#খোঁপার_ওই_গোলাপকাঁটা

#৩য়_পর্ব


[কপি করা নিষিদ্ধ❌]


"কৃপা করে না নড়লে ভালো হয়।"


কথাটা শুনতেই আমি আরোও জমে গেলাম। মনে হলো এতো বাতাস থাকা সত্ত্বেও আমি শ্বাস নিতে পারছি না। কিছু বলতেই যাব তখন অনুভব করলাম আলিঙ্গনটা আরোও গাঢ় হয়েছে। তার এবং আমার মধ্যকার দূরত্ব নেই এর কাছাকাছি। উনার গালের খোঁচাখোঁচা দাঁড়িগুলো আমার গালে বিঁধছে। উষ্ণ নিঃশ্বাস ঘাড়ের উপর পড়ছে। বিয়ের আগের দিন মা আমাকে ইশারায় বলেছিলো, 

 “বর কাছে টানলে বাঁধা দিবি না।“


ফলে সাহেব যদি এই মুহূর্তে আমাকে কাছে চায় তাকে বাঁধা দেবার মত সাহস বা শক্তি আমার নেই। অতভারী একটা শরীরকে দু হাতে ঠেললেও আমার মতো পাটকাঠির পক্ষে সরানো সম্ভব নয়। কখনোই নয়। আমার বুকে হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ হতে লাগলো যেন। পুরুষের সান্নিধ্য এমন যাতনাদায়ক হবে জানা ছিলো না। নিজেকে সামলানোর আগেই অনুভূত হলো গলার কাছটায় সাহেব মুখ ডুবিয়েছেন। তার দাঁড়ির খোঁচা আমার চামড়া বিদ্ধ হচ্ছে। সেই সাথে বেসামাল চুমু। উষ্ণ ঠোঁটের লাগামছাড়া স্পর্শে আমার গলা, ঘাড় জ্বলছিলো। নিঃশ্বাস তীব্র হয়ে উঠলো। মনে হলো উপকূলীয় অঞ্চলের তীব্র কালবৈশাখী ঝড়ে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সেই নগন্য ঝাউ গাছটি আমি। সাহেব আরোও বেপরোয়া হয়ে উঠতেই আমি অস্পষ্ট স্বরে গুঙ্গিয়ে উঠলাম, 

"আমার পা"


আমার কথাটা শুনার সাথে সাথে সাহেব গলা থেকে মুখ তুললেন। গাঢ় নয়নে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে শুধালেন,

 "পায়ে কি হয়েছে?"


গম্ভীর স্বরে সামান্য উদ্বেগ ছিলো কি? ঘর তখন অন্ধকার। শুধু নীল একটা ড্রিম লাইট জ্বলছিলো। সেই আলোতে তার কঠিন মুখখানা আমি আবছা দেখলাম। কপালে তীব্র ভাঁজ। চোখ জোড়া পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত আমার পা। তিনি এবার আমার চোখে চোখ রেখে শুধালেন,

 "কি হয়েছে পায়ে?"

 "কিছু হয় নি!"

 "তাহলে?"


তার মুখে তীব্র বিস্ময়। তিনি উত্তরের প্রতীক্ষায় রয়েছেন যেন। আমি শুকনো ঢোক গিলে বললাম,

 "পায়ে তো ব্যান্ডেজ আমার!"

"পায়ের এখানে কি ফাংশন?"


পালটা প্রশ্নের উত্তর কি দেওয়া যায় বুঝে উঠতে পারলাম না। ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেলাম। তিনি কিছুসময় আমার দিকে শীতল, সূঁচালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে গাঢ় স্বরে বললেন,

 "পা পায়ের জায়গাতেই আছে। পা নিয়ে না কি আমি মঙ্গলগ্রহে যাচ্ছি নাকি চারশত মিটারের দৌড় দিচ্ছি! আবার পা দিয়ে ছু কিতকিতও খেলা হবে না। এখন অন্য কোনো সমস্যা থাকলে কৃপা করে বললে ভালো হয়।"


