#কুয়াশায়_ঘেরা

#পর্ব_০২+০৩+০৪

#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা


প্রকৃতিতে মৃদু ঠান্ডা বাতাসের অস্তিত্ব। বিশাল দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে অট্টালিকা। সেদিক থেকে দৃষ্টি ফেরালো প্রভাতি। গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো গন্তব্যে। ভাবিদের বাসায় পা ফেলার পর চারিদিকে ধূ ধূ শূন্য দেখতে পেলো। আশেপাশে কোনো মানুষজন নেই। ঢিপঢিপ হৃদকম্পন নিয়ে সামনে পা বাড়ালো। হঠাৎ ভাবির তীব্র ঝংকারের সুর তোলা হাসির শব্দ পেলো প্রভাতি। কৌতুহলে চোখজোড়া তীক্ষ্ণ হয়ে এলো। ভাবির রুমে পা বাড়াতেই প্রচন্ড রকম শকড হলো। তার ভাবি আর ভাই দুজনে একইসাথে বসে হাসিঠাট্টা করছে। আশরাফুল সাইফার অল্প বেড়ে ওঠা পেটে কান লাগিয়ে বাবুর সাথে কথা বলছে। যেনো সত্যি সত্যি বাবু উত্তর দিতে পারছে।


মাথা ঘুরছে প্রভাতির। গতকাল থেকে কি হচ্ছে, কিছুই তার বোধগম্য হচ্ছে না। ভাইয়া কতটা রুক্ষ, খসখসে মেজাজে থাকলে ভাবিকে সোজা তার বাবার বাড়ি দিয়ে যেতে পারে, সেটা প্রভাতির অজানা নয়।তবে কোথায় গেলো সেই রা'গ? ভাবুক হয়ে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রইলো প্রভাতি। হুট করেই সাইফার নজর পড়ে প্রভাতির ওপর। ঠোঁট প্রসারিত করে বলল,


-"প্রভাতি, দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ভেতরে এসো।"


আশরাফুল অদ্ভুতভাবে হাসলো। প্রভাতিকে এখানে দেখে সে চমকায়নি, বরং সে যেনো জানতো প্রভাতি এখানে আসবে। তাই সকালে বের হওয়ার সময় গাড়ি নিয়ে আসেনি। ড্রাইভারকে বলে দিয়েছে 'প্রভাতি কোথাও যেতে চাইলে নিয়ে যাবেন"। আশরাফুল মোটা কন্ঠে বলে উঠলো,


-"দুজনে মিলে গল্প কর। আমার একবার ফ্যাক্ট্রিতে যাওয়া দরকার।" 

কথা শেষ করে আর বসলোনা আশরাফুল। দুজনকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লো। 


-"আমি দু'কাপ চা বানিয়ে আনছি।"

সাইফাকে খপ করে ধরলো প্রভাতি। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,


-"আমার আর অস্থিরতা ভালো লাগছেনা। কি হয়েছে বলো তো? মাথাটা ভীষণ জট পাকিয়ে আছে। এই মুহূর্তে সব কিছু জানা প্রয়োজন।"


সাইফা মৃদু হেসে বলল,

-"চা হলে ব্যাপারটা বেশ এনজয় করতে পারবে। প্রথমে তোমার মতো আমিও প্রচুর ভ'য় পেয়েছিলাম।"


প্রভাতি ঠোঁট চোখা করে শ্বাস ছাড়লো। মাথা হেলিয়ে বলল,

-"আচ্ছা, তবে চা নিয়ে এসো। কিন্তু তোমাদের বাসা খালি কেনো? সবাই কোথায়?"


সাইফা মেয়েটা যেনো হাসতে ভালোবাসে। এবার ও তার ব্যতিক্রম হলোনা। একগাল হেসে বলল,

-"সবাই সকালেই ভাইয়ার শশুর বাড়ী গিয়েছে। ভালোলাগছিলো না বলে আমি যাইনি।"


প্রভাতি ফিক করে হেসে ওঠে বলল,

-"সবাই তোমার ভাইয়ের শশুর বাড়ি আর আমি আমার ভাইয়ের শশু বাড়ি এসে বসে আছি।"


সাইফা দু'কাপ চা নিয়ে ফিরলো। প্রভাতির চায়ে চিনি একটু বেশি লাগে। এককাপ চায়ে দেড় চামুচ চিনি না হলে জমেনা। 

চায়ের কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে কানের পাশে কয়েক গাছি এলোমেলো চুল গুঁজে দিয়ে প্রভাতি বলল,

-" এবার অন্তত সবটা আমায় বলো। আমি কিন্তু হাঁপিয়ে উঠেছি।"


সাইফা আর সময় নিলোনা। মিষ্টি করে হাসলো।

-"তুমি তো জানো কয়েকদিন যাবত আমাদের বাসায় আসার জন্য আমি কেমন ছটফট করেছি। কিন্তু মা আসতে দিলেন না। কাল হুট করেই তোমার ভাইয়ার টাকার বান্ডিল থেকে টাকা মিসিং। মা ব্যাপারটা জানতেই হৈচৈ শুরু করলেন। উনার ধারণা টাকা আমিই সরিয়েছি। আমার ভীষণ খা'রাপ লেগেছিলো, যখন দেখলাম তোমার ভাইয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। 

কিছুই বলছেনা। ফের আমাকে বলল বাবার বাড়ি চলে আসতে। 

রুমে ফিরে আমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বোঝালেন ব্যাপারটা আমি যেমন ভাবছি ঠিক তেমনটা নয়। ভিন্ন একটা ব্যাপার। আমাকে সেইফ রাখার জন্য উনি মায়ের কথার জবাবে কিছু বলতে পারেননি।"


সাইফা একটু থেমে আবার বলল,

তুমি নিশ্চয়ই বুঝেছো আমি কিসের কথা বলছি। বাবু আর আমার সেইফ থাকার জন্যই তোমার ভাইয়া আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। মোদ্দাকথা সে সুযোগ খুঁজছিলো আমাকে এখানে পাঠানোর। মায়ের ব্যাপারটা তুমিই বেশ ভালো জানো।"


ভাবির কথায় লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল প্রভাতি। বাবা থাকলে আজ সবকিছুই ঠিক থাকতো। প্রভাতি আর বেশিক্ষণ বসতে চাইলোনা। হাতের চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বিদায়ের সুরে বলল,

