#বিষাক্তফুলের_আসক্তি
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
পর্ব-০৪ =০৫
আবার ফোন বেজে উঠলে স্কিনে তিতির নামটা দেখে পৈশাচিক হাসি ফোটে উঠলো লোকটার ঠোঁটের কোণে।
কেমন আছিস বোন ?
বিতৃষ্ণায় মুখ কুঁচকে গেলো তিতিরের। ঝাঁঝালো গলায় বললো, আপনার মুখে বোন শব্দটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট শব্দ মনে হচ্ছে। দয়া করে এমন পবিত্র একটা সম্পর্ক আপনার নোংরা মুখে নিয়ে অপবিত্র করবেন না।
তিতিরের কথায় উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো লোকটি, আচ্ছা নিলাম না এই শব্দ। তো কেমন কাটলো খান ভিলায় প্রথম রাত ?
ঘৃণায় কথা বলতে ইচ্ছে করছে না এই লোকের সাথে কিন্তু তিতিরের আর কোনো পথ খোলা নেই।
আমার বোনু কোথায় ? আমি তো আপনার কথা অনুযায়ী সবকিছু করেছি। আমাদের দুই বোনের সমস্ত প্রোপার্টি এখন আপনাদের। তাজ স্যারের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে। এবার আমার বোনুকে ফিরিয়ে দিন।
সেটা তো এখনই সম্ভব নয় তিতিরপাখি।
তিতির এবার রেগে বলল, আর কত নিচে নামাবেন আমাকে ? নিজের বোন না হলেও আপনার সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক। নিজের রক্তের সাথে আর কত বেইমানি করবেন।
বোন হয়ে ভাইয়ের এতটুকু কাজ করে দিতে পারছিস না ?
কে ভাই, আপনি ? আমার কোনো ভাই নেই। এই পৃথিবীতে আমার একটা বোন ছাড়া আর কেউ নেই। যেই বোনটাকেও আপনি কেড়ে নিয়েছেন আমার থেকে।
চিন্তা করিস না, পাখি যেখানে আছে ভালো আছে। তুই যতক্ষণ আমার কথা মতো চলবি ততক্ষণ পাখির গায়ে একটা ফুলের টোকাও পড়বে না তার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি তোকে।
আমার বোনুর সাথে কিছু করার কথা স্বপ্নেও ভাববেন না। এই তিতিরের একমাত্র দূর্বল জায়গা তার বোনু। সেখানে আঘাত করলে তার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হবে আমি কল্পনাটও করতে পারবেন না। যে বোনের জন্য তাজের মতো মানুষকে ধ্বংস করতে আমি দু'বার ভাবিনি, মৌ আপুর মতো মানুষের জীবন নষ্ট করেছি। সেখানে আপনাকে ধ্বংস করতে আমি দু সেকেন্ড সময় নিবো না। আহত বাঘিনীর আক্রমন কতটা ভয়ংকর হয় সেটা আপনার জানা আছে নিশ্চয়ই।
তুই যাদের এত মহান মনে করছিস তারা এতটাই মহান তো ? থাক সেসব, তুই আমার কথা মতো চল, আমি আমার কথা রাখবো। কাজ হয়ে গেলে অক্ষত অবস্থায় তোর বোনকে তোর কাছে পৌঁছে দিবো।
ফোন কেটে বেলকনিতে দেয়াল ঘেঁষে নিচে বসে পড়লো তিতির। ফোনের স্কিনে পাখির হাসোজ্জল মুখটা ভাসছে। তিতির হাত বুলিয়ে দিলো বোনের মুখে। আজ পাঁচদিন হলো পাখিকে দেখে না তিতির। আপুনি বলে গলা জড়িয়ে ধরে না কেউ। বাবা-মা যখন খুন হয় তিতিরের বয়স তখন কেবল দশ বছর আর পাখি এক বছরের বাচ্চা। এক বছরের ছোট পাখিটাকে আগলে বড় করেছে তিতির। আপনজনের মুখোশধারী নরপিশাচদের থেকে লুকিয়ে রেখেছে দীর্ঘ পনেরোটি বছর। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। যে প্রোপার্টির জন্য তার বাবা-মাকে খুন করা হয়েছে সেসব তো তিতির দিয়েই দিয়েছে। তারপরও কেনো এই নোংরা খেলায় নামিয়েছে তাকে।
