প্রহর শেষে (শেষ পর্ব)
লেখনীতে – সোহা মণি
আরও একসপ্তাহ কেটে গেছে। এই একসপ্তাহ তানভির আসে নি। ঢাকায় যেতে হয়েছিলো। রত্না বেগম অসুস্থ৷ উনাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। এখন আপাতত সুস্থ আছেন। বাসাতেই আছেন। আগের চাইতে অনেক নরম হয়েছেন উনি। তানভিরকে নিজে থেকে বলেছেন এবার ফিরলে যেন উপমাকে নিয়েই ফিরে। তানভির মায়ের পাশে অনেক্ষণ মাথা নিচু করে বসে ছিলো। ছলছল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে সেদিন রাতের ট্রেনে করেই রওনা দিয়েছে তানভির।
আজ আকাশটা মেঘলা। ভোরের আলো ফুটলেও তাতে কোনো উজ্জ্বলতা নেই। তানভির আগের মতো আজও উপমাদের বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো। তার দুচোখের নিচে কালচে দাগ, শার্টের হাতা গুটানো।
ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই, কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাতেও তো মানা নেই।
সে চেয়ে ছিল বারান্দার দিকে। কিন্তু আজ বারান্দার দরজা বন্ধ। এমনকি জানালার পর্দাও নড়ছে না। তানভিরের বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ পর গেটের বুড়ো দারোয়ান কাসেম মিয়া বাইরে বেরিয়ে এল। তানভিরকে প্রতিদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকটার মায়া পড়ে গিয়েছিলো। তবে মাঝের একসপ্তাহ আসে নি তানভির। উনিও বেশ চিন্তিত ছিলেন। উনি এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বললেন,
' বাবা, আজ আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। বড় আম্মাজানরে গতকাল রাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। খুব জ্বর ছিল শরীরটায়, জ্ঞান হারিয়েছিলো।'
কথাটা শোনামাত্র তানভিরের পায়ের তলা থেকে মাটিটা সরে গেল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে উঠল,
' কোন হাসপাতালে কাসেম চাচা? কোন হাসপাতালে নিয়ে গেছে?'
কাসেম মিয়ার দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছাতে তানভিরের কতক্ষণ সময় লেগেছে সে জানে না। তার মনে হচ্ছিল, এই শহরটা আজ বড্ড বড় হয়ে গেছে। হাসপাতালের করিডোরে যখন সে পৌঁছালো, তার হাঁপানির টান ওঠার মতো অবস্থা।
কড়িডোর দিয়ে এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল, সামনেই উপমার বাবা আসাদুল্লাহ সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ কালো উনার। চিন্তিত মুখ দেখে তানভিরের বুক ধক করে উঠলো। তানভিরকে দেখে তিনি কিছুই বললেন না, শুধু হাতের ইশারায় কেবিনটা দেখিয়ে দিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা উর্মিলা বেগমও আজ বাধা দিলেন না, বরং তার চোখ দুটোও ভেজা ছিল। অন্তিকা আর আরেকজন মহিলাকেও দেখা গেলো সেখানে।
উপমাও খুব একটা ভালো ছিলো না। তার ওপর প্রেগন্যান্ট এখন। অসুস্থ হয়ে পড়েছে খুব বাজেভাবে। রক্তশূণ্যতা দেখা দিয়েছে। তাইতো গতকাল তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে উপমাকে। আপাতত এখনও হাসপাতালেই এডমিটেড রাখা হয়েছে।
তানভির ধীর পায়ে কেবিনের ভেতরে ঢুকল। সাদা বিছানায় উপমা শুয়ে আছে রোগীদের পোশাক পড়ে। হাতে স্যালাইন চলছে। জ্বরের ঘোরে তার ঠোঁট দুটো শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। চোখ দুটো বোজা। তানভির নিঃশব্দে বিছানার পাশে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। উপমার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল সে। হাতটা আগুনের মতো গরম।
তানভিরের কণ্ঠরোধ হয়ে এল। সে চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
' এতটা জেদ কেন করলে উপমা? কেন আমাকে একবারও জানালে না? আমার ওপর রাগ করে নিজের শরীরটাকে এভাবে শেষ করে দিলে? জানো না, এই শরীরে আমার সন্তানেরও অধিকার আছে?'
