#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ০৫+০৬+০৭


দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। মেহমানরা একজন দুজন করে চলে যেতে আরম্ভ করেছেন। অনেকেই বলছে, মেয়ের বাড়ি থেকে কেউ এলো না মেয়ে-জামাইকে নিতে? 


বাবারা এখনো কেন আসছে না ভেবে আমার দুঃশ্চিন্তা হতে লাগল। বাবাকে ফোন দিচ্ছি রিং হচ্ছে। কিন্তু ধরছে না। গাড়ির আওয়াজে নিশ্চয়ই শুনতে পাচ্ছে না ফোনের আওয়াজ। 

এরই মধ্যে আমার ননদ এসে দরজা ধাক্কাতে লাগল। 

'ভাবি! দরজা খোলো! '


দরজা খুলে দিতেই শ্রেয়া আমার হাতে দুটো ট্যাবলেট বাড়িয়ে দিল, 'এই নাও নাপা এক্সট্রা! '


তখন শ্রেয়াকে মিথ্যে বললেও নানান দুঃশ্চিন্তায় এখন সত্যি সত্যিই আমার মাথা ব্যাথা করছে।


শ্রেয়ার সঙ্গে ঘর থেকে বের হব তখনি আমার শ্বাশুড়ি মা এলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ' বেয়াইরা রওনা দিয়েছেন কি না তোকে ফোন করে জানিয়েছে না-কি মা?


আমি জবাব দিলাম, 'হ্যাঁ মা। বাবারা তো বারোটার পরপরই রওনা দিয়ে দিয়েছিলেন!'


'একটাবার ফোন করে দেখতি তারা এখনো আসছেন না কেন? বিকেল হয়ে গেল!'


যদিও আমি এর আগে অনেকবার কল করেছি। তবুও আমার শ্বাশুড়ি মায়ের কথায় আরেকবার ফোন করলাম। এবারও আগের মতোই।

আমি বললাম, 'রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ তুলছে না!'


তিনি বললেন, 'হয়তো জ্যামে আটকা পড়েছেন তাই দেরি হচ্ছে। তুই দুঃশ্চিন্তা করিস না!'


আমি হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে বললাম, 'মা, আর ছাদে না গেলে হবে? ভীষণ মাথা ব্যাথা করছে!'


'না আর যেতে হবে না। তুই শুয়ে বিশ্রাম নে।'


আমার শ্বাশুড়ি মা শ্রেয়ার সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। যেতে যেতে তিনি শ্রেয়াকে বললেন, 'তোর ভাইয়াকে একটু ডেকে আন তো!'


.

ঘরের লাইট নিভিয়ে শুয়ে ছিলাম। ড্রয়িং রুম থেকে কারো চেঁচামেচির আওয়াজ কানে এলো। ভালো করে শোনা যাচ্ছে না কিছু। আবছা আবছা শুনে যা বুঝলাম প্রত্নর ব্যাপারে কথা হচ্ছে। বারবার দুটো শব্দ এসে ঘুরপাক খাচ্ছে কথার মাঝে 'প্রত্ন', 'শ্রাবণ '!

ওদের দুজনের ব্যাপারে এতো গুরুতর কী কথা হচ্ছে! জানার জন্যে আমার কৌতুহল হতে লাগল। আমি উঠে দরজা খুলে রুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম শ্রেয়ার সঙ্গে শ্রাবণ কথা বলতে বলতে ড্রয়িংরুমের দিকেই এগোচ্ছে। শ্রাবণ বলছেন, 'ওনারা আবার কেন এসেছে? '

আর কিছু শুনতে পেলাম না। আমার আচমকা শ্রেয়ার শ্রাবণকে ছাদে বলা কথাগুলোর কথা মনে পড়ল। শ্রাবণের ছোট চাচা, চাচীই কি এসেছেন তবে?


ঘটনা জানার উদ্দেশ্যে আমি ড্রয়িংরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। এদিকে কেউ তাকালেই আমাকে দেখে ফেলবে। অবশ্য কেউ তাকাবে বলে হয়না। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলায় ব্যস্ত। কথা না বলে ঝগড়া বললে হয়তো ঠিক হবে। তাদের ঝগড়ার মূল বিষয়বস্তু প্রত্নর বর্তমান অবস্থা। শ্রাবণ ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই সবাই থেমে গেল। একজন ভদ্রমহিলা শ্রাবণকে দেখিয়ে আমার শ্বাশুড়ি মা'কে বলল, 'ওকেই জিজ্ঞাসা করেন ভাবি! সত্যটা কী ওই বলুক!'


ভদ্রমহিলাটি সম্ভবত প্রত্নর মা আর শ্রাবণের ছোট চাচী।

মা বললেন, 'তোমার কাছে কী প্রমাণ আছে রাশিদা তুমি যে আমার ছেলের ওপর এভাবে দোষ দিচ্ছো?'


'প্রমাণ কেন লাগবে? এই বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটা লোকই শ্রাবণের মেজাজের ব্যাপারে অবগত!'


মা হঠাৎ গলার স্বর অতি কঠোর করে ফেললেন। 'আমার ছেলের রাগ একটু বেশি বলে এই না যে পৃথিবীর সব খারাপ কাজ সেই করছে।'


সহসা শ্রাবণের চাচী বিদ্রুপ করে হাসলেন। 'যে ছেলে বিয়ের দিনই সবার সামনে...!'