তিতির বিড়বিড় করে বললো, তুই চিন্তা করিস না বোনু আমি তোর কিচ্ছু হতে দিবো না। মিস্টার চৌধুরী এবার বুঝবে কার সাথে খেলছে। একবার তোকে পেয়ে যাই। চৌধুরীদের পাপের শাস্তি দিয়ে তবেই তোকে নিয়ে দূরে চলে যাবো। বাবা-মায়ের খুনের প্রমাণ আমার কাছে থাকলেও কখনো সাহস হয়নি শাস্তি দেওয়ার। কিন্তু এবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এদের শাস্তি না দিলে বারবার আমাদের জীবনে বিষাক্ত ছোবল দিবে। তবে যাওয়ার আগে স্যার আর মৌ আপুর জীবন গুছিয়ে দিয়ে যেতে হবে। আমি তাদের জীবনে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো সব এলোমেলো করে দিয়েছি আবার আমিই সব ঠিক করে দিবো। একটু সময়ের প্রয়োজন শুধু।
নানা রকম চিন্তা করতে করতে একসময় বেলকনিতে ঘুমিয়ে পড়লো তিতির।
আজ পাঁচটি রাত ধরে ঘুম নেই তার চোখে। তাজের প্রতি তিতিরের ভালোবাসা অপ্রকাশিত। পাখির পর পৃথিবীতে এই একজনকে সে ভালোবেসেছে। কিন্তু কখনো প্রকাশ করেনি, কখনো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেনি। তিতির তাজকে দেখতো তাজের থেকে লুকিয়ে। পাঁচদিন আগেই তাজ আর মৌয়ের বিয়ের কথা জানতে পারে। প্রথম একটু কষ্ট হলেও পরে নিজেকে সামলে নেয়। তাজ তার নয়, তাজ তার জীবনে একটা না ছোঁয়া স্বপ্ন। মৌকে তার ভালো লেগেছে তাজের স্ত্রী হিসাবে, মেয়েটা খুব ভালোবাসে তাজকে। এ নিয়ে বেশ খুশি হয়েছিলো তিতির। আগামী দশদিন বিয়ের জন্য তাজের অফিশিয়ালি কাজের চাপ কম তিতিরের উপর। বোনুকে অনেকটা সময় দিতে পারবে ভেবে খুশি মনে চকলেট, আইসক্রিম নিয়ে ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখে পুরো ফ্ল্যাট এলোমেলো হয়ে পরে আছে। পাখিকে দেখাশোনা করা মেয়েটাও উধাও। পুরো ফ্ল্যাট খোঁজে পাখির অস্তিত্ব না পেয়ে ভয় পেয়ে যায় তিতির। কী করবে বুঝে উঠার আগেই ফোন বেজে উঠে। বার কয়েক রিং হবার পর তিতিরের হুঁশ ফিরে। ফোনটা ছিলো মিস্টার চৌধুরীর, তখন থেকে তিতির তার হাতের পুতুল।
৫.
মৌ দরজাটা খোল মা।
উঠে গিয়ে দরজা খোলার মতো শক্তি মৌয়ের অবশিষ্ট নেই। গতরাতে কতটা সময় বাথটবে ডুবে ছিলো সে হিসাব নেই তার কাছে। প্রচন্ড শীত অনুভব হতেই উঠে এসে কোনোরকমে চেঞ্জ করে বেডে শুয়েছে ব্ল্যাঙ্কেট মুড়ি দিয়ে। অনেকটা সময় ডাকাডাকি করার পরও মৌয়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভয় পেয়ে গেলো মৌয়ের মা রেহেনা খন্দকার। স্বামীকে ডেকে এনে চাবি দিয়ে রুমের লক খুললেন। মেয়েকে শুয়ে থাকতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও কাছে গিয়ে আঁতকে গেলেন। শীতে কাঁপছে মেয়েটা, কপালে হাত রাখতেই চমকে উঠলেন।
স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, জ্বরে তো শরীর পুড়ে যাচ্ছে।
মহিবুল রহমান ব্যস্ত গলায় বললো, তুমি ওর কাছে বসো আমি ডাক্তারকে ফোন দিচ্ছি।
মিতা মিতা কোথায় তুই ?
