথা আমার সহ্য হয় না। কৃপা করে কথাগুলো মনে রাখলে ভালো হয়!"
তিনি উঠতেই যাবেন, আমি অসহায়ের মত শুধালাম,
"আমার সাথে ভাববাচ্যে কেন কথা বলেন! আমার নাম কানন। আমাকে কানন বলে ডাকলে কি হয় আপনার?"
তিনি প্রশ্নটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। সূক্ষ্ণ চোখে আমার মুখ বরাবর তাকিয়ে রইলেন কিছু সময়। অতঃপর কঠিন গলায় ঘোষণা দিলেন,
"পারবো না। যে না আমার চেহারা নাম রেখেছে পেয়ারা!"
আমি তার দিকে একরাশ হতাশ নিয়ে তাকয়ে রইলাম। তিনি আমার চোখ নিজের হাতে ঢেকে দিয়ে বললেন,
"আমি আমার দিকে এভাবে তাকাতে নিষেধ করেছি না! যন্ত্রণা যতসব!"
*****
পা ঠিক হবার পর থেকে আমার জীবনের গতি বদলে গেলো। প্রতিদিন ফজরের সময় উঠে পড়ি। সাহেব নামায পড়ে এসে চা খান। আমি নিজ হাতে সেই চা বানাই। সাহেবের কড়া আদেশ,
"এবার পা পুড়লে হাসপাতালে রেখে আসবো!"
ফলে সতর্ক হলাম দশগুণ। তিনি অফিস চলে গেলে বাড়িতে আমি আর মা। মিষ্টি আপুর পরীক্ষা শুরু হয়েছে। মাহমুদ তার "আয় আয়" সংঘের সাথে টো টো কোম্পানির কাজটা আবার শুরু করেছে। এর মধ্যে একদিন মিষ্টি আপুর জন্য একটা বড় ঘরের সম্বন্ধ এলো। ছেলে বিসিএস ক্যাডার। মিষ্টি আপুর থেকে বয়সটা একটু বেশি। আমার আর সাহেবের মতো তাদের বয়সের পার্থক্য না হলেও খুব কমও না। একটু ভুড়ি আছে। মাথায় একেবারেই চুল নেই। মিষ্টি আপুর পাশে খুব একটা মানায়ও না। তবুও মা খুব আগ্রহী। সম্বন্ধটা আমার খালা শ্বাশুড়ি এনেছেন। তার ভাষ্যমতে এমন ছেলে চিরুণী তল্লাসিতেও পাওয়া যাবে না। তারা কোনো কিছু চায় না। মিষ্টি আপুকে দেখেই পাগল হয়ে গেছেন। সোনায় মুড়িয়ে নিয়ে যাবে তারা। আরোও কত কি! আমি ছবি দেখে মিষ্টি আপুকে শুধালাম,
"তোমার পছন্দ হয়েছে আপু?"
মিষ্টি আপু মলিনমুখে বললেন,
"আমার কি পছন্দ ভাবী? মা-ভাইয়া যা বলবে!"
আমার মনে হয় মিষ্টি আপু এই সম্বন্ধে খুশি নন। যদিও আমার আন্দাজ পরে খেটেও গিয়েছিলো। তবুও আমি ছোট হিসেবে বড়দের মধ্যে কথা বললাম না। মা যখন সাহেবকে উৎসাহিত স্বরে জানালেন। সাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন,
"তা হবে না। মিষ্টির পড়াশোনা শেষ না হলে আমি বিয়ে দিব না।"
"মিষ্টির এখন বাইশ বছর বয়স!"
"তো? আমি বিয়ে দিব না। ছেলে মিষ্টিকে হীরায় মুড়ালেও দিব না। মার্সিডিসে এলেও দিবো না। পড়াশোনা শেষ হোক। তারপর ভাববো!"
"ততদিন কি আয়বুড়ো থাকবে? বয়স বেশি হলে বিয়ে হবে পরে?"