বলতে গিয়ে অকস্মাৎ চুপ হয়ে গেলেন তিনি। তার দৃষ্টি লক্ষ্য করে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম শ্রাবণ হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শ্রাবণের চোখগুলোকে অসম্ভব রকমের লাল মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করছে সে নিজের রাগকে।

মা ছোটো চাচীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হলো? থেমে গেল কেন?'


ছোটো চাচী যেন চুপসে গেছেন। কোনো কথাই বের হচ্ছে না তার মুখ দিয়ে। আমি আশ্চার্যান্বিত হয়ে গেলাম। বাড়ির বড়রাও এত ভয় পায় ওনাকে! উনি তো আর বাঘ-ভাল্লুক নন! বড় জোর কী করতে পারবেন উনি? আসল কথা হচ্ছে বাড়ির বড়রাই লাই দিয়ে দিয়ে ওনার রাগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আমার শ্বশুর বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো শ্রাবণ নিয়ন্ত্রণে থাকতেন।


শ্রাবণ এই প্রথম মুখ খুললেন। 'চাচী, আপনি দয়া করে একটু পরপর আমাদের ফ্ল্যাটে এসে চেঁচামেচি করবেন না! বাড়ি ভর্তি মেহমান। তারা আপনাদের কথা শুনলে কী ভাববে একবার ভেবেছেন? আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষও আসবে এখন। আমি চাইনা আপনাদের কারণে তাদের সামনে আমাদের সম্মান নষ্ট হোক!'


ছোটো চাচীর মুখ লাল হয়ে উঠলো অপমানে। তিনি চলে যাবার জন্যে পা বাড়ালেন। শ্রাবণ আবার বললেন, 'ও হ্যা আরেকটা কথা! আপনার ছেলেকে বলবেন, অন্যের বউয়ের দিকে যেন চোখ তুলে না তাকায়! অন্যের বউকে নিয়ে দিবা স্বপ্ন দেখাটাও কিন্তু অসচ্চরিত্রতার মধ্যেই পড়ে!'


ছোটো চাচীকে দেখে মনে হল তিনি এখনি রাগে ফেটে পড়ে শ্রাবণকে উল্টোপাল্টা কিছু একটা বলে বসবেন! কিন্তু না! নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুতপায়ে এ ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে গেলেন তিনি।

মায়ের মুখভঙ্গি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তিনি কিছু আঁচ করতে পেরেছেন। কোনো এক কারণে হয়তো ছেলেকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারছেন না!


শ্রাবণের কখন আমার ওপর চোখ পড়েছে জানিনা। উনি আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। ওনাকে এড়িয়ে যাবার জন্য আমি জলদি পায়ে পুনরায় রুমে চলে এলাম।


 রুমে এসে আমি দরজা লাগাতে নিতেই শ্রাবণ এসে এক হাত দিয়ে দরজা টেনে ধরল। আমি সরে গেলাম। উনি হঠাৎ ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন। 

আমার দিকে একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 'নাও।'


দেখে মনে হচ্ছে ওষুধের প্যাকেট। তবুও জিজ্ঞেস করলাম, 'কী এটা?'


উনি বললেন, 'মাথা ব্যাথার ওষুধ!'


'ওহ। লাগবেনা, খেয়েছি!'


উনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'ব্যাথা কমেছে?'


'হ্যা।'


শ্রাবণ নিজের ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে ওষুধের প্যাকেটটা রেখে দিয়ে বললেন, 'ভবিষ্যতে কখনো প্রয়োজন হলে এখান থেকে নিয়ে নিও।'


আমি মনে মনে হাসলাম। ভবিষ্যতে এ বাড়িতে থাকলে তো!


শ্রাবণ চলে যেতে নিলেন। 

 আমি পেছন থেকে বললাম, 'প্রত্নকে কেন মারলেন?'


শ্রাবণ থেমে পেছনে ঘুরলেন। কিন্তু জবাব দিলেন না। আমি আবার বললাম,' কেন মারলেন প্রত্নকে? '


শ্রাবণ এবার উপহাস করে বললেন, 'কেন কষ্ট হচ্ছে? '


ওনার বাঁকা কথা শুনে আমার মেজাজ খারাপ হল। তবুও স্বাভাবিক থেকে বললাম, 'আপনি কাজটা মোটেও ঠিক করেননি! '


মুহূর্তেই শ্রাবণের মুখাবয়ব ভয়ংকর আকৃতি ধারণ করল! দু চোখে রাগ স্পষ্ট! বড় বড় পা ফেলে আচমকা কাছে এসে এক হাতে আমার গাল চেপে ধরলেন, 'প্রেমিকের জন্য কষ্ট হচ্ছে খুব তাই না?'


আমি অগ্নি দৃষ্টিতে ওনার দিকে তাকালাম, 'ছাড়ুন আমাকে!'


উনি ছাড়লেন না। ওভাবেই বললেন, 'ভবিষ্যতে যদি ওকে কখনো তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখি, এবার তো শুধু হাত-পা ভেঙেছি! তখন একদম কবরে পাঠিয়ে দেবো!'


আমি বাধ্য হয়ে আমার হাত দিয়ে ওনার হাত সরানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম, 'একদিন আপনার এত রাগের জন্যই আপনার ভালোবাসার মানুষগুলোকে হারাবেন!'


শ্রাবণ আমার গাল থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিলেন। এরপর অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ' ভালোবাসার মানুষগুলোকে হারাতে চাই না বলেই রাগ দেখাই!'