ড্রয়িংরুম থেকে আওয়াজ আসতেই মৌয়ের বাবা-মা একে অপরের দিকে তাকালো। এত সকালে কে এসেছে বুঝতে পারছে না।
রেহেনা মহিবুলের দিকে তাকিয়ে বললো, তুমি গিয়ে দেখো কে এসেছে।
মহিবুল বের হয়ে গেলো রুম থেকে। রেহেনা ওয়াশরুমে গেলেন পানি আনতে, মাথায় পানি দেওয়ার জন্য। ওয়াশরুমের ফ্লোরে ভেজা বেনারসি দেখে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন। এক বালতি পানি নিয়ে রুমে এসে মেয়ের মাথায় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে লাগলেন।
আন্টি মিতার জ্বর এলো কীভাবে ?
পেছন থেকে আওয়াজ আসতেই রেহেনা ঘুরে তাকালেন দরজার দিকে। দরজার সামনে রায়হান দাঁড়িয়ে আছে। রেহেনার অনুমতির অপেক্ষা না করে রুমে চলে এলো রায়হান।
রেহেনা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো, মেয়েটার উপর দিয়ে যা গেলো। বেঁচে আছে এতেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।
রায়হান মৌয়ের ড্রয়ারে ফার্স্ট এইড বক্স খুঁজতে খুঁজতে রেহেনার কথা শুনে প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, যা গেলো বলতে ?
রেহেনা কিছু না বলে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লেন। রায়হান উত্তর না পেয়ে ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে মৌয়ের কাছে গেলো। বক্সে প্রয়োজনীয় সব পেয়েও গেলো। থার্মোমিটার মুখে পুরে দিলো জ্বর মাপার জন্য।
রেহেনা শান্ত গলায় বললো, তুই দেশে ফিরলি কবে ?
সকাল ছয়টায় ল্যান্ড করেছি। সেখানে থেকে সোজা মিতার সাথে দেখা করতে এলাম।
থার্মোমিটার বের করে দেখলো ১০৩° জ্বর।
আন্টি জ্বর তো অনেক৷ তুমি এক কাজ করো মাথায় পানি দিয়ে শরীরও মুছিয়ে দাও। আমি কিছু মেডিসিন নিয়ে আসছি, খাবারের পর খাইয়ে দিও।
তুই তোর আঙ্কেলকে দে, সে নিয়ে আসবে। তুইও ফ্রেশ হয়ে আয় ব্রেকফাস্ট করবি। মেয়েটার এই অবস্থা, তুই আজ এখানে থাক।
রায়হান কিছুটা সময় চিন্তা করে বললো, ঠিক আছে।
রেহেনা ওয়াশরুমে চলে গেলো মৌয়ের শরীর মুছে দেওয়ার জন্য পানি আনতে। রায়হান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌয়ের শুকনো মুখটার দিকে। তাজ, মৌ আর রায়হান তিনজনই ছোটবেলার বন্ধু। মৌ আর রায়হান ডাক্তার হলেও তাজ আলাদা হয়ে গেছে তাদের থেকে। এক মাসের জন্য দেশের বাইরে ছিলো রায়হান। আজই দেশে ফিরেছে তাই গতকালের কিছুই জানা নেই তার। অজানা কারণে মৌ আর তাজ নিজেদের বিয়ের খবর সবচেয়ে কাছের বন্ধুকেই জানায়নি। তাজ জানাতে চাইলেও মৌ বাঁধা দিয়েছে।
রেহেনা এসে রায়হানকে একইভাবে বসে থাকতে দেখে বললো, কী হলো এখনো বসে আছিস কেনো ? গেস্ট রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আয়। মেডিসিন তোর আঙ্কেলকে আনতে বলে যা।
রায়হান মৌয়ের দিকে একবার তাকিয়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। রেহেনা মৌয়ের শরীর মুছে দিতে লাগলো।
৬.