"না হলে আমার কাছে থাকবে? আমার তো ওর খরচ বইতে সমস্যা নেই। তাহলে? আমার বাড়িতে থাকবে আমার বোন।"
"মুহাইমিন তুই জোর করিস না। বুঝিস না কেন বাবা! মেয়ে মানুষ তো। বয়স বাইন মাছের মত। তোর বিয়ে আমি বত্রিশে দিয়েছি। কিন্তু মিষ্টিকে ওই বয়সে বিয়ে দিতে পারবো না।"
"খুব উদ্ধার করেছো। এনেছো তো একটা গ্যাদা। ওই যে! পানি ঢালতে যেয়ে পা পুড়ায়! আমার শেষ কথা, মিষ্টির বিয়ে হবে না। সবাই আমার মত না যে বিয়ের পরও বউকে লেখাপড়া করাবে!"
কথাটা শুনতেই আমার এবং মার পিলে চমকে উঠলো। আমার চোখ মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মায়ের মুখটা খানেকটা বেজার হলো। তিনি অসন্তোষ গলায় বললেন,
"বউমা আর পড়ে কি হবে?"
"অশিক্ষিত থাকবে নাকি? আমি মাস্টার্স ফার্স্ট ক্লাস আর আমার বউ ইন্টার ফেইল? বাচ্চাকাচ্চা তো ফাইভ পাসও করতে পারবে না। মা পালো, বোন পালো, ভাই পালো, বউ পালো-- এর পর বাচ্চাকাচ্চাকেও আমার পালতে হবে। তা হবে না। আমি আর দায়িত্ব নিচ্ছি না। অন্তত কলেজের গন্ডি পার হোক। ঘিলু না থাকলে হেসেল টানবে। হেসেল তো আছেই, পার্মানেন্ট এড্রেস।"
মা মিনমিনিয়ে বললেন,
"বউ কলেজ গেলে মিষ্টির উপর কত চাপ পড়ে যাবে! ভাবী-ননদ মিলেমিশে কাজ গুলো করতো। আর আমিও তো তাহলে বাসায় একা থাকবো।"
সাহেব খুব দায়সারা ভাবে বললেন,
"রুবি খালা তো আসেই বাসায়। ওই সময়টা না হয় সেই তোমাকে সঙ্গ দিল। আর কলেজে যে প্রতিদিন যেতে হয় না সেটাও তুমি জানো। এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না মা।"
বলেই সাহেব বড়বড় পায়ে ঘরে গেলেন। মা অসন্তুষ্ট মুখে বসে রইলেন। আমি সাহেবের পিছু পিছু ঘরে এলাম। আমাকে এক কোনায় শাড়ির আঁচলে আঙ্গুল পেঁচাতে দেখে সাহেব আড়চোখে চাইলেন। বিছানায় বসে চুল টানতে টানতে বললেন,
"কি?"
"ধন্যবাদ"
খুব মৃদু স্বরে বললাম। সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কঠিন গলায় বললেন,
"টাকা আমার গাছে ধরে না। পড়াশোনা করাচ্ছি, রেজাল্ট যেন খারাপ না হয়। আর পড়াশোনা করছি বলে ফড়িং এর মতো উড়বো এমনটা যেন না হয়। সংসারে বাতাস লাগানো যাবে না। আমি কোনো অভিযোগ চাই না। নিজের ঘর, আজীবন মিষ্টি বা মা সামলাবে না। তাই অনীহা যেন আমি না দেখি। কলেজে আমি দিয়ে আসবো। আসার সময় একটা রিক্সা ঠিক করে দিব, সে দিয়ে যাবে। কলেজের বাহানায় অন্য জায়গায় ঘুরঘুরানির যেন ছুঁক ছুঁক না থাকে। কথাগুলো কানে গেছে পেয়ারা?"
পেয়ারা? তিনি আমাকে পেয়ারা বলে ডাকলেন! আমি হতভম্ব চোখে তার দিকে তাকাতেই তিনি ভ্রু নাঁচিয়ে শুধালেন,
"কি?"
"আমার নাম কানন?"
"কৃপা করে কপালে খোঁদাই করে রাখলে ভালো হয়, তাহলে যদি আত্মস্থ হয়!"
