#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ১১+১২+শেষ পর্ব


চিঠি হাতে নিয়ে নির্বাক বসে আছি আমি। গাল বেয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে। বুকের ভেতরটায় একই সঙ্গে কষ্ট ও আনন্দ দুটোই হচ্ছে। কেন কষ্ট হচ্ছে, কেনইবা আনন্দ হচ্ছে কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। শুধু বুঝতে পারছি, নিজের পুরোনো হারানো কিছু ফিরে পেলে যেমন অনুভব হয় এই অনুভূতি তারই অনুরূপ। 

যুক্তিযুক্তভাবে ভাবতে গেলে, শ্রাবণকে আমি ধোঁকাই দিয়েছিলাম। সেটা যে কারণেই হোক না কেন। তবুও উনি কেন আমাকে এত ভালোবাসেন? ওনার উচিত আমাকে ঘৃণা করা। আমাকে অবজ্ঞা করে ওনার ভালোবাসার যোগ্য এমন কারো সঙ্গে সংসার বাঁধা। কিন্তু আমি কি সেটা সহ্য করতে পারব? নিজের প্রথম প্রেমকে কি কখনো ভুলতে পেরেছিলাম আমি? এগুলোর উত্তর আমার জানা নেই। আমি শুধু জানি, পুরো পৃথিবী আমার বিপক্ষে চলে গেলেও আমাকে ওনার কাছে ফিরতে হবে। 


রিহা আচমকা ঘরে ঢুকে আমাকে কাঁদতে দেখে বিস্মিত হল। 'আপু, কাঁদছিস কেন? দুলাভাই চিঠিতে কী লিখেছে?'


আমি উত্তর না দিয়ে চটজলদি চোখ মুছে নিলাম। রিহা আবার বলল, 'আপু একটা ঘটনা ঘটে গেছে।'


রিহার দিকে তাকিয়ে বললাম, 'কী ঘটে গেছে?'


'প্রত্ন ভাইয়া আমাদের বাসায় এসে হাজির হয়েছে।'


আমি আঁতকে উঠলাম। 'কী বলিস?'


'ড্রয়িংরুমে বসে তোর জন্যে অপেক্ষা করছে।'


আমি শঙ্কিত হয়ে বললাম, 'ও না হাসপাতালে ভর্তি! কীভাবে এল?'


 রিহা ভ্রু কুঁচকালো। 'আমাকে বলেছে না-কি? দেখলাম খুড়িয়ে খুড়িয়ে ঘরে ঢুকছে। হাতেও ব্যান্ডেজ করা।'


চিঠিটা ড্রয়ারে রাখতে রাখতে বললাম, 'মা ওকে দেখে তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছে?'


'না। প্রত্ন ভাইয়াকে তো মা চিনতেই পারেনি। তাকেই জিজ্ঞেস করেছে। সে বলেছে, আমি হৃদির বন্ধু।'


হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। রিহাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলাম। আমাকে দেখে প্রত্ন স্বস্তির হাসি দিল। জিজ্ঞেস করল, 'কেমন আছিস?'


প্রত্ন আমি দুজন দুজনকে স্বাভাবিকভাবে তুমি বলে উঠতে পারি না। আগেও পারতাম না। তবুও চেষ্টা চলত মাঝেমধ্যে। প্রত্নর জেদেই অবশ্য।

প্রত্নর আর আমার সম্পর্ক আর চার-পাঁচটা প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো ছিল না। সাধারণত একজন বেস্টফ্রেন্ড যেমন থাকে প্রত্ন ছিল আমার কাছে সেরকমই একজন। বেস্টফ্রেন্ডের মতোই সবসময় সবরকম বিপদে-আপদে ওকে পাশে পেতাম। আর কেউ সাহায্য করুক কিংবা না করুক যেকোনো কাজে সবার আগে ওরই সাহায্য পেতাম। 

আমাদের এই বন্ধুত্বের মতো সম্পর্ক নিয়ে প্রত্নর কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না। কখনো কোনো অন্যায় আবদারও করতো না আমার কাছে। মানুষ হিসেবে প্রত্ন ছিল মিশুক, বন্ধুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। ওকে আমার কখনো এক মূহুর্তের জন্যও খারাপ ছেলে মনে হয়নি। কিন্তু ইদানীং ও যা করছে তা সত্যিই খুব বিরক্তিকর এবং হতাশাজনক। 


আমি উত্তর দিলাম, 'ভালো। তুই এখানে কেন এসেছিস?'