-"অনেকটা সময় ছিলাম। এতক্ষণে হয়তো তোমার বাবা মা এসে পড়বে। আমি আসছি। সময় পেলেই হুটহাট তোমাকে আর আমার প্রিন্স না প্রিন্সেস জানিনা তাকে দেখতে চলে আসবো।"


সাইফা হাসিমুখে বিদায় দিলো প্রভাতিকে। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেলো। প্রভাতি যখন গেট পেরিয়ে গেলো, তার সবুজ ওড়নার কিছু অংশ অস্পষ্ট দেখা গেলো।


-"তোমার জন্য সামনে দারুণ কিছু অপেক্ষা করছে ননদিনী।"

বলেই চোখে হাসলো সাইফা। যেনো ব্যাপারটা দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে তৃষ্ণার্ত চোখজোড়া। অধর জোড়া সূক্ষ্ম হাসিতে তাল মেলালো।


পশ্চিমাকাশ কালো রং এ সেজেছে। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে কেঁপে উঠছে গতর। অপেক্ষা ঝুমবৃষ্টির। শরীরের সাদা রং এর শাড়িটি এখনো বদলায়নি প্রভাতি। নিজেকে সবসময় পরিপাটি রাখতে পছন্দ করে। একটু আগেই নিজেকে কৃত্রিম রূপে সজ্জিত করে দেখা করে এসেছে একটা ছেলের সাথে। মা অনেকদিন যাবত ছেলেটার সাথে দেখা করার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। আজ দেখা করেই আসলো। খা'রাপনা, বরং তার নিজের তুলনায় ছেলেটাকে একটু বেশিই সুন্দর মনে হচ্ছিলো। কিন্তু কেনো জানেনা বিয়েতে এগোনোর মতো সেরকম কথাবার্তা বলতে পারেনি প্রভাতি। ভালোলাগেনি। 


বসার ঘর থেকে ইলানের মা ইরতিজার কথা শোনা যাচ্ছে। প্রায় বারো-তেরো বছর ধরে পাশাপাশি ফ্ল্যাট কিনে থাকছে আশরাফুল আর ইলানের পরিবার। ওদের দুজনের বন্ধুত্বের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কটা ও বেশ মজবুত হয়েছে। ইলানের মা এসেছেন আনোয়ারা জাহানের সাথে গল্প করে সময় কা'টাতে। তখনই আনোয়ারা জাহান প্রভাতির বিয়ের কথা তুললেন। 


বৃষ্টির পর সতেজ নির্মল পরিবেশ। পাতায় পাতায় জমে থাকা বৃষ্টিকণা বড় ফোঁটা হয়ে টুপ করে গলে পড়ছে। ঘড়ির কা'টা দশ এর ঘর অতিক্রম করেছে। মুঠোফোন ''বিপ' শব্দে কেঁপে উঠলো। পাওয়ার বাটনে ক্লিক করে স্ক্রিন অন করতেই এক টুকরো মেসেজ ভেসে উঠলো। 


"ছাদে আসো। কথা আছে। ত্যাড়ামো করবেনা।

আজ ভালোয় ভালোয় না আসলে কাল তোমার নিস্তার নেই।"


ওড়নাটুকু শক্ত করে চেপে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো দরজায় দিকে। একবার মায়ের রুমে উঁকি দিয়ে দেখলো মায়ের জহুরি নজর তার দিকেই আটকে আছে। মায়ের প্রশ্নবিদ্ধ চোখজোড়া দেখে প্রভাতি বলল,


-"মোহনা ডেকেছে। যাবো আর কাজ সেরে চলে আসবো।"


আনোয়ারা জাহানের মত পেয়েই প্রভাতি ছাদে পা বাড়ালো। মোহনা নিচতলার একটা মেয়ের নাম। 

কচ্ছপের গতিতে শব্দহীন পায়ে ছাদে এসে পৌঁছালো।

ইলান ছাদের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে বক্ষঃস্থলে দুহাত গুঁজে বুক টা'ন টা'ন করে দাঁড়িয়ে রইলো। 


প্রভাতি তাড়া দেখিয়ে প্রশ্ন করলো,

-"কি বলার আছে বলো। আমাকে বাসায় ফিরতে হবে।"


-"সিরিয়াসলি? আমাকে তাড়া দেখাচ্ছো তুমি? দুদিনের পিচ্চি মেয়ে আমায় তাড়া দেখায়?"


ইলানের কথায় তাচ্ছিল্য হাসলো প্রভাতি,

-" ইশ! তোমার কি কঠিন ব্যক্তিত্ব। দুদিনের পিচ্চির পেছনে পড়ে আছো।"


ভেতরে জ্বলুনি হলেও ইলান নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করলো।

-"প্রবলেম কি তোমার? আমার কোথায় সমস্যা? সবার আমাকে পছন্দ, কিন্তু তোমার না।"


প্রভাতি শান্ত চোখে তাকালো। ইলানের চেহারা দেখে তার ভেতরের অস্থিরতা অনুমান করা যাচ্ছেনা বিন্দুমাত্র। প্রভাতির কন্ঠে তেজ নেই। তবে দৃঢ়তা আছে।


-"আমি তো বলিনি, আমি আপনাকে পছন্দ করিনা। আমি আপনাকে পছন্দ করতাম এবং এখনো পছন্দ করি। কিন্তু আপনি যেমনটা চাইছেন, সেটা মনের ব্যাপার, সময়ের ব্যাপার।"


তাচ্ছিল্য হাসলো ইলান।

-"আর আজ যার সাথে দেখা করে এসেছো, মন তাকে সায় দিয়েছে নিশ্চয়ই। বিয়েটা করে নিও। ভালো ছেলে, ভালো প্রফেশন। সবচেয়ে বড় কথা হ্যান্ডসাম।"


ইলানের পি'ঞ্চ করে কথা বলাটা ঠিকই টের পেলো প্রভাতি। আড়ালে মুখ লুকিয়ে দুর্বোধ্য হাসলো। কারো নজরে পড়লেও বোঝার উপায় নেই সে হেসেছে কিনা?