বলে এক মূহুর্তও দেরি করলেন না। হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।


.

বাবারা যখন এলেন তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। রাস্তায় না কি জ্যাম ছিল। আবার তাদের ভাড়া করা মাইক্রোও নষ্ট হয়ে যায়। তাই এত দেরি হল।

 বাবার সঙ্গে ফুফা আর আমার ছোটো বোন রিহা এসেছে শুধু। ঘরে ঢুকে আমার শ্বাশুড়ি মায়ের সঙ্গে সবাই কুশল বিনিময় করলেন।


গতকালকেই এসেছি নিজের বাপের বাড়ি ছেড়ে। অথচ মনে হচ্ছে কতো যুগ পেরিয়ে গেছে মাঝে। আমি বাবা আর রিহাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছিস, মা? '


'আমি ভালো আছি বাবা। তুমি কেমন আছো?'


বাবা জবাব না দিয়ে ঝাপসা চোখে চেয়ে রইলেন আমার দিকে। বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছেন তার বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়ে। 

আমি বাবাকে আবার বললাম, 'ও বাবা, বলো কেমন আছো!'


বাবা বললেন, 'আমার বড় পরীকে ছাড়া আমি কীভাবে ভালো থাকবোরে মা!'


আমি আর চোখের জল আটকাতে পারলাম না। কেঁদে দিলাম। বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

 

রিহাও কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, 'কাঁদছিস কেন তোর তো খুশি হবার কথা! এখন আর তোর আদর-ভালোবাসার ভাগীদার কেউ নেই!'


রিহা গাল ফুলিয়ে বলল, 'আপু!'


আশেপাশে সবাই হাসতে লাগল। এতক্ষণ হয়তো তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ফ্যামিলি ড্রামাই দেখছিল!


.

খাবারদাবার সব গন্ধ হয়ে গেছে। পোলাও, রোস্টসহ অন্যান্য সব আইটেমই খাবার অনুপযোগী। স্বাভাবিক। এতক্ষণ অব্দি কি এসব খাবার খোলায় রাখলে ভালো থাকে! মা ফ্রিজে কিছু খাবার তুলে রেখেছিলেন। কিন্তু নতুন কুটুমদের তিনি সেসব খাবার খাওয়াবেন না। ফ্রিজে রাখা মানে না কি বাসি হয়ে যাওয়া। আর বাসি খাবার কী করে তিনি নতুন কুটুমদের খাওয়াবেন!

তাই তিনি এখন নতুন করে সবকিছু রান্না করছেন। বাবা, ফুফা অনেকবার করে নিষেধ করলেও তিনি শুনলেন না।

শ্রাবণ সামনের রেস্টুরেন্ট থেকে স্ন্যাকস জাতীয় খাবার কিনে আনলে মা নিজেই সবাইকে পরিবেশনা করলেন। 

রান্নার কাজে মা'কে সাহায্য করতে গেলে মা জোর করে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি একা একা এতদিক কীভাবে সামলান আমার বুঝে আসেনা!


ড্রয়িংরুমে সবার সাথে গিয়ে বসলে বাবা আমাকে ইশারায় আমার ঘরে যেতে বললেন। বুঝলাম বাবা হয়তো জরুরী কিছু বলবেন। ঘরে আসতেই বাবা অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে আমাকে বলল, 'এ বাড়িতে তোর যা যা আছে সবকিছু ঠিকমতো গুছিয়ে নে মা! যাতে আর কখনো এ বাড়ির চৌকাঠ না মাড়াতে হয়!'


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা


(গতকাল ইচ্ছে ছিল গল্প দেবার। কিছু কারণে পারিনি তাই দুঃখিত! এখন থেকে রোজই গল্প দেবার ইচ্ছে আছে। কিন্তু প্রতিদিন দিলে বেশি করে দিতে পারব না। এখন পাঠকরাই ঠিক করুন, ১২০০ শব্দে রোজ গল্প চান না কি একদিন পরপর আরো বড় করে?


আরেকটা কথা, গল্পের ভুল-ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেবেন প্লিজ!)#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ০৬


বাবা কি তবে সব জেনে গেছে! বাবা আবার বলল, 'এ বাড়িতে থেকে দেওয়া কোনো জিনিস নেওয়ার দরকার নেই। গয়নাগাটিও না!'


আমি মাথা নেড়ে 'হ্যা' বললাম।


বাবা হঠাৎ রুষ্ট কন্ঠে বললেন, 'তোমার উচিৎ ছিল সেদিনই আমাকে সব জানানো। বোকার মতো মায়ের ওপর রাগ করে চলা আসাটা একদমই ঠিক হয়নি। তোমার মা নাহয় গ্রামের মানুষ! আশি দশকের চিন্তাভাবনা এখনো ভুলতে পারেনি। কিন্তু তোমার বাবা তো আর তেমনটা নয়! তাহলে কেন তুমি আমাকে না বলে এভাবে সেই লোকের সাথে চলে এলে যে তোমাকে বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে অপমানিত করেছে?'


বুঝতে পারলাম বাবা প্রচন্ড সিরিয়াস! কী জবাব দেবো খুঁজে না পেয়ে চুপ করে রইলাম। আমাকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে বাবা তার কন্ঠ থেকে রুষ্ট ভাবটা সরিয়ে নিল। 'ঠিকাছে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন সেটা নিয়ে আর মন খারাপ করে থেকো না।'


আমি মাথা উঁচু করে বাবার দিকে তাকালাম, 'স্যরি, বাবা!'


