#বর্ষণ_মুখর_দিন

জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা

পর্ব ১১+১২+শেষ পর্ব


অফিসে ঢুকতেই সবাই নিয়াজ আর জারাকে বিবাহিত জীবনের শুভেচ্ছা জানাতে লাগলো।সবার সাথে কথা বলে নিয়াজ নিজের কেবিনে চলে গেলো।জারা নিজের কেবিনে বসতেই রিহা পাশে এসে দাঁড়ালো।জারা একবার রিহার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে বলল,তোমার সাথে কোনো কথা নেই তুমি বিয়েতে গেলেনা কেনো?

রিহা মুখটা ছোট করে বলল,সরি!আসলে আমার জার্নি করার অভ্যেস নেই।বমি করে ক্লান্ত হয়ে যাই চোখ ও মেলতে পারিনা।তাইতো যাইনি।


জারা শান্ত কন্ঠে বলল,বাহানা বাদ দেও।তাহলে রিসিপশনে গেলেনা কেনো?সেটাতো আর গ্রামে হয়নি।

রিহা বলল,কাল মাকে নিয়ে একটু ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম।

জারা আচ্ছা বলে কাজে মন দিলো।রিহা জারাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।ঘাড় একবার একদিকে ফিরিয়ে জারাকে পর্যবেক্ষণ করছে।জারা মাথা তুলে রিহার দিকে তাকিয়ে বলল,কাজ নেই তোমার?

রিহা যা খুঁজছিলো সেটা না পেয়ে ভ্রু কুচকে বিরক্তি নিয়ে বলল,পাচ্ছিনা কেনো?

জারা বোকার মতো চেয়ে থেকে বলল,কি পাচ্ছো না?

রিহা কোনো সংকোচ ছাড়াই বলে দিলো,নতুন বিয়ে হয়েছে তোমার ঘাড়ে গলায় দাগ নেই কেনো?না মানে এই দাগ সরানোর জন্য কি রিমুভার আছে?


জারা আজ শাড়ির সাথে হিজাব পড়েনি।এখানে ওর কাছে কোনো হিজাব ছিলোনা। নিয়াজ বলেছিলো যাওয়ার সময় জারাকে কয়েকটা হিজাব কিনে দেবে।হিজাব না পড়ার দরুন গলা ঘাড় দেখা যাচ্ছে।জারা লজ্জা পেয়ে বলল,ক-কি উল্টাপাল্টা কথা বলছো?রিহা অবাক হওয়ার ভান করে বলল,কি উল্টাপাল্টা বললাম?যা সত্যি তাই তো বললাম।স্যার আর তোমার রোমাঞ্চকর মুহূর্ত গুলো মনে পড়ায় লজ্জা পেলে বুঝি?

জারা চোখমুখ এদিক ওদিক করে বলল,এরকম কিচ্ছুনা।তুমি কাজ করো যাও।

রিহা হাসতে হাসতে বলল,যাচ্ছি যাচ্ছি।হায় আল্লাহ কবে আমার এরকম দিন আসবে?

জারা আজ আর ভার্সিটিতে যায়নি।কাল থেকে যাবে তাই আজ নিয়াজের সাথেই অফিসে চলে এসেছে।গতকাল রিসিপশনের অনুষ্ঠান খুব জাঁকজমকপূর্ণ ভাবেই করা হয়েছে।রাতে ক্লান্ত হয়ে জারা নিয়াজের আগেই ঘুমিয়ে গেছে।নিয়াজ আর জারাকে না জাগিয়ে নিজেও জারাকে জড়িয়ে ধরে পাশে শুয়ে পড়লো।


নিয়াজকে কম্পানির একটা কাজে বিদেশে যেতে হবে।দশদিন পরই যাওয়ার ডেট ফিক্সড হয়েছে।জারাকে নিয়ে যেতে পারতো।কিন্তু ওখানে নাকি দুমাস থাকা লাগবে।এই দুমাসে জারার পড়ালেখার ব্যঘাত ঘটবে।তাছাড়া জারার কোনো পাসপোর্ট নেই।এখন অল্প কয়দিনে সব করতে গেলে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হবে।নিয়াজ জারাকে নিতে চাইলেও জারা যেতে চায় কিনা সেটাও তো জানতে হবে।