তার সরাসরি প্রশ্নে আমি লজ্জায় মিয়ে গেলাম। চোখ নত হলো। শব্দ খুঁজে পেলাম না বলার মত। কি বলবো? "আমাকে একটু সময় দিন? পাটা সেরে যাক!" নাকি "আমার আপনাকে খুব ভয় করে। আপনি কাছে আসলে মনে হয় খেয়ে ফেলবেন।" কি বলবো? তিনি আমার উপর উবু হয়ে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। পলক পড়ছে না তার। যেন আমার অন্তরাত্মাও খুঁটিয়ে দেখছেন তিনি। সেই দৃষ্টি আঁচ পেতেই আরোও গুটিয়ে গেলাম। এবার তিনি প্রচন্ড বিরক্তি প্রকাশ করলেন৷ তিক্ত স্বরে বললেন,

 "আমার সময় নষ্ট করা একেবারে অপছন্দ।"


কথাটা শুনে কিছু বলতে যাবো তার আগেই পুরু ঠোঁটের স্পর্শে আমার ঠোঁট বন্ধ হয়ে গেলো। আর কিছু বলা হলো না। তার একটি হাত চলে আমার চুলের পেছনে। তার উন্মাদ চুমুতে চোখ বুঁজে ফেললাম। সাহেবের কথাগুলো যতটা তিক্ত তার স্পর্শ ততটাই কোমল, আদুরে। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। অনেক আটকানোর চেষ্টা করলেও সেই অবাধ্য অশ্রুগুলো গড়ালোই। সেই সাথে নাক বন্ধ হয়ে গেলো৷ ফলে নাক টানতেই সাহেব সতর্ক হলেন যেন। আমার বুকের খাঁজ থেকে মুখ তুলে তাকালেন গভীর দৃষ্টিতে। পলকয়েক দেখেই বিরক্তি নিয়ে "ধ্যাত" বলে সরে গেলেন। আমার মনে হলো বিশাল একটা ভুল করে ফেলেছি বোধ হয়। সাহেব সঠান হয়ে তার বালিশে শুয়ে পড়লেন। চোখের উপর হাত দিয়ে চোখ ঢেকে দিলেন। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। নীল আবছা আলোতে তার মুখখানা বিরস লাগলো। কাটা কাটা চোয়ালটা দেখা যাচ্ছে। আমার উচিত ছিলো তার সাথে আমার মনের সংশয়গুলো ব্যক্ত করা। কিন্তু মনের গভীরতম কথা তাকেই বলা যায় যার প্রতি বিশ্বাস জন্মে। সাহেবের প্রতি তখনো আমার বিশ্বাস জন্মায় নি। থিঁতিয়ে গেলাম অনিশ্চয়তা, সংকোচে। কিছুসময় বাদে আবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটনা। সাহেব তার বা হাতে আমাকে হ্যাচকা টানে নিজের প্রশস্ত বুকের কাছে নিয়ে এলেন। এক হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। গাঢ় স্বরে বললেন,

 "শান্তি হয়েছে? এখন কৃপা করে আমাকে এমন হাপুস নয়নে না দেখলে ভালো হয়। আমি কোনো চিড়িয়াখানা জন্তু না।"


এই প্রথম যেন তার কণ্ঠে কোনো উত্তাপ ছিলো না। বরং যথেষ্ট নরম শোনালো ভারী গলাটা। আমার সংশয়ের খরা জমিতে আশ্বাসের এক পশলা বৃষ্টি নেমে এলো। জলরুপে ভেসে গেলো ভয়গুলো। আমি দুহাতে আমার সাহেবকে জড়িয়ে ধরলাম। সেই প্রথম আমি নিজ থেকে তাকে ছুঁয়েছি। তার পেশীবহুল হাতটা ছিলো আমাকে ঘিরে। আমি তার প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়েছিলাম। সে গোলাপ হোক বা কাঁটা। তার অবস্থান আমার খোঁপাতেই। গোলাপ হলে তা বরং আমি কোনো বইয়ের পাতায় সযত্নে রেখে দিব। আর কাঁটা হলে তাতে আঘাত পাবো। এটুকুই তো! ভাগ্য যখন আমাদের জোড় বেঁধেছে, তা অস্বীকার করতে ক্ষতি কি? 