-"বিয়ে অবশ্যই করবো। খুব তাড়াতাড়ি কার্ড পেয়ে যাবে। ওহহো! কার্ডের কথা কেনো বলছি বলোতো? নিজেদের মানুষকে কেউ কার্ড দেয় নাকি? বিয়েতে সব দায়িত্ব ভাইয়ার পাশাপাশি তোমার ঘাড়েই পড়বে।আসছি আমি। মাকে মি'থ্যে বলে এসেছি।"


ফোনের ফ্ল্যাস অন করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে পড়লো প্রভাতি। 

ইলান মনে মনে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিলো। আর নয়, সে আর পিছু ফিরবেনা। তার প্রফেশনাল লাইফের কঠোর, বিচক্ষণ মানুষে ফিরে যাবে সে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আপনমানুষ গুলোর কাছে সে সর্বদাই নরম। কথায় আছেনা? "লেবু বেশি চিপলে তেঁতো হয়ে যায়"।

অনুভূতিগুলো প্রকাশিত হয়ে গেলে অবহেলার মাত্রা ও বেড়ে যায়। 

সেদিনের পর ইলান প্রভাতির সামনে আগের মতো খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করলো। কিন্তু প্রভাতির কাছে ব্যাপারগুলো কেমন অস্বাভাবিক লাগলো।


—————

আশরাফুলের বাবার একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্ট্রি আছে। উনার মৃ'ত্যুর পর আশরাফুল সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়। একঘন্টা পূর্বে প্রভাতি জানালো সে শপিং এ এসেছে তাকে যেনো সাথে নিয়ে বাসায় ফেরে আশরাফুল। আশরাফুল গাড়ি শপিংমলের দিকে ঘোরালো। 

নিস্তব্ধ, শুনশান রাস্তা। দু'পাশে ঘন গাছগাছালি। একা একাই গাড়ি ড্রাইভ করছে আশরাফুল। আচানক গাড়ির সামনে কিছু একটা পড়লো। পাশ থেকে একটা গাড়ি শাঁই শাঁই করে ছুটে চলে গেলো। গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লো আশরাফুল। চমকে উঠলো সে। শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেলো শীতল শ্রোত। গলা শুকিয়ে কাঠ। ঠান্ডাভাব কে'টে গিয়ে দরদরিয়ে ঘাম ছুটেছে। গাড়ির সামনে একটি ন'গ্ন নিথর নারীদেহ। অতিপরিচিত এই মুখ। নৃশং'স, বি'ধ্বস্ত রূপে পড়ে রইলো। ভেতরটা মুচড়ে আসলো। চোখ ফিরিয়ে নিলো আশরাফুল। দেহ অসাড় হয়ে আসছে। তখনই তার মুঠোফোন তীব্র শব্দে কেঁপে উঠলো।


#চলবে........

(সবকিছু বেশ অনেকটা খোলসাভাবে বুঝতে পারবেন। আগামী পর্বে কি হতে যাচ্ছে? অনুমান করুন। গল্প সম্পর্কে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে আমার লিখার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিন। সুন্দর মন্তব্য পেলে ব্যস্তাতার মাঝেও লিখতে মন চায়।

ভুল ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইলো। হ্যাপি রিডিং।)#কুয়াশায়_ঘেরা

#পর্ব_০৩

#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা


অন্ধকারে নির্জন রাস্তায় একা একটা ম'রদেহ সামনে নিয়ে গলা শুকিয়ে আসলো আশরাফুলের। হঠাৎ মুঠোফোনের শব্দে চমকে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন রিসিভ করে নিজেকে ধাতস্থ করে জিজ্ঞেস করলো,

-"কোথায় তুই?"


-"তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।"


আশরাফুল প্রভাতিকে আশ্বস্ত করে বলল,

-"আর একটু দাঁড়া, আমি এক্ষুনি আসছি। কোনো কিছুর আভাস পেলেই আমাকে কল করবি। ফোন চালু রাখ।"


প্রভাতির নাম্বার থেকে লাইন ডিসকানেক্ট করে ইলানের নাম্বারে কল দিলো। এটা যার কাজ, তাকেই সামলাতে দেওয়া উচিত। একবার রিং হওয়ার মাঝেই ফোন রিসিভ হলো।


-"এড্রেস পাঠাচ্ছি, এক্ষুনি ফোর্স নিয়ে চলে আয়। মনে হচ্ছে জটিল কে'স।"


ইলান ওপাশ থেকে বলল,

-"আসছি আমি।"


পনেরো মিনিটের মাথায় ইলান তার টিম নিয়ে পৌঁছে গেলো। মেয়েটির ন'গ্ন শরীর আশরাফুলের শার্টে ঢেকে রাখা। মেয়েটির বাবার যথেষ্ট নামডাক আছে। বিজনেসের পাশাপাশি রাজনৈতিক লোকের সাথেও ওঠাবসা। বাবার সুবাদে মেয়েটিও লোকচোখে পরিচিত মুখ। এত ক্ষমতাশীল ব্যক্তির মেয়ে হয়েও এত অবহেলায় মৃ'ত্যুকে বরণ করে নিলো। আল্লাহ কখন কাকে কিভাবে মৃ'ত্য দেবেন সেটা একমাত্র তিনিই ঠিক করেন।

আশরাফুলের কাছ থেকে বিবরণ শুনে লা'শটি এখান থেকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করলো। আশরাফুল তাড়া দিয়ে বলল,

-"প্রভা আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে শপিং মলে। ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে।"


প্রচন্ড আক্রোশের সাথেই ইলান চেঁচিয়ে উঠলো,

-"হোয়াট? এই তোর বোন কি রাত ছাড়া বের হতে পারেনা? সবসময় ও রাত করে কোথাও বের হবে বা ফিরবে। এই মেয়েটার দিকে দেখ? দেশের অবস্থা কিছুই কি নজরে পড়ছেনা? ওর কথা বাদই দিলাম, তুই? তোর কোনো কমন সেন্স নেই। বোনকে সামলাতে পারিস না? ব্যাটা কা'পুরুষ"


শেষ কথাটি দাঁতে দাঁত চেপেই বলল ইলান। 

আশরাফুল তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

-"এখন আমি যাই। অপেক্ষা করে আছে আমার বোনটা।"


ইলান রা'গের চো'টে আর কথা বললনা। আগামীকাল জিজ্ঞাসাবাদে আশরাফুলকে থাকতে হবে। যেহেতু লা'শটি তার গাড়ির সামনেই পড়েছিলো। 


আশরাফুল স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে শপিংমলে পৌঁছেছে। রাস্তায় দু'একজন মানুষকে দেখা যাচ্ছে। সমস্ত কার্যাদি শেষে বিছানায় শরীরটুকু এলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ফিরছে সবাই। মলের সামনে একপাশে প্রভাতিকে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কলিজায় পানি ফিরে এলো। প্রভাতি এগিয়ে এসে গাড়িতে চড়লো। মুখ ঝামটা মেরে বলল,

-"তুমি না আসতে, এটাই ভালো ছিলো। একঘন্টা যাবত অপেক্ষা করিয়েছো আমায়। ভাবি যে কিভাবে তোমাকে সহ্য করে? বিরক্তকর মানুষ।"


বোনকে সুস্থসবল পেয়েছে এতেই শান্তি। তাই চুপচাপ প্রভাতির সব কথা হজম করে নিলো আশরাফুল। 


ভাইবোন রাতে বাসায় ফিরেই দেখলো এলাহিকান্ড।

আনোয়ারা জাহান রান্নাঘরের হাঁড়ি-পাতিল ছো'ড়াছু'ড়ি করছেন। নিচের বিল্ডিং এর মোহনা এসে সাইফার কথা জিজ্ঞেস করলো। 

-"আন্টি ভাবি কবে আসবে?"