জারা তার ভার্সিটি তারপর অফিস এসব নিয়েই আছে।ওদের সম্পর্কের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।নিয়াজ যদিও জারার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে জারা কেমন যেন নিজেকে গুটিয়ে নেয়।তাই নিয়াজ নিজের ইচ্ছাকে দমিয়ে রেখে জারাকে সময় দিতে চাইছে।জারা হয়তো এখনো নিয়াজের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি।নিয়াজের যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এলো।নিয়াজের বাবা অবশ্য বলেছেন নিয়াজ না গিয়ে ওর বদলে তিনিই গিয়ে কোম্পানির জামেলাটা সামলে নিবেন।কিন্তু নিয়াজ নাকোচ করে দিয়ে বলল,তোমাকে আর এই বয়সে এসব নিয়ে দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে হবেনা।

জারা কেমন চুপচাপ থাকে।ওকে দেখলে বোঝা যায়না ও আসলে কি চায়?কি চলছে ওর মনে।নিয়াজ জারার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে গিয়েও মাঝেমাঝে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে জারার কাছাকাছি চলে যায়।ছুঁয়ে দিতে গেলেই লজ্জাবতী গাছের মতো নুইয়ে যায় জারা।নিয়াজ সরে এসে ভাবে তবে কি জারা আমাকে পছন্দ করেনা?এসব ভেবেই মনটা বিষিয়ে যায়।


কালকেই নিয়াজের ফ্লাইট।যেতে মন চাইছেনা।ইচ্ছে করছে জারার কাছে থেকে যেতে।ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও একরাশ মন খারাপ নিয়ে জামা কাপড় ঘুছিয়ে সব ট্রলিতে ভরছে।

জারা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সবকিছু গুছিয়ে নিয়াজ বারান্দায় জারার পাশে গিয়ে দাঁড়িলো।পকেটে একহাত গুঁজে বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,কালকেই আমার ফ্লাইট।সাবধানে থাকবে নিজের খেয়াল রাখবে।কিছু প্রয়োজন হলে বাবা মাকে জানাবে।ফোন কাছে রেখো আমি সময় পেলে কল দেবো।জারা কোনো উত্তর না দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বারান্দার লাইট নিভানো।রুমের লাইটের হালকা আলো এসে আছড়ে পড়ছে বারান্দায়।জারার মুখ ভঙ্গি নিয়াজ ঠিক ঠাওর করতে পারলোনা।জারাকে নিশ্চুপ দেখে নিয়াজ একটু কষ্ট পেলো।বুকের ভেতর একটা মোচড় দিয়ে উঠলো।এতদিনেও কি নিয়াজের প্রতি জারার সামান্য মায়া জন্মায় নি?পেছন ঘুরে রুমে ফিরে আসতে নিলেই দু’জোড়া হাত পেছন থেকে নিয়াজকে ঝাঁপটে ধরে।

নিয়াজ থেমে যায়।কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ কানে আসতেই নিয়াজ বিচলিত হয়ে পড়ে জারার হাত দুটো ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,কি হয়েছে জারা তুমি কাঁদছো কেনো?কোথাও ব্যথা পেয়েছো।


জারা নিয়াজকে আরো ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে কাঁদতে থাকে।ধীরে ধীরে কান্নার গতি তীব্র হতে লাগলো।নিয়াজের শার্ট পেছনের দিকে ভিজে গেছে জারার চোখের পানিতে।নিয়াজ বুঝতে পারছেনা জারার এরকম কান্নার কারণ কি।ও কি কোনোভাবে কোনো কথা দ্বারা জারাকে হার্ট করেছে?