ফোনের রিংটোনে ঘুম ভেঙে গেলো তাজের। ফোন রিসিভ করে ওপাশের কথা শুনে চোখমুখ শক্ত হয়ে গেলো। নতুন যে মুভির জন্য সাইন করেছিলো সেটা ক্যান্সেল করতে চাইছে পরিচালক। তাজের সাথে কাজ করতে চায় না সে। তার সাথে একপ্রকার ঝামেলা করে ফোন রেখে দিলো তাজ। থম মেরে বসে আছে বেডে। এটা তো হওয়ারই ছিলো, কেবল শুরু তার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার। সকাল সকাল এমন একটা নিউজে সারা শরীর রাগে ফেটে যাচ্ছে তাজের। রেগে সোফার দিকে তাকিয়ে তিতিরকে দেখতে পেলো না। আশেপাশে খোঁজে না পেয়ে বেড থেকে নেমে বেলকনির দিকে গেলো। দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমানো মলিন মুখটা দেখে মায়া হলো না তাজের। তিতিরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে গাল চেপে ধরলো।
চমকে উঠলো তিতির, সামনে তাকিয়ে তাজকে দেখে ভয় পেয়ে গেলো।
রাগে দাঁত খিঁচিয়ে বললো, তোকে যদি এখন খুন করতে পারতাম তাহলে হয়তো একটু শান্তি হতো আমার। তোকে যেই শাস্তি দেই না কেনো কম হয়ে যাবে।
তিতির কিছু না বুঝে তাকিয়ে আছে তাজের দিকে। তাজের চোখে তার জন্য তীব্র ঘৃণা হৃদয় ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে এখনই গরগর করে সব সত্যি বলে দিয়ে তাজ আর মৌয়ের জীবন থেকে সরে যেতে। তিতিরের মনে হচ্ছে সে তাজ আর মৌয়ের জীবনের সূর্য গ্রহণ।
তাজ ছেড়ে দিলো তিতিরকে,বসে পড়লো মেঝেতে।
তিতিরের দিকে তাকিয়ে বললো, তুই যত টাকার বিনিময়ে এসব করছিস তার থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা আমি তোকে দিবো। তবু এই নোংরা খেলাটা বন্ধ কর।
তিতির এবারও চুপ, যেনো সে কথা বলতে শিখেনি।
একবার আমি সত্যিটা জানতে পারি। তোকে নিজের হাতে খুন করে সবকিছুর বদলা নিবো আমি।
ফ্রেশ হয়ে আসছি তারপর হসপিটালে যাবো। তোর সব মিথ্যে সকলের সামনে আসলে এমনই সব স্বীকার করতে বাধ্য হবি।
তাজ চলে যেতেই দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো তিতির। তার জানা আছে তাজ তাকে যেখানেই নিয়ে যাক রিপোর্ট একই আসবে। শহরের প্রত্যেকটা হসপিটালে শয়তানটার লোক আছে। তারা হসপিটালে যাওয়ার সাথে সাথে তার কাছে খবর পৌঁছে যাবে।
তিতির বললো, না এভাবে বসে থাকলে হবে না। বোনুকে খুঁজতে হবে৷ একমাত্র বোনুকে খোঁজে পেলেই এই খেলা শেষ করা যাবে। আচ্ছা আমি কী মৌ আপুর কাছে যাবো একবার ? মৌ আপুর কাছে গেলেও সে সব জেনে যাবে ? একবার চেষ্টা তো করে দেখি। তুমি চিন্তা করো না আপু, আমি যেমন ভেসে আসা মেঘের মতো তোমাদের জীবনে উড়ে এসেছি, ঠিক সেভাবেই উড়ে চলেও যাবো। একবার শুধু আমার বোনুকে পেয়ে যাই।
চলবে,,,
#বিষাক্তফুলের_আসক্তি
লেখনীতেঃ তাহমিনা তমা
পর্ব-০৫
খবরের কাগজ হাতে থম মেরে সোফায় বসে আছে ইকবাল খান। প্রত্যেকটা নিউজপেপারে তাজের নামে জঘন্য থেকে জঘন্যতম নিউজ ছাপা হয়েছে। টিভি অন করে সোফাতে বসে আছে ইরিনা রহমান। ছেলের নামে এমন জঘন্য কথা শুনতে হবে কোনোদিন কল্পনা করেনি দুজনের কেউই। যে ছেলের জন্য একদিন গর্বে বুক ভরে এসেছিলো আর সেই ছেলের জন্য লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। ইকবাল খান অফিসে যেতে ভয় পাচ্ছেন। মানুষের কথা শোনার ভয়ে সে বাড়ি থেকেই বের হতে চাইছেন না।
ইকবাল খান হতাশ গলায় বললো, ইরি এসব দেখার জন্যই কী বেঁচে ছিলাম ?