উপমা জেগে ছিলো। তানভিরের উপস্থিতি সে হাড়ে হাড়েই বুঝেছে। ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর তানভিরের ঘ্রাণ পেয়েই সে বুঝেছিলো তানভির এসেছে হয়তো। সে চোখ খুলল না। নির্লিপ্ত হয়ে রইল। তানভির তার কপালে হাত রেখে ভেজা গলায় বলল,
' আমি অপরাধী, উপমা। তোমার পবিত্রতাকে সন্দেহ করেছি, আমার নিজের রক্তকে অস্বীকার করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওই একটা মুহূর্তের শয়তানি চিন্তা আমার আট বছরের ভালোবাসাকে তো ছাপিয়ে যেতে পারে না। তুমি না থাকলে এই তানভিরের কোনো অস্তিত্ব নেই উপমা। আমি জানি, তুমি আমাকে ঘৃণা করছো। কিন্তু এই ঘৃণাটুকু করার জন্যও তো তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে।'
তানভির আবারও উপমার হাতের পিঠে মাথা রেখে কান্নাভেজা গলায় বলতে লাগল,
' আমি 'আদলান' পড়েছি উপমা। সারারাত জেগে পড়েছি। তোমার ভেতরের সেই দহন, সেই শূন্যতা সব আমি বুঝতে পেরেছি। নয় বছর আগে তুমি যাকে হারিয়েছো, আমি হয়তো তার জায়গা নিতে পারব না কখনো। তবে আমি নিতেও চাই না। আমি আমার নিজের জায়গা করতে চাই। হয়তোবা করেও ছিলাম। কিন্তু বুঝে উঠতে পারিনি। আমি তোমার পাশে একটা ছায়া হয়ে থাকতে চাই উপমা। আমাকে ক্ষমা করো উপমা, শুধু একবার ফিরে তাকাও।'
কিছুক্ষণ নিরবতা। তারপর তানভির উপমার হাতটা নিজের গালে ঠেকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
' মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব কী জানো উপমা? আমরা সবচেয়ে বড় ভুলগুলো করি সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার কাছে। আজ যদি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও, তবে আমি হয়তো বেঁচে থাকব, কিন্তু আমার ভেতরের অনুশোচনাটা কোনোদিন মরবে না। আমি বেঁচে থাকবো জ্যান্ত লাশ হয়ে। আমি হয়তো তোমাকে সেই বিশ্বাসের পাহাড়টা দিতে পারব না ঠিকই যেটা ভেঙে গেছে অতীতে, কিন্তু আমি তোমাকে সেই ছায়াটা হতে পারব, যে ছায়াটা রোদে পুড়বে ঠিকই কিন্তু তোমাকে আর কখনো তপ্ত হতে দেবে না।'
উপমা চোখ বোজা অবস্থাতেই অন্যদিকে মুখ ফেরালো। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। কিছু বলল না উপমা। তানভির আরও কিছুক্ষণ রইলো উপমার হাত ধরে বসে। আরও অনেক কথা বলল। রত্না বেগমের কথাও বলল। উপমা তাকালো না। আধাঘণ্টা ওভাবেই কেটে গেলো। একসময় তানভির ভাবলো উপমা হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। তানভির উপমার হাতের পিঠে একটা চুমু খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেলো। আজ খুব নিঃস্ব লাগছে তার। সবকিছু কেমন শান্ত শান্ত লাগছে।
তানভির চলে যেতেই উপমা চোখ মেলে তাকালো। পেটের ওপর এক হাত রাখলো। কষ্ট তারও হচ্ছে। অনুশোচনা তারও হচ্ছে। আর পাথর হয়ে থাকতে মন চাচ্ছে না তারও। কিন্তু আরও কিছুক্ষণ।
বাইরে আসতেই আসাদুল্লাহ সাহেব তানভিরের দিকে এগিয়ে এলেন। তানভিরের মাথায় হাত রেখে বললেন,
' অপেক্ষা করো বাবা। উপমা তার প্রিয় কিছুকে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো মেয়ে নয়।'
তানভির তাকালো আসাদুল্লাহ সাহেবের দিকে। তানভির মাথা নিচু করে ধীরপায়ে হেঁটে চলে গেলো।
.
উপমাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সন্ধ্যায়। সেই বলেছে যেন বাসায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাতের দিকে বৃষ্টি নামা শুরু করলো। তানভির আড়ালে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। সেই হাসপাতাল থেকেই সাথে সাথে আছে।
রাস্তার ওপাশে একটা গাছ আছে বড়। সেই গাছের নিচেই দাঁড়িয়ে ছিলো। গাছের পাতা হয়তোবা তাকে একটু বৃষ্টি থেকে আড়াল করলো। তবুও ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভিজছে তার অন্তরাত্মা। আকাশের প্রতিটি জলবিন্দু তার বুকের ভেতরে জমে থাকা তপ্ত দীর্ঘশ্বাসগুলোকে আরও ভারী করে তুলছে। অদ্ভুত!
জানালার ওপাশে কাঁচের আড়ালে উপমা পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। জ্বরের তপ্ত আঁচে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাইরের ওই অবিরাম বর্ষণ তার ভেতরের দহনকে আরও উষ্কে দিচ্ছে। মেঘে ঢাকা আকাশের তমসায় সে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেলো রাস্তার ধারের ওই গাছটার ছায়া। আর ওই ছায়ার নিচে আশ্রিত হয়ে থাকা একটা বিধ্বস্ত মানুষকেও।
এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা...
সময় বয়ে যাচ্ছে নিজস্ব গতিতে। বৃষ্টির তীব্রতা কমছে না, বরং আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আছড়ে পড়ছে ধরণীর বুকে। উপমার মনের ভেতরে তখন এক মহাপ্রলয়। সে কি পারবে ওই মানুষটাকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে? ঘৃণা আর মায়া যখন যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন শেষ পর্যন্ত মায়ারই জয় হয়।
উপমা আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলো না। কাঁপাকাঁপা হাতে আলমারি থেকে একটা বড় কালো ছাতা বের করে সে ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। নিচে আসাদুল্লাহ, উর্মিলা বেগম আর আবিরা বেগম। উপমাকে দেখে আবিরা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। কাছে এগিয়ে এলেন উপমার। উপমা তাকাতেই উনি উপমার মাথায় হাত রেখে মুচকি হেসে বললেন,
' জানো মা, আমার ছেলেটা সেদিন আমায় বলেছিল, ‘মা, উপমা আমায় যতটা ভালোবেসেছে, আমি হয়তো তাকে ততটা দিয়ে যেতে পারছি না। কিন্তু আমি আমার আল্লাহকে বলেছি, আমার বাকি ভালোবাসাটা যেন তিনি অন্য কারও বুকের ভেতর জমা করে দেন। কোনো একদিন সেই মানুষটাই উপমার দরজায় কড়া নাড়বে, সেদিন যেন সে ফিরিয়ে না দেয়। আমি চলে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু উপমাকে বোলো আমি ওর চোখের জল হয়ে নয়, বরং কোনো একদিন ওর হাসির কারণ হয়ে ফিরে আসব। আমি হয়তো থাকব না, কিন্তু আমার ভালোবাসাটা অন্য কোনো এক প্রহর হয়ে ওকে আগলে রাখবে।’'
একটু থামলেন তিনি। উপমা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। আবিরা বেগম আবারও বললেন,
' কিছু আশ্রয় অধিকার দিয়ে নয়, ক্ষমার করুণা হয়ে ফিরিয়ে নিতে হয়। তুমি তানভিরকে ফিরিয়ে দিও না আজ। আমি মন প্রাণ থেকে দোয়া করি, খুব সুখে থাকবে তোমরা।'
উপমার কপালে একটা চুমু খেলেন তিনি। উপমা ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো সদর দরজার দিকে। বাড়ির সদর দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই শ্রাবণের মাতাল হাওয়া তাকে গ্রাস করতে চাইল। কিন্তু উপমার গন্তব্য স্থির।