জারাকে সামনে টেনে দুহাতে আঁজলা ভরে জারার মুখটাকে তুলে বলল,কি হয়েছে তোমার বলো আমায়।আমি কি কোনো ভুল করেছি?


জারা হেঁচকি তুলে বলছে,আপনি আমাকে এখানে রেখেই বিদেশে চলে যাবেন।আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না।নাহলে আমার কথা কি করে ভুলে গেলেন?আমি একা একা কি করে থাকবো?

নিয়াজ অবাক হয়ে তাকিয়ে জারাকে দেখছে।সত্যিই কি জারা ওর জন্য কাঁদছে?নিয়াজের যেনো বিশ্বাস হচ্ছেনা।তাই জারাকে বলল,আমি গেলে তোমার সমস্যা কি?আমি কাছে গেলেই তুমি নিজেকে গুটিয়ে নাও।আমাকে ভালোও বাসোনা তাহলে আমার থাকা না থাকায় তোমার কি আসে যায়?

জারা ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দিয়ে বলল,আমি জানিনা এতকিছু।আপনি আমাকে রেখেই চলে যাবেন আমি আপনাকে যেতে দেবোনা।নিয়াজ আল্লাদি কন্ঠ বলে উঠলো,আচ্ছা যেতে দেবেনা তো কি করবে?

জারা নিয়াজের কাছ থেকে সরে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল,একদম দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবো।নিয়াজ শব্দ করে হেসে বলল,বরকে দড়ি দিয়ে নয় আঁচল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয় গো বউ।

নিয়াজের মুখে বউ ডাক শুনে জারা থমকালো।মনে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছে।জারা জানেনা ওর মনের অনুভূতির নাম কি তবে সামনের এই মানুষটাকে ওর বড্ড প্রয়োজন।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মানুষকে তার পাশে চাই।


জারাকে এক দৃষ্টে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিয়াজ তুড়ি বাজিয়ে বলল,হারিয়ে গেলে নাকি বউ।আচ্ছা তুমি হারিয়ে যাও আমি কালকের যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।নিয়াজ ঘুরে আসতে নিলেই জারা নিয়াজের ঘাড়ের দিকের কলার চেপে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল,বিদেশে যাওয়ার জন্য দেখছি পাগল হয়ে আছেন।বিদেশ মেয়েদের সাথে নেচে বেড়াতে পারবেন সেই জন্য ভালো লাগছে?

জারার রিয়েকশন দেখে নিয়াজ মিটিমিটি হাসছে।জারাকে আরেকটু জ্বালানোর জন্য বলল,বিদেশি মেয়েরা কি কিউট হয়।একটু ইশারা করলেই কাছে আসার জন্য তারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রাগে জারার কান গরম হয়ে আসছে।শরীরের চামড়া গুলো জ্বলে যাচ্ছে।নিয়াজের দুপায়ে ভর দিয়ে দুহাতে ওকে আঁকড়ে ধরে নিয়াজের ঠোঁটে কুটুস করে একটা কামড় দিয়ে সরে আসতেই নিয়াজ জারাকে আঁকড়ে ধরে।জারাকে ছেড়ে দিয়ে নিয়াজ দূরে সরে যেতেই জারা আবারো ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠে বলে,দূরে সরে যাচ্ছেন কেনো?

নিয়াজ অন্যদিকে ফিরে বলল,নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে চাইনা।যাওয়ার একদিন আগে তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনা।আমি চাইনা আমার আচরণে তুমি কষ্ট পাও।জারা ছলছল চোখে বলল,আপনি দূরে সরে গেলেই আমার কষ্ট হয়।

নিয়াজ জারার দিকে ফিরে বলল,কাছে আসলেই খুব করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে।

জারা এগিয়ে এসে নিয়াজের ঠোঁট জোড়া স্পর্শ করে।সম্মতি পেয়ে নিয়াজ জারাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়।


