#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ০৮+০৯+১০


শ্রাবণ পরদিনই আবার হাজির হলেন। একা নয়, সঙ্গে একটা ট্রাক নিয়ে। একাধারে অনেকক্ষন হর্নের আওয়াজ শুনে আমরা বাইরে বেরোই। ততক্ষনে আশেপাশের মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। ঘটনা জানতে সবাই-ই যেন উদগ্রীব। গিয়ে দেখি রাস্তায় শ্রাবণ একটা মিনি ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই বাবা অপ্রসন্ন হয়ে গেলেন। 

একদিন এই শ্রাবণের ব্যক্তিত্বকে ভালোবেসেই বাবা ওনার হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন। শ্রাবণের রাগ তার প্রতি বাবার সম্পূর্ণ ধারণাটাই হয়তো বদলে দিয়েছে। আমার এখনো চোখে ভাসছে, বিয়ের দিন অব্দিও বাবা কীভাবে শ্রাবণকে মাথায় তুলে রেখেছিলেন! এখনো হয়তো রাখতেন। যদি না উনি বাবার অতি আদরে লালিত মেয়েকে চড় না মারতেন। বাবা কোনোদিনই তার দুই মেয়ের গায়ে ফুলের টোকাটুকু পর্যন্ত লাগতে দেননি। নিজে তো কখনো গায়ে হাত তুলতেনই না। মাকেও তুলতে দিতেন না। ঘুনাক্ষরেও বাবা যদি টের পেতেন মা আমাকে কিংবা রিহাকে মেরেছে, সেদিন থেকে তিন দিন অব্দি তিনি মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন না। মাঝে মাঝে ভাতও খেতেন না এজন্যে। 

তাই মা-ও আমাদের তেমন মারতেন না। তবে বকতো খুব! কিন্তু মায়ের বকুনি আমাদের গায়ে লাগত না একদম। অথচ যে বাবা আমাদের এত ভালোবাসেন তার সামান্য ক্রোধী মুখচ্ছবিও আমাদের অন্তর কাঁপিয়ে দিত। বাবা একবার নিষেধ করলে সে কাজ দ্বিতীয়বার করার স্পর্ধা আমরা কখনোই করতাম না। বাবাকে আমরা ভয় পেতাম, ভয় পাই। কিন্তু তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিমাণটা এত বেশি, যে সবকিছু অতিক্রমণ করে যায়।


 বাবা ভ্রু কুঁচকে শ্রাবণকে বললেন, 'তুমি আবার এখানে কেন এসেছো? আর পাড়ার রাস্তায় দাঁড়িয়ে এভাবে অনবরত হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছ কেন? এটা একটা ভদ্র এলাকা। '


শ্রাবণ ট্রাকের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে চার জন লোক মিলে একটা বৃহদাকার শোকেস নামালো ট্রাক থেকে। শ্রাবণ বাবার দিকে দৃষ্টিপাত করে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম, বাবা। গতকালের ঘটনার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত! দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন! '

বলতে বলতে শ্রাবণ রাস্তাতেই হাটু গেড়ে বসে পরল। আশেপাশের মানুষজন কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছে এই দিকে। এলাকার লোকজন যারা উপস্থিত তাদের মধ্যে প্রায় সবাই-ই এসেছিল বিয়েতে। চড় মারার শো'টা তো উপভোগ করেছিলেনই তারা। এখন শ্রাবণের ক্ষমা চাওয়ার শো'টাও উপভোগ করছেন। 


হাটু গেড়ে বসেই শ্রাবণ বললেন, 'আমি অতি জঘন্য একটা কাজ করেছি। সামান্য একটা কারনে নিজের স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছি..!'


শ্রাবণকে থামিয়ে দিয়ে বাবা বললেন, 'শুধুমাত্র তোমার চাচাতো ভাইকে জানোয়ার বলেছে বলে তুমি ওকে চড় মারবে? তোমার ভাইয়েরও তো দোষ ছিল। হৃদি যখন ফাজলামো করা পছন্দ করছিল না তবুও সে কেন বারবার ফাজলামোগুলো করছিল? '


এখন কি শ্রাবণ বলে দেবে ওনার চাচাতো ভাই যে আমার প্রাক্তন! বিয়ের আগে সে আমার প্রেমিক ছিল!

এখন আবার এই বাহানা দেবে না তো, প্রত্ন আর আমি একে অপরকে ভালোবাসতাম আর সেটা শ্রাবণ মেনে নিতে পারেননি। তাই জনসম্মুখে আমাকে চড় মেরেছে।

অবশ্য এই বাহানা দিলেই বা কী! আমি তো কোনো অন্যায় করিনি! কাউকে ভালোবাসাটা কী অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে? এমন তো না আমি বিয়ের পরও প্রত্নর সাথে যোগাযোগ রেখেছি! সমস্তটাই বিয়ের আগের ব্যাপার। তাহলে শ্রাবণ কেন অহেতুক একারনে আমাকে শাস্তি দেবে?


শ্রাবণ নতিস্বীকার করে বললেন, 'আমার বোঝায় ভুল ছিল বাবা। আমি ভুল করে ফেলেছি। এখন তো চাইলেও সেদিনের ঘটনা বদলাতে পারব না! কিন্তু আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি। এই ইহকালে আমি কোনোদিনও হৃদির ওপর রাগ দেখাব না, গায়ে হাত তোলা তো দূর। আপনি প্লিজ এই অধমকে ক্ষমা করে দিন!'


বাবা শ্রাবণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ' তোমার মনে হয় না আমার কাছে ক্ষমা না চেয়ে যার সাথে অন্যায়টা করেছ তার কাছেই তোমার ক্ষমা চাওয়া উচিত? '


শ্রাবণ ত্রস্ত কন্ঠে জবাব দিলেন, ' ওর কাছে তো অবশ্যই ক্ষমা চাইব বাবা। আগে প্লিজ আপনি অনুমতি দিন ওকে নিয়ে যাওয়ার!


বাবা নিশ্চল হয়ে বললেন, 'আমার মেয়ের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। ও যদি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়ে তোমার সাথে যেতে চায় আমি বাঁধা দেবো না। আবার ও যদি তোমার সাথে যেতে না চায় ওকে আমি জোরও করবো না।


শ্রাবণ আশান্বিত হয়ে তাকালেন আমার দিকে। নরম গলায় বললেন, 'আমাকে ক্ষমা করে দাও হৃদি! আমি ভুল করে ফেলেছি। আর কখনো এমন ভুল হবে না! প্রমিস!'


আমি নির্বাক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে থাকা লোকটা কি সত্যিই অনুতপ্ত না-কি কেবলই ছল?


আমি তপ্ত শাস ফেললাম। 'প্লিজ উঠুন! '


শ্রাবণ নাছোড় ভাব নিয়ে বললেন, 'তুমি ক্ষমা না করলে আমি উঠব না।'


আমি নিঃস্পৃহ হয়ে বললাম, ' এখানে বসে আর তামাশা করবেন না। দয়া করে উঠুন।'


শ্রাবণ কি আশাহত হলেন? ওনার মুখের রঙ যেন বদলে গেল। নিরাশ কন্ঠে বললেন, 'হৃদি তুমি কি সত্যিই ভাবছো আমি তামাশা করছি? তুমি সবসময়ই কেন আমার ভালোবাসাকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য কর! আমি কি এতই ঘৃণ্য, এতই কুৎসিত, এতই বর্বর?'

কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার বললেন, 'হ্যা আমি ভুল করেছি নিশ্চয়ই। তাই বলে কি আমাকে একেবারেই ক্ষমা করা যায় না হৃদি! অন্তত একটাবার কি সুযোগ দেওয়া যায় না আমাকে!'


আমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে শ্রাবণ বললেন, 'আচ্ছা ঠিকাছে। তোমাকে এখনি ক্ষমা করতে হবে না। তুমি চলে যাও। কতক্ষণ এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে! আমি নাহয় অপেক্ষা করবো তোমার ক্ষমার। এখানে বসেই।'


রিহা চেঁচিয়ে উঠল 'এখানে বসে অপেক্ষা করলে তো সিএনজি আপনাকে চাপা দিয়ে চলে যাবে দুলাভাই!'


রিহার গিরগিটির মতো রঙ বদলাতে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। ও না-কি শ্রাবণকে কখনোই দুলাভাই বলে ডাকবে না? গতকাল পর্যন্তও ওই লোক, ওই লোক করছিল। আর আজ চোখের পলকে দুলাভাই হয়ে গেল!


রিহার কথার প্রতুত্তরে শ্রাবণ বললেন, 'কী করব বল! আমিও তো নিরুপায়। তোমার বোন ক্ষমা না করলে আমরণ অনশন করা ছাড়া আমার তো আর কোনো উপায় নেই!'


মা, বাবা, রিহা, শ্রাবণ সকলেই আমার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যার অর্থ হচ্ছে এই, ক্ষমা করেছ না-কি করনি?


রিহাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে ও চাইছে আমি শ্রাবণকে ক্ষমা করে দেই। মা'র দৃষ্টিতেও একই বচন। আর বাবা আমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।


আমি আমার উত্তর জানালাম, 'আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এবার উঠুন!'


আনন্দে শ্রাবণের চোখ চকমকিয়ে উঠল। উনি খুশিতে গদগদ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। ওনার ভাব-ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে এখনি আমাকে জড়িয়ে ধরবেন। আমি শঙ্কায় আতকে উঠলাম। বাবা-মা সকলের সামনে উনি যদি এখন আমাকে জড়িয়ে ধরেন এর চাইতে লজ্জার আর কিছু হবে না।


কিন্তু না আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে উনি মায়ের দিকে এগিয়ে গেলেন। মা'কে বললেন, 'মা কালকে আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। রাগের বশে আপনার প্রিয় একটা জিনিস ভেঙে ফেলেছি। ফার্নিচারের দোকানে হুবহু ওইরকমি অনেক খুঁজেছি, পাইনি। এটা আপনার পছন্দ হয়েছে তো মা?'


মা বলল, 'এসবের কোনো দরকার ছিল না, বাবা!'


শ্রাবণ জোর করলেন, 'অবশ্যই ছিল! আপনার অতো প্রিয় ছিল ওটা! আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি মা। এখন থেকে আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব নিজের রাগকে দমানোর।'


বাবাও চাইলেন না শ্রাবণের আনা শোকেসটা রাখতে। প্রথমত, ওটা আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, তাও আবার আমাদের আগেরটার ডাবল। 

শ্রাবণ মা-বাবার সাথে জোরাজোরি করতে লাগলেন। বলতে লাগলেন, সে ক্ষতি করেছে তাই ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে তো এটা গ্রহন করলে তাতে দোষ কোথায়?

অবশেষে শ্রাবণ বিজয়ী হলেন। শোকেসটা নিয়ে মা'র ঘরে রাখা হল।


মিস্ত্রিদের সাথে শ্রাবণও ঘরে এলেন। মা ওনাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে চা-নাস্তা খেতে দিলেন। এবারও শ্রাবণ রিহাকে দিয়ে খবর পাঠালেন। আমি ওনার সামনে গিয়ে না বসলে উনি খাবেন না। গতকালকে এভাবেই রাগ করে না খেয়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি। উপায় শূন্য হয়ে তাই ওনার সামনে গিয়ে বসলাম। মা আমাদের একা ছেড়ে চলে গেল। শ্রাবণ আমাকে একটা বিস্কুট সাধলেন। কথা না বাড়ানোর জন্য বিস্কুটটা নিয়ে কামড় বসালাম। আচমকা ছো মেরে বাকি অর্ধেকটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিলেন উনি। তারপর নিজে খেতে লাগলেন। আমি বিরক্তি চোখে তাকালাম ওনার দিকে। উনি দাঁত বের করে হাসলেন।


আমি বললাম, 'আপনি গতকাল থেকে এমন আচরণ করছেন যেন আমাদের প্রেমের বিয়ে! আর আমাকে কতোই না ভালোবাসেন।'


শ্রাবণের দৃষ্টি পরিবর্তিত হয়ে গেল। অদ্ভূত চোখে তাকিয়ে বললেন, 'প্রেমের বিয়ে না। কিন্তু এটা তো ঠিক, আমি তোমাকে প্রবলভাবে ভালোবাসি।'


আমি বললাম, 'আপনি আমাকে যেহেতু ভালোবাসেন, সেহেতু আপনার তো আমাকে বোঝার দরকার!'


শ্রাবণ ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 'বুঝবো।'


'আমি আপনার সঙ্গে যেতে চাই না।'


বিস্ময়ের ঝলকানি দেখা গেল শ্রাবণের চোখে-মুখে। 'কেন যাবেনা হৃদি? তুমি কি এখনো আমাকে ক্ষমা করতে পারো নি? '


আমি জবাব দিলাম, 'ব্যাপারটা এমন নয় যে আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি। আমি জাস্ট আপনার সাথে যেতে চাইছি না।'


শ্রাবণ হঠাৎ মন খারাপ করে বললেন, 'আমাকে অপছন্দ বলে?'


'আমি জানিনা কেন! কিন্তু আমার আপনার সাথে যেতে ইচ্ছে করছে না। '


শ্রাবণ আচমকা উঠে দাঁড়ালেন। সামান্য হেসে বললেন, 'আচ্ছা ঠিকাছে। তুমি কিছুদিন সময় নাও। আমি নাহয় ততদিন তোমার জন্য অপেক্ষাই করি! কিন্তু একলা ছাড়বো না কিছুতেই। প্রতিদিনই তোমাকে বিরক্ত করতে এই বান্দা হাজির হয়ে যাবে। ' বলেই দুষ্টু হাসি হাসলেন। তারপর আবার বললেন, 'আচ্ছা তোমাদের বাড়ির আশেপাশে কোনো বাসা ভাড়া পাওয়া যাবে?'


আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, 'আপনি কি নিজের বাড়ি ছেড়ে এখন আমাদের এলাকায় এসে ভাড়া থাকবেন?'


শ্রাবণ চলে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। মুখে বললেন, 'অবশ্যই!'

এরপর চলে যেতে যেতে অকস্মাৎ পিছু ফিরে তাকিয়ে বললেন, 'আমাদের প্রেমের বিয়ে না ঠিক। কিন্তু তুমি চাইলে কি হতে পারতো না?'


আমি বিস্মিত হলাম। আমি চাইলেই বা কীভাবে হতে পারতো! ওনাকে চিনতে-জানতে পারলামই তো বিয়ে ঠিক হবার পর! সবে মাত্র দশ দিন হলো ওনার সঙ্গে আমার পরিচয়ের।


(প্রতিদিনই গল্প দিতে চাই কিন্তু একটার পর একটা ব্যস্ততা লেগেই আছে। তাই সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল দেইনি তাই আজ অনেকটাই বড় করে দিয়েছি। প্রায় ১৪০০ ওয়ার্ড!

আগামীকালও বোধহয় গল্প দিতে পারব না। ডাক্তার দেখাতে যাব। ওখানেই সারাদিন পার হয়ে যাবে। কেউ রাগ করবেন না! আপনারা সবাই-ই যদি শ্রাবণ হয়ে যান তাহলে আমি কী নিয়ে বাঁচবো?😔😁)


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ০৯


শ্রাবণ সত্যি সত্যিই আমাদের এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে নিলেন। তারপর থেকেই ওনার আমাদের বাড়িতে হুটহাট করে আসার উৎপাত বেড়ে গেল। মা না পারেন কিছু বলতে আর না পারেন ফেলে দিতে। রিহাকে তো উনি বশ করে ফেলেছেনই। এখন মা'কে বশ করতে উঠে পরে লেগেছেন। গতকাল মা'কে জোর করে কোথায় যেন নিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন ডজনখানেক কাঁচের জিনিসপত্র নিয়ে। রোজ রিহাকে নিজের প্রাইভেট কার করে কলেজে দিয়ে আসেন। ইদানীং বাবার পেছনেও পড়েছেন। অকারণে বাবার দোকানে গিয়ে বসে থাকেন। বাবার সঙ্গে খোশগল্প করেন। বাবার কাজে সাহায্য করেন বাবা না চাইলেও। নিজের অফিস ছেড়ে, কাজকর্ম ছেড়ে কেন এখানে এভাবে পড়ে আছেন উনি!

ওনার এতসব ছলাকলা কীসের জন্য তা অবশ্য আমার বুঝতে বাকি নেই। উনি নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন আমি তার সঙ্গে কিছুতেই ফিরে যাব না। তাই আমার পরিবারকে মানাতে উঠেপড়ে লেগেছেন। যাতে তারা অনেকটা জোর করে হলেও আমাকে ও বাড়িতে পাঠান।


মা, রিহাকে নিজের বশে করে নিলেও বাবাকে উনি কখনোই বশীভূত করতে পারবেন না আমার দৃঢ় বিশ্বাস।


.

সেদিন লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম বই কিনতে। থার্ড ইয়ারে ভর্তিই হয়েছিলাম শুধু। কোনো বই কেনা হয়নি, ক্লাসও করা হয়নি। ফেরার সময় গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখনি শ্রাবণ এসে হাজির। এসেই জোরাজোরি করতে লাগলেন গাড়িতে ওঠার জন্য। কিন্তু আমি কিছুতেই উঠব না। শেষে একটা অটোরিকশা করে বাসায় ফিরি। পুরোটা রাস্তা উনি আমাকে ফলো করতে করতে এসেছেন। শুধুমাত্র একদিনই এমন হলে হয়তো ব্যাপারটা আমাকে ভাবাত না। কিন্তু তিনি রোজই এমন করতে লাগলেন। বই কেনার পর আমি রোজ ক্লাস করতে শুরু করি। রোজ যাবার সময় তিনি আমাকে ফলো করতে করতে যান। ফেরার সময় ফলো করতে করতে ফেরেন। 


আর সহ্য করা যাচ্ছে না ওনার উপদ্রব। আমি একদম অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। আজ ওনাকে কড়াকড়ি ভাবে জানাবো আমি ওনার সঙ্গে কখনোই ফিরবো না এবং ফিরতে চাই না।


অবশেষে সে সুযোগটা এল। দুপুরে রিহাকে কলেজ থেকে আনতে গিয়েছিলেন তিনি। মায়ের কথায় ঘরে ঢুকে বসার ঘরে বসে ছিলেন। মা'কে বলে খাবারের ট্রে'টা আমি নিজেই নিয়ে গেলাম। এই অযুহাতে ওনার সঙ্গে কথা বলা যাবে।

আমাকে দেখেই ওনার চোখদুটো চকচক করে উঠল। আমাকে ট্রে হাতে নিয়ে এগোতে দেখে আহ্লাদে আটখানা হয়ে বললেন, 'তুমি নিজের হাতে আমার জন্যে খাবার এনেছো হৃদি!'


হাত থেকে ট্রে'টা টেবিলের ওপর রেখে বললাম, 'এতে এত সারপ্রাইজড হবার কী আছে!'


উনি ঈষৎ হেসে বললেন, 'না তুমি তো কখনো আনো না তাই আর কি।'


আমি বললাম, ' আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।'


উনি গাল ভরে হাসলেন। 'বলো!'


আমি গুরুতর ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলাম, 'আমি চাইনা আপনি আর এ বাড়িতে আসুন।'


উনি তড়িৎ গতিতে বলে উঠলেন, 'কেন হৃদি? আমিতো কাউকে বিরক্ত করছি না!'


'আপনি করছেন না কিন্তু সবাই হচ্ছে।'


উনি বিদ্রুপ করে হাসলেন। 'সবাই না-কি তুমি?'


'ধরুন আমিই।'


শ্রাবণ হঠাৎ দু'হাত জোড় করলেন, 'প্লিজ হৃদি! অন্তত তোমাকে দেখার অধিকারটুকু আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না!'


আমি এবার বিরক্তির চরম সীমানায় পৌঁছে গেলাম। 'আমিই আপনার কাছে হাতজোড় করছি! আপনি প্লিজ আমাকে যন্ত্রণা দেওয়াটা বন্ধ করুন! আপনি কেন বুঝতে পারছেন না আপনি যতো যাই করুন না কেন আমি আর কখনো আপনার কাছে ফিরব না!'


শ্রাবণ ঠান্ডা স্বরে বললেন, 'আমি কি একটা সেকেন্ড চান্সও ডিজার্ভ করি না, হৃদি!'


'আমি জানিনা আপনি ডিজার্ভ করেন না-কি করেন না! আমি শুধু জানি, আপনার প্রতি শ্রদ্ধা জিনিসটা আমার আর নেই। আর যার প্রতি শ্রদ্ধা নেই তাকে সারাজীবন চেষ্টা করেও ভালোবাসা সম্ভব না।'


শ্রাবণ বলে উঠলেন, 'কী করলে আমার প্রতি তোমার শ্রদ্ধা ফিরবে হৃদি? আমাকে বলো। আমি তা-ই করবো। '


আমি তপ্ত শাস ফেললাম। 'আপনি চলে যান। তাহলেই হবে।'


'আমি এখান থেকে চলে গেলে তুমি আমার কাছে ফিরে যাবে? '


' আচ্ছা, আপনি কি সোজা কথা সোজা ভাবে বুঝতে পারেন না? আমি একবার বলেছি, আরেকবার বলছি। যাই হয়ে যাক না কেন আমি আপনার কাছে কখনোই ফিরব না!'


আচমকা শ্রাবণের মুখচ্ছবির পরিবর্তন ঘটল। কয়েক সেকেন্ডেই ভয়ংকর মূর্তি ধারণ করলেন তিনি। বসা থেকে উঠে এগিয়ে এসে আমার গাল চেপে ধরলেন। 'কেন তোর ওই আশিককে এখনো ভুলতে পারিসনি? কী করলে ভুলতে পারবি? ওকে মেরে ফেললে?'


আমি ঝটকা মেরে ওনার হাত সরিয়ে দিলাম। 'এবার বুঝতে পেরেছেন কেন আমি আপনার কাছে ফিরতে চাই না? আপনার এই অফেন্সিভ বিহেভিয়ারের কারনে!'


শ্রাবণ হঠাৎ শান্ত হয়ে বসে পড়লেন। 'তুমি আমার কাছে ফিরছো না বলেই তো এমন করছি। ফিরলে কি আর..!


'যে স্বামী তার স্ত্রীকে বিয়ের দিনই সবার সামনে চড় মারে শুধুমাত্র বিয়ের আগে তার চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে স্ত্রীর প্রেম ছিল বলে, বিয়ের দু'দিন পর্যন্ত রুঢ আচরণ করে সেই একই কারনে, নিজের শ্বশুরের সামনেই রাগ দেখিয়ে সে বাড়ির শোকেস ভাঙে, আবার এখন স্ত্রী সেসব সংগত কারণে তার সাথে যাবে না বলে অফেন্সিভ আচরণ করে সে স্বামীর কাছে ফেরাটা কতটা স্বাভাবিক? '


'আমি আর কোনোদিনই কোনোরকম ভায়োলেন্স সৃষ্টি করবো না, অফেন্সিভ বিহেভিয়ারও না। তুমি শুধু আমাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখো হৃদি!'


আমি জবাব দিলাম না। ওনাকে বোঝাতে বোঝাতে আমি ক্লান্ত।


শ্রাবণ আবার বললেন, ' সেদিন আমি তোমাকে ওভাবে চড় মেরে অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছি। সেজন্য আমি অনুতপ্তও! কিন্তু ওমন একটা শুনে আমি নিজের মাথা ঠিক রাখতে পারিনি।'


আমি বললাম, 'প্রত্নর সাথে তো আমার বর্তমানে কোনো সম্পর্ক নেই! অতীতে বিয়ের আগে ছিল। সেটা শুনে এতটা রিয়েক্ট করার মানে আমি বুঝতে পারছি না। যদি এমন হতো বর্তমানে বিবাহিত অবস্থায় আমার ওর সাথে সম্পর্ক আছে তাহলে আপনার রাগটা যুক্তিসঙ্গত হত। কিন্তু সেদিনেরটা মোটেও নরমাল বিষয় ছিল না।'


শ্রাবণ বললেন, 'আমি তোমাকে সেজন্যে মারিনি।'


আমি বিস্মিত হলাম, 'তাহলে কেন মেরেছেন?'


শ্রাবণ ইতস্তত করতে লাগলেন। 'বিয়ের দিন তোমাকে দেখার পর প্রত্ন আমাকে বলে, নিজের ছোট ভাইয়ের এক্স গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করছো! এর সঙ্গে তো আমি শুয়েছিও!

এ কথা শোনার পর থেকেই মাথা গরম হয়ে ছিল। সারাদিনই কানে এই সেন্টেন্স দুটো বেজেছে। কখন কী করে ফেললাম বুঝতেই পারিনি। যখন বুঝতে পারলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।'


রাগে, ঘৃণায় আমার গা রি রি করে উঠল। প্রত্ন এত জঘন্য মিথ্যে কথাগুলো এভাবে বানিয়ে বানিয়ে বলেছে!

' ও কীভাবে বলতে পারল এই নোংরা কথাগুলো! প্রত্নর সাথে আমার কখনোই ওরকম কোনো সম্পর্ক ছিল না। ও খুব ভালো করেই জানতো বিয়ের আগে এসব আমি ভুলেও পছন্দ করব না। তাই ও কখনো অন্যায়ভাবে দাবিও করতো না। আমি জানিনা কেন ও এসব কথা আপনাকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছে!'


শ্রাবণ বললেন, 'যাতে আমি তোমার ওপর রাগ করে বিয়ে ভেঙে দেই। ও বোধহয় আগে জানতো না আমার হবু স্ত্রী তুমি!'


আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'তাহলে বিয়েটা ভাঙলেন না কেন? আপনি যেহেতু ওর কথা প্রায় বিশ্বাসই করে নিয়েছিলেন!'


'ঠিক বিশ্বাস করিনি। হঠাৎ অমন একটা কথা হজম করতে পারিনি। তোমাকে তো আগে থেকেই খুব ভালোভাবে চিনতাম। আমি জানতাম তুমি কখনোই কোনোরকম অনৈতিক সম্পর্কে জড়াবে না। কিন্তু প্রত্নতো তোমাকে বাধ্যও করতে পারে! তাই! আসলে কী ঠিক কী মন্দ তখন আমার মাথাই কাজ করছিল না! আর বিয়ে ভাঙার তো প্রশ্নই ওঠে না! এত দিন এত সাধনার পর তোমাকে নিজের করে পেতে চলেছিলাম। সেটাকে আমি ওভাবে ভেস্তে দিতাম!'


আমি শ্রাবণের কথার কোনো আগামাথা খুঁজে পেলাম না। শুধু তিনটা কথাই মাথায় ঘুরতে লাগল। চিনতাম, এত দিন, এত সাধনা!


আমাকে কিছু একটা ভাবতে দেখে শ্রাবণ বললেন, 'কী ভাবছো?'


'আপনার কথার মানে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না!'


'তোমাকে কীভাবে চিনতাম সেটা?'


আমি মাথা নাড়িয়ে 'হ্যাঁ ' বললাম। 


শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'সেগুলো আর জেনে কী লাভ! তুমি আগেও আমাকে ঘৃণা করতে, এখনো করবে!'


বলে আর বসলেন না। উঠে চলে যাবার জন্যে পা বাড়ালেন। আমি পেছন থেকে ডাকলাম, 'তবুও বলুন!'


শ্রাবণ চলে যেতে যেতেই বললেন, 'যেভাবে শুরুটা হয়েছিল সেভাবেই নাহয় বলবো! '


এবারো ওনার কথা বোধগম্য হলো না আমার। আমি ভাবতে লাগলাম, শুরুটা কীভাবে হয়েছিল! 


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা


(বহু কষ্টে এইটুকু লিখেছি। আজকে লেখার মতো কোনো অবস্থাই ছিল না। দু'দিন দেরি হয়েছে বলে কমেন্ট সেকশনে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। আপনাদের তো আমি বলেই গিয়েছিলাম, ডাক্তার দেখাতে যাব। আমার অবস্থাটাও তো আপনাদের বোঝা উচিত তাই না?🙂)#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ১০


সেদিন বিকেলেই আমার নামে একটা চিঠি এলো। রিহার মাধ্যমে। চিঠিটা দেখে আমি স্মৃতিবেদনাতুর হয়ে পড়লাম। একটা সময় এমন কত-শত চিঠি আসতো আমার নামে! সেই চিঠির জন্যে সবসময় মুখিয়ে থাকতাম আমি। আজ সব শুধুই স্মৃতি! 


 অতীতে যার চিঠির অপেক্ষায় প্রহর গুনতাম এই চিঠি সে পাঠায়নি। শ্রাবণ পাঠিয়েছে। হঠাৎ চিঠি পাঠালেন কেন উনি?


নিজের ঘরে গিয়ে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। 


  প্রিয় বহ্নিশিখা, 


   তোমার ওই বুদ্ধিদীপ্ত চোখের প্রেমে পড়েই তো তোমার নাম দিয়েছিলাম বহ্নিশিখা! আগুনের মতোই যেন জ্বলজ্বল করছিল সেদিন তোমার চোখের তারাগুলো। তোমার ওই অগ্নিমূর্তি ধারণ করার কারন কী ছিল সেদিন, মনে আছে?

বৃহস্পতিবার। তুমি শ্রান্ত হয়ে স্কুল থেকে ফিরছিলে। আমিও ছোট খালার বাসা থেকে ফিরছি। কাকতালীয়ভাবে দুজনেই একসঙ্গে বাসে উঠে দেখি একটামাত্র সিট! সেটাও আমি দখল করে নেই। তুমি না পারছিলে কিছু বলতে আর না পারছিলে সহ্য করতে! তাই হয়তো খানিক বাদে বাদে আমার দিকে চেয়ে অগ্নি দৃষ্টি ছুড়ছিলে। সেটা কিন্তু আমার নজর এড়ায়নি! পুরোটা রাস্তা তুমি তোমার বান্ধবীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইলে। আমি চাইলেই কিন্তু তোমাকে সিটটা অফার করে নিজে দাঁড়িয়ে আসতে পারতাম। কিন্তু করিনি। কেন করিনি জানো? ওই যে তোমার দৃষ্টি! তোমার দৃষ্টির লোভে। তুমি হয়তো খেয়াল করোনি যার ওপর তুমি অগ্নিদৃষ্টি বর্ষন করছো সেও লুকিয়ে চুরিয়ে তোমাকে দেখছিল! 

অবশেষে তোমার গন্তব্যস্থান এল। তুমি নেমে গেলে। আমি কিন্তু সে জায়গাটার ছবি আমার মস্তিষ্কে ভালোমতো গেঁথে নিয়েছিলাম। কারণ ওখানেই যে আমার বহ্নিশিখার পুনরায় দেখা মিলবে!

বাসায় ফেরার পর আমার আর কোনোকিছুতেই ঠিকমতোন মন বসছিল না। সারাটাক্ষন শুধু তোমার ওই দৃষ্টি আমার চোখে চোখে ভাসছিল। তোমার সেই বাঁকা, জ্বলজ্বলে চোখদুটো! 

সারারাত ঘুমোতেও পারলাম না। ভোরের দিকে একটুখানি চোখ লেগে এসেছিল। সেখানেও অস্থিরতা। স্বপ্নে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হলো। আগের দিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। 

রাতের স্বপ্নকে সত্যি করার প্রচেষ্টায় আমি পরদিনই আবার ছোটো খালার বাসায় যাই। রোজ তোমার অপেক্ষায় সেই একই বাস-স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকি। তোমার সঙ্গে রোজ একই বাসে উঠি। তুমি নেমে গেলে আমিও নেমে যাই। অথচ কিছুই তোমার চোখে পড়ে না। তুমি আর কখনো দ্বিতীয়বার আমার দিকে দৃষ্টি ফেললে না। আমি আহত হই। পরের দিন আবার নতুন উদ্দ্যমে তোমাকে দেখার উদ্দেশ্যে নিয়ে পুনরায় বেরিয়ে পড়ি। পড়াশোনা ফেলে কল্পনায় তোমাকে নিয়েই পড়ে থাকি দিন রাত। ফলাফল, এক বছর পিছিয়ে পড়া। তাতে অবশ্য আমার কিছুই যায় আসেনি। আমি যে তখনো তোমাতে মগ্ন! কিন্তু মা'র অনেক কিছুই গেল, আসলো। মা অকস্মাৎ আমার এই করুন দশার কারণ বুঝতে পারেন না। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেও আমি বলি না। মা ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তার ছেলেটার কী হয়ে গেল হঠাৎ!

 ততদিনে মনে সাহস সঞ্চয় করে তোমাকে চিঠি লিখতে আরম্ভ করে দিয়েছি। পাঁচ -ছয়টা চিঠি পাবার পর একসময় হয়তো দয়া করে তুমি আমাকে চিঠির উত্তর দাও! তোমার চিঠি পেয়ে খুশিতে আমি আমার সব বন্ধুদের মিষ্টি খাওয়াই। ওদের ভাবি এই প্রথম আমাকে চিঠি লিখেছে কি-না!

চিঠিতে তুমি আমার পরিচয় জানতে চাও। আমি দেইনি। তোমার সঙ্গে আমার বাসে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথাও জানাইনা। শুধু বলি, আমি হৃদি নামক লাইলির মজনু! 

তুমি কি হাসছো হৃদি? চিঠি পড়ে?

এরপর তোমার সঙ্গে আমার নিয়মিত চিঠি আদান-প্রদান হতে থাকে। প্রথম প্রথম তুমি খুব সহজে উত্তর দিতে না। একটাসময় নিয়মিত দিতে শুরু করলে। আমি বুঝতে পারলাম তোমারো হয়তো আমার প্রতি একটা অদৃশ্য টান জন্মাতে শুরু করেছে!

একদিন চিঠিতে জানালে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাও। আমি বলি, একেবারে মা'কে সঙ্গে করে তোমার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়ে তোমাকে চমকে দেবো! ব্যাপারটা নিয়ে তুমিও অনেক এক্সাইটেড ছিলে। দুজনেরই প্রথম প্রেম কি-না! 

করেছিলামও কিন্তু তা-ই! তুমি নিশ্চয়ই সেদিন আমাকে দেখে চিনতেই পারোনি তাইনা? 


তোমার আমার প্রেম ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। চিঠিতেই। রহস্যময়ভাবে। আমাদের দেখা সাক্ষাৎ কিছুই হয় না। অথচ ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। তোমার কিশোরী মনের সবটুকু ভালোবাসা তুমি উজার করে দিয়েছিলে। কিন্তু আমার ভালোবাসার পরিমাণের কাছে তা ছিল অতি ক্ষুদ্র এবং থাকবে। বিশ্বাস হয় না? প্রমান দেবো?


হঠাৎ একদিন তুমি আমাকে চিঠিতে জানাও তুমি আমার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে। আমি যেন আর তোমাকে চিঠি না দেই। আমি কিন্তু তোমার কথা শুনিনি! আমি রোজ নিয়মকরে তোমাকে চিঠি লিখতাম। কিন্তু তুমি উত্তর দিতে না। আমি বুক ভরা কষ্ট নিয়ে আবারও চিঠি লিখতাম। তুমি এবারো উত্তর দিলে না। এমনি করেই চলতে থাকে তিনটে মাস! আমি রাতে ঘুমোতে পারি না। পড়াশোনায়, চাকরিতে কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারি না। তোমার কথা ভুলতে পারি না এক মুহুর্তের জন্যেও। 

তুমি কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটিতে উঠে গেলে। ভার্সিটিতে যাবার জন্যে যখন সেই একই স্টেশনে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে, আমি দূরে দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখতাম। সামনে আসার সাহস হতো না কখনো। পুরো দুনিয়ার সামনে আমি ছিলাম অতি বদরাগী, জেদি, ভয়ানক একজন মানুষ। অথচ তোমার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার বুক কাঁপত। এর কারণ আমি আজও উপলব্ধি করতে পারিনি!

একদিন জানতে পারলাম, আমারই চাচাতো ভাই প্রত্নর সঙ্গে তোমার প্রেমের সম্পর্ক। আমি মেনে নিতে পারি না। আমার চাচাতো ভাই বলে নয়। আমার প্রথম ভালোবাসা অন্য কারো হয়ে যাচ্ছিল বলে। 

আমার ভীষণ অভিমান হয়। দেড়টা বছর যাবৎ আমি পাগলের মতো তোমাকে রোজ চিঠি লিখে গিয়েছি তুমি উত্তর না দেওয়া স্বত্তেও। তুমি আমার সঙ্গে আর কোনোরকম সম্পর্ক রাখতে চাও না জানা স্বত্তেও। আজীবনই হয়তো এমনটা করতাম। যদি না তুমি আমাকে ওভাবে ধোঁকা দিতে। তুমি কীভাবে পারলে নিজের প্রেমিককে অবহেলা করে অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে? তোমার কি একটাবারও আমার কথা মনে পড়েনি? একটাবারও মনে হয়নি আমি জানতে পারলে আমার কি অবস্থা হবে? চিঠিতে তুমি যে আমাকে এত এত ভালোবাসার কথা বলতে সব কি তবে মিথ্যে ছিল? সব কি তবে অভিনয়? শুধুই নাটক?

আচ্ছা হৃদি, প্রত্নর মাঝে কী এমন আছে যা আমার মাঝে নেই?


এরপর আমি আর কখনো তোমাকে চিঠি লেখিনি। তোমাকে ভুলতে নতুন কাজে নিয়োজিত হই। চাকরি ছেড়ে বাবার ফেলে যাওয়া ব্যাবসা নতুনভাবে দাঁড় করাই। নিজের সম্পূর্ণ সময়, সম্পূর্ণ মনোযোগ সেখানে দেই। ব্যাবসায় লাভবান হয়েছি ঠিকি কিন্তু তোমাকে ভুলতে পারিনি। এ জীবনে পারার চান্সও নেই। মাঝখানে আরো কয়েকবছর পেরিয়ে যায়। তুমি আমাকে ভুলে গেলেও আমি কিন্তু তোমার খোঁজ ঠিকই রাখি। 

প্রত্নর সাথে তোমার প্রেমের সম্পর্ক জানা স্বত্তেও মা'কে সঙ্গে নিয়ে তোমার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হই। তুমি কি আমাকে দেখে চমকেছিলে? তুমি নিশ্চয়ই চিনতেই পারোনি এ-ই সেই তোমার পত্র প্রেমিক!

 সেদিন তোমাকে আমাকে কিছুক্ষণ একা কথা বলতে দেওয়া হয়েছিল। আমি ইচ্ছে করেই সারাটাক্ষন চুপ হয়ে ছিলাম। কারন তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তুমি কী বলবে। তুমি নিশ্চয়ই বলতে, আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। তাইনা?

কিন্তু সেই ভালোবাসায় তো প্রত্নর কোনো অধিকার নেই! সম্পূর্ণটাই আমার। তুমিই তো চিঠিতে বলতে, তোমার সমস্ত ভালোবাসা আমার জন্য। তাহলে? তাহলে সে ভালোবাসার ভাগ আমি অন্য কাউকে কেন দেবো?

তাই সেদিন তোমাকেও কোনো কথা বলতে দেই না আমি। তুমি কিছু বলতে নিলে উঠে চলে আসি। তুমি নিশ্চয়ই ভেবেছো, ছেলেটা কি অসভ্য!


ভাগ্য ভালো থাকায় হয়তো সেদিন তোমার বাবা-মা রাজি হয়ে যায়। তোমার সঙ্গে আমার বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক হয় ঠিক এক সপ্তাহের মাথায়।


বিয়ের পূর্বের সাতদিনে আমি আর তোমাকে ফোন দেই না। যদিও মা আমাকে তোমার নাম্বার দিয়েছিল তবুও। এই ফোন না করার কারন একটাই। ফোন করলেই তুমি বলতে, আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। এই ভয়ে আমি আর তোমাকে ফোন করার সাহস করে উঠতে পারিনি।


প্রত্ন হয়তো আগে থেকে জানতো না তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। বিয়ের দিন তোমাকে দেখা মাত্রই তোমার নামে কিছু বাজে কথা আমার কানের কাছে এসে উল্লেখ করে। ও ভেবেছিল এগুলো করলে আমি রেগে বিয়ের আসর থেকে উঠে পালিয়ে যাব। পুরোপুরি সফল না হলেও কিছুটা সফল হয়ে যায় ওর পরিকল্পনা। রেগে বিয়ে ভেঙে না দিলেও তোমার গায়ে হাত তুলে বসি সবার সামনেই। রাগে তখন আমার হিতাহিত জ্ঞান না থাকলেও পরক্ষণে রাগ কমলে আমি বুঝতে পারি কী ভুল করেছি! তৎক্ষনাৎই আমি ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। বিয়ের রাতে তুমি যখন মায়ের ঘরে বসেছিলে আমি তোমাকে খুঁজতে ও ঘরে যাই। উদ্দেশ্য একটাই, ক্ষমা চাওয়া! কিন্তু তখন আচমকা মা এসে পড়েন। তখন যদি মা'র সামনে ক্ষমা চাইতাম তাহলে মেহমানদের সবার সামনেই মা আমাকে চড় মেরে বসতেন নিজের বউকে অসম্মান করেছি বলে। তখন বিষয়টা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওটাই ঠিক হত। তাহলেই হয়তো তোমার আর আমার মাঝে এতটা দূরত্বের সৃষ্টি হতো না।

মা চলে যাবার পর আমি পুনরায় ও ঘরে গিয়েছিলাম তোমাকে খুঁজতে। তখনই প্রত্নকে ও ঘর থেকে বেরোতে দেখি। সে মূহুর্তে আমার কতটা রাগ হয়েছিল তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। ও কোন সাহসে আমারই বউয়ের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করে?


সে রাতে রাগ করে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই না। আমার ভয় ছিল প্রত্ন হয়তো ভুলিয়ে-ভালিয়ে তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। তাই সে রাতেই ইঙ্গিতে তোমাকে বোঝাই এমন কিছু না করতে। কিন্তু তুমি আমাকে ভুল বোঝো রেগে যাও।

এরপরের দিন আমার ধারণাকে সত্যি প্রমাণ করে প্রত্ন তোমাকে চিরকুট দেয়। নিজের মতো করে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে পালিয়ে যেতে চায় তোমাকে নিয়ে।

তুমি ভাবতে পারছো ওর কত বড় দুঃসাহস! আমারই সামনেই আমার বউকে চিরকুট দেয় আর ভাবে আমি বুঝতেই পারব না! ওকে মেরেছি বলে তোমার কষ্ট হয়েছিল হৃদি? আমার বউকে ওর সাথে পালাবার প্রস্তাব দেবে, আমারই বউকে নিয়ে পালানোর প্ল্যান করবে ওকে আমি মারতাম না তো কী করতাম! বলো!


যেদিন তোমাকে-আমাকে ফিরতি তোমার বাবার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল সেদিন তুমি আমাকে একা ছেড়ে দিলে। আমার সঙ্গে ঘুমোতে এলে না। আচ্ছা, মানলাম। তোমার ইচ্ছে হয়নি তাই আসোনি। কিন্তু আমার অনেক কথা বলার ছিল তোমাকে। ক্ষমা চাওয়ারও বাকি ছিল। তোমাকে ডাকতে গেলে তুমি এলে না। আমাকে অবহেলা করলে বরাবরের মতো।


পরদিনও আমার সঙ্গে বাসায় ফিরতে চাইলে না। হয়তো অন্যায় করেও ক্ষমা চাইনি এজন্যে! কিন্তু আমি অনেকবারই চেয়েছিলাম। সুযোগটাই আসেনি। তুমিও দাওনি!

তুমি কিছুতেই আমার সঙ্গে ফিরবেনা জানার পর আমি নিজের মাথা ঠিক রাখতে পারিনি। সেদিন বাবার সামনে ওমন বেয়াদবি কীভাবে করতে পারলাম তা আমি নিজেও ভেবে কূলকিনারা করতে পারছি না। 


বিয়ের পর থেকেই নানান ঘটনায় আমার অতো রিয়েক্ট করার কারনও হয়তো তুমি অনুমান করতে পারছো। এতকিছুর পর তোমাকে পেয়েছিলাম। কীভাবে হারাতে দেই আমি?


আমি আবারও সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইছি হৃদি। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমার কাছে ফিরে এসো প্লিজ!

মানুষ ভুল করে। কিন্তু সে ভুলের জন্য সে যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায় তাকে কি একটাবার সুযোগ দেওয়া উচিৎ নয় হৃদি! তাকে কী সারাজীবনের জন্য এভাবে ছেড়ে চলে যেতে হয়!

আমার ভুলের জন্য তুমি আমাকে যে শাস্তি দিতে চাও আমি মাথা পেতে নেবো। তবুও প্লিজ আমার কাছে ফিরে এসো তুমি। আমার মনে হয় তুমি আমার কাছে না ফিরলে আমি পাগল হয়ে যাব! আমি নিজের সবকিছুর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছি। আমার রাগ, জেদ সবকিছু একমাত্র তুমি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। প্লিজ তুমি আমাকে আর একটাবার সুযোগ দাও! আরেকটাবার ভালোবাসো আমাকে! সেই আগের মতো! চিঠিতে যেমন করে বাসতে!


ইতি তোমার,

স্বামী কিংবা প্রেমিক।


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url