বাবা সামান্য হেসে আমার মাথায় হাত রাখলেন, 'মানুষ মাত্রই ভুল!' 


.

বাবা, ফুফা অনেকবার নিষেধ করা স্বত্তেও আমার শ্বাশুড়ি মা পুনরায় রান্না করলেন। পোলাও, মুরগির রোস্ট, খাসির রেজালা আর ইলিশ মাছ ভাজা। এতসব রান্না মা এত কম সময়ে কীভাবে করলেন কে জানে! সারাটাসময় মা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে বেড়ে খাওয়ালেন। সবাইকেই অনেক জোরাজোরি করলেন এটা-সেটা নেওয়ার জন্য। বরাবরের মতো সাহায্য করতে গেলে মা আমাকে জোর করে খেতে বসিয়ে দিলেন।

 খাওয়া শেষে দই আর মিষ্টিও পরিবেশনা করা হল। 


.

ব্যাগ গোছানোর সময় আমার শ্বাশুড়ি মা আর শ্রেয়ার জন্য আমার খারাপ লাগতে লাগল। শ্রাবণ যেমনই হোক, ওনার মা আর ছোটো বোন মোটেও ওনার মতো নয়। শ্রেয়া ভীষণ মিশুক। আর মা প্রচন্ড মমতাময়ী। এ দুদিন আমার মোটেও মনে হয়নি আমি একটা অচেনা, অজানা পরিবারে বউ হয়ে এসেছি। মা কেমন করে সারাটাক্ষনই আমার খেয়াল রেখেছেন! 

এ বাড়ি থেকে চলে যাবার পর মা'কে আর শ্রেয়াকে অনেক মিস করব নিশ্চিত!


.

ব্যাগ গোছাচ্ছি তখন রিহা এসে বলল, 'সব গুছিয়ে নিয়েছিস আপু?'


'হ্যা এইতো হয়ে গেছে।'


রিহা আবার বলল, 'বাবা সব জেনে গেছে আপু!'


আমি বললাম, 'হুম। কিন্তু বাবা কীভাবে জানল?'


রিহা হাসতে হাসতে বলল, 'মা নিজেই বলে দিয়েছে।'


আমি বিস্ময়ের সপ্তম চূড়ায় পৌঁছে গেলাম, 'মা! মা'র কারনেই না এ বাড়িতে এলাম?'


রিহা বলল, 'বিদায়ের সময় তুই তো মাকে বলে এলি না। তুই চলে আসার পর থেকে মা কিচ্ছু মুখে দেয়নি। সারাক্ষণ কাঁদে। '


'কী বলিস!'


 'হ্যা। বাবা মা'কে স্বান্তনা দেয়, মেয়ে বিয়ে দিয়েছো বুকে পাথর দিয়ে তো থাকতে হবেই। এভাবে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে সারাদিন কাঁদলে চলবে! আর ওর শ্বাশুড়ি, ননদ দুজনেই ভালো মানুষ। দেখো আমাদের মেয়ে ভালো থাকবে। 

তখনি মা চেঁচিয়ে উঠে, কেমনে ভালো থাকবো জামাইডা হইল মহা শয়তান!'


আমি উচ্চস্বরে হাসতে লাগলাম। 

রিহা বলল, 'হাসিস না আপু! এরপর বাবা জিজ্ঞেস করে, কেন সে কী করেছে?

তখনি মা গড়গড় করে সব বলে দেয় বাবাকে। সব শুনে বাবা রাগে একদম ফেটে পড়ে। মা'কে অনেকক্ষণ বকাবকি করে কেন বাবাকে জানালো না আর কেন তোকে যেতে দিলো!'


আমি বললাম, 'তারপর?'


রিহা বলল, 'বাবা প্ল্যান করেছে আজকে স্বাভাবিকভাবেই তোকে আর ওই লোককে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে। নয়তো যদি তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তোকে যেতে না দেয়, আটকে রাখে!

 কিন্তু আগামীকাল বাবা আর কিছুতেই ফিরতি পাঠাবে না তোকে। '


আমি বললাম, 'বাহ! দারুন প্ল্যান!'


'হুম। আচ্ছা আপু ওই লোক তোর গায়ে আবার হাত তোলেনি তো?'


আমি হাসলাম। রিহা হঠাৎ রেগে গেল। 'এত হাসিস না তো আপু!'


'তাহলে কী করব?'


'আমার কথার উত্তর দে।'


আমি বললাম, 'না। আর মারেনি।'


.

এখনি আমরা চলে যাবার জন্য রওনা দেবো। যাবার আগে আমার শ্বাশুড়ি মা'কে সালাম করে এলাম। মা বললেন, 'এ কি! গয়নাগাটি কিছু পড়িসনি কেন?'


কী বাহানা দেবো বুঝতে পারলাম না। বললাম, 'মা, এত রাত হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটের ব্যাপার। যদি রাস্তায় চোর-ডাকাতের খপ্পরে পড়ি! তাই আর রিস্ক নেইনি।'


'ওহ! আচ্ছা ঠিকাছে! সাবধানে যাস মা!' এরপরে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, ' ভালোয় ভালোয় ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসিস!' 


আমি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললাম। যদিও মিথ্যে কথা। আমি তো আর ফিরবো না!