রাস্তার ওপাশে, জলমগ্ন কাদা মাখা মাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তানভিরের কাছে যখন সে পৌঁছালো, তানভির তখন শীতে আর জ্বরে জুবুথুবু। শরীরটা অবশ হয়ে আসছিলো তার। হঠাৎ মাথার ওপর বৃষ্টির অঝোর বর্ষণ থেমে গেল। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের বদলে সে শুনতে পেল এক অতি পরিচিত নিশ্বাস।
তানভির চমকে মুখ তুলল। বৃষ্টির জলে চোখ ঝাপসা, তবুও সে চিনতে পারল তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবীকে। উপমা দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে না। তার ফ্যাকাসে মুখ আর লালচে চোখের কোণ বলছে সে এখনও সুস্থ নয়। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে সে ছাতাটা সামান্য হেলে তানভিরের মাথার ওপর ধরল।
দীর্ঘক্ষণ কেউ কোনো শব্দ উচ্চারণ করল না। চারিদিকে বৃষ্টির উন্মত্ত নৃত্য, আর তার মাঝে দুই জোড়া স্থির চোখ। যেখানে সহস্র অভিযোগের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ সমর্পণ। তানভিরের মনে হলো, এই মুহূর্তটা যদি এখানেই থেমে যেত! উপমার বাড়িয়ে দেওয়া এই ছাতাটা কি কেবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার ঢাল, নাকি ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের ওপর আবারও এক টুকরো নির্ভরতার আকাশ?
নিস্তব্ধতা ভেঙে উপমা শুধু ছাতাটা তানভিরের দিকে আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিল। তার এই নিঃশব্দ ইশারা যেন বলে দিচ্ছে,
' ফিরিয়ে দিলাম না।'
তানভির কাছে এসে দাঁড়ালো। নিরবতা ভাঙলো উপমা। উপমা স্বাভাবিক আওয়াজে বলল,
' আসলে মানুষ যখন খুব বেশি ভালোবাসে, তখন সে স্বার্থপর হয়ে যায় তানভির। তুমি তোমার ভালোবাসাকে আগলে রাখতে গিয়ে সন্দেহকে ঢাল বানিয়েছিলে। আর আমি আমার অতীতকে আগলে রাখতে গিয়ে বর্তমানকে অবহেলা করেছি।'
তানভিরের চোখে বিস্ময়। কাঁপা হাতে যখন উপমার হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে দুজনের মাথার ওপর ধরলো। উপমা তখন তানভিরের মুখের দিকে তাকালো। কি মায়াবী মুখখানা। উপমা মৃদু হেসে তানভিরের এক হাত ধরলো। তারপর নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। আবারও বলল,
' আমরা দুজনই অপরাধী, তানভির। তুমি সন্দেহের দহনে পুড়েছ, আর আমি অতীতের অভিমানে। আজ এই বৃষ্টির দিনে সব ধুয়ে যাক। আমার সবটুকু অভিমান আর ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।'
একটু থামলো। তারপর আবারও বলল,
' দুঃখিত, আমার অতীত ধরে তোমাকে অবহেলার জন্য। দুঃখিত, তোমাকে এত কষ্ট দেওয়ার জন্য। আর দুঃখিত, আজ ফিরিয়ে দিতে পারছি না বলে। প্রহর শেষে আমি আবারও বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।'
তানভির কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। শুধু উপমার হাতটা খুব শক্ত করে ধরলো। আর বলল,
' এই বৃষ্টি ভেজা রাত কি দারুণ সাক্ষী হয়ে রইলো উপমা, আমার আবার আমাকে ফিরে পাওয়ার শুভলগ্নে। ধন্যবাদ তোমাকে, আমাকে ভালোবাসার জন্য। ধন্যবাদ তোমাকে, আমাকে আমার মাঝে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। আর ধন্যবাদ তোমাকে আমার অস্তিত্ব নিজের মাঝে স্বীকার করার জন্য।'
উপমা তাকিয়ে ছিলো। তানভির এক হাতে আগলে নেয় উপমাকে। অন্য হাতে ছাতা। কপালে দীর্ঘ একটা চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে,
' সবশেষে, ভালোবাসি তোমাকেও।'
.
কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে আজ শরতের গোধূলি নেমেছে। সন্ধ্যার আকাশটা বেগুনি, কমলা আর লাল রঙের এক মায়াবী সংমিশ্রণে অনিন্দ্যসুন্দর হয়ে রয়েছে। সাগরের নোনা জলরাশি এসে আলতো করে পা ছুঁয়ে যাচ্ছে উপমা আর তানভিরের। সে এখন অনেক সুস্থ, চোখেমুখে মাতৃত্বের এক অপূর্ব আভা। পেটটা বড় হয়েছে আগের তুলনায়।
তানভির উপমার হাতটা খুব শক্ত করে ধরে বালুচরের ওপর দিয়ে হাঁটছে। দূরের সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে তানভির বলে ওঠে,
' যতদিন এই সমুদ্রের বুক চিরে ঢেউরা তীরে আছড়ে পড়বে, আর গোধূলির এই রঙিন আকাশ সাক্ষী হয়ে থাকবে, ততদিন আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকব উপমা। প্রহর শেষ হতে পারে, কিন্তু আমার ভালোবাসার এই সমুদ্র কোনোদিন শান্ত হবে না।'
তানভিরের কথাগুলো শুনে উপমা থামল। সে মুখ তুলে তাকাল তানভিরের দিকে। তার চোখে তখন অস্তগামী সূর্যের সোনালি আভা প্রতিফলিত হচ্ছে। উপমার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। যে হাসিটা গত কয়েক বছরের বিষাদ আর পাথরচাপা কষ্টকে এক নিমেষেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। এই হাসিটা কোনো অভিযোগের নয়, কোনো লুকানো যন্ত্রণারও নয়। বরং এই হাসিটা ছিল শরতের মেঘমুক্ত আকাশের মতো স্বচ্ছ আর সমুদ্রের শান্ত ঢেউয়ের মতো গভীর। সে আরেকটু পাশ ঘেষে দাঁড়ালো তানভিরের। আলতো করে তানভিরের হাতের ওপর নিজের হাতের বাঁধনটা আরও জোরালো করল। বালুচরের ওপর তাদের দুই জোড়া পায়ের ছাপ ঢেউ এসে মুছে দিলেও, হৃদয়ের গহীনে আঁকা পুনর্মিলনের এই ছাপ মোছার সাধ্য কারোর নেই। আকাশ আর সমুদ্রের মায়াবী মিলনের এই শুভলগ্নে, প্রহর শেষে এক জোড়া বিচ্ছিন্ন আত্মা আবারও এক হলো, এক নতুন জীবনের গল্প লিখতে।
হয়তো ওপার হতে একজন খুশি হলো এই দৃশ্যে। শান্তি ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। জান্নাতের সুবাসিত সমীরণে ভেসে এলো এক অলৌকিক তৃপ্তি। সেও হয়তো মেঘেদের আড়ালে দাঁড়িয়ে আজ মুচকি হাসছে। তার সেই প্রিয় ছায়াটা যে দীর্ঘ প্রহর শেষে অবশেষে তপ্ত রোদ থেকে মুক্তি পেয়ে এক টুকরো শীতল আশ্রয়ের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। উপমার এই হাসিটাই তো সে দেখতে চেয়েছিল, যে হাসিতে কোনো বিচ্ছেদ নেই, আছে কেবল প্রাপ্তির পূর্ণতা।
সমুদ্রের গর্জনের এই ভীড়ে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে এলো একটি কথা,
‘ ভালো থেকো, ভ্যালেন্টাইন গার্ল।’
____________সমাপ্ত___________
