#প্রহর_শেষে ৩
লেখনীতে- সোহা মণি
ট্রেনের জানালার বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। তূর্ণা এক্সপ্রেস তীব্র গতিতে ছুটে চলছে চট্টগ্রামের দিকে, আর উপমার মনের ভেতরে চলছে স্মৃতির এক ভয়াবহ ভাঙাগড়া। পাশে বসে থাকা অন্তিকা লক্ষ্য করল, উপমার চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ছে। যে মেয়েটা গত আট বছর একটা পাথরের মতো অটল ছিল, আজ তার বাঁধ ভেঙেছে।
অন্তিকা আলতো করে উপমার কাঁধে হাত রাখল। নিচু স্বরে বলল,
' এখনও সময় আছে উপমা। একটা ফোন কর তানভিরকে। ছেলেটা স্টেশনে যেভাবে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছিল, আমার দেখে মায়া লাগছিল।'
উপমা চোখের জল মুছে জানালার বাইরে দৃষ্টি স্থির রাখল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত শূন্যতা,
' মায়া তো আমারও লাগে আপু। কিন্তু আত্মসম্মান যেখানে ধুলোয় মিশে যায়, সেখানে মায়া দিয়ে কি হবে? যে মানুষটা আমার গর্ভের সন্তানকে অন্যের বলে সন্দেহ করতে পারে, তার সাথে এক ছাদের নিচে থাকা আর বিষপান করা একই কথা। ওকে এত সহজেই ক্ষমা করব না আমি। কিছুদিন ভোগান্তিতে রাখব।'
অন্তিকা আর কিছু বলল না। সে জানে উপমা যখন একবার সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে ফেরানো কঠিন।
অন্যদিকে, ঢাকার সেই জনশূন্য স্টেশনে তানভির তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনের হুইসেলটা এখনও তার কানে বাজছে। যেন একটা শেষ বিদায়ের সুর। তার মনে পড়ছে উপমার সেই শান্ত চাউনি, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল সে কতটা নিচ মনের পরিচয় দিয়েছে।
বাসায় ফিরতেই মা রত্না বেগম ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। তানভিরকে একা ঢুকতে দেখে মুখ ঝামটা দিয়ে উঠলেন,
' গেল তো আপদ বিদায় হলো! ও তো কোনোদিন আমাদের আপন ভাবেনি। এই অবস্থায় বাপের বাড়ি যাওয়ার শখ হয়েছে! বলি, খবর নিয়েছিস কার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ওইদিন?'
তানভিরের ভেতরের দহন এবার বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ল। সে চিৎকার করে বলে উঠল,
' মা! থামবে তুমি?'
তারপর শান্তস্বরে বলল,
' আমি নাহয় ভুল বুঝেছিলাম। কিন্তু মা তুমিও সবসময়ই ওর সাথে বাজে ব্যবহার করেছো। অথচ উপমা কখনোই কোনো অভিযোগ তুলে নি আমার কাছে। আর না তোমার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে।'
রত্না বেগম তেঁতে উঠলেন,
' এখন আমাকে দোষ দিচ্ছিস? ওই মেয়ের চরিত্রে সমস্যা।'
মায়ের দিকে শীতল চোখে তাকালো তানভির। তারপর হালকা হাসলো। হেসেই জবাব দিলো,
' উপমা আমার কাছে এসেছিলো জীবনটা দ্বিতীয়বারের মতো সুন্দর করে শুরু করতে। করেও ছিলো, কিন্তু আফসোস আমি বুঝি নি। তুমি বুঝবে না মা। তোমার চোখে এখন পট্টি বাঁধা আছে। ওটা যেদিন খুলতে পারবে সেদিনই আমার সাথে কথা বলতে এসো।'
রত্না বেগম থমকে গেলেন। তানভিরের চোখে জল দেখে তিনি কিছুটা ভড়কে গেলেন। তানভির নিজের রুমে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে গেল খাটের দিকে। ধপ করে বসে পড়ল। নিঃস্ব লাগছে নিজেকে। তানভির ঠিক করে নিলো সেও আগামীকালই চট্টগ্রাম যাবে। চোখের জল মুছে নিলো তানভির। আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। জামা কাপড় ব্যাগে গোছানোর জন্য। আলমারি খুলতেই উপমার কাপড় চোপড় না দেখেই ভীষণ খারাপ লাগলো তানভিরের। হঠাৎ চোখ পড়ল একটা বইয়ের দিকে। তানভির বইটা হাতে নিলো। বইটার প্রচ্ছদে নদীর ধারে ঘাসের ওপর বসে থাকা এক যুবক আর দাঁড়িয়ে হাত দুইদিকে ছড়িয়ে দেওয়া এক যুবতীর পেইন্টিং করা। সুন্দর নামলিপিতে লেখা 'আদলান'। আর নিচে লেখকের নামে লেখা 'উপমা আহমেদ'। অবাক হয় না তানভির। এটা উপমা সাতবছর আগে বের করেছিলো বইটা। প্রকাশকালে উপমা একবার তানভিরকে বলেছিলো,
' একবার বইটা পড়ে দেখবেন?'
তানভির নাকোচ করে কাজের ব্যস্ততা আর বই পড়ার শখ কখনোই না থাকায় বলেছিলো,
' আমার পড়ার সময় নেই উপমা।'
উপমা কিছু বলে নি সেদিন। তানভির ভীষণ অনুতপ্ত হচ্ছে। পড়া উচিত ছিলো সেদিনই। তবে আজ হয়তো এই দিন দেখতে হতো না তার। তানভির ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। চাঁদের আলোর নিচে বারান্দায় চলে গেলো তানভির বইটা হাতে। বারান্দায় পাতানো বেতের সোফাটায় বসলো ধপ করে। সেদিনের না পড়া বইটা আজ পড়বে তানভির। দেখবে কি আছে এই বইয়ে। কেন সেবছর এই বইটা সাড়া ফেলেছিলো দেশব্যাপী?
পরদিন সকালে চট্টগ্রাম স্টেশনে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন উপমার বাবা, মেজর জেনারেল আসাদুল্লাহ আহমেদ। মেয়েকে দেখেই তিনি বুঝতে পারলেন কিছু একটা বড় সড় অঘটন ঘটেছে। কিন্তু তিনি অভিজ্ঞ মানুষ, জনসম্মুখে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
বাড়িতে পৌঁছে উপমা নিজের পুরনো ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। জানালার বাইরে পাহাড়ের সারি দেখা যায়। এখানে বাতাস পরিষ্কার, কিন্তু উপমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার পেটের ভেতর ছোট্ট প্রাণটা যেন বারবার জানান দিচ্ছে, সে একা নয়।
বিকেলের দিকে আসাদুল্লাহ সাহেব মেয়ের ঘরের দরজায় টোকা দিলেন। হাতে এক কাপ চা। উপমা দরজা খুলতেই তিনি শান্ত গলায় বললেন,
' মা, জীবনটা যুদ্ধের ময়দান নয় যে সবসময় জিততেই হবে। মাঝে মাঝে পিছু হটাও একটা কৌশল। তুই কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস?'
উপমা বাবার চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো শাসন নেই, আছে অগাধ ভরসা। উপমা ধীর গলায় বলল,
' বাবা, আমি জানি বাবা। তবে আমি তানভিরকে এত সহজেই ক্ষমা করব না। থাকুক কিছুদিন সে তার মতো। তার ভুল বুঝুক। তারপর নাহয় ভেবে দেখব।'
' ভেবে চিন্তে কাজ করিস মা। আমার ছোট্ট নাতিটার ক্ষতি হোক এমন কিছুই চাই না আমি।'
উপমা নিজের পেটে হাত রাখল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,
' ওর জন্যই আমি কঠিন হতে চেয়েও হতে পারব না বাবা।'
আসাদুল্লাহ সাহেব মেয়ের মাথা হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। মেয়ের প্রতি উনার বিশ্বাস আছে। উনি চলে যেতেই উপমার ফোনে একটা মেসেজ এল। তানভির পাঠিয়েছে,
' উপমা, আমি জানি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই। কিন্তু আমি আসছি। আমাদের সন্তানকে দেখার অধিকারটুকু কেড়ে নিও না। আর ডিভোর্স! সেটা আমি কখনোই চাই না। ডিভোর্সের কথা কখনোই বলবে না।'
উপমা ফোনটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিল। আসুক না, বের করে দেবে বাড়ি থেকে।
বিকালে উপমা কাজ করছিল। তার মা উর্মিলা বেগমের সাথে। তখনই দরজা কলিংবেলের আওয়াজ শোনা গেলো। উপমা ধীর পায়ে হেঁটে আগে পিপহোলে দেখে নিলো কে এসেছে। দরজার বাইরে তানভিরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চোখমুখ শক্ত হয়ে এলো তার।
#চলবে
(কয়েক পর্বেই শেষ হয়ে যাবে গল্পটা।)