শ্রেয়ার সঙ্গেও কথা হলো। শ্রেয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'ভাবি, কাল সকাল সকালই ফিরে আসবে কিন্তু! আমি তোমাকে অনেক মিস করবো! আবার ছোটো বোনকে পেয়ে ননদকে ভুলে যেওনা!'


রিহা শ্রেয়ার দিকে তাকিয়ে মুখটাকে বাংলার প্যাঁচার মতো করে ফেলল। আমি হেসে বললাম, 'আমিও তোমাকে অনেক মিস করবো শ্রেয়া!'


মাঝখান থেকে শ্রাবণ হাসতে হাসতে বলে উঠল, 'তোর ভাবিকে ছাড় শ্রেয়া। কান্নাকাটি করিস না। কাল সকালেই তাকে এ বাড়িতে উপস্থিত পেয়ে যাবি!'


আমি মনে মনে ব্যঙ্গাত্মক হাসলাম।


বাবা, ফুফা আমার শ্বাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলেন।


.

বাবা বুদ্ধি করে গাড়িতে শ্রাবণকে তার আর ফুফার সাথে বসিয়েছেন। শ্রাবণ হয়তো মনে মনে বিষয়টাকে অদ্ভুত ভাবছেন! তারা বসেছেন একদম পেছনের সিটে। মাঝের সিটে আমি আর রিহা। আর সামনে ড্রাইভার একা। 

গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দূরে অন্ধকার ছাড়া আর তেমন কিছু চোখে পড়ল না। তবে কিছু রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের বাতি জ্বলছে। গাড়ির সংখ্যা খুব কম। অনেক রাত হয়েছে বলে হয়তো। 

শিরশিরিয়ে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। হাওয়াটাকে আরো ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য জানালা দিয়ে মাথা বের করলাম। সাথে সাথে শ্রাবণ চেঁচিয়ে উঠল। 'জানালা দিয়ে মাথা বের করো না হৃদি! এটা রিস্কি!'


বাধ্য হয়ে গাড়ির ভেতর মাথা নিয়ে এলাম। মনে মনে বললাম, রিস্কি কীভাবে! রাস্তায় তো গাড়িই নেই তেমন! যত্তসব! কিন্তু মুখে কিছু বললাম না। 


.

বলাই বাহুল্য ফিরতে ফিরতে গভীর রাত হয়ে গেল। শ্রাবণ মা'কে সালাম করে জিজ্ঞেস করলেন, 'কেমন আছেন মা?'


মা একবার আমার দিকে তাকায়। আরেকবার শ্রাবণের দিকে। এরপরে কোনোরকমে উত্তর দেয়, 'ভালো।' 

শ্রাবণকে আর জিজ্ঞেস করে না সে কেমন আছে। হয়তো আমার ভয়ে! ভাবছে আমি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাই!


মা আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। আমিও আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারি না! সব ভুলে যাই।


রাতে আমার ঘরে শ্রাবণের একা শোয়ার ব্যবস্থা করা হলো। মা আমাকে বলল, রিহার ঘরে রিহার সাথে ঘুমাতে। আমি রিহার সাথে ঘুমাতে গেলাম। শুয়েছি পাঁচ মিনিট হল। হুট করে টুং শব্দ করে মোবাইলে মেসেজ এল। আননোন নম্বর! লেখা,

'তুমি কোথায় হৃদি?'


কে পাঠালো! প্রত্নর তো আর আমাকে মেসেজ পাঠানোর সাহস করার কথা না! এছাড়া ও তো আর আমাকে তুমি করে বলে না। কোনো ক্লাসমেটরাও তো না! তবে কি শ্রাবণ? রিপ্লাই করব কি করব না ভেবে করেই ফেললাম। 'আপনি কে?'


রিপ্লাই এলো, 'নিজের হাজবেন্ডের নম্বর চেনো না!'


ওহ শ্রাবণই তাহলে। আমি আর রিপ্লাই করলাম না। পুনরায় মেসেজ এল, 'কী হল? বললেনা কোথায় তুমি?'


আমি কোথায় জেনে উনি কী করবেন! আর আজ এত মেসেজ কেন করছেন উনি! বিয়ের আগে কেন করলেন না! তখন যদি কথা হতো তাহলে ওনার রাগ স্বমন্ধে একটা ধারণা পেতাম। বিয়েটাই আর করতাম না তবে!


আবার মেসেজ এল, 'তুমি কোথায় বলবে না কি শ্বাশুড়ি মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করবো?'


আমি রিপ্লাই দিলাম, 'রিহার ঘরে।'


পুনরায় মেসেজ এল, 'তুমি ও ঘরে কী করছো?'


'ঘুমুচ্ছি।' পাঠিয়ে মোবাইলটা অফ করে রাখলাম।


কিছুক্ষন পরেই দরজা খটখট করার আওয়াজ পেলাম। রিহা ঘুমিয়ে গিয়েছিল। আওয়াজ পেয়ে ঘুমুঘুমু কন্ঠে বলে উঠল, 'আপু বোধহয় মা এসেছে। একটু গিয়ে দেখনা!'


আমি দরজা খুলে দেখলাম বাইরে শ্রাবণ দাঁড়িয়ে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পরল। উনি এখানে কী করছেন! 

'আপনি এখানে কেন এসেছেন?'


উনি খপ করে আমার হাত ধরে বললেন, 'চলো ঘুমোবে চলো!'


আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম, 'ঘুমোচ্ছিলামই। আপনিই এসে ডিস্টার্ব করলেন। আমার হাত ছাড়ুন!'