জারা ঘুমিয়ে আছে।নিয়াজ জারাকে বুকে নিয়ে হাসছে।প্রথম যেদিন প্রেয়সীকে দেখেছিলো সেদিন ও ভারী বর্ষণ ছিলো।আজ প্রেয়সীকে সম্পূর্ণ নিজের করে নিয়েছে আজও ভারী বর্ষণ হচ্ছে।বৃষ্টি হওয়ার কারণে একটু শীত অনুভব হচ্ছে।জারা নিয়াজের বুকে আরেকটু গুটিয়ে গেলো।নিয়াজ জারার গায়ে ভালো করে কাঁথা জড়িয়ে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে গ্রিলে হাত রেখে দাঁড়ালো।মেয়েটা এতদিন দূরে সরে থাকতো এটাই ভালো ছিলো।আজ এতটা কাছে এসে সামনের দুই মাসের কষ্ট বাড়িয়ে দিলো।এখন কি করে দুই মাস জারাকে ছাড়া থাকবে?এখন জারাকে নিয়ে যেতেও পারবেনা আবার ছেড়ে যেতেও কষ্ট হবে।হাজারো ভাবনা চিন্তায় ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

রুমে ফেরত এসে জারাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।


কি হলো জানু আমার কল কেটে দিচ্ছো কেনো?

মিমির কথায় বিরক্ত হয়ে তুহিন বলল,তুমি কি আমাকে শান্তি দিবানা?

মিমি একহাতে নিজের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বলল,এই মিমির পাল্লায় পা দিয়েছো তোমার শান্তি আর খুঁজে পাবেনা।

তুহিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,মনে করো একটা ভূতুড়ে বাড়ি।চারদিকে গা কাঁটা দেওয়া পরিবেশ।বাড়িটার ভেতরে পুরো অন্ধকার।এক রুমে শুধু হালকা টিমটিমে আলো জ্বলছে কিন্তু কোনো কিছুই স্পষ্ট না।তোমাকে সেখানে রেখে আসলে কি করবা?


মিমি একটু ও ঘাবড়ে না গিয়ে মুচকি হেসে বলল,তোমাকে বিয়ে করে সেখানে নিয়ে গিয়ে রোমান্স করবো।ওয়াও কি সুন্দর রোমান্টিক পরিবেশ।ডিস্টার্ব করার জন্য কেউ থাকবেনা।নাইস না?


তুহিন নিজেই নিজের কপাল চাপড়ে বলল,দেখাতে গেলাম ভয় আর এই মেয়ে উল্টো আমাকে পেঁচিয়ে ধরছে।


চলবে…..


নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন। 🖤#বর্ষণ_মুখর_দিন

জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা

অন্তিম পর্ব


একটুপরই নিয়াজ বিদায় নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাবে।জারা রুমের দরজা চাপিয়ে হাটুতে মুখ গুঁজে কাঁদছে।নিয়াজ জারার সামনে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,এভাবে আর কতক্ষণ কাঁদবে?আমি চলে যাচ্ছি কোথায় আমাকে হাসি মুখে বিদায় দেবে তা না কেঁদে কেটে বিদায় দিচ্ছো।আমি তোমার হাসিমুখ দেখে যেতে চাই।এরকম কান্নামাখা চেহারা দেখলে আমি যেতে পারবোনা।


জারা মাথা তুললো না।সমানে কেঁদেই যাচ্ছে।নিয়াজের যে কষ্ট হচ্ছেনা এমনটা নয়।কষ্ট হলেও পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই।চোখ দুটো জ্বলে উঠছে।চোখের পাতা বন্ধ করে নিজেকে শক্ত করে নিয়ে নিয়াজ বলল,ঠিক আছে তুমি কাঁদো।আমি আর বিদেশে যাবোনা।ধপ করে জারার পাশে বসে পড়তেই জারা মাথা তুলে তাকায়।

দ্রুত চোখের পানি মুছে বলল,আমি আর কাঁদবোনা।আপনি বিদেশে যাওয়া বাদ দিবেননা।তাহলে কোম্পানির অনেক লস হয়ে যাবে।বাবার অনেক ইচ্ছে তার ছোট্ট কোম্পানিটাকে একটু একটু করে বড় করার।এখন যেহেতু এতবড় একটা সুযোগ পেয়েছেন তাহলে আমার জন্য কেনো সব শেষ করবেন?