ইরিনা কী বলবে, সে নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেছে।
ইকবাল পুনরায় বললো, তাজ কোথায় ?
ইরিনা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো, সার্ভেন্ট বললো সকালেই তাজ বেড়িয়ে গেছে মেয়েটাকে নিয়ে।
ইকবাল অবাক হয়ে বললো, কোথায় গেছে ?
সেটা তো জানি না। তবে সার্ভেন্ট বললো মেয়েটাকে নাকি এক প্রকার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছে, অনেক রেগে ছিলো তাজ।
ইকবাল নিউজপেপার রেখে বললো, মহিবুলের সাথে একবার কথা বলা দরকার কিন্তু কোন মুখে তাদের সাথে কথা বলবো। মৌয়ের কী অবস্থা সেটাও জানা প্রয়োজন।
মেয়েটা সেই ছোটবেলা থেকে তাজকে ভালোবাসে কিন্তু তাজ কখনো ওকে বুঝার চেষ্টাই করেনি। মেয়েটা অনেক বড় আঘাত পেয়েছে। মহিবুল অনেক শান্ত প্রকৃতির মানুষ। মহিবুলের জায়গায় অন্যকেউ হলে হয়তো অনেক সমস্যা করতো।
বুঝলে ইরি, জীবনে এমন কিছু পরিস্থিতি আসে মানুষ সেই পরিস্থিতির কাছে অসহায় হয়ে যায়। চাইলেও কিছু করার থাকে না। আমি অফিসে যাচ্ছি, পরিস্থিতি খারাপ বলে তো আর ব্যবসা বানিজ্য বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকা যাবে না। সেলিব্রিটিদের জীবন বরাবরই আমার পছন্দ নয়, তার বড় একটা কারণ হচ্ছে এদের পার্সোনাল লাইফ বলতে কিছু নেই। এদের বেডরুমের কথাও মানুষের নখদর্পনে।
ইকবাল খান রুমে চলে গেলেন অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হতে। ইরিনা রহমান বসে রইলেন সোফায়। মহিবুল ইরিনা রহমানের ছোট চাচার ছেলে। তাজ আর মৌ সম্পর্কে মামাতো ফুপাতো ভাইবোন হয়।
ব্রেকফাস্ট করে রায়হান বসে আছে মৌয়ের কাছে। হালকা খাবার খাইয়ে মেডিসিন দেওয়া হয়েছে মৌকে। জ্বর কমতে শুরু করেছে, মৌ এখন ঘুমাচ্ছে। মৌয়ের বাবা-মা গেছে ব্রেকফাস্ট করতে।
রায়হান মৌয়ের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো, কী ভেবেছিলি মৌমাছি ? আমাকে ফাঁকি দিয়ে তাজের হয়ে যাবি ? ছোটবেলার সেই বোকা রায়হান নই রে আমি। তোর ধোঁকা খেতে খেতে বুঝতে শিখে গেছি, নিজের জিনিস কীভাবে নিজের করতে হয়। এখন বোকা তুই নাকি আমি সেটা বুঝতে পারছি না। দেখ তাজের তোকে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই, তবু তুই তাজের জন্য পাগল। আমি তোকে এতোটা ভালোবাসি সেটা সারাজীবন তুই শুধু ব্যবহারই করে গেছিস। এদিকে তুই আমার থেকে পালাই পালাই করিস কিন্তু আমি তোকে ছাড়তে পারছি না আর কোনো দিন পারবও না। এখন বোকাটা কে বল তো। তুই আমাকে বাধ্য করেছিস এই নোংরা খেলাটা খেলতে। আমার এতে দোষ নেই রে মৌমাছি।
৭.