****


সাহেব বাসায় থাকা মানে ঘরে অব্যক্ত আতঙ্ক বিদ্যমান। সাহেব হলেন আমাদের বাসার কিম জং উন। আমরা নর্থ কোরিয়ার নিরীহ জনগণ। তার অনুমতি ছাড়া হাসাও যেন অপরাধ। তার এই মার্শাল ল তে সবাই অতিষ্ঠ। মায়ের ডায়াবেটিস আছে। কিন্তু তিনি তার ঔষধ বা খাবারের ব্যাপারে তিনি অসচেতন। মন চাইলো দু চামচ চিনি দিয়ে চা খেলেন। এই বিষয়টা জানতেন না সাহেব। একদিন ধরা পড়লো। ও বাবা! কি দক্ষযজ্ঞ। মায়ের দিকে তিনি কড়া নয়নে তাকাতেই মা ছোট বাচ্চাদের মতো বললেন,

 "আর খাবো না। আজ একটু মন চাইছিলো!"

 "শুধু আজ?"

 

মা উত্তর দিতে পারলেন না। সবাই আমরা তটস্থ। সাহেব মায়ের ঔষধের ডিব্বা বের করলেন। পাতার ঔষধ গুনে একটা ঔষধের পাতা ভরা পেলেন। সেটায় এখন নাকি চারটা ঔষধ থাকার কথা। আছে দশটাই। মানে মা খান নি। তিনি হুংকার দিলেন মিষ্টি আপুর উদ্দেশ্যে। মিষ্টি আপু আমতা আমতা করে বললেন,

"আমি তো পাতা বের করে দেই। মা না খেলে কি করবো?"

 "খুলে হাতে দিতে হাত ক্ষয়ে যায়?"

 

মিষ্টি আপু জবুথুবু হয়ে গেলেন। কিছু বললেই ক্ষেপাটে সাহেব ক্ষেপে যাবেন। সাহেব কপালের চামড়া টেনে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে রাগী স্বরে বললেন,

 "শোনো মা, ঔষধ না খেয়ে আমার পয়সা বাঁচানোর কৃপার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং কৃপা করে অসুস্থ না হয়ে আমাকে একটু স্বস্তি দিলে ভালো হয়।"

 

সাহেব সেদিন ফরমান জারি করলেন, 

"ঘরে এখন থেকে মিষ্টি বন্ধ, চিনি বন্ধ।"


সবাই কেনো যেন অসহায়ের মতো আমার দিকেই চাইলো। যেন এই শাস্তির জন্য আমিও দায়ী। অবশ্য আমার জন্যই খচ্চর সাহেব ঘরে থাকছে। পা'টা যে কবে সারবে! আর সাহেব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বে! ধ্যাত! যন্ত্রণা! মনে মনে কথাটা বলতেই আমি হেসে উঠলাম। সাহেবের মুদ্রাদোষ আমাকেও ধরেছে। আমার হাসির শব্দ কি তার কানে গেলো নাকি? তিনি কঠিন নয়নে আমার দিকে তাকালেন। আমার হাসি সাথে সাথেই উবে গেলো। চোখ সরিয়ে নিলাম। উফ! সাহেব আপনি এতো যন্ত্রণা কেন? হাসতেও পারবো না আমি? 


****


সাতদিন পর ডাক্তারের চেকাপে দেখা গেলো পায়ে কোনো ইনফেকশন হয় নি। আস্তে আস্তে চামড়া বাঁধছে। সময় লাগবে। ব্যান্ডেজ খোলা হলো। তবে ড্রেসিং করতে জোর দিয়েছেন। অবশ্য এতোদিন আমার ড্রেসিংগুলো সাহেব নিজ হাতেই করেছেন। ড্রেসিং এর সময় আমি আতঙ্কে কাঠ হয়ে বসে থাকতাম। সাহেবের প্যা-পু পছন্দ না। তিনি প্রথম দিন কঠিন স্বরে বলে দিয়েছিলেন,

 "কৃপা করে ফ্যাসফ্যাস না করলে ভালো হয়। আমার অত্যন্ত অপছন্দ এই ফ্যাসফ্যাসানি। আল্লাহ জবান দিয়েছেন, সমস্যা গুলো সেই জবানে বললেই ভালো হয়।"


কিন্তু কৃপা করতে পারলাম না। উনার উত্তপ্ত নয়নে তাকালে আমার জবান বন্ধ হয়ে যায়। একটা শব্দ বের হয় না। অবশ্য এই সমস্যা একটু একটু দূর হয়েছিলো বটে। কিন্তু বহু সাহস লেগেছিলো। এখনো সাহেবের দৃষ্টিতে আমার জবান বন্ধ হয়ে যায়। ভয়ংকর দৃষ্টি তার। 


ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতেই দেখলাম একটা ফুচকার দোকান। ফুচকা দেখেই আমার জিভে পানি চলে এলো। আমার ছোটবেলা থেকে আমার একটা স্বভাব আছে, তা হল মুখে কিছু না চাওয়া। বাবার সাথে স্কুলে যাওয়া বা আসার পথে কখনো কিছু খেতে মন চাইলে আমি বাবার শার্টের হাতাটা একটু টেনে তার দিকে তাকাতাম। বাবা বুঝে যেতেন। আমার বাবা ততটা বিত্তবান নন। এমন অনেক সময় হত বাবার পকেটে টাকা থাকতো না। বাবা তখন অসহায় নজরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

 "আজ নেই মা।"


সেকারণে আমার মুখ ফুটে চাওয়ার অভ্যাস হয় নি। মনে হয় মুখ ফুটে চাইলে অপর মানুষটির না দিতে পারার যাতনা হবে। আমি তাই তার দিকে তাকিয়ে নিজের চাওয়া ব্যক্ত করতাম। স্বভাববশত আমি সাহেবের দিকেও তাকালাম। কেন যেন মনে হলো তিনিও হয়তো আমার মনের কথাটা বাবার মতো বুঝে যাবেন। তার শার্টের হাতায় একটু টান দিতেই তিনি বিরক্ত নিয়ে শুধালেন,

 "কি?"


তপ্ত রোদে মুখখানা তার ঘেমে গেছে। কপালে ঘামের স্তুপ। একটা রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে বিরক্ত। ফলে "কি?" আরোও ঝাঁঝালো শোনালো। আমার আর চাওয়ার ইচ্ছে হলো না। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,

 "কিছু না।"


কপালে তীব্র ভাঁজ ফেলে কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। অতঃপর এক দলা থুথু ফেলে বললেন,

 "যতসব!"


আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছিলো খুব। কিন্তু উনার প্রকোপের ভয়ে ইচ্ছে মেরে ফেললাম। ফলে একপ্রকার কৃপা করেই ফেললাম। একটু পর একটা রিক্সা পাওয়া গেলেও। তিনি কোলে তুলে নিলেন আমাকে। রিক্সায় বসাতে বসাতে কঠিন স্বরে বললেন,

"একেই পা পোড়া, এরপর হাগা ছুটলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।"


তার কথা শুনে আমার গাল জমে গেলো। লজ্জায় আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম তার লাগামহীন কথা শুনে। মনে মনে বললাম,

 "আল্লাহ আমাকে তুলে নেন, এই খচ্চর সাহেব আমার মান সম্মানের ফালুদা করে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে প্রাণআপ খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই।"


******


আমার দেবর মাহমুদ পড়াশোনায় নবডঙ্কা। তার জীবনের একটাই দুঃখ তা হলো পড়াশোনা। পড়তে বসলে তার হাতে ব্যথা, মাথায় ব্যথা, পেটে ব্যাথা। অথচ টো টো করে ঘুরতে তার ক্লান্তি নেই। সাহেব বাড়ি থাকায় সে বের হতে পারছে না। কিছু লাফাঙ্গা বন্ধু আছে। তারা প্রতিদিন জানালার ধারে এসে তাকে ডাকে। 

"আয়, আয়"


কিন্তু মাহমুদ বের হতে পারে না। কারণ আমার সাহেবের শকুনী নজর। তিনি এক বিকেলে ওই "আয়, আয়" পার্টিকে ধরে ফেললেন। গম্ভীর গলায় বললেন,

 "এই কাকে চাই?"


মাহমুদের বন্ধুরা তব্দা খেয়ে গেলো। হকচকিয়ে তোঁতলাতে তোঁতলাতে বললো,

 "মাহমুদকে ডাকছিলাম ভাইজান"

"কি কাজ ওকে নিয়ে?"

 "কো.. কোচিং এ যেতাম!"