প্রত্ন মায়া জড়ানো কন্ঠে বলল, ' তোকে দেখতে ইচ্ছে করল। কত দিন পর দেখলাম তোকে!'


আমি বললাম, 'বাচ্চামো করিস না। তুই কোন আক্কেলে একবারে আমাদের বাড়িতেই চলে এলি? তাও আবার এমন ভর সন্ধ্যেবেলায়!'


প্রত্ন কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে বলল, 'আমি তো দুপুরেই রওনা দিয়েছিলাম। রাস্তায় জ্যাম থাকলে আমার কী দোষ!'


আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, 'কেন এসেছিস ক্লিয়ারলি বল তো।'


'বললাম না তোকে দেখতে!'


'দেখা হয়েছে? এবার চলে যা।'


'এমন করছিস কেন হৃদি! ' ক্লেশ নিয়ে বলল প্রত্ন। 'দেখা করতে এসেছি ঠিকই। কিছু কথাও বলার ছিল।'


মা রিহাকে দিয়ে প্রত্নর জন্য নাস্তা পাঠালো। নিজে এলো না। এর মানে মা প্রত্নকে ভালো চোখে দেখছে না। ওর ওপর খুবই মেজাজ খারাপ হলো আমার। 

আমি বিরক্তি প্রকাশ করে বললাম, 'যা বলার জলদি বলে বিদায় হ।'


প্রত্ন শীতল গলায় বলল, 'শ্রাবণ ভাইকে ডিভোর্স দিয়ে দে।'


আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। রিহা নাস্তার ট্রে টেবিলে রেখে আড় চোখে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। যার মানে হচ্ছে, এই পাগলটাকে জলদি তাড়া!

বোঝাই যাচ্ছে রিহাও ওর স্পর্ধা দেখে হতবাক।


আমি নিস্পৃহ কন্ঠে প্রত্নকে বললাম, 'সেটা তুই বলার কেউ নস।'


'আজ হয়তো কেউ নই। একদিন তো সবই ছিলাম!'


আমি শূন্য দৃষ্টিতে প্রত্নর দিকে তাকালাম। 'কখনোই ছিলিস না। আমি কখনো তোকে বলেছি তুই আমার সব?'


প্রত্ন বিদ্রুপ করে হাসল। 'ভালোবাসলে তো বলবি! আমি ভেবেছিলাম এতদিন যাবৎ একসাথে আছি হয়তো আমার প্রতি তোর মায়া পড়ে গেছে! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল ভাবতাম সব।'


'জানা স্বত্তেও এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? দূর হ!'


প্রত্ন বলল, 'চলে যাব। শুধু আমাকে কথা দে যাই হয়ে যাক না কেন তুই কখনোই শ্রাবণ ভাইয়ের সঙ্গে যাবি না!'


'প্রশ্নই ওঠে না। তোকে আমি এই কথা দিতে যাব কেন?'


প্রত্ন সশব্দে শ্বাস ত্যাগ করল। বলল, 'কারণ শ্রাবণ ভাই তোর জন্য সঠিক মানুষ নয়।'


আমি বাঁকা হেসে বললাম, 'তাহলে কে সঠিক? তুই?'


'আমি বলছি না আমি সঠিক। আমি শুধু তোকে সতর্ক করতে চাইছি। আমি চাইছি আমার ওপর রাগ করে যাতে তুই কোনো ভুল সিদ্ধান্ত না নিস।।'


'বাজে কথা বলা বন্ধ কর। তোর ওপর রাগ করে আমি এত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাব কেন?'


'কারণ তুই রাগ করেই সব সিদ্ধান্তগুলো নেস। আর সেগুলোর ফলাফল সবসময়ই ভয়ংকর হয়।'


'বাজে কথা বলা বন্ধ কর। আমার একটা কথার উত্তর দে। তুই শ্রাবণকে কেন এই নোংরা মিথ্যেটা বলেছিলি যে আমি তোর সাথে শুয়েছি?'