তার টিটকারী কথা শুনে আমার রাগ হলো ঠিক। কিন্তু আমার পড়াশোনা করতে পারার খুশিতে সেই রাগটা হাওয়ায় উড়ে গেলো। আমার সাহেব রাগী বটেই, তার জবান হারপিকের মতো তিক্ত। কিন্তু সে মানুষটা একেবারে খারাপ না। সে গোলাপের মতো, সুগন্ধও ছড়াবে, আবার বেদনাও দিবে।
****
বইখাতা সব বাবার বাসায়। বিয়ের পর আনা হয় নি। নতুন করে কেনার মানে হয় না। বাবাকে বললে সে এসে সব দিয়ে যাবে। কিন্তু আমি বাবাকে বললাম না। ফন্দি আঁটলাম বাবার বাড়ি যাবো। শুক্রবার সাহেবের ছুটি। শুক্রবার যদি যাই তবে সাহেবও যেতে পারবেন। তিনি যে আমাকে একা একা যেতে দিবেন না, তা আমার জানা কথা। মানুষ দেখলে বলবে, স্বামী বুঝি আমাকে চোখে হারায় তাই কাঁধছাড়া করেন না। কিন্তু তা ডাহা মিথ্যে। কৃপাধারী হুতুম আমার উপর ছুড়ি ঘোরানোর সুযোগ হারাতে চান না বলেই এতো কড়াকড়ি। তাই তাকে নিয়েই আমার বাপের বাড়ি যেতে হবে। আমি আগের রাতে তার সামনে দাঁড়য়ে আছি। তিনি বিছানা গুছাচ্ছেন। আমাকে শাড়ির আঁচলে আঙ্গুল পেঁচাতে দেখে তিনি সরু চোখে তাকালেন। ভ্রু নাঁচিয়ে শুধালেন,
"কি চাই?"
"কালকে আপনার ছুটি, একটু বাবার বাসায় নিয়ে যাবেন?"
কপালে ভাঁজ পড়লো সাথে সাথে। কিছু বলতে যাবেন, আমি সাথে সাথেই বলে উঠলাম,
"আমার বই-খাতা সব ওখানে। নতুন করে কিনে টাকা কেন খরচ করবেন৷ এর থেকে বরং বাবার বাসা থেকে নিয়ে আসি। আপনার সাথে যাব। আবার আপনার সাথেই চলে আসবো। একদম জিদ করবো না থাকার। চলুন না!"
তিনি কিছুসময় শান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমাকে ঠিক কি বলে ঝাড়ি দিবেন বুঝে উঠতে পারলেন না বোধ হয়। এরপর মুখ কুঁচকে বললেন,
"ধান্দাবাজ!"
***
অবশেষে বিয়ের একমাস পর আমি বাপের বাড়ি গেলাম। মা আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন। অশ্রু পড়ছে তার চোখ থেকে। বাবা সেভাবে তার আনন্দ ব্যক্ত করতে পারলেন না ঠিক-ই কিন্তু তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন আমাদের আপ্যায়নে। মা আমার পছন্দের রান্না করলেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো বিকালে ফেরত আসা। কিন্তু মা-বাবার জোরাজোরিতে আমাদের সেদিন থেকে যেতেই হলো। সাহেব মা-বাবাকে ঝাড়ি দিতে পারলেন না। আমার মা তার সামনে আমাকে নলা দিয়ে খাইয়ে দিলো। কতদি পর মায়ের হাতে খেলাম। এতোদিন খেলেও আমার মনে হলো অবশেষে আমার ক্ষুদা তৃপ্ত হয়েছে।
খাওয়া দাওয়া শেষে সাহেব গেলেন আমার ঘরে। ছোট সাজানো মেয়েলি ঘর। খাটটাও ছোট। তিনি দেওয়ালে আমার আঁকা ছবিগুলো দেখছিলেন। মা একটু পর পর আমাকে পাঠাচ্ছিলেন, যেন জিজ্ঞেস করি কি লাগবে। প্রথম বার তিনি কঠিন স্বরে বললেন,
"কিছু না।"
দ্বিতীয়বার চা চাইলেন, তৃতীয়বার কাপড়। শার্ট প্যান্ট পড়ে তার অসহ্য লাগছিলো। তাই বাবার লুঙ্গি দিলাম তাকে। তিনি লুঙ্গি পড়েন না। ফলে বড্ড বিরক্ত হলেন। রাগী স্বরে বললেন,
"চাল কি আমি বুঝি না। থাকার ইচ্ছেই যখন ছিলো আমাকে বললেন হত"
রাতে মা এলাহি কান্ড করলেন। সাহেব অবশ্য বাজার করে এনেছিলেন। বাবা খুব লজ্জিত স্বরে বললেন,
"এতো বাজারের কি দরকার ছিলো!"