ডাহা মিথ্যে, মাহমুদের এই সময়ে কোনো কোচিং নেই। ও এখন বড় মাঠে ক্রিকেট খেলবে। ছেলেটার সামনে ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা অথচ গুরুত্ব নেই তার। আমারোও টেস্ট পরীক্ষা সামনে। ইশ! হয়তো দেওয়া হবে না। বুকের দীর্ঘশ্বাসটা ফোঁস করে ফেলে মনোযোগী হলাম সাহেবের কর্মকান্ডে। সাহেব তাদের বলে উঠলেন,

 "এই উপরে আসো তোমরা। কোন কোচিং আমিও দেখি।"


মাহমুদ এবং তার "আয় আয়" সংঘ জেরায় পড়লো সাহেবের। তাদের মুখগুলো একেবারে বিবর্ণ লাগছে। সাহেবকে তারা কোনো মতে বললো, 

"ভাইজান কেমেস্ট্রি কোচিং আছে।"

 "স্যারের নাম কি?"

 "তূর্য স্যার!"

"কোথার হনু?"

 "জি?"

"বললাম, তিনি কোন কলেজের স্যার?"

"স্যার না ভাই। ভার্সিটির কেমেস্ট্রিতে পড়ে।"

"এজন্যই মাহমুদ নতুন করে আটশ টাকা চেয়েছিলি?"

 "হ্যা। আসলে হাফ ইয়ারলিতে ফেইল করেছিলাম তো! তাই..."

"যা বই নিয়ে আয়। আমিও দেখি তূর্য ভাই কি পড়ায়!"


মাহমুদ এবং "আয়, আয়" সংঘের প্যান্টে হিসু করে দেবার মতো অবস্থা হলো। আমার সাহেবের ধারালো বাঘের মতো দৃষ্টির প্রকোপে তারা বলেই দিবে যেন,

 "ছেড়ে দাও ভাই, কেন্দে বাঁচি"


তারা নড়ছিলো না দেখে সাহেব এবার ধমকে উঠলেন,

 "পায়ে কি কেউ সিমেন্টে খোঁদাই করে দিয়েছে? নাকি পা মেঝেতে চিপকে গেছে! যাস না কেন?"


মাহমুদ ছুটে গিয়ে বই আনলো। আমার সাহেব টানা প্রশ্ন করতে লাগলো। বুলেটের মতো সেই প্রশ্নের আঘাতে মাহমুদ এবং "আয়, আয়" সংঘ কুপোকাত। আমার মুখ নিশপিশ করছিলো উত্তর দিতে। একটা সময় ফট করে বলেই ফেললাম দু একটার উত্তর। আমার উত্তর শুনে সাহেব সরু নয়নে চাইলেন। গাধাগুলোকে আর প্রশ্ন না করে এবার প্রশ্ন আমার দিকে ছুড়লেন। আমি উৎসাহের সাথে উত্তর দিতে লাগলাম। কখন যে আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো টের পেলাম না। সাহেব বই বন্ধ করলেন। মাহমুদকে কড়া স্বরে বললেন,

 "এই কোচিং এর স্যারের সাথে আমি কথা বলবো। শালায় আটশ টাকা নিচ্ছে অথচ পর্যায়সারণীর ১৭ গ্রুপের মৌলের নামও পারিস না। আমার টাকা কি গাছে ধরে?"


মাহমুদের মুখ শুকিয়ে চুপসে গেলো। "আয়, আয়" সংঘ একসাথে বলে উঠলো,

"ভাইজান আজকে যাই?"

"কেন কোচিং এ যাবে না!"

 "শেষ হয়ে গেছে এতোক্ষণে। এখন বাসায় যেয়ে পড়তে বসবো।"


বলেই ছুট দিলো তারা। মাহমুদের মুখটা হাত থেকে পড়ে ভেঙ্গে যাওয়া ডিমের মতো হয়ে ছিলো। সে সুরসুর করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি ভেবেছিলাম, সাহেব বুঝি আমাকে সাবাসি দিবেন। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। তিনি সুন্দর টেবিলে বসে ল্যাপটপে মুখ গুজলেন। যেন কিছুই হয় নি। শালা! কৃপাধারী হুতুম। 


*****


সাহেবের পনেরোদিন ছুটি নেওয়া হলো না। একটা বিশেষ দরকারে তাকে এগারোতম দিনে অফিস যেতে হলো। তিনি সকালে ফোন পেয়ে প্রচন্ড বিরক্ত হলেন। শুধু "ধ্যাত! যন্ত্রণা! ধুর!" এগুলো বলছিলেন। একবার আমার দিকে তাকিয়ে শুধালেন,

 "পায়ের কি হাল?"