কারো উচ্চস্বরে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো আহানের। কানের উপর বালিশ চাপা দিয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করেও লাভ হলো না।
Jhony, Jhony.
Yes papa ?
Eating sugar ?
No papa.
Telling lie ?
No papa.
Open your mouth.
Ah, ah, ah.
বিরক্ত হয়ে উঠে বসলো আহান। শব্দের উৎস খুঁজতে আশেপাশে তাকালে স্পিকারের দিকে চোখ গেলো। পাখির সেফটির জন্য তার রুমে একটি ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন লাগিয়েছে আহানের বড় ভাই। সেটার সাহায্যে আহান যেখানেই থাকুক পাখি রুমে কী করছে আর বলছে সব দেখতে আর শুনতে পারবে নিজের ফোনে বা ল্যাপটবে। আহানের রুমের স্পিকারে পাখির কথা সবসময় শোনা যাচ্ছে, আহান রুমে থাকলে। আহানের বিরক্ত লাগলেও কিছু করার নেই, বড় ভাই চব্বিশ ঘণ্টা পাখির উপর নজর রাখতে বলেছে। একটা পাগল মেয়ে তার ভাইয়ের কাছে এতটা ইম্পর্ট্যান্ট কেনো বুঝতে পারছে না আহান। গতরাতে এজন্যই পাখির চেঁচামেচি নিজের রুমেই শুনতে পেয়েছিলো। আহান চরম বিরক্তি নিয়ে পাখির রুমে গিয়ে দেখে পাখি বেডের উপর বসে শব্দ করে ছড়াটা বারবার পড়ছে।
আহান ধমক দিয়ে বললো, এই মেয়ে তুমি কী পাঁচ বছরের বাচ্চা ? এটা কী ছড়া পড়ছো হ্যাঁ ?
পাখি ভয় পেয়ে কেঁপে উঠে আহানের দিকে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললো, জনি জনি।
আহান পুনরায় ধমক দিয়ে বললো, কী জনি জনি ? বাচ্চাদের ছড়া তুমি বারবার পড়ছো কেনো ?
পাখি ঠোঁট উল্টে কান্নার ভাব করে বললো, এটা আমার ফেবারিট ছড়া।
আহান বিরক্ত গলায় বললো, এতবড় মেয়ের নাকি জনি জনি ছড়া ফেবারিট।
পাখি এবার ঠোঁট উল্টে কান্না করে বললো, আপনি আমাকে বকেন কেনো সবসময় ? আপুনি তো কখনো আমাকে বকে না। আমি কতকিছু ভেঙে ফেলি আপুনি কিচ্ছু বলে না আমাকে আর কিছু না করলেও বকেন আপনি। খুব পঁচা আঙ্কেল তো আপনি।
আহান চোখ বড় বড় করে বললো, হোয়াট ? আঙ্কেল, আমাকে আঙ্কেল বললো ?
আহান নিজের বিস্ময় কাটিয়ে জোরে ধমক দিয়ে বললো, এই মেয়ে আমাকে তোমার আঙ্কেল মনে হয় ?
পাখি এবার জোরে জোরে কান্না শুরু করে দিলো, পাখির কান্নার আওয়াজ শুনে দৌড়ে এলো ন্যান্সি।
আহান থতমত খেয়ে বললো, মহা জ্বালা তো।
ন্যান্সি পাখির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, কী হয়েছে বেবি ?