উনি আমার কথা ভ্রুক্ষেপই করলেন না। 'এখানে কেন ঘুমোবো? চলো তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে!'


আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, 'হাত ছেড়ে কথা বলুন! কেউ দেখলে কী ভাববে ভেবেছেন একবারো?'


শ্রাবণ হাসলেন, 'কে কী ভাববে? তুমি আমার স্ত্রী।'


আমি উপহাস করে হাসলাম, 'স্ত্রী! '


শ্রাবণ আচমকা কিছু না বলে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। আমি আবার বললাম, 'আপনি যদি আমার হাত না ছাড়েন আমি কিন্তু চিৎকার করবো!'


শ্রাবণ হাসতে লাগল, 'ঠিকাছে! করো।'


আমি সত্যি সত্যিই মা'কে চিৎকার করে ডাকলাম। আমার চিৎকার শুনে বাবা, মা দুজনেই ঘর থেকে বের হল। বাবা বললেন, 'কী হয়েছে মা?'


ঘটনার আকস্মিকতায় শ্রাবণ হকচকিয়ে গেলেন। হয়তো উনি ভাবতেও পারেননি আমি সত্যিই চিৎকার দিয়ে বসব!

আমি বললাম, 'বাবা, শ্রাবণ আমাকে জোর করে ওনার ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন!'


আমার কথা শুনে মা চোখ কপালে তুলে ফেলল। কিন্তু বাবার মুখভঙ্গির কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। বরং ঠান্ডা গলায় শ্রাবণকে বললেন, 'ও যখন চাইছে না তোমার সঙ্গে যেতে তাহলে জোর করছো কেন? তোমার কোনো অধিকার নেই আমার মেয়েকে কোনো বিষয়ে জোর জবরদস্তি করার!'


শ্রাবণ যে বাবার কাছ থেকে এমন ব্যবহার মোটেও আশা করেননি সেটা ওনার মুখ দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। অপমানে, লজ্জায় ওনার মুখ লাল হয়ে উঠল । উনি আমার হাত ছেড়ে দিয়ে গটগট করে হেটে রুমে চলে গেলেন।


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা


(সবাই মন্তব্য করবেন কিন্তু!🥺 নাইস, নেক্সট, n, ন, ফ এগুলো বলতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু! তবুও কেন বলেন!)#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ০৭


পরদিন সকাল আটটা বাজেই শ্রাবণ চলে যাবার জন্য বায়না উঠালেন। আমি তখন সবে হাত-মুখ ধুয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছি। শ্রাবণ এসে বললেন, 'হৃদি রেডি হয়ে নাও। আমরা এখনি বেরোবো।'


কী ব্যাপার! কাল রাতের অপমান কি উনি ভুলে গেছেন? গত রাতের ঘটনার পর তো ওনার মতো আত্নবাদী, দাম্ভিক ব্যাক্তির কাছ থেকে এমন স্বাভাবিক ব্যবহার আশা করা যায় না!


উনি নিজে যেহেতু স্বাভাবিক আছেন তাই আমি আর ব্যাপারটাকে ঘাটালাম না। আমিও অবিকৃত ভাবেই বললাম, 'আমি যাবো না।'


উনি সহসা আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। ওনার কথার অবাধ্য হয়েছি বলে কি মারবেন এখন? আমি কয়েক কদম পিছিয়ে গেলাম। উনি অকস্মাৎ দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি ওখানেই জমে গেলাম।

শ্রাবণ ওভাবেই জড়িয়ে ধরে আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, 'এত দিন ধরে রাগ করে থাকতে হয় না, বউ! গতকাল রাতে এত করে বললাম আমার সাথে যেতে! শুনলেনা কেন? সত্যিই অনেক জরুরী কথা ছিল!'

আমি কখনো ওনাকে এত নরম গলায় কথা বলতে শুনিনি। যারপরনাই অবাক হলাম!


কথা শেষ করে শ্রাবণ আচমকাই আমার কপালে চুমু খেলেন। এরপর হেসে বললেন, 'থাক! বাড়িতে ফিরেই নাহয় বলব সব! এখন ফাস্ট ফাস্ট রেডি হয়ে নাও তো! মা, শ্রেয়া তোমার পথ চেয়ে বসে আছে। সকাল থেকে তিনবার ফোন করে জিজ্ঞেস করে ফেলেছে আমরা কখন ফিরছি!'


শ্রাবণ চলে গেলেন। কিন্তু আমি ঘোরগ্রস্তের মতো পাথরের মূর্তির ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম।


আমার সংবিৎ ফিরল রিহার ডাকে। 'কী ভাবছিস? ফিরে যাবি ওনার কাছে?'


আমি চমকে উঠলাম। 'ইমপসিবল! কখনোই না!'


.

 টেবিলে নাস্তা খেতে বসেছি। শ্রাবণের খাবার মা রিহাকে দিয়ে আমার রুমে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে একা রুমে বসেই খাক।

রিহা খাবার দিয়ে এসে বলল, 'এই দেখ আপু!'


তাকিয়ে দেখলাম ওর হাতে দু'টো ক্যাডবেরি। জিজ্ঞেস করলাম, 'কে দিয়েছে?'


রিহা বিরক্তি নিয়ে বলল, 'তোর সো কল্ড হাজবেন্ড! অসহ্য!'


আমি হেসে বললাম, 'এতই যখন অসহ্য তাহলে নিলি কেন?'