"ভালো।"

 "একা থাকা যাবে কি?"

"হ্যা! আর একা তো না। মিষ্টি আপু, মা তো আছেন"


নিজের প্রবল অহং এর জন্য আমার মাকে ডেকে আনলেন না তিনি। আনলে ভালো হত। যাবার সময় আমাকে বাথরুম করিয়ে খাটে বসিয়ে বললেন,

"আমি যেন এসে কোনো অঘটন না দেখি। কৃপা করে শান্ত হয়ে থাকলে ভালো হয়।"


আমি মাথা দোলালাম। তিনি বেরিয়ে যাবার আগেও ঘরে আমার দিকে চাইলেন। কপাল কুঁচকে ভারী স্বরে শুধালেন,

"পারা যাবে তো?"

"হ্যা, আমি পারবো।"

"পারলেই ভালো!"


সাহেবকে চিন্তিত দেখালো। তার চিন্তা দেখে আমার হাসি পেলো খুব। একটা চাঁপা আনন্দে আমার হৃদয় কুলকুল করছে। সাহেব আমাকে নিয়ে চিন্তিত। কোথাও না কোথাও আমি তার হৃদয়ে প্রবেশ করেছি। মা-ভাই-বোনের মতো এখন আমিও তার একটি চিন্তার মানুষ। আমি হেসে বললাম,

 "আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমার কিছু হবে না।"

"চিন্তা কে করছে! যতসব!"


কড়া স্বরে উত্তর দিলেন তিনি। তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার অলীক কল্পনার উপর তাচ্ছিল্যভরে হাসলাম। হায় রে কানন! কি হতচ্ছাড়া চিন্তা তোর! 


সারাদিন বিপদ হলো না। বিপদ বাঁধলো বিকেলে। আমার খুব বাথরুম চাপলো। আমি মিষ্টি আপুকে ডাকলাম। মিষ্টি আপুর ঘর আমার ঘরের পাশে। মা থাকেন নিচে। আমি ডাকলে মিষ্টি আপু শুনতে পান। আমি বার কয়েক ডাকলাম। কিন্তু মিষ্টি আপু সাড়া দিলেন না। তিনি হয়তো ঘুমাচ্ছেন। মাকে ডাকা অনর্থক। বেচারি হাটুর ব্যথা নিয়ে দোতালায় আসতে পারবেন না। তাই ঠিক করলাম নিজেই যাবো। আমি ধরে ধরে দাঁড়াতে পারি তখন। পায়ের চামড়া বেঁধেছে খানিকটা। এন্টিবায়োটিক অবশ্য তখনো চলছিলো। গোড়ালিতে ভর করে হাটলে আমি বোধ করেছিলাম পারবো। পেটিকোটটা গুটিয়ে আস্তে করে খাট থেকে নামলাম। গোঁড়ালিতে ভর দিয়ে দিয়ে বাথরুমে গেলাম। আমার নিজের উপর গর্ববোধ হচ্ছে। সাহেব আসলে তাকে বলবো,

 "আপনি আর কামাই দিয়েন না। আমি সুস্থ।"


ততক্ষণ পর্যন্তও কোনো ঝামেলা হলো না। যেই ফেরত আসবো অমনি একটা মস্ত তেলাপোকা দেখতে পেলাম বেসিনের কোনায় সুর বের করে আছে। তেলাপোকাটা আবার উড়তেও পারে। ওই দেখে আমার আত্মা খাঁচাখাড়া হলো। আমি উড়ন্ত তেলাপোকা প্রচন্ড ভয় পাই। যেই না তেলাপোকাটা তার পাখা উড়ালো। আমি ভুলে গেলাম আমার পায়ে এখনো কাঁচা মাংস। আঙ্গুল মেঝেতে রাখতেই জ্বলে উঠলো। তেলাপোকাটাও আমার মাথার উপরে উড়ছে। ভয়, আতঙ্ক আর যন্ত্রণায় আমার অবস্থা নাজেহাল। তাড়াহুড়ো করে বের হবার জন্য দৌড় দিতেই পাটা পিছলে গেলো মেঝের পানিতে। আমি টাল না সামলাতে পেরে বাথরুমের কলের নিচে পানিভর্তি বালতি সহ মুখ থুবড়ে পড়লাম। আমার পায়ের কাঁচা মাংস থেকে গলগল করে রক্ত বের হতে থাকলো। কি তীক্ষ্ণ ব্যথা! আমার চিৎকারে অবশেষে মা এবং মিষ্টি আপু এলেন। আমি ভিজে একাকার। তারা আমাকে তুললেন। মিষ্টি আপু বললেন,

