#বর্ষণ_মুখর_দিন
জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা
পর্ব ০২+০৩+০৪
মায়ের আসার অপেক্ষা করতে করতে প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ায় নিয়াজ একহাত মাথার উপর দিয়ে ছাউনির নিচে এসে দাঁড়ায়।নিজের গাড়িটা সাইডে পার্ক করে রেখেছে।এখন গাড়িতে গিয়ে বসলে মা আবার ওকে না দেখতে পেয়ে কোথায় খুঁজবে?গ্রামে বাবার বাড়িতে কিছুদিন থাকতে গিয়েছে।সকালে গাড়িতে উঠেই নিয়াজকে কল দিয়েছে উনাকে এসে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসায় নিয়ে যেতে।
হাতঘড়িতে সময় দেখে কাউন্টারে গিয়ে মা যে বাসে আসার কথা ছিলো সেটার কথা জিজ্ঞেস করতেই লোকটা জানালেন দশমিনিট আগেই বাস এসে থেমেছে।
ছাউনিতে বৃষ্টির কারণে লোকজনে ভরপুর।ফোন বের করে মায়ের নাম্বারে কল দিচ্ছে।রিং হয়ে ফোন কেটে যাচ্ছে।নিয়াজ চিন্তিত হয়ে এদিক ওদিক চোখ বুলাতে লাগলো।এতগুলো মানুষকে এখন ঠেলে ঠেলে মাকে খুজতে হবে ফোন ও তুলছেনা।
জারাকে অনেক্ষণ ধরে বৃষ্টির পানি নিয়ে দুষ্টুমি করতে দেখে একজন ভদ্র মহিলা বলে উঠেন,এতক্ষণ পানি ঘাটাঘাটