#প্রহর_শেষে ৪
লেখনীতে – #সোহা_মণি
পিপহোলে বাইরে তানভিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো উপমা। তবে দরজাটা খুললো না। চলে যেতে নিলে উর্মিলা বেগম এসে প্রশ্ন করেন,
' কে এসেছে?'
' কেউ না। দরজা খুলবে না বলে দিলাম।'
' কেন?'
উপমা তাকালো তার মায়ের দিকে। উর্মিলা বেগম মেয়ের চাহনিতে কিছুটা অবাক হন। উপমা চলে গেলে উনি পিপহোলে গিয়ে দেখে আসেন। তানভিরকে দেখে বুঝে যান তিনি। মায়া লাগে উনার। কিন্তু কিছু করার নেই উনার নিজেরও।
এদিকে তানভির অনেক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে রইলো। ভেতরের কথাগুলো শুনেছে সে। প্রায় একঘণ্টার মত দাঁড়িয়ে থাকলো তানভির। তারপর আরেকবার কলিংবেল বাজালেও কেউ খুললো না। হয়তো আসাদুল্লাহ সাহেব থাকলে দরজা খুলে দিতেন। কিন্তু উনি কাজে ঢাকায় গিয়েছেন সকালের দিকেই।
তানভির বেড়িয়ে গেলো। কল দিয়েছিলো উপমাকে কিন্তু উপমা সব কিছু থেকে ব্লক করে রেখে দিয়েছে। তানভির হতাশ হলো। কষ্ট হচ্ছে খুব।
উপমাদের বাড়িটা বেশ বড়, দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে পেছনে বাহারি ফুল গাছের সমাহার। গেইট পর্যন্ত রাস্তাটা বেশ প্রশস্ত। তানভির সে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল। পেছনে একবার তাকালো উপমার রুমের দিকে। বারান্দাটা খালি শুধু বাগানবিলাস দেখা যাচ্ছে। রুমের দরজাটাও বন্ধ।
তানভির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে হাল ছাড়ার পাত্র নয় সে। তখনই গাড়ির আওয়াজ পেলো। সামনে তাকাতেই দেখলো গেইটের বাইরে একটা আর্মি জিপ গাড়ি এসে থেমেছে। গাড়ি থেকে নামলো গতকালকের সেই মেয়েটা। যে উপমাকে নিতে গিয়েছিলো। সাথে সুঠামদেহী,সুদর্শন এক পুরুষও আছে। তানভির হয়তোবা আঁচ করলো কিছুটা।
অন্তিকা আর নাফিস এগিয়ে এলো। অন্তিকা তানভিরকে দেখে অবাক হলো। তানভিরও এগিয়ে গেলো। অন্তিকা বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল,
' তানভির তুমি এখানে? বাইরে কেন? চলো বাড়িতে।'
তানভির একপলক আবার পেছনে ফিরে তাকালো। তারপর সামনে তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলল,
' বোধহয় আমার শাস্তি পাওয়া উচিত।'
অন্তিকা বলল,
' উপমা জেদী। তবে ভীষণ ভালো। ও তোমাকে ভালোবাসে তানভির।'
তানভির মাথা নিচু করে হালকা হাসলো। তারপর উদাসীন হয়ে বলল,
' আমি বুঝতে পারি নি।'
তারপর অন্তিকার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
' আপনি অন্তিকা মাহমুদ? আদলান মাহমুদ আদিলের বড় বোন?'
অন্তিকা কিছুটা চমকালো। মাথা নাড়িয়ে হ্যা বোঝালো। নাফিস এতক্ষণ তাকিয়ে ছিলো। তানভির এবার নাফিসের দিকে তাকালো। তারপর বলল,
' আর আপনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাফিস জামান?'
নাফিস মুচকি হেসে বলে,
' হ্যা।'
তানভির হাসে। জীবন্ত লাগছে সবকিছু। তাকিয়ে দেখলো নাফিস অন্তিকার দিকে। নয়বছর আগের ঘটনাগুলো সচক্ষে না দেখলেও সামনে দুজন চরিত্রকে দেখে খুব জীবন্ত লাগছে। কি অদ্ভুত!
নাফিস তানভিরের কাঁধে হাত রেখে বলে,
' ডোন্ট গিভ আপ তানভির। কিপ এট ইট। উপমা নরম মনের। বেশিদিন রাগ করে থাকতে পারবে না। আর উপমারও দোষ আছে। তাকেও বুঝতে হবে। তুমি চট্টগ্রামেই থাকো। চাইলে অন্তিকাদের বাসায় থাকতে পারো।'
তানভির কৃতজ্ঞতার স্বরে বলল,
' ধন্যবাদ নাফিস ভাই। আমি আমার সবটা দিয়ে চেষ্টা করব। আর আমি আজ চলে যাব ঢাকায়।'
অন্তিকা বলল,
' উপমার সাথে দেখা করবে না?'
' ও চায় না আপু।'
' তাহলে কিছুদিন চট্টগ্রামেই থাকো। আমাদের বাড়িতে না থাকো। অন্য কোথাও থাকো। আর এমনিতেও তুমি তো এখন ফ্রিই আছো।'
তানভির কিছু বলল না। সে শূন্যে তাকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেলো। পেছনে তাকালো না। তাকালে হয়তো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা উপমাকে দেখতে পেতো।
.
একসপ্তাহ হয়ে গেছে৷ তানভির সত্যিই ঢাকা ফিরে যায় নি। একটা হোটেলে উঠেছে। খাওয়া দাওয়া ঠিক না, ঘুম ঠিক না। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। প্রতিদিন উপমাদের বাড়ির সামনে আসে। অনেক্ষণ উপমার রুমের বারান্দাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে কেউ আসে না। আসাদুল্লাহ সাহেবের সাথে একদিন বাড়ির সামনের সেই পাতানো বেতের চেয়ারে বসে চা খেয়েছে। উনি ভেতরে যেতে বলেছিলেন তবে তানভির যায় নি।
আজও এসেছে উপমাদের বাড়ির সামনে। অনেক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে আছে। উপমাকে দেখছে না আজ কতদিন। অথচ আগে যখন সামনে থাকতো তখন ভালোভাবে তাকাতো না। কিন্তু এখন? তৃষ্ণা পেয়েছে দেখার৷ কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না।
এদিকে উপমা আড়ালে তানভিরকে দেখে প্রতিদিন। তানভিরের লাল চোখ, উসকোখুসকো চুল, ফ্যাকাশে মুখ দেখে খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। থাকুক আরও কিছুদিন। আজও আড়াল থেকে দেখছিলো উপমা। কেমন উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে থাকে তানভির তার দিকে। উপমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বারান্দার দরজা খুলে বের হলো। ভাবটা এমন যেন বারান্দায় কাপড় মেলে দিতে বের হয়েছে। তাকে দেখতেই তানভির নড়েচড়ে দাঁড়ালো। লাল চোখ দুটোতে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা এখন কিছুটা মিলিয়ে গেছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না থামানোর চেষ্টা করল বোধহয়। বুকে ব্যথা হচ্ছে। উপমাকে যে সে ভীষণ ভালোবাসে সেটা আজ নয় অনেক আগেই বুঝতে পেরেছে। তানভিরকে আড়চোখে একপলক দেখে আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না উপমা। ভেতরে চলে গেলো। তানভির হাত উঁচিয়ে থামাতে চাইলেও হাত নামিয়ে নিলো। বিড়বিড় করে আওড়ালো,
' ভালোবাসি উপমা। সত্যিই ভীষণ ভালোবাসি।'
চলবে
আগামী পর্বে শেষ হবে। এরপর আদলান শুরু করব।