এরপর থেকেই শুরু। মেয়েটা ভ'য় পেয়ে চলে গেলো।আনোয়ারা জাহান সাইফার কথা শুনেই মোহনার উপর অযথা চেঁচামেচি করলেন। রান্নাঘর থেকে হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে ছুঁ'ড়ে মা'রছেন। স্বামী মা'রা যাওয়ার পর থেকেই মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। সব সময় সুস্থই থাকেন। হুট করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রতিবার যেকোনো একজনের প্রতি উনার ক্ষো'ভ জন্মে। চিকিৎসা চলছে, কিন্তু খুব একটা উপকার হচ্ছেনা। আবার ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময় টাতে অতিরিক্ত ঠান্ডা আর টক খাবার বেশি খান। এবার সাইফার প্রতি ক্ষো'ভ দেখে আশরাফুল আগেই চাইছিলো সাইফাকে তার বাবার বাড়ি রাখতে। সাইফা এখন অন্তঃসত্ত্বা। এসবে তার উপর মানসিক প্রভাব পড়বে। তারউপর কখন কি ছুঁ'ড়ে মা'রেন আনোয়ারা বেগম। কোনোভাবে পেটের উপর আ'ঘাত লাগলে কি হবে ভাবতে পারছেনা আশরাফুল। সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো সাইফাকে বাবার বাড়ি রেখে আসবে।


সাইফার যাওয়ার কথা তুলতেই আনোয়ারা জাহান না করে দিলেন। এ সময় মায়ের কথার বিপরীতে কিছু বললে মা আরও ক্ষে'পে যাবেন। একদিকে স্ত্রী-সন্তান, অন্যদিকে মা। মা তাকে জন্ম দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, আর স্ত্রী তার শারিরীক মানসিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাবা হওয়ার আনন্দ দেবে। কারো গুরুত্বই কম নয়। কাউকেই ছাড়তে পারবেনা আশরাফুল।

তাই সেদিন সুযোগ পেতেই হাত ছাড়া করেনি। সাইফাকে বাবার বাড়ি দিয়ে আসার মোক্ষম সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে। 


প্রভাতিকে রুমে পাঠিয়ে আশরাফুল ব্যস্ত হয়ে পড়লো মাকে সামলাতে। মা যেমনই হোক, সে তো মা'ই।


পরেরদিন প্রভাতি সাইফার নাম্বারে কল দিলো তার খোঁজখবর নিতে।

একপর্যায়ে সাইফা বলল,

-"সেদিন বিয়ের চমকটা কেমন ছিলো? আমি এখানে আসার দুদিন আগেই শুনেছি, মা বলছিলেন ছেলেটার সাথে তোমার দেখা করিয়ে দেয়ার কথা।"


প্রভাতি নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল,

-"একদমই বাজে ছিলো।"


সাইফা খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল,

-"ইশ! কাছে নেই বলে তোমার চেহারা দেখার দারুণ মুহূর্তটা মিস করে গেলাম।"


——————


সকাল সকাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আশরাফুলকে ডাকা হলো। যে মেয়েটি মা'রা গিয়েছে তার নাম তুর্শি। তার পরিবারকে খবর দেওয়া হলো। আপাতত তুর্শির ম'রদেহ পোস্টমর্টেম এর জন্য পাঠানো হয়েছে।

আশরাফুলকে জিজ্ঞাসাবাদের পর সে ইলানের সাথে কিছু কথা শেষ করে বেরিয়ে পড়ে। কে'সের ত'দন্তের ভার এসে পড়ে ইলানের উপর। ইলানের আন্ডারে সে সহ পাঁচজন আছে। ইলান ক্রাইম ব্রাঞ্চের লোক। আপাতত তুর্শির বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হলো ইলান, মুনির, শিহাব, নাজমুল, তনুশ্রী। 

তুর্শির বাড়ির সকলকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করেই বাসায় ফিরবে।


তুর্শির বাবা স্বপন মির্জা মেয়ে হারিয়ে শান্ত, নিরব হয়ে পড়েছেন। উনার স্ত্রী মেয়ের শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। যেনো বাড়ি নয়, স্তব্ধপুরীতে এসেছে ইলান। জহুরি নজরে ইলান সহ পাঁচজন অফিসার সবকিছু পরোখ করছে। ইলান স্বপন মির্জার মুখোমুখি বসলো। স্টেটকাট কথা বলল,


-"আপনার মেয়ে কবে নিখোঁজ হয়েছিলো?"


সময় নিলেন না স্বপন। তিনি জানালেন,

-"গত পরশু সকালেই বেরিয়েছে স্কুলের উদ্দেশ্যে। সেদিন বিজনেসের কিছু কাজ সেরে ওর স্কুলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। স্কুলের ভেতর ঢুকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তুর্শি স্কুলে আসেনি। প্রচন্ড অবাক হলাম আমি। আমার মেয়ে তো কখনো এমন কাজ করেনা, সবসময়ই বাবা মায়ের বাধ্য মেয়ে ছিলো। ভাবলাম বাড়ি ফিরলেই জেরা করবো। কিন্তু সারাদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও তুর্শি বাড়ি ফেরেনি।"


ইলান তীক্ষ্ণচোখে তাকালো স্বপন মির্জার দিকে। 

-" আপনার মেয়ে বাড়ি থেকে বের হলো স্কুলে যাবে বলে। আপনি খোঁজ নিয়ে জানলেন মেয়ে স্কুলে যায়নি। সারাদিনেও বাড়ি ফেরেনি। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো আপনি বা আপনার পরিবার মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে কোনো পুলিশ কমপ্লেন করেন নি। তারউপর আপনি একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি। ভাবনার বিষয়, মোটেও ফে'লে দেওয়ার মতো ব্যাপার নয়।"


স্বপ্নন মির্জাকে বেশ অপ্রস্তুত দেখালো, যা কারোরই চোখ এড়ালোনা। 

স্বপন মির্জার চ্যালা জহির বলল,

-"স্যারের একটা ইমেজ আছে সমাজে। তার মেয়ে নিখোঁজ, হুট করেই ব্যাপারটা ছ'ড়া'ছড়ি হয়ে গেলো। স্যারের ইমেজের উপর একটা ছাপ পড়তো না?"