আমি সত্যিই আর কাঁদবোনা বলতে বলতে আবারও ফুঁপিয়ে উঠে।


নিয়াজ জারার দুগালে হাত রেখে বলল,আবার কান্না করে,হাসো।

জারা জোর করে হাসার চেষ্টা করতেই নিয়াজ বলল,উঁহু!জোর করে হলে হাসার দরকার নাই।আচ্ছা তোমার জন্য আসার সময় বড় টেডি নিয়ে আসবো ওকে?

জারা এবার সত্যিই হেসে দিয়ে বলল,আমি বাচ্চা না যে আমার জন্য টেডি নিয়ে আসবেন।নিয়াজ মিষ্টি হেসে বলল,এখন ঠিক আছে।নিচে সবাই দাঁড়িয়ে আছে বলে নিয়াজ জারার দুগালে চুমু দিয়ে সিঁথিতে একটা চুমু দিলো।চোখের পাতায় চুমু দিতেই জারা আবার ফুঁপিয়ে উঠে নিয়াজকে শক্ত করে চেপে ধরে।নিয়াজ মুখটা ছোট করে বলল,বললামতো এরকম কাঁদলে আমি আর যাবোনা।জারা হেঁচকি তুলে বলল,আমি কি করতাম আমার খালি কান্না পায়।

নিয়াজ মুখ বেঁকিয়ে বলল,এমনিতেও তুমি ছিঁচ কাঁদুনে।জারা চোখ পাকিয়ে বলল,আপনি ছিঁচ কাঁদুনে।

নিয়াজ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,আমি কি কিছু হলেই ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলি?

জারা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছে বলল,আর কাঁদবোনা।

নিয়াজ জারার হাত মুঠো করে ধরে রুমের বাইরে নিয়ে আসলো।


মিসেস রেনু ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলেন।জারার বাবা-মা,তুহিনরা সবাই এসেছে।সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিয়াজ বেরিয়ে গেলো।সাথে রাজ আর তুহিন এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যাবে।


নিয়াজকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে তুহিন মিমির সাথে দেখা করতে গিয়েছে।মিমির নাকে বারবার মেয়েলি পারফিউমের স্মেল আসছে।তুহিনের শার্ট শুঁকে চেঁচিয়ে বলল,এই তুমি কোন মেয়ের সাথে দেখা করে এসেছো?

তুহিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।এখন তো মিমি ছাড়া তুহিন অন্যকোনো মেয়ের সাথে কথাই বলেনা।বলতে গেলে মিমি সেই সুযোগটাই দেয়না।তুহিন অবাক হয়ে বলল,মেয়ের সাথে দেখা করেছি মানে?


জারা তুহিনের শার্ট চেপে ধরে বলল,তাহলে তোমার শার্ট থেকে মেয়েলি পারফিউমের স্মেল আসছে কেনো?

তুহিন মাথা ঝুঁকিয়ে নিজের শার্ট থেকে স্মেল নিয়ে বলল,ওহ এটাতো জারার পারফিউম।আসলে আমার পারফিউম শেষতো।ওর রুমে আগের কয়েকটা পারফিউম ছিলো।আমি ভাবলাম অপচয় করে কি লাভ জারাতো এখন জামাইয়ের টাকায় পারফিউম ইউজ করে।আমি নাহয় এগুলো ইউজ করি।তবে যাই বলো স্মেলটা কিন্তু সেই লাগছে।

মিমি কাপালে হাত দিয়ে বলল,শেষমেশ তুমি মেয়েদের পারফিউম ইউজ করো?