রিহা রেগে বলল, 'নেব না তো কী করব?' পরক্ষণেই রাগ মাখা মুখটাকে হাসি মুখে রূপান্তরিত করে ফেলল, ' ক্যাডবেরি যে আমার জীবন!'


'শয়তান!'


রিহা আবার বলল, 'তোর হাসবেন্ড তোকে যেতে বলেছে ও ঘরে। তোকে ছাড়া না কি খাবে না!'


আমি বিতৃষ্ণা নিয়ে বললাম, 'বারবার তোর হাজবেন্ড তোর হাজবেন্ড করবি না তো! না খেলে না খাক! আমার তাতে কী যায় আসে।'


বাবা টেবিলে এসে বসলেন। রিহা, আমার দুজনেরই খাওয়া হয়ে গেছে। অকারণেই বসে ছিলাম। বাবা মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার মায়েরা খেয়েছে?'


আমরা দুজনেই মাথা নেড়ে 'হ্যা' বললাম।


.

শ্রাবণ সত্যি সত্যিই খাবার ছুঁয়েও দেখেননি। রিহা প্লেট আনতে ওঘরে গিয়ে দেখে খাবার ওমনিই পড়ে আছে। রিহাকে দেখে শ্রাবণ জিজ্ঞেস করেন, 'তোমার বোনকে বলেছিলে রিহা?'


রিহা বলে, 'হ্যা। আপু আসবে না।'


শুনে শ্রাবণ রিহাকে বলেন, খাবারগুলো নিয়ে যেতে। সে খাবে না।


রিহা এসে এসব জানালো আমাকে। এরপর জিজ্ঞেস করল, 'লোকটা এমন করছে কেন রে আপু?'


'জানিনা!' বলতেই দেখলাম শ্রাবণ এদিকেই আসছেন। রিহা ওনাকে আসতে দেখে বলল, 'দেখ আপু, তোকে খুঁজতে শেষমেশ এ ঘরেও এসে পড়ল।'


একদম ফরমাল ড্রেসআপে হাজির হয়েছেন তিনি। নিশ্চয়ই এসে এখন আমাকে আদেশ করবে, বাসায় চলো!


বলতে না বলতেই উনি বলে উঠলেন, 'চলো হৃদি!'


তখনি দেবদূতের মতো বাবা এলেন। উচ্ছল কন্ঠে শ্রাবণকে বললেন, 'এই গরিবের ঘরে একদিন থাকলে সেজন্যে আমি আর হৃদির মা দুজনেই খুব খুশি হয়েছি। '


শ্রাবণ বলতে নিলেন, 'আমিও খুশি হয়েছি বা..!


কিন্তু বাবা তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন। 'এবার তুমি আসতে পারো, বাবা!'


শ্রাবণ হয়তো কিছু বুঝতে পারলেন না। বললেন, ' আপনার কথা আমি ঠিক বুঝলাম না, বাবা!'


বাবা নম্র অথচ শীতল গলায় বললেন, 'হৃদি আর কখনো ও বাড়িতে যাবে না!'


শ্রাবণ একবার আমার দিকে তাকিয়ে পুনরায় বাবার দিকে তাকালেন। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমি কী কোনো ভুল করেছি?'


বাবা শ্রাবণের প্রশ্নের জবাব দিলেন না। হয়তো প্রয়োজন বোধ করলেন না দেওয়ার!


শ্রাবণ আবার বললেন, 'বাবা, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না কী দোষ করেছি! তবুও বলছি প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দিন! মা আমাদের অপেক্ষায় বসে আছে আমাদের যেতে দিন!'


বাবা এবার রূঢ় হলেন, 'হৃদি তোমার সঙ্গে যাবে না! তুমি নিজে যেতে পারো। '


শ্রাবণ হঠাৎ একরোখা কন্ঠে বলে উঠলেন, 'আমি আমার স্ত্রীকে না নিয়ে এক পা ও নড়বো না এ বাড়ি থেকে!'


বাবা বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন, 'হৃদি নিজেই যেতে চায় না তোমার সঙ্গে। তুমি ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখো!'


শ্রাবণ আমার দিকে দৃষ্টিপাত করে অত্যন্ত মোলায়েম গলায় বললেন, 'আমার সঙ্গে যাবে না হৃদি?'


আমি না সূচক মাথা ঝাঁকালাম। 

এটাই আমার জন্য কাল হল।

শ্রাবণ বাবার সামনেই ঘরের কোনে রাখা লোহার টুলটা তুলে নিয়ে ক্ষীপ্র গতিতে শোকেসের দিকে ছুড়ে মারলেন। টুলটা শোকেসের কাঁচ ভেঙেই ক্ষান্ত হল না। ভেতরে সাজিয়ে রাখা কাঁচের কাপ-পিরিচ, প্লেটসহ সবকিছু গুড়িয়ে দিল। অক্ষত রইল মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা জিনিস।

আমার চোখ ফেটে জল চলে এল। আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত। মায়ের বহুদিনের শখ ছিল একটা শোকেসের। বাবা গতবছর বহু কষ্টে মায়ের সে শখ পূরণ করতে পেরেছেন। আজকে এক মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। অমানুষটা সব শেষ করে দিল। একটাবার ভাবল না আমাদের পরিবার যে তাদের মতো ধনী নয়। একটাবার চিন্তা করল না তার মতো আজ একটা নষ্ট করলাম তো কাল তিনটা হাজির হবে এমনটা যে আমার বাবার সামর্থ্য না।


শ্রাবণ অগ্নি দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। কিন্তু তাকানোর সাথে সাথেই সে দৃষ্টি পরিবর্তিত হল অনুতাপে। হয়তো আমার চোখের জল দেখেই! তবে এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকলেন না। বরাবরের মতো গটগট করে হেঁটে চলে গেলেন অগ্নিশর্মা হয়ে।


.