জুনিয়র অফিসার মুনির বলল,

-"উনার মেয়ে আগে, নাকি ইমেজ?"


স্বপ্নন মির্জা নিজেকে ধাতস্থ করে বললেন,

-"আমি পুলিশকে না জানিয়ে ব্যাপারটা নিজেই হ্যান্ডেল করতে চেয়েছি। চারদিকে লোক লাগিয়ে দিয়েছি তুর্শিকে খুঁজতে। কিন্তু খুঁজে পাওয়ার আগেই....


আর কিছু বলতে পারলেননা স্বপন মির্জা। হু হু করে কেঁদে ফেলেন। 

ইলানের জন্য আপাতত এতটুকু ইনফরমেশনই যথেষ্ট। স্বপ্নন মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-"নিজেকে শক্ত রাখুন। যেকোনো ইনফরমেশনের জন্য আমরা আপনার বাড়িতে চলে আসতে পারি। তৈরি থাকবেন।"


ইলানসহ তার আন্ডারের পুরো টিম বেরিয়ে পড়ে। 

তনুশ্রী চিন্তিত কন্ঠে বলল,

-"স্যার! স্বপন মির্জাকে কেমন স'ন্দেহজনক লাগছে না?"


ইলান নাজমুলকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-"প্রত্যেকটা লোককে কড়া নজরে রাখতে হবে। আমরা কিন্তু জানিনা কে আসল কালপ্রিট। হয়তো সভ্য সমাজে সভ্য মানুষের মুখোশ পড়ে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে।"


নাজমুল মনযোগ দিয়ে শুনলো কথাটি।


-"শিহাব, তুমি আজ রাতের ভেতর তুর্শির ফ্রেন্ড সার্কেলের সমস্ত ইনফরমেশন জোগাড় করে আমাকে মেইল করবে।"


ইলান আর কাউকেই কিছু বললোনা। আপাতত সবাই নিজ নিজ বাড়ি ফিরে গেলো। 

বাসায় ফিরেই লম্বা একটা শাওয়ার নিলো ইলান। 

প্রভাতি চিংড়ি মাছের তরকারি নিয়ে ইলানের বাসায় নক করলো। ওর মা পাঠিয়েছে।

কলিংবেলের শব্দে চুল মুছতে মুছতে ইলান এসে দরজা খুলে দিলো। ইরতিজা ব্যস্ত থাকায় ইলানকেই দরজা খুলতে হলো।


এমনিতেই প্রভাতির উপর রা'গ চড়ে আছে, দরজা খুলে তাকে দেখতেই ইলান কাঠকাঠ স্বরে প্রশ্ন করলো,

-"কি চাই?"


ইলানের প্রশ্নে থতমত খেলো প্রভাতি। চোখ গিয়ে স্থির হলো ইলানের ভেজা পেটানো শরীরে। বুক টা'নটা'ন করে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের বাঁ পাশে খানিকটা উপরে একটা গাঢ় তিল। প্রভাতির বেহায়া চোখজোড়া সেখানে গিয়েই আটকে গেলো।

প্রভাতির থেকে কোনো প্রকার রেসপন্স না পেয়ে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বাঁকা হাসলো ইলান।

হালকা ঝুকে প্রভাতির মুখের সামনে চোয়াল এগিয়ে নিলো।

-"ইন্টারেস্ট জাগছে? চাইলে ছুঁ'য়ে দেখতে পারো।"


প্রভাতি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। আমতা আমতা করে রাগ দেখানোর ভঙ্গিতে বলল,

-"একদম ফা'লতু কথা বলবেনা। অ'সভ্য লোকের সবসময় অ'সভ্য কথা।"


 তরকারির বাটি ইলানের হাতে জোর করে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

-"এটা আন্টির জন্য মা পাঠিয়েছে।"


ইলান তরকারির বাটি হাতে নিয়ে প্রভাতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ক্রুর হেসে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

-"বাটি নিতে দাঁড়িয়ে আছো, নাকি আরেকটু দেখার জন্য?"


প্রভাতি নাক ফুলিয়ে চলে গেলো। ইলান মিটিমিটি হেসে দরজা বন্ধ করে দিলো।


রাতে শিহাবের পাঠানো ইমেইল চেক করতে স্ক্রিনে ট্যাপ করলো ইলান। ইমেইল চেক করার পরই কপালে ঢেউ খেলানো ভাঁজ পড়লো।


"তুর্শির সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড মনি আজ বিকেল থেকে মিসিং।"


————


অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী প্রভাতি। আজ ইম্পরট্যান্ট ক্লাস এটেন্ড করার জন্যই তৈরী হয়ে আশরাফুলের সাথে একই গাড়িতে বের হলো। বন্ধুদের সাথে ভার্সিটি থেকে বেশ কিছুদূর কাঁঠালীজঙ্গল ঘুরতে গেলো। কাঁঠালীজঙ্গল নাম হলেও কোনো কাঁঠাল গাছের ধোঁয়া-ছোঁয়া ও দেখতে পেলোনা প্রভাতি। জঙ্গল ঘুরতে ঘুরতে প্রভাতি একসময় বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে গেলো। পিছু ফিরে বুঝলো আশেপাশে কেউ নেই। সে বেশ গভীরে চলে এসেছে। বুকে সাহস সঞ্চার করলো। তাকে তো এখান থেকে বের হতে হবে। ভ'য় পেলে চলবেনা। একসাথে চারপাঁচটা পথ। বের হওয়ার পথ খুঁজতে খুঁজতে আরও ভেতরের দিকে চলে গেলো প্রভাতি।


নিয়ন, তন্ময়, রিজু প্রভাতিকে সাথে না দেখে ঘাবড়ে গেলো। তিনজনে জোরে জোরে ডেকেও কোনো সাড়া পেলোনা। হন্যে হয়ে তিন বন্ধু একসাথে খুঁজে যখন পেলোনা, তখনই নিয়ন হাঁপানো গলায় বলল,