তুহিন ক্যাবলার মতো হেসে বলল,সমস্যা নেই বিয়ের পর তুমি থ্রিপিস কিনলে আমি সেটাও ইউজ করবো।আমি আবার চিকন তোমার মতো অতো ভুটকি না।

মিমি ক্ষেপে গিয়ে বলল,আমি ভুটকি?সবাই আমাকে চিকন বলে আর তুমি ভুটকি বলতেছো?তুহিনের পিঠে কয়েক ঘা বসিয়ে মিমি হনহন করে হেটে চলে আসে।


নিয়াজকে ছাড়া জারার দিনগুলো কেমন বিষন্ন কাটে।সারাদিন নিজেকে ভার্সিটি আর অফিসে ব্যস্ত রাখলেও রাতের বেলায় খুব করে মনে পড়ে নিয়াজের কথা।নিয়াজ প্রতিদিন নিয়ম করে তিনবার ফোন করে।ভিডিও কল দিলেই মাঝেমাঝে জারা কেঁদে ওঠে।তখন নিয়াজ লাইন কেটে দিয়ে চুপ করে থাকে।ভালোলাগেনা এরকম কান্না শুনতে।সারাদিন কাজ শেষে ক্লান্তি দূর করতেই ভিডিও কল দেয়।যখন হাসি মুখের বদলে কান্নামাখা মুখ দেখে তখন কি আর ভালো লাগে?

জারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের একটা বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।লাইটের আলোতে দেখা যাচ্ছে সেখানে দুজন দম্পতি খুনসুটি ময় মুহূর্ত কাটাচ্ছে।ওদেরকে চিনে জারা।প্রতিদিন এই সময় তারা বারান্দা বিলাস করে।জারাও এই সময়টা বারান্দায় কাটায় বলে প্রতিদিন ওদেরকে দেখতে পায়।জারার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।নিয়াজের সাথে খুনসুটি ময় মুহূর্ত কাটানোতো দূরে থাক ঠিকমতো কথাও বলতোনা জারা।নিয়াজ যাওয়ার আগেরদিনই যা একটু কাছাকাছি ছিলো দুজনে।

রিংটোন এর আওয়াজে জারা বারান্দার গ্রিল ছেড়ে রুমে আসে।ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই সমস্ত মন খারাপ উবে গিয়ে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠে।নিয়াজ ভিডিও কল দিয়েছে।অনেক্ষণ দুজনে কথা বলে নিয়াজ ফোন রেখে দিয়েছে।


ডিনার করে আসার পর জারার নাম্বারে একটা কল আসে।নাম্বারটা তানিশার ছিলো।জারা কল রিসিভ করে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করার পর তানিশা উত্তর দিয়ে বলল,কালকে দেখা করতে পারবি আমাদের সাথে?

জারা বুঝতে না পেরে বলল,তোদের সাথে মানে?

তানিশা মুচকি হেসে বলল,আমি আর রোহান ঢাকায় আছি।ভাবছি কাল তোর সাথে দেখা করবো।

জারা বলল,বাসায় চলে আয়।

তানিশা বলল,নাহ তুই বরং কাল চলে আসিস রেস্টুরেন্টে।আমি ঠিকানা পাঠিয়ে দেবো।

তানিশা কল কেটে দিয়েছে।জারা ভাবছে কাল তানিশার সাথে দেখ করতে যাবে নিয়াজকে জানাবে?না থাক পরে উনি শুধু শুধু টেনশন করবেন।তারচেয়ে বরং আমি তুহিনকে নিয়ে যাবো।একা যাওয়া ঠিক হবেনা।

পরেরদিন জারা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে তুহিনকে নিয়ে তানিশার দেওয়া ঠিকনায় চলে যায়।তানিশা আর রোহান আগেই বসা ছিলো।তানিশার সাথে কুশল বিনিময় করে বসে পড়ে জারা।তুহিন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে রোহানের দিকে।

তানিশা রোহানকে কিছু ইশারা করতেই রোহান নড়েচড়ে বসে।মাথা নিচু করে জারার উদ্দেশ্য বলল,সরি!

জারা অবাক হয়ে বলল,কেনো?