প্রত্ন থতমত খেয়ে গেল। 'বিয়ে ভাঙার জন্য।'


'বিয়ে তো ভাঙেনি। উলটো শুধুশুধু চড় খেতে হয়েছে তোর কারণে। '


'স্যরি হৃদি! আমি বুঝতে পারিনি এর জন্যে শ্রাবণ ভাই তোর গায়ে হাত তুলবে। আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের সম্পর্কের কথা জেনে গেছে বলে হয়তো ! আচ্ছা যাই হোক না কেন, একারণে কেউ নতুন বউয়ের গায়ে হাত তোলে? কাজটা কিন্তু সে মোটেও ঠিক করেনি। '


'তোর আর আমার প্রতি দরদ দেখাতে হবে না। এবার প্লিজ তুই চলে যা। বাবা এসে পড়বে কিছুক্ষণ পর। '


প্রত্ন বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে ইশারা করল। 'এই দেখ শ্রাবণ ভাই মেরে কী করেছে। তোর কি একটুও মায়া হচ্ছে না আমার প্রতি?'


আমি শক্ত কন্ঠে বললাম, 'না। তোকে তো আমি নিষেধ করেছিলামই যোগাযোগ করতে। তবুও এ ভুলটা করেছিস। ভুলের মাশুল তো দিতে হতোই!'


প্রত্ন উপহাস করে বলল, 'শ্রাবণ ভাইয়ের সাপোর্ট টানছিস এখন! বাহ!' এরপর কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবার বলল, 'তুই যদি তাকে ভালো বেসেও ফেলিস তবুও আমি আবার ডিসিশন বদলাবো না। যাই হয়ে যাক না কেন তোকে আমি ওনার সাথে কখনোই যেতে দেবো না। তাতে আমার যা করতে হয় করব। তোকে সেফ রাখাটাই হচ্ছে আমার কাছে সবচাইতে বড় প্রায়োরিটি।'


বলে আর এক মূহুর্ত দেরি করল না। চলে গেল।


প্রত্নর হুমকি ধামকিতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। ওকে আমি মোটেও ভয় পাই না।


প্রত্নকে পুনরায় গেট দিয়ে ঢুকতে দেখলাম। দ্রুত হেঁটে দরজার কাছে এসে বলল, 'হৃদি মাগরিবের আজান দিয়েছে?'


আমি বললাম, ' হ্যা। সেই কখন! '


প্রত্ন কী যেন একটা ভাবল। এরপর ইতস্তত করে বলল, 'খুব খিদে পেয়েছে হৃদি! সারাদিনে কিছু খাইনি! নাস্তা গুলো খেয়ে যাই?'


ডান হাত ভাঙা বলে প্রত্ন নিজের হাতে খেতে পারল না। চামচ দিয়ে হলেও বাম হাত দিয়ে খেতে না-কি অসুবিধে হয় ওর। একটা ক্ষুধার্ত মানুষ লাজ-লজ্জা কিনারে রেখে নিজে থেকেই খেতে চেয়েছে। তাকে তো আর এভাবে খালি মুখে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া যায় না! তাই বাধ্য হয়ে আমিই খাইয়ে দিতে লাগলাম। প্রত্ন খাবার মুখে নিয়ে মুচকি হাসছে। আমি সেদিকে পাত্তা দিলাম না।


কে জানতো এ খাওয়াই ছিল প্রত্নর জীবনের শেষ খাওয়া!


(পর্ব ছোটো হবার জন্য দুঃখিত।) 


চলবে...


লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা#জনৈক_প্রেমিক

পর্ব- ১২ (শেষ)

লেখা: #ত্রয়ী_আনআমতা


প্রত্ন চলে যাবার সময় পুনরায় বলল, 'তুই কিন্তু কিছুতেই যাবি না শ্রাবণ ভাইয়ের সঙ্গে। বুঝেছিস?'


আমি জবাব দিলাম না। প্রত্ন আবার বলল, ' আগামী পরশু দিন কী মনে আছে?'


আমি মাথা নাড়ালাম। প্রত্ন ভ্রু কুঁচকালো, 'এভাবে ভুলে যেতে পারলি? '


আমি ভাবতে লাগলাম আটাশ অক্টোবর কী এমন বিশেষ দিন! আমাকে ভাবতে দেখে প্রত্ন বলল, 'থাক! আর ভাবতে হবে না। ' এরপর নিজেই কোনো এক ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে গেল। তারপর প্রশ্ন করল, 'একটা কাজ করতে পারবি হৃদি?'


'কী?'


'পরশু আমার সঙ্গে একবার দেখা করতে পারবি? তোকে একটা সারপ্রাইজ দেবার আছে!'


আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কী সারপ্রাইজ? '


প্রত্ন হেসে বলল, 'সেদিনই দেখবি!'


'আমি দেখা করতে পারব না।'


প্রত্ন অনুনয় করল, 'প্লিজ হৃদি! ইটস ইমপর্টেন্ট! তোকে আমার অনেক কিছু বলার আছে।'


আমি বললাম, 'এখনি বল!'