-"আমার মনে হয় আশরাফুল ভাইয়াকে ব্যাপারটা জানানো উচিত।"


রিজু নিয়নের কথায় বিরক্তি হয়ে উঠলো। এমনিতেই ভ'য়ে গলা শুকিয়ে আছে। প্রভাতির কিছু হলে আশরাফুল ভাই ওদের ছে'ড়ে দেবেনা।

-"তোদের মাইয়া মানুষের মাথায় সব গোবর। তুই কি আশরাফুল ভাইকে খবর দিয়ে বি'পদ বাড়াতে চাস? গবেট কোথাকার।"


তন্ময় বিজ্ঞদের মতো বলে উঠলো,

-"নিয়ন ঠিকই বলেছে। আশরাফুল ভাইয়াকে ব্যাপারটা জানানো উচিত। আল্লাহ না করুক, যদি কোনো ধরনের দু'র্ঘনা ঘটে যায়? ঘটনা ঘটে গেলেতো আমরা প্রভাতির ক্ষ'তি এড়াতে পারবোনা। ভাইয়াকে খবর দিয়ে তিনি আসতে আসতে আমরা আরেকটু খুঁজে দেখি।"


রিজু এবার মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। তন্ময় আশরাফুলের নাম্বারে ডায়াল করলো। এখনি ভ'য়ে গলা শুকিয়ে আসছে নাজানি আশরাফুল ভাই কি রিয়েক্ট করে? রিজু আর সে সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে প্রভাতিকে নিয়ে এসেছে। অথচ অল্প কিছুক্ষণেই কি থেকে কি হয়ে গেলো?


#চলবে.......


(অনেকেই কাহিনিটি বুঝতে পারছেননা। আমি প্রথমেই বলে দিয়েছি গল্পটিতে রহস্য থাকবে। এখন টু'করো টু'করো কাহিনী পড়ে হয়তো বুঝতে পারছেননা কি থেকে কি হচ্ছে? সামনের দিকে সব খোলসা হবে। সমস্ত ঘটনা গিয়ে একটা জায়গায় মিলিত হবে। তাই যারা এখন কাহিনি বুঝতে পারছেননা, বা যারা অপেক্ষা করতে পারবেননা তারা গল্পটি শেষ হলে পড়ুন। আজকের পর্ব পড়ে মন্তব্য করার অনুরোধ রইলো। ভুল ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেবেন। হ্যাপি রিডিং।)#কুয়াশায়_ঘেরা

#পর্ব_০৪

#জিন্নাত_চৌধুরী_হাবিবা


-"স্যার, তুর্শির পোস্টমর্টাম রিপোর্টে এসেছে শি ইজ নন-ভার্জিন?"


মুনিরের কথায় ইলানের খুব একটা ভাবাবেগ হলো বলে মনে হচ্ছেনা। ব্যাপারটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। যে তুর্শিকে মা'র্ডার করেছে এটাও হয়তো তারই কাজ। তাছাড়া মেয়েটাকে রাস্তায় ন'গ্ন অবস্থায় ফে'লে যাওয়া হয়। শরীরে সমস্ত আ'ঘাতের চিহ্নই বলে দিচ্ছে ধারালো কিছু দিয়ে কু'পিয়ে মারা হয়েছে। কিন্তু ১৬ বছরের এই বাচ্চা মেয়েটার সাথে কারো কি এমন শ'ত্রুতা থাকতে পারে তার রহস্য উন্মোচন করা গেলোনা। 

তুর্শির পরপরই তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী মনি মিসিং। তাহলে কি মনি তুর্শির ব্যাপারে কিছু জানতো? 


কপালে দু’আঙ্গুল চেপ রেখে বাঁ ভ্রু উঁচু করে শিহাবকে প্রশ্ন করলো ইলান,

-"মেয়েটার বন্ধুমহলের বাইরে বাড়িতে ক্লোজ কে কে ছিলো?"


শিহাব চট করেই উত্তর দিলো,

-"স্যার, তাদের বাসারই একজন সারভেন্ট। মেয়েটা বেশির ভাগ সময়ই তুর্শির সাথে কাটাতো।"


-"তুমি, তনুশ্রী, মুনির তিনজনই তুর্শির বাড়ি যাবে। বাড়ির সারভেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। আপাতত নাজমুলকে দিয়ে আমার কাজ আছে।"


————————


তন্ময়ের ফোন পেয়েই আশরাফুল ফ্যাক্ট্রি থেকে ছুটে এসেছে। তন্ময়, রিজু, নিয়ন তিনজনকেই দেখতে পেলো। কিন্তু তার বোন নেই। 

একটাই আদরের বোন। প্রভাতির জন্মের পর সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলো আশরাফুল। প্রচন্ড ভালোবাসে বোনকে। বাবা মা'রা যাওয়ার পর থেকে বোনের প্রতি ভালোবাসা যেনো আরও বেড়ে গেলো। একজন বড় ভাই থাকা মানে তুমি বাবা সমতুল্য ছায়ার আদলে আছো। আশরাফুলকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ দেখা গেলো। চেঁচিয়ে উঠে বলল,


-"আমি তোমাদের উপর ভরসা করে প্রভাকে তোমাদের সাথে পাঠিয়েছি। আর তোমরা কি করলে? একটা মেয়ের খোঁজ রাখতে পারলেনা? চারজন তো একই সাথে বেরিয়েছিলে, তাহলে একজন মিসিং হয় কিভাবে?"


