#ভাইরাল_গার্ল
#লুৎফুন্নাহার_আজমীন
#পার্ট৩
পৃথা আর প্রণয়ের ঘর পাশাপাশি। পৃথার ঘর থেকে কাঠের টুল পড়ে যাওয়ার আওয়াজ শুনে প্রণয় দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়। পৃথার ঘরে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখে দরজা বন্ধ।দুই তিনবার দরজা ধাক্কা দেয় প্রণয়।সাথে পৃথাকেও ডাকে।সাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে দরজা ভাঙে প্রণয়।দরজা ভেঙে পৃথাকে ঝুলন্ত অবস্থায় ছটফট করতে দেখে প্রণয়।দৌড়ে গিয়ে পৃথার পা জড়িয়ে উঁচু করে ধরে সে যাতে পৃথার গলায় ফাঁস কিছুটা কম হলেও লাগে।মিসেস রুবিকে ডাক দেন।তিনি এসে পৃথার পায়ের নিচে কাঠের টুলটা দেন।পৃথাকে নামিয়ে কষিয়ে চড় মারেন মিসেস রুবি।
-পাগল হয়ে গেছিস?কি করতে যাচ্ছেলি তুই?
-আমার জন্য তোমাদের মুখ লুকিয়ে চলতে হচ্ছে।আমি যদি না থাকি তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
পৃথার কথা শুনে পাশ থেকে প্রণয় বলে,,
-সারাজীবন মাথা মোটাই থেকে গেলি।কি ভেবেছিস?তুই মরে গেলে সমাজ মুখে আঙুল দিয়ে থাকবে?নাহ উল্টা আরও খোঁচা মেরে বলবে দেখ মেয়েটা ছবি ভাইরাল হয়েছিলো তাই মেয়েটা গলায় ফাঁস দিয়ে মরেছে।ইহকাল তো গেছেই সাথে পরকালও গেলো।জাহান্নামী। কথাটা তেঁতো হলেও সত্য বোন।
পৃথা মিসেস রুবি প্রণয় কারও কথার জবাব দেয় না।সে অঝোর ধারায় কেঁদেই চলেছে।মিসেস রুবি মেয়ের পাশে বসেন।মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেন,,
-এই পাগলি মেয়ে তুই জানিস না আত্মহত্যা মহাপাপ?যারা আত্মহত্যা করে তারা জাহান্নামী।তো কেন জেনে বুঝে ভুল করতে গেছিলি?
-কিন্তু আম্মু....
পৃথা থেমে যায়।কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে পৃথার।মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না।ফাঁস লাগার কারণে গলাটাও ব্যথা করছে।মিসেস রুবি পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলেন,,,
-মারে!আত্মহত্যা করে হেরে যাওয়ার নাম জীবন না।লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই জীবন।লড়াই করে সবাইকে দেখিয়ে দিবি বিশেষ করে নিলয়কে যে তুই নিলয়ের সেই খারাপ কাজের কাছে হেরে যাস নি।আর জানিসই তো বাঙালি কেমন!এক্টা ঘটনা নিয়ে কয়েদিন মাতামাতি করবে।তারপর ভুলে যাবে।আর ভুলে যদি না ই যেন তাহলে তনু,নুসরাত সাগর-রুনি,আবরার হত্যা,সহ আরও কত মামলা আছে সেগুলোর বিচার হতো।কয়েকদিন আগেই তো দেখলি ধর্ষণের বিরুদ্ধে সারাদেশ কেমন বিক্ষোভে ফেটে উঠেছিলো!কিন্তু আজ?না কমেছে ধর্ষণের হার।আর না কমেছে নারীর প্রতি বর্বরতার হার।তাই যা হয়েছে ভুলে যা।স্বাভাবিক জীবনে আসার চেষ্টা কর।
মিসেস রুবির কথা শুনে এক পলকে কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে পৃথা।কি সুন্দর না কথাগুলো?কলিজা ঠান্ডা করে দেয়।কাঁধে প্রণয়ের হাতের স্পর্শে ধ্যান ভাঙে পৃথার।কাঁধে হাত দিয়ে সে পৃথাকে সাহস দিয়ে বলছে,,,,
-তুই শুধু নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা কর।এমন একটা জায়গায় নিয়ে যা যাতে তুই মানুষের কাছে অন্যভাবে ভাইরাল হোস।
মা ভাইয়ের কথায় যেন পৃথা ভরসা পায়।বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা যেন আবার নতুন করে জেগে ওঠে।
★
-আরেহ পৃথা আপু যে!কেমন আছেন আপু?
দীর্ঘ দেড় মাস পর ভার্সিটিতে যাচ্ছিলো পৃথা।যাওয়ার পথে এলাকার চায়ের দোকানে বখাটেদের ডাকে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় পৃথা।সমাজ তো বলবেই!তাই বলে পৃথার থেমে গেলে হবে?আবার নিজের গন্তব্যের দিকে হাঁটা লাগায় পৃথা।কিন্তু একটা বখাটে এসে পৃথার পথ আটকায়।পৃথা কোনো কথা না বলে চুপ চাপ ছেলেটাকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে ছেলেটা পৃথার ওড়না টেনে ধরে।
-কই যাও সোনা?বয়ফ্রেন্ড তো মাগনা খাই ছেড়ে দিছে। আমরা না হয় টাকা দিবো নি।কি বলিস তোরা!
কথাটা বলে অট্টহাসি দিয়ে হেসে উঠে ছেলেটা।ছেলেটার সাথে সাথে বাকি ছেলে গুলোও হেসে দেয়।আশেপাশে বেশ মানুষ জন আছে। তারা কিন্তু চাইলেই পৃথাকে সাহায্য করতে পারে।কিন্তু না তারা দর্শক।চুপচাপ নাটক দেখবে আর নিজেদের মধ্যে পৃথাকে নিয়ে খারাপ কথা বলা বলি করবে।এই মুহুর্তে পৃথার নিজেকে পৃথিবীর সবচে অসহায় মানুষ হচ্ছে।একটা মেয়ে যে কতটা অসহায় তা সেই বোঝে।ছেলেটা পৃথার ওড়না টান দিয়ে ফেলে দিতে নেয় ঠিক তখনই পৃথা ডান হাতে সর্বশক্তি দিয়ে ছেলেটার হাতে আঘাত করে।ব্যথা পেয়ে ছেলেটা পৃথার ওড়না ছেড়ে দেয়।বখাটে দলের একটা ছেলে পৃথার এমন আচরন দেখে বলে উঠে,,
-আপু তো দেখতেছি শুধু দেখতেই হট না!ব্যবহারের দিক থেকেও তো সেই হট আর সেক্সি।মামা আজকে খেলা হবে!ধর পাখিটারে।
কথাটা বলে ছেলেটা পৃথার দিকে এগিয়ে আসতে লাগে।ছেলেটার পেছন পেছন বাকি ছেলেগুলোও পৃথার দিকে হিংস্র হায়নার মতো এগিয়ে আসতে লাগে।উপায় না পেয়ে পৃথা বাসার দিকে দৌড় লাগায়।হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বাসায় ঢোকে পৃথা।তা দেখে মিসেস রুবি,,
-কিরে! তুই না ভার্সিটিতে যাচ্ছিলি।
-যাচ্ছিলাম ই তো!কিন্তু এলাকার বখাটে ছেলে গুলো....
পৃথা শুরু থেকে মা কে সব খুলে বলে।শেষে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না।হাউ মাউ করে কেঁদে মা কে জড়িয়ে ধরে পৃথা।মিসেস রুবি কি করবেন বুঝতে পারেন না।মেয়েকে স্বান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই তার।মেয়ে যে কি পরিমাণ মানসিক চাপের মধ্যে আছে মা হয়ে তিনি বুঝতে পারছেন।বয়সের আবেগের বশে,অন্ধের মতো বিশ্বাস করে যে ভুলটা করেছে তার কতটুকু যে খেসারত দিতে হবে তা এক মাত্র আল্লাহ পাকই জানেন।
★
ভাইয়ের সামনে গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে নুপুর।সামনে তার ভাই নিলয় অগ্নিচোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।রাগে ক্ষোপে নিলয়ের চোখ রক্ত লাল আকার ধারণ করেছে।উত্তেজিত হয়ে ক্রমাগত গামছে নিলয়।নুপুরের থেকে ও এইসব মোটেও আশা করেনি।
-কি করেছিস এইসব?তুই জানিস এর পরিনাম কি হতে পারে?
-ভাইয়া আমি তো কোনো খারাপ ছবি দেই নি ওকে।
মাথা নিচু করে ভাইয়ের কথার জবাব নুপুর।নিলয় ঝাঁঝালো গলায় বলে,,,
-তো কি হয়েছে?বেশি পাকনা হয়ে গেছো?পরের ছেলেকে ছবি দাও আর সে ছেলে তোমার সর্বনাশ ডেকে আনুক।নেকেট ছবিতে তোমার মুখ বসিয়ে সে গুলো যদি ভাইরাল করে দেয় তাহলেই তো সব শেষ।নিজে তো বিপদে পড়বিইই সাথে আমাদেরও বিপদে ফেলবি।
-ভাইয়া ও ওরকম ছেলে না!
নিলয় আবার কষিয়ে চড় বসিয়ে দেয় নুপুরের গালে।নুপুর এবার কেঁদেই দেবে।নিলয়ের খুব আদরের নুপুর।দুজনের মধ্যে ভাইবোনের মিষ্টি সম্পর্কের ছোটখাটো মারামারি হলেও নিলয় কখনো নুপুরকে এভাবে মারে নি।চাপা কান্না নিয়ে নিলয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে যায় নুপুর।নুপুরকে ওভাবে যেতে দেখে নিলয়ের মা মিসেস শিউলি ঘরে ঢোকেন।নুপুরের এমন করার কারণ জানতে চান।নিলয় জানে নুপুর অন্য ছেলের সাথে সম্পর্ক করে,,তাকে নিয়মিত ছবি দেয় এটা জানলে মিসেস শিউলি নুপুরকে মেরেই ফেলবেন।তাই নুপুরকে বাঁচাতে মায়ের কাছে মিথ্যা কথা বলে নিলয়,,,
-আরেহ আম্মু জানোই তো তোমার মেয়ে কেমন কাঁদুনী!
-মেয়েটাকে এত জ্বালিয়ে কি পাস?
-শান্তি
-বানর ছেলে।
কথাটা বলে মুচকী হাসি দিয়ে নিলয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে যান মিসেস শিউলি।নিলয় শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে আয়নার দিকে তাকায়।আয়নায় নিলয়ের প্রতিচ্ছবিটা যেন কি বলছে নিলয়কে,,,,,,
চলবে,,,ইনশাআল্লাহ