তিনি নিরুত্তাপ স্বরে বললেন,
"এটা তো আমার কর্তব্য!"
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে আমি ঢুকলাম মায়ের ঘরে। অনেকক্ষণ মায়ের কোলে মাথা রেখে ছিলাম। মা আমার মাথায় বিলি কেটে দিলেন। চুলে তেল দিয়ে দিলেন। মাথায় বেনি করে দিলেন। সাহেব ছিলেন আমার ঘরে। আমাকে না দেখে তিনি হাক দিলেন,
"পেয়ারা! পেয়ারা!"
মা কথাটা বুঝলেন না। তিনি ভাবলেন তার জামাই মনে হয় পেয়ারা খেতে চায়। তিনি ইতস্ততভাবে বললেন,
"এই রাতে পেয়ারা পাই কই?"
আমার লজ্জায় মিশে যেতে ইচ্ছে হল। এই বুড়া লোক আমার মানসম্মান রাখবে না। মা পাশের বাড়ি থেকে পেয়ারা পাড়িয়ে কেটে মেখে আমাকে দিয়ে পাঠালেন। আমি তার সামনে পেয়ারা মাখা নিয়ে যেয়ে বললাম,
"নিন খান!"
তিনি কপাল কুঁচকে শুধালেন,
"এটা কি?"
"পেয়ারা! একটু আগে চেচাচ্ছিলেন। মা পাঠিয়েছে!"
তিনি কঠিন চোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি খুব একটা পাত্তা দিলাম না। এটা আমার বাড়ি, উনাকে পাত্তা দিব কেন? তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"আমি ঘুমাবো!"
"ঘুমান।"
"কৃপা করে ঘরে আসলে তো ভালো হয়!"
"আমাকে লাগবে কেন! আমি কি এখন আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে দিব?"
বাপের বাড়ির জোরেই যেন আমার মুখে খই ফুটলো। তিনি কঠিন চোখে কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি তার দৃষ্টিতে হতাশ হয়ে বললাম,
"দাঁড়ান, মাকে বলে আসি।"
তিনি বাধ্য হয়ে বাবার লুঙ্গি পরলেন। বাবার পাঞ্জাবি তার গায়ে লাগলো না বলে সেটা পরতে পারলেন না৷ উদোম গায়ে শুয়ে পড়লেন। আমি লাইট বন্ধ করে তার পাশে শুইলাম। খাট ছোট বলে আমাদের মধ্যকার দূরত্ব ছিলো না বললেই চলে। আমার গায়ে তার উদোম শরীর স্পর্শ লাগছে। জানালা দিয়ে চাঁদের মিহি আলো ঘরে আসছে। সেই সাথে শীতল বাতাস উড়ছে পর্দা। বৃষ্টি হবে বলে মেঘের গর্জন একটু পর পর শুনতে পারছি। ঝড় হবে হয়তো। সাহেব এপাশ ওপাশ করতে করতে আমার দিকে মুখ ফিরে চাইলেন। তার ঘুম আসছে না। খাট ছোট হবার জন্য আমারও ঘুম আসছে না। একটু ঠিক করে শুতে গেলেই সাহেবের শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছিলাম। সাহেব আমার দিকে চেয়ে আছেন। কাঁটা কাঁটা চোখে নয়! বরং বড্ড গভীর চাহনীতে। এমন সময় আকাশ কাঁপিয়ে বিকট বজ্রপাত হলো। আমি কেঁপে উঠলাম না চাইতেই। একটু নড়তেই টাল না সামলে খাট থেকে পড়ে যাবার মত অবস্থা হলো। সাহেব এক হাতে আমাকে টেনে বুকে মধ্যে নিলেন। এক হাত ঘাড়ের পেছনের ডুবিয়ে নাকে একটা কামড় বসালেন। আমার বুক ধকধক করছে। তিনি খুব ধীর কণ্ঠে শুধালেন,
"এখন তো পায়ে ব্যান্ডেজ নেই, একটু কৃপা করা যায়?"
চলবে
মুশফিকা রহমান মৈথি
[লাইখ কমছে কেন! হ্যা? পটকু মটকু পর্ব দিচ্ছি🫥, কৃপা করতে ইচ্ছে হয় না? আজকে ভুল থাকতে পারে। অফিসে বসে লেখা, কোনো রচেক দেই নি। তাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন]