আমি ভেবেছিলাম হয়তো ওখানেই সব শেষ হয়ে গেছে। প্রখর দাম্ভিকতায় ভোগা শ্রাবণ আর কখনো আমাকে ফিরিয়ে নেবার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাববেন না। কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বিকেলেই তিনি আমার শ্বাশুড়ি মা'কে নিয়ে এ বাড়িতে এলেন।

 মা আর পাঁচটা সাধারণ মেহমানদের মতোই আপ্যায়ন করল আমার শ্বাশুড়ি মা'কে। এই ফাঁকে রিহা গিয়ে বাবাকে দোকান থেকে ডেকে নিয়ে এল। আমার শ্বাশুড়ি মা আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। কেন তারা তাদের মেয়েকে তাদের জামাইয়ের সঙ্গে শ্বশুর বাড়ি পাঠায়নি!


বাবা তবু বিচলিত হলেন না। ঠান্ডা মাথায় সব কথা বলতে লাগলেন। 'দেখুন আপা, আপনি আর আপনার মেয়ে অত্যন্ত ভালো মানুষ। আপনাকে আমি মন থেকেই শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আপনার ছেলে মোটেও আপনাদের মতো নয়। সে অতি জঘন্যরকমের খারাপ একজন মানুষ। আমি যদি আগে ঘুনাক্ষরেও টের পেতাম তাহলে কখনোই অমন ছেলের কাছে আমার মেয়েটাকে তুলে দিতাম না!'


নিজের ছেলের স্বমন্ধে ছেলের শ্বশুরের নেতিবাচক মনোভাব দেখেও মা রাগ করলেন না। মুখের মুচকি হাসি বজায় রেখেই বললেন, 'ভাই, আপনি যদি আমার ছেলের অপরাধটা একটু খুলে বলতেন!'


বাবা বললেন, 'আপনার ছেলের অপরাধ হচ্ছে সে প্রচন্ড বদমেজাজী আর রাগী প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের দিনই সে সকলের সামনে নিজের সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীকে চড় মেরেছে। শুধু তাই নয়, আজ সকালে হৃদি তার সঙ্গে যাবে না বলে ও ঘরের শোকেস ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে।'


মুহূর্তেই আমার শ্বাশুড়ি মায়ের হাসি মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি হয়তো ভাবতেই পারেননি ছেলের শ্বশুরের কাছ থেকে ছেলের নামে এসব কথা শুনবেন।

শ্রাবণ চেয়ারগুলোর পেছনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উনি উঠে দাঁড়িয়ে শ্রাবণের সামনে গেলেন। গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুই হৃদিকে চড় মেরেছিলি? '


শ্রাবণ শান্ত স্বরে জবাব দিল, 'হ্যা।'


মা তৎক্ষনাৎ শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে শ্রাবণের গালে চড় বসিয়ে দিলেন। শ্রাবণ লজ্জায়, অপমানে মাথা নিচু করে ফেললেন। মা আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'হৃদিদের শোকেস ভেঙেছিস?


শ্রাবণ সামান্য তাকিয়ে অতি নিম্ন স্বরে বললেন, 'হ্যা!'


মা পুনরায় শ্রাবণকে চড় মারলেন। শ্রাবণের কী হল জানি না উনি পাগলের মতো আমার সামনে ছুটে এলেন। প্রায় থাবা দিয়ে আমার দু'হাত নিজের দু'হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলেন। প্রলাপের মতো বললেন, 'এবার আমার সঙ্গে যাবে তো হৃদি!'


আমার শ্বাশুড়ি মা বাবার সামনে হাতজোড় করে বললেন, 'আমার ছেলের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চাইছি ভাই! পারলে আমাদের মাফ করবেন!'


বাবা অতি ব্যস্ত হয়ে বললেন, 'ওভাবে বলবেন না আপা! এতে তো আপনার কোনো দোষ নেই! আপনি কেন এভাবে হাত-জোড় করছেন!'


মা ঝটকা দিয়ে আমার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে শ্রাবণকে বললেন, 'তুই কোন অধিকারে ওর হাত ধরিস?'

 এরপর আমার দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করতে নিতেই আমি খপ করে মায়ের হাত ধরে নিলাম। 'মা প্লিজ আপনি এমন করবেন না!'


মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। 'পারলে আমাদের ক্ষমা করিস মা! ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তোকে আমরা কখনো জোর করবো না! তুই যে ডিসিশন নিবি সেটাই আমরা মেনে নেব। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস, তোর এ মায়ের দরজা আজীবন তোর জন্য খোলা থাকবে।'


আমার কান্না পেয়ে গেল। কারো শ্বাশুড়ি মা এতো মমতাময়ী, এতো ভালো হয়! বুঝতেই পারলাম না কখন গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে! মা আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, 'ভালো থাকিস মা!'


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা


(১২০০+ শব্দ আছে এ পর্বে। পাঠকদের এটুকু পড়ে পোষায় না জানি। কিন্তু কী করব! ইচ্ছে থাকলেও সময় নেই আমার। কেউ রাগ করবেন না প্লিজ!)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url