প্রত্যেকে আশরাফুলের চেঁচামেচিতে ভয়ে তটস্থ হলো। কেউ মাথা তোলার সাহস করলোনা। নিয়নের চোখে পানি। থেকে থেকে ফুঁপিয়ে উঠছে।

তন্ময় মাথা নিচু রেখেই বলল,

-"ভাইয়া আমাদের যা শাস্তি দেবেন, আমরা মাথা পেতে নেবো। কিন্তু প্লিজ আগে প্রভাকে খুঁজে বের করা জরুরি।"


এতক্ষণে আশরাফুলের হুশ ফিরলো। সে এখানে এসেছে যে কাজে তা সম্পন্ন না করে অযথাই চেঁচামেচি করছে। আশরাফুল কাউকে কিছু না বলে ফোন লাগালো ইলানের নাম্বারে। দু'দুবার রিং হয়ে কে'টে গেলো। মেজাজ বিগড়ে গেলো আশরাফুলের। প্রয়োজনের সময় কলে পাওয়া যায়না। তাই একটা টেক্সট পাঠিয়ে ছুটে গেলো জঙ্গলের ভেতর। তার দেখাদেখি তন্ময়, নিয়ন, রিজু ও পিছু নিলো। কিছুদূর গিয়েই পা জোড়া থামিয়ে ফেললো আশরাফুল। আকাশে তাকিয়ে দেখলো সন্ধ্যা নামতে বেশি দেরি নেই। পিছু ফিরে একবার নিয়নের দিকে তাকিয়ে তন্ময়কে উদ্দেশ্য করে বলল,

-"নিয়নকে বাসায় পৌঁছে দাও। ওর এখানে থাকা সেফ না। নাকি এই দায়িত্ব টুকুও পালন করতে পারবেনা।"


তন্ময় মাথা নিচু রেখেই বলল,

-"পারবো ভাইয়া। আমি দিয়ে আসছি নিয়নকে।"


নিয়ন ব্যাগড়া দিয়ে বলল,

-"আমি বাসায় যাবো না। প্রভাকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমি কোথাও যাবোনা।"


আশরাফুলের ধমকে পিলে চমকে উঠলে সবার।

-"বড় হয়েছো তুমি। বিবেকহীনের মতো কথা বলে যাচ্ছো। এখানে আমরা সবাই ছেলে, একেকজন একেকদিকে ঢুকে পড়বো। এই মুহূর্তে তোমাকে সাপোর্ট দেওয়ার মতো মুড কারো নেই। আকাশে তাকিয়ে দেখো সন্ধ্যা নামছে। তোমার পরিবার নিশ্চয়ই টেনশন করবে? সোজা বাসায় যাও।"


আশরাফুলের ভাবনা দেখে প্রত্যেকে মুগ্ধ হলো। নিজের বোন বি'পদে আছে জেনেও অন্য আরেকটি মেয়েকে সেফ রাখার চিন্তা তার মাথা থেকে যায়নি। অথচ তারা বন্ধু হয়েও বন্ধুকে দেখে রাখতে পারেনি।


তন্ময় নিয়নকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো জঙ্গল থেকে। আশরাফুল আর রিজু ভেতরে ঢুকে পড়লো। ভেতরের দিকে আসায় ফোন নেটওয়ার্ক শূন্য হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়বার ইলানকে ট্রই করতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। 


পথ যেনো শেষই হচ্ছেনা। কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে প্রভাতি বুঝতে পারছেনা। সন্ধ্যা নামছে। এতক্ষণ নিজেকে সাহস জোগাতে পারলেও এই মুহূর্তে আর সাহস ধরে রাখতে পারছেনা। 

সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়লো। রক্তিমা আভা কে'টে গিয়ে অন্ধকার ঠাঁই পেলো অন্তরিক্ষে। একাকী নির্জন ঘন জঙ্গলে, গাছের ডালপালা আলো আসতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো। এতে করে জঙ্গলে আরও অন্ধকার দেখা গেলো। কয়েকবার ফোনে সবাইকে ট্রাই করে দেখেছে। জঙ্গলের ভেতরে চলে যাওয়ায় নেটওয়ার্কের দেখা পেলোনা। 

গাছের শুকনো পাতা ঝরে পড়ার শব্দে গা চমচম করে উঠলো। এবার ভীষণ কান্না পেলো প্রভাতির। মনে হচ্ছে এখনই সে মা'রা যাবে। আর কখনো মা আর ভাইয়ের চেহারা দেখতে পাবেনা। ঘন লতাপাতার ঝোপ থেকে কেমন আর্তনাদের শব্দ ভেসে আসছে। প্রভাতি আৎকে উঠলেও কৌতুহলের বশে সেদিকে এগিয়ে গেলো। শুকনো পাতায় পা পড়াতে মড়মড়ে আওয়াজ হচ্ছে। সাবধানে পা ফেললো প্রভাতি। ঝোপের কাছে গিয়েই থেমে গেলো। ভেতরে মনে হচ্ছে একজন মানুষকে দেখা যাচ্ছে। প্রভাতি স্বস্তি পেলো। লোকটিকে বললে হয়তো তাকে এখান থেকে বের করে দেওয়ার পথ বলে দেবে। পরোক্ষণেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে গেলো। যদি লোকটি ভালো না হয়? তার সাথে জবরদস্তি করতে চায়? মুহূর্তেই মনে হলো সে তো এখানে কারো আর্তনাদে গুঙিয়ে ওঠার শব্দ পেয়ে এদিকে এসেছে। ভালো করে মনযোগ দিতেই দেখতে পেলো লোকটি কিছু একটা কু'পিয়ে যাচ্ছে। ঝট করেই প্রভাতি বসে পড়লো ঝোপের আড়ালে। পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে দৃষ্টি মেলে যা দেখলো তাতে পুরো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। থরথর করে কাঁপছে শরীর। নিজেকে এখান থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার শক্তি পাচ্ছেনা। তবে এই দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখলেও আতঙ্কে নির্ঘাত তার মৃ'ত্যু হবে।


লোকটির চেহারার একপাশ আবছা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে। স্পষ্ট নয়। দেখে বোঝা যাচ্ছে একটা মেয়েকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত কুড়াল দিয়ে কু'পিয়ে যাচ্ছে।

একপর্যায়ে প্রভাতি অনুভব করলো অতিরিক্ত ভ'য়ে তার শরীরের তাপমাত্রা তরতর করে বেড়ে যাচ্ছে। বিভ'ৎস দৃশ্য দেখে বমি বমি ভাব হচ্ছে। যে করেই হোক এখান থেকে যাওয়া প্রয়োজন। কোনোভাবে নিজের শরীরটাকে টে'নেহিঁ'চড়ে দৌঁড়ে পালাতে চাইলো। 


অজ্ঞাত ব্যক্তির মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠলো। এতক্ষণ পাতার মড়মড়ে শব্দ পেলেও গুরুত্ব দেয়নি। কারণ এই ঘন জঙ্গলে কোনো মানুষ আসবেনা। কিন্তু এবার স্পষ্টভাবে কারো পদধ্বনি শুনতে পেলো। 

মেয়েটাকে সেখানে রেখেই ছুটে বেরিয়ে এলো। সচেতনতা অবলম্বনে মুখে মাস্ক এঁটে কালো হুডি দিয়ে মাথা ঢেকে নিলো। সামনে আসতেই দেখতে পেলো একজন মেয়ে ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে। অজ্ঞাত ব্যক্তি তার পিছু ছুটলো। কিছুদূর যেতেই মনে হলো অনেকগুলো পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ব্যক্তিটি আর এগোলোনা। নিজেকে বাঁচাতে লুকিয়ে পড়লো। 

প্রভাতি ছুটতে ছুটতে একপর্যায়ে ধপ করেই পড়ে গেলো। শ্বাস ওঠানামা করতে করতে একপর্যায়ে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলো। চোখজোড়া নিভু নিভু হয়ে আসছে। তখনই দেখতে পেলো কয়েকজোড়া পা তার দিকে এগিয়ে আসছে। কষ্ট করে চোখের পাতা টেনে খুলে দেখার চেষ্টা করলো পায়ের মালিকগুলোকে।

আশরাফুল ফোনের ফ্ল্যাশ তাক করে প্রভাতিকে দেখতে পেয়ে আর দেরি করলোনা। বোনকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। এতক্ষণ যেনো প্রভাতি প্রাণ ফিরে পেলো। সে নিশ্চিন্ত মনে আশরাফুলের বুকে শরীরের ভর ছেড়ে দিলো। জ্ঞান হারায়নি, তবে চোখ খোলার শক্তিও পাচ্ছে না। শুধু হাতের ইশারায় পেছনে দূরের ঝোপের দিকে ইশারা করলো। ইলান রিজুকে আশরাফুলের কাছে রেখেই নাজমুলকে নিয়ে সাবধানী পায়ে এগিয়ে গেলে ঝোপের দিকে। 

বিধ্বস্ত, বি'ভৎস অবাস্থায় তুর্শির বান্ধবী মনি'র নিথর দেহখানা দেখেই চমকে উঠলো নাজমুল। কিন্তু ইলানের মুখভঙ্গি পরিবর্তন হলোনা। ব্যাপারটা তার উপর প্রভাব ফেলেছে কিনা বোঝার উপায় নেই। তবে চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সে। 


প্রভাতিকে বুকে নিয়ে আশরাফুল বুঝতে পারলো তার বোন কোনকিছু নিয়ে অতিরিক্ত ভ'য় পেয়েছে বলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। প্রভাতিকে নিজের সাথে আরেকটু মিশিয়ে নিয়ে কপালে গাঢ় করে চুমু খেলো আশরাফুল। গলগল করে বমি করে আশরাফুলের শার্ট ভিজিয়ে দিলো প্রভাতি। পরপর দুবার বমি করলো। এখন এই শার্টের উপর প্রভাতিকে রাখা যাবেনা। এতে ওর গাল, চুল বমিতে ভরে যাবে। আশেপাশে পানিও পাওয়া যাবেনা এখন। 


ইলান লা'শটা এখান থেকে নেওয়ার জন্য নাজমুলকে পাঠিয়ে দিলো জঙ্গল থেকে বাহিরে। নেটওয়ার্ক পেলেই তাদের টিমকে কল দিয়ে জানিয়ে দেবে।

নাজমুলকে নিয়ে একবার তুর্শির পোস্টমর্টাম করা ডক্টরের সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলো ইলান। মাঝপথে দু'বার কল আসায় ধরতে পারেনি। পরোক্ষণে ফ্রী হয়ে ফোন চেইক করতেই আশরাফুলের টেক্সট দেখতে পেলো। আর দেরি করলোনা। ডক্টরের সাথে দেখা করা ক্যান্সেল করে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলো। 


ইলান আশরাফুলের কাছে ফিরে আসতেই দেখতে পেলো আশরাফুলের অবস্থা বমিতে মাখোমাখো। বেচারা বউয়ের বমিতেও মাখামাখি হয়েছে, এখন বোনের বমিতেও। ইলান বলল,

-"আমি ওকে ধরছি, তুই শার্টটা খুলে ফেল।"


রিজু বলল,

-"ভাইয়া আমার ভেতরে টিশার্ট আছে। আপনি আমার শার্টটা আপাতত পরুন।"


নিজেকে পরিষ্কার করা জরুরি। প্রভাতিকে সামলাতে হবে ভেবে ইলান আর রিজুর কথায় সায় জানালো আশরাফুল। 

প্রভাতির মাথাটা আস্তে আস্তে উঠিয়ে ইলানের বাহুতে ঠেকিয়ে দিয়ে আশরাফুল শার্ট খুলে ফেললো।


প্রভাতির মাথা বাহু থেকে ধপ করে বুকে গিয়ে পড়লো। তড়াক করে উঠলো ইলান। মনে হচ্ছে তার অস্বাভাবিক হৃদকম্পন হচ্ছে। প্রভাতির শরীরের তাপমাত্রায় বুকটা জ্বলে যাচ্ছে। ভেতরটা উত্তপ্ত প্রণয়ের আগুণে ঝল'সে যাচ্ছে। প্রভাতি পড়ে যেতে নিলেই ইলান একহাত নিয়ে প্রভাতির পিঠে রাখে। বুকের সাথে আগলে নিয়ে চোখ বুঝে ফেলে। এই শান্তিটুকু সে সারাজীবনের জন্য চায়। সারাজীবনের জন্য। অথচ মেয়েটা তার প্রণয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়না। 


শার্ট বদলে নিয়ে আশরাফুল প্রভাতিকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিলো। ঘাড় আর হাঁটুর নিচে হাত রেখে কোলে তুলে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। জঙ্গলের বাইরে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে কদম ফেললো। ইলান জানালো সে পরে আসবে। লা'শের ব্যাপারে খুলে বলতেই আশরাফুল নিশ্চিত হলো তার বোন কি দেখে ভ'য় পেয়েছে। আপাতত প্রভাতির সুস্থ হওয়ার পালা। পরে এসব জিজ্ঞেস করা যাবে। 


আশরাফুল আর রিজু প্রভাতিকে নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই ইলান আশেপাশে তীক্ষ্ণ চোখে দৃষ্টি ঘোরালো। মা'র্ডারার নিশ্চিত প্রভাতিকে দেখে নিয়েছে। এমই মুহুর্তে সে প্রভাতির ক্ষ'তি করার চেষ্টা করবে। প্রভাতির সিকিউরিটি নিশ্চিত করা জরুরি। ইলান পা চালিয়ে ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেলো।


#চলবে.......


(ভুল ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইলো। হ্যাপি রিডিং।)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url