রোহান নিচুস্বরে বলল,আমি তোমার সাথে অনেক মিসবিহেভ করেছি।ক্ষণিকের মোহে পড়ে সত্যিকারের ভালোবাসাকে ভুলতে বসেছিলাম।বাবা মা যখন তোমার ছবি দেখালো আমি জানিনা আমার কি হলো।তোমাকে দেখেই ভালো লেগে গেলো।বাবা মা আমাকে নিজের কোনো পছন্দ আছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই আমি তানিশার কথাটা চাপিয়ে গেলাম।মরিচিকার মতো মিথ্যা মোহে ছুটলাম।সব কিছুর জন্য সরি।আমি এখন বুঝতে পেরেছি তানিশা আমাকে কতটা ভালোবাসে।আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি।আমি চেয়েছিলাম আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে।


তুহিন দাঁত কিড়মিড় করে বলল,জারা তোর সন্তানের কথা ভেবেই সেদিন আমাকে দমিয়ে রেখেছিলো।নয়তো এতোদিনে মরে ভূত হয়ে থাকতি।জারা তুহিনকে থামিয়ে দিয়ে বলল,আমি চাইবো আপনি আপনার স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভবিষ্যতকে সুন্দর করে গড়ে তুলুন।আর আপনি আমার কাছে ক্ষমা চাইছেন কেনো?আপনি ভুল করেছেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করুন।আজ আসি বলে তুহিনকে উঠতে বলে।তানিশা বলল,আমি খাবার অর্ডার করে ফেলেছি খেয়ে তারপর যাবি।জারা মুচকি হেসে বলল,আমি বাসায় না বলেই এসেছি আমাকে ফিরতে হবে।


দেখতে দেখতে দু’মাস কেটে গিয়েছে।নিয়াজের ফিরতে আর মাত্র দুদিন বাকি।জারার ভেতর টানটান উত্তেজনা কাজ করছে।নিয়াজ যে কাজে বিদেশে গিয়েছে সেটাতে সফল হয়েছে।আরো একটু কাজ বাকি আছে বলে জানালো নিয়াজ।তাইতো দুদিন পর ফিরবে।

গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে জারার মনে হলো কেউ ওকে পেঁচিয়ে রেখেছে।চোখ মেলে কিছুই দেখতে পারছেনা কিন্তু ওর পাশে কোনো মানুষ ওকে পেঁচিয়ে শুয়ে আছে সেটা ঠিকই বুঝতে পারছে।ছটপট করে ছুটতে গেলেই পাশে শুয়ে থাকা মানব জারাকে আরো পেঁচিয়ে ধরে।ভয়ে জারার প্রাণ পাখি উড়ে যাওয়ার উপক্রম।পাশে হাতিয়ে ওড়নাটা নিয়ে ওই ব্যাক্তির গলায় পেঁচিয়ে দিয়ে তাকে ধাক্কা মেরে উঠে লাইট অন করে।জারা থমকে গেছে এরকম দৃশ্য দেখবে ও ভাবেনি।মনে হচ্ছে এটা কেবল স্বপ্ন।

নিয়াজ গলা থেকে ওড়না ছুটিয়ে পাশ থেকে পানি নিয়ে খেয়ে নিলো।বেচারা কাশতে কাশতে শেষ।বউকে সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজের গলা নিয়ে মরছে।জারা নিয়াজের পাশে এসে ওকে ছুঁয়ে দেখছে সত্যিই কি নিয়াজ এসেছে নাকি ও স্বপ্ন দেখছে।নিয়াজ জারার হাতে চুমু খেয়ে বলল,আমি সত্যিই এসেছি বউ।চোখ ছোট ছোট করে অসহায় কন্ঠে বলল,কিন্তু তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে দুদিন আগে ফিরেই যে এরকম হবে ভাবিনি।একটু হলেই আমি মার্ডার হয়ে যেতাম।জারা নিয়াজের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই নিয়াজ তাল সামলাতে না পেরে খাটের সাথে বাড়ি খায়।একহাত দিয়ে মাথা ঘষে আরেকহাতে জারাকে জড়িয়ে ধরে।জারা বলল,আপনি রুমে কিভাবে আসলেন?আমিতো দরজা লক করে রেখেছিলাম।নিয়াজ বলল,বাবা জানতো আমি আসবো বাবাই আমাকে চাবি দিয়ে দিয়েছে।মায়ের সাথে দেখা করে এখানে এসেছি।মা ও প্রথমে অবাক হয়ে গিয়েছিলো তোমার মতো।জারা চুপ করে নিয়াজের বুকে মুখ গুঁজে আছে।