'সেসব কথা এখন বলা সম্ভব নয়। শোনার পর তুই কেমন রিয়েক্ট করবি সেটাও বুঝতে পারছি না। এখনি আমার টেনশন হচ্ছে। আবার একটুপরে আঙ্কেলও এসে পড়বে। '


'কী এমন কথা, প্রত্ন? এবার কিন্তু আমারও টেনশন হচ্ছে!'


প্রত্ন হাসল, 'আরে তোর টেনশন নেবার কিছু নয়! তুই নিশ্চিন্ত মনে থাক। ' এরপর আবার বলল, 'পরশু দেখা করবি তো?'


'কথা দিতে পারছি না।'


'তোকে কথা দিতে হবেই! নয়তো আমি এখান থেকে কিছুতেই যাব না। '


'প্রত্ন! পাগলামো করিস না!'


'কথা দে! আমি চলে যাব।'


বাধ্য হয়ে বললাম, 'আচ্ছা, দেখা করব। এবার প্লিজ দয়া করে বিদেয় হন আপনি।'


প্রত্ন দাত বের করে হাসল। যেতে যেতে বলল, 'পরশু দিন ঠিক বিকেল চারটায় তোদের কলেজের পাশের কফিশপটায়!'


.

প্রত্ন চলে যেতেই মা আমার উদ্দেশ্যে এক গাদা প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে বসল। 'ছেলেটা কে রে?'


'আমার ফ্রেন্ড মা!'


মা বলল, 'কেন আসছিল?'


'আবার কেন! দেখা করতে।'


'এমন ভাঙা হাত-পা নিয়া?'


আমি বললাম, 'মা ও একটু পাগলাটে ধরনের। যখন যেটা মন চায় সেটাই করে। এজন্য।'


মা কেমন বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, 'আমি একটা ডিসিশন নিয়েছি মা।'


মা জিজ্ঞাসু হয়ে বলল, 'কী? '


'শ্রাবণের সাথে ফিরে যাব।'


মুহূর্তেই মা'র মুখের বিরক্তি ভাবটা কেটে গেল। এক গাল হেসে বলল, 'সত্যি?'


'হ্যা মা! '


মা আমার মাথায় হাত রাখল, 'ছেলেটা ভালো। কতবার বলসি একবার ক্ষমা করে দেখ! একবার ক্ষমা করে দেখ! তুই আর তোর বাবা তো কানেই তুলোস না আমার কথা। অনেক ভালো থাকবি মা, দেখিস!'


আমি মা'কে জড়িয়ে ধরলাম, 'হুম।'


মা বলল, 'তোর বাবারে বলছিস?'


'না মা। বাবা দোকান থেকে এলে জানাবো। তুমিও একটু জানিয়ো!'


'অসম্ভব! আমার কলিজায় ডর-ভয় নাই না-কি? আমি বললেই ভাববো, তার মেয়েরে আমি জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠাইতাসি।' 


আমি শব্দ করে হাসলাম। ' মা তুমি শুধু শুধুই বাবাকে এত ভয় পাও। আচ্ছা যাও তোমার বলতে হবে না। আমি নিজেই বলব!'


.

শ্রাবণকে কিছু বিষয় পরিষ্কার করে বলার দরকার। উনি ভাবছেন আমি ওনাকে ধোঁকা দিয়ে প্রত্নর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছি। আপাত দৃষ্টিতে সত্যি মনে হলেও সেগুলো সত্যি নয়। 

শ্রাবণের সঙ্গে যখন আমার প্রেমের শুরু তখন আমি কেবল ক্লাস নাইনে পড়ি। ক্লাস টেইনে ওঠার পর একবার শ্রাবণের একটা চিঠি কেমন করে যেন বাবার হাতে পড়ে যায়। তখন আমার বয়স কেবল পনেরো। বাবা চাইছিলেন না এমন সংবেদনশীল একটা বয়সে মোহে পড়ে কোনো ভুল করে বসি। বাবা একদিন ডেকে আমাকে সাবধান করেন। জিজ্ঞেস করেন চিঠি পাঠানো ব্যাক্তিটা কে? তার নাম কী? কোথায় থাকে।