পাখি আহানকে দেখিয়ে বললো, আঙ্কেলটা বকেছে।
আহান থতমত খেয়ে ধমক দিয়ে বললো, এই মেয়ে খবরদার আঙ্কেল বলবে না আমাকে। আর একবার আঙ্কেল বললে একদম বাসা থেকে বের করে দিবো।
আহান হনহনিয়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। পাখি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আহানের যাওয়ার দিকে।
ন্যান্সির দিকে তাকিয়ে বললো, পঁচা আঙ্কেল।
ন্যান্সি বাংলা বুঝতে আর বলতে পারে ভালো করেই। পাখিও ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেছে বেশ ভালোই। তাই পাখির সাথে কথা বলতে ন্যান্সির প্রবলেম হয় না। ন্যান্সি ইংরেজিতে বললে সেও ইংরেজিতে বলে আবার ন্যান্সি বাংলা বললে সেও বাংলা বলে। তিতির পাখিকে যতটা শেখানোর যায় চেষ্টা করেছে শিখাতে।
ন্যান্সি মুচকি হেসে বললো, আঙ্কেল বলে না বেবি।
পাখি ভাবুক ভঙ্গিতে বললো, তাহলে কী বলবো ?
তুমি ভাইয়া বলতে পারো।
ঠিক আছে ভাইয়া বলবো, পঁচা ভাইয়া।
ন্যান্সি মুচকি হেসে বললো, চলো ব্রেকফাস্ট করবে।
আপুনি কখন আসবে ?
তুমি গুড গার্ল হয়ে থাকলে তাড়াতাড়ি চলে আসবে।
ঠিক আছে আমি একদম গুড গার্ল হয়ে থাকবো।
ন্যান্সি দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো পাখির দিকে তাকিয়ে। কারণ সেও জানে পাখির আপুনি বেঁচে নেই। এদিকে আহান নিজের রুমে গিয়ে পাখিকে ইচ্ছে মতো বকতে বকতে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। মেয়েটাকে একদমই সহ্য হচ্ছে না আহানের। কিন্তু কিছু করারও নেই তার।
৮.
রাগে মাথা ফেঁটে যাচ্ছে তাজের। যতগুলো হসপিটালে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করিয়েছে, ইমারজেন্সি রিপোর্ট বের করেছে। সবগুলো রিপোর্ট একই কথা বলছে, তিতির প্রেগনেন্ট। কিন্তু সেটা তো অসম্ভব, মাথায় কিছুই ঢুকছে না তাজের। সারাদিন একটার পর একটা হসপিটালে গিয়েছে কিন্তু ফলাফল শূন্য। তাজ যেখানে জানে তিতির প্রেগনেন্টই নয় সেখানে ডিএনএ টেস্ট করার মানেই হয় না। তাজ এটাই প্রমাণ করতে পারছে না তিতির প্রেগনেন্ট নয়, সেখানে ডিএনএ টেস্ট করে পজিটিভ কিছু আশা করাও বোকামি মনে হয়েছে তাজের কাছে। সেটাও তাজের বিরুদ্ধেই আসবে, তাজের বুঝা হয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে বসে আছে পুরো খান পরিবার। ইকবাল খান গম্ভীর মুখে বসে আছে। ইরিনা রহমান একবার ছেলের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার স্বামীর দিকে তাকাচ্ছে।
ইকবাল খান গম্ভীর গলায় বললো, গতরাতে একবার মনে হয়েছিলো আমার হয়তো কোথাও ভুল হয়েছে। তুমি এমন একটা জঘন্য কাজ করতে পারো না। কিন্তু এতগুলো হসপিটালের রিপোর্ট কীভাবে ভুল হয় তাজ ?