 "আমাকে ডাকলে না কেন!"


আমি ব্যথায় কাঁদতে কাঁদতে বললাম,

 "ডেকেছিলাম।"


আমার ভেজা কাপড় পরিষ্কার করে দিলেন মিষ্টি আপু। পা ড্রেসিং করলেন। সদ্য বাঁধা কাঁচা চামড়া বালতির কোনায় লেগে আবার নরম হয়ে গেছে। তাই রক্ত বেরিয়েছে। এই ঘটনা সাহেবকে জানানোর এক ঘন্টার মধ্যে তিনি বাড়ি এলেন। অবিন্যস্ত, এলোমেলো অবস্থা তার। টাইটা ঢিলে হয়ে আছে। শার্টটার অবস্থা বেগতিক। ঘামে তার চুল লেপ্টে আছে কপালে। হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন তিনি। আমার পায়ের অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়। কিন্তু তা দেখে সাহবের মুখখানা কেমন রাগে লাল হয়ে গেলো। তার রাগে লাল হওয়া মুখখানা দেখে আমার বুকে ত্রাশ বাসা বাঁধলো। তার চোয়াল কঠিন। চোখ রোষের অগ্নিতে দগ্ধ। মিষ্টি আপুর দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে শুধালেন,

"কিভাবে হলো?"

"ও আমাদের কাউকে ডাকে নি। একা একা বাথরুমে গিয়েছে।"


মিষ্টি আপুর মিথ্যে কথাটা আমাকে খুব কষ্ট দিলো। আমি আহত চোখে তার দিকে তাকাতে তিনি অপরাধীর মতো তাকালেন। বুঝলাম ভাইয়ের রাগের শিকার সে হতে চান না। পরে অবশ্য তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন,

"তোমাকে ভাই কিছু বলবেন না। কিন্তু আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খাবেন।"


মিষ্টি আপুর ভাষ্য শুনে আমার দিকে চাইলেন সাহেব।আমি তার দিকে তাকিয়ে নীরিহ শাবকের মতো বললাম,

 "আমার তর সইছিলো না।"


তিনি কিছুসময় আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কপালের চামড়া টানতে লাগলেন। তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। তার চোখমুখ ছিলো ইস্পাতের মতো কঠিন। হয়তো বউয়ের কাছে কৃপা চাইতে পারলেও বউকে সবার সামনে ধমকানোর স্বভাব তার নেই। ফলে একটু স্বস্তি পেলাম। মা তার পেছন পেছন বের হলেন। তিনি ঘরের বাহিরে চিৎকার করছেন। সেই চিৎকার আমার ঘর অবধি আসছে। মা তাকে শান্ত করার প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছেন। ব্যর্থ চেষ্টা। এর মধ্যে একটা কথা খুব কানে বিঁধলো,

"এজন্য আমি বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করতে চাই নি। বলেছিলাম না আমি, বলেছিলাম যে আমি আর কারোও দায়িত্ব নিতে পারবো না। শুনলে না কেন! যন্ত্রণা যত্তসব আমার ঘাড়েই জুটে।".........


চলবে


মুশফিকা রহমান মৈথি 


[কমেন্টে মন্তব্য জানাবেন। অনেকেই নতুন আমার গল্প পড়ছেন। চাইলে আমার গ্রুপে জয়েন করতে পারেন। আর এই গল্পটা আসবে দুপুর ৩.৩০ টা থেকে চারটার মধ্যে। সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ গল্পটির ৬৭ তম পর্ব আসবে শনিবার। কিছু ইনফোরমেশন নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি বলে দেরি হচ্ছে।]

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url