কিন্তু আমি তার নামধাম কিছুই বলতে পারি না। ফলে বাবা ক্রুদ্ধ হয়ে বলেন, আমি কেন বোকার মতো এই চিঠির উত্তর দিয়ে এসেছি এতকাল। বারবার করে নিষেধ করেন আর যেন কখনো ভুলেও এ চিঠির উত্তর না দেই। ছোটোবেলা থেকে কোনোদিন বাবার কোনো কথার অবাধ্য হইনি। ভয়, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা সবগুলোর জন্যই। বাবার নিষেধ করা বস্তুকে আমরা দু'বোন নিজেদের জন্য হারাম ভাবতাম। কাজেই বাবার নিষেধ করা স্বত্তেও শ্রাবণের চিঠির জবাব দেয়া অসম্ভব ছিল আমার পক্ষে। কখনো না দেখলেও ওনাকে আমি মন থেকেই ভালোবাসতাম। উনি ছিলেন আমার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা। যাকে কখনোই ভোলা সম্ভব নয়। ওনার শত শত চিঠি পাবার পরও উত্তর দিতে পারার অপারগতা আমাকে কুরেকুরে খেত। একপ্রকার মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল আমার কিশোর মন। তখনি আচমকা আমার জীবনে প্রত্নর প্রবেশ। 

আমরা দুজনে একই ক্লাসে পড়তাম ভিন্ন কলেজে। আমাদের দেখা হয়েছিল একটা পিকনিক স্পটে। সেদিন ওদেরও পিকনিকে নিয়ে আসা হয়েছিল ওদের কলেজ থেকে। ও-ই প্রথম আমার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। ভালো ছেলে মনে হওয়ায় আমিও আপত্তি জানাই না বন্ধু হতে। আমাদের নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ হতো। ধীরে ধীরে ও আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায়। একদিন হুট করেই ও আমাকে প্রপোজ করে বসে। আমাকে জানায়, ও প্রথম থেকেই আমাকে পছন্দ করতো, ভালোবাসতো। আমি তখনো আমার প্রথম প্রেমকে ভুলতে পারিনি। ওকে তার ব্যাপারে সবই জানাই। প্রত্ন জানায়, যেহেতু বাবা আমার পত্রপ্রেমিককে পছন্দ করছে না, আবার সে কে তাও আমরা জানি না সেহেতু তার সাথে ভবিষ্যতে কোনো রকম সম্পর্ক হবারও সম্ভাবনা নেই। তাকে ভুলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। একপ্রকার তাকে ভোলার উদ্দেশ্য নিয়েই আমি প্রত্নর সাথে নামমাত্র প্রেমের সম্পর্কে জড়াই। তাকে ভুলতে পেরেছি কি-না জানিনা। তবে প্রত্নকে কখনো সেভাবে ভালোবেসে উঠতে পারিনি। প্রত্নও জানতো সেটা। ওর নিজেরও এ নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিল না। প্রত্ন সবসময়ই বলত, ওর একার ভালোবাসাই আমাদের দুজনের জন্য যথেষ্ট। প্রত্নর দিক থেকে ভালোবাসার কোনো কমতি না থাকলেও আমার দিক থেকে কেবল বন্ধুত্বই ছিল। তবুও প্রত্ন কখনো চাইতো না সম্পর্কটা ভাঙ্গুক। এভাবেই এতদিন যাবৎ আমাদের প্রেম নামক সম্পর্কটা চলেছে। 

শ্রাবণকে সব বুঝিয়ে বলতে হবে। তিনি নিশ্চয়ই এতদিন যাবৎ আমাকে ভুল বুঝে বসে আছেন!


শ্রাবণের নম্বরটায় ডায়াল করতেই রিসিভ করে কেউ 'হ্যালো' বলল। সঙ্গে সঙ্গে আমি গরগর করে বলতে আরম্ভ করলাম, 'আমি আপনার সাথে ফিরতেই চাই শ্রাবণ! '


ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। বেশ কিছুক্ষণ নিরবতার পর উত্তর এল, 'সত্যি বলছো হৃদি!'


'হ্যা!'


'আমি এখনি আসছি!'


এতক্ষণে গাড়ির আওয়াজ আমার কানে এল। 'আপনি কী চলে যাচ্ছিলেন? '


শ্রাবণ উত্তর দিলেন, 'হ্যা।'


'কেন?'


শ্রাবণ হঠাৎ গলার স্বর নামিয়ে নিলেন, 'তুমি আমাকে ঘৃণা করো তাই।'


আমি কী জবাব দেবো খুঁজে পেলাম না। শ্রাবণ আবার বললেন, 'হৃদি?'


'হুম?'