——————


পাঁচ বছর পর★


জারা রাতের জন্য রান্না শেষ করে রুমে এসেছে।খাটের উপর বাপ বেটার দিকে তাকিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিচ্ছে।নিয়াজ ছেলেকে কোলে নিয়ে খুনসুটি করছে।নিয়াজ আর জারার ছেলের নাম জাহিয়ান।বয়স মাত্র আট মাস।তাসিন,তুহিন সবাই বিয়ে করে নিয়েছে।তাসিনের একটা তিনবছরের মেয়ে আছে।তুহিন মিমিকে বিয়ে করেছে কয়েকমাস হলো।জাহিয়ান “পাপ্পা” বলে নিয়াজকে ডাকছে।জাহিয়ানের দাঁত উঠতেছে তাই যাকেই সামনে পায় কামড়ে দেয়।কুটুস করে নিয়াজের গালে একটা কামড় বসিয়ে দিলো।জারা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।নিয়াজ কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,মা ছেলে মিলে আমাকে কামড়ে শেষ করতেছো তোমরা।ছেলে কামড়াবে গালে,নাকে সেখানে সুযোগ পায় সেখানে আর ছেলের মা আমার হাত আর কান সরকারি পেয়ে কামড়ে যায়।জারা হাসি থামিয়ে বলল,নট সরকারি ওনলি আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হুহ।


জাহিয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে জারা বারান্দায় নিয়াজের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।নিয়াজ জারাকে নিজের সামনে ঘুরিয়ে এনে জারার পিঠের সাথে নিজের বুক ঠেকিয়ে দাঁড়ায়।জারা বলল,চারদিকে শো শো করে ঝড়ো হাওয়া বইছে।মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে।নিয়াজ বলল,তুমি কি জানো আমি তোমাকে প্রথম বৃষ্টির দিনেই দেখেছিলাম।জারা বলল,জানি!সেদিন আমি ঢাকায় ফিরেছি আপনি মাকে আনতে বাসস্ট্যান্ড এ গিয়েছিলে।

উঁহু বলেই নিয়াজ জারাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলো সেই দিনের কাহিনী খুলে বলে।জারা অবাক হয়ে বলে বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে এক বাচ্চার মা হয়ে গেলাম আর আপনি আমাকে একথা আজ বলছেন?

নিয়াজ নিশঃব্দে হাসলো।কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,ছাদে যাবে?সেদিনের মতো বর্ষণ তোমাকে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে আমি অপলক তোমায় দেখবো।সেদিন দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো পথ ছিলোনা।কিন্তু আজ কোনো বাঁধা নেই বর্ষণের সাথে আমিও তোমাকে ছুয়ে দেবো।


বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।নিয়াজ জারা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজে চলেছে।জারাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ওর চুলে মুখ গুঁজে দিয়ে নিয়াজ বিড়বিড় করে বলল,ধন্যবাদ বর্ষণ আমার জীবনকে সুন্দরতম করে তোলার জন্য। এই মানুষটাকে আমায় উপহার দেওয়ার জন্য।

আগামী বর্ষণ মুখর দিনগুলোতে ও আমি এই মেয়েটাকে পাশে চাই।

জারা চোখ বন্ধ করে বৃষ্টি আর সাথে প্রিয় মানুষের উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করছে।


~~~~~~~~~সমাপ্ত~~~~~~~~~~

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url