তাজ অসহায় গলায় বললো, প্লিজ বাবা বিলিভ মি।
কীভাবে বিশ্বাস করবো বলো তো ? একটা হসপিটালের রিপোর্টও যদি ভিন্ন হতো তাহলে তুমি এই কথা বলতে পারতে।
তাজ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। কীভাবে তাকে বুঝাবে সে মিথ্যা নয় বরং এই মেয়েটা মিথ্যা, সবগুলো রিপোর্ট মিথ্যা। ইরিনা বরাবরই শান্ত মেজাজের মানুষ, তাই সে নিরব ভূমিকা পালন করছে। ইরিনা ঘুরে তাকালো একটু দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে।চোখমুখ বলে দিচ্ছে সে প্রচন্ড ক্লান্ত, দাঁড়িয়ে থাকতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। মেয়েটার মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যা। কেমন অনুভূতিহীন পুতুলের মতো নিষ্প্রাণ চোখে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। ইরিনা দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকালো। রাগ, হতাশা আর অসহায়ত্ব চোখে মুখে স্পষ্ট। নিজের বাবার দিকে তাকালো অসহায় দৃষ্টি যেনো বলে দিচ্ছে সে মিথ্যা বলছে না। ইরিনা রহমানের নিজেকে কেমন পাগল পাগল মনে হতে লাগলো। কেমন গোলকধাঁধা মনে হচ্ছে সবকিছু। ধুপ করে কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজে সবাই ঘুরে তাকালো। তিতির লুটিয়ে পড়েছে ফ্লোরে। ইরিনা দ্রুত এগিয়ে গেলো তিতিরের দিকে।
ব্যস্ত গলায় বললো, কেউ এক গ্লাস পানি নিয়ে এসো।
একজন সার্ভেন্ট দ্রুত এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো ইরিনার দিকে। চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দিয়েও কোনো লাভ হলো না।
তাজের দিকে তাকিয়ে বললো, ওকে রুমে নিয়ে চল।
তাজ অবাক হয়ে বললো, আমি ?
এতকিছু ভাবার সময় নেই তাজ। মেয়েটা যেমনই হোক একজন মানুষ সে। এই অবস্থায় তো ফেলে রাখা মানুষের মতো কাজ হবে না। রাজিব ভাইকে একটা কল করুন তো, ইকবালের উদ্দেশ্যে বললো।
তাজ বাঁধ্য হয়ে তিতিরকে কোলে তুলে নিচের গেস্ট রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে তাজদের ফ্যামিলি ডক্টর রাজিব হোসেন হাজির হলো।
তিতিরকে পরীক্ষা করে বললো, দেখে মনে হচ্ছে প্রচন্ড মানসিক চাপের মধ্যে আছে। বেশ কয়েকদিন ঠিকমতো খাওয়াদাওয়াও করেনি, শরীর একদমই দূর্বল। এভাবে চলতে থাকলে আরো অবণতি হবে, খারাপ কিছু হতে সময় লাগবে না। এই সময়ে তো আরো দিগুণ দেখাশোনার প্রয়োজন। নাহলে দুজনেরই ক্ষতি হবে।
তাজ তাকিয়ে আছে রাজিবের দিকে। একটা অন্তত আশা ছিলো, রাজিব হোসেন বুঝতে পারবে তিতির প্রেগনেন্ট নয়। সেই আশায় পানি ঢেলে দিলো। রাজিব কিছু মেডিসিন দিয়ে, তিতিরের খেয়াল রাখতে বলে চলে গেলো।
ইরিনা বললো, তাজ মেডিসিনগুলো আনানোর ব্যবস্থা কর।
তাজ বিরক্ত হয়ে বলো, সব নাটক।
ইরিনা শান্ত গলায় বললো, রাজিব ভাই আমাদের ফ্যামিলি ডক্টর। সে নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা বলবে না।
তাজ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মায়ের দিকে। নিজের বাবা-মাই তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না, এটা তাকে আরো বেশি কষ্ট দিচ্ছে। তিতিরের দিকে রক্তচক্ষু করে বের হয়ে গেলো রুম থেকে। মেয়েটার প্রতি ঘৃণা যেনো তাজের ধাপে ধাপে বেড়ে চলেছে।
চলবে,,,,