'আমি আর কখনো তোমাকে হারাতে চাই না।'


_______________


গতকাল আমাদের অ্যানিভার্সারি ছিল। দু'বছর হয়ে গেছে শ্রাবণের সঙ্গে আমার বিয়ের। বেশ বড় করেই উদযাপন করা হয়েছিল গতকালের দিনটা। আমি ক্লান্ত ভঙ্গিতে শোবার ঘরে বারান্দায় রাখা চেয়ারটায় বসে আছি। প্রত্যেক বছর এ দিনটায় এক অদ্ভুত কারণে আমার প্রত্নর কথা মনে পড়ে। এখনো পড়ছে। সেদিন রাতে শ্রাবণের সাথে ফেরার পরপরই আমি প্রত্নর মৃত্যুর কথা জানতে পারি। আমাদের বাসা থেকে ফেরার সময়ই সম্ভবত ওর এক্সিডেন্টটা ঘটে। কার এক্সিডেন্ট। এরপর আটাশ অক্টোবর আমার আর ওর সঙ্গে দেখা করা হয়ে উঠেনি। ওর না বলা কথাগুলো শোনা হয়ে উঠেনি। সারপ্রাইজ পাওয়াটাও বাকি রয়ে গেছে। প্রত্ন আমার জীবনের কিছুই ছিল না। আবার অনেক কিছুই ছিল। জীবনে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে যাকে পাওয়া যেত সে ছিল প্রত্ন। ভালোবাসার পরিবর্তে ভালোবাসা না পেয়েও যে আমাকে ভালোবাসতো সে ছিল প্রত্ন। নিজের মন খারাপ নিয়েও যে আমার মন ভালো করতে উঠে পড়ে লাগত সে ছিল প্রত্ন। প্রত্ন ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু। বেঁচে থাকতে কতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছি, অবহেলা করেছি! এখন আফসোস হয় ভীষণ! ওর দিক দিয়ে তো ও কখনো ভুল ছিল না! আমিই তো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আজীবন সবাইকে কষ্ট দেই। নিজের ওপর রাগ হয়। এত ইমম্যাচিউর এত বোকা কেন আমি!

 মাঝে মাঝেই ওর শূন্যতা আমি ভীষণভাবে অনুভব করি। কিছু বলার থাকে না। কিছু করারও থাকে না। আমার কান্না পায়। কিন্তু জানিনা কেন কাঁদতেও পারিনা। দম বন্ধ হয়ে আসে শুধু। তখন শ্রাবণ এসে সামলে নেন আমাকে। উনি ভালো করেই জানেন প্রত্নর প্রতি আমার এই ভালোবাসা শুধুই বন্ধুত্বের। তাই রাগ না দেখিয়ে উলটো স্বান্তনার হাত বাড়িয়ে দেন। আগের মতো বদমেজাজী থাকলে হয়তো উনি আমার এই কান্নাকাটি দেখলে রেগে যেতেন। কিন্তু এখন আর উনি তেমনটা নেই। ওনার অনুদ্ধত স্বভাব মাঝে মাঝেই আমাকে ভীষণ অবাক করে।আমার জন্য এতটা বদলে নিয়েছেন নিজেকে! 


ভাবনায় এতটাই ডুবে ছিলাম যে বুঝতেই পারিনি কখন শ্রাবণ এসে পেছনে দাঁড়িয়েছেন! কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে পেছন ফিরে দেখি উনি দাঁড়িয়ে। আমাকে কাঁদতে দেখে হঠাৎ আমার হাত ধরে দাড় করিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। 'কাঁদে না বউ! ' এরপর আমার পেটে হাত রেখে বললেন, 'তুমি কাঁদলে তোমার সাথে সাথে আমার আর আমাদের সন্তানেরও যে মন খারাপ হয়!'


আমি শ্রাবণের বুকে মাথা রাখলাম। আমার বাবার পরে একমাত্র এই মানুষটার বুকেই যেন সমস্ত প্রশান্তি। 

আমি মুখ উঁচু করে শ্রাবণের দিকে তাকালাম। 'আমি খুব ভাগ্যবতী আপনাকে পেয়ে!'


শ্রাবণ আমার কপালে চুমু খেলেন। 'আমি আরো বেশি ভাগ্যবান তোমাকে পেয়ে!'


আমি আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আমার পাগল মানুষটাকে।


"সমাপ্ত"


(এতদিন ধৈর্য ধরে পাশে থাকার জন্য সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। সবাই অনেক ভালো থাকবেন এবং অন্যকে ভালো রাখবেন।❤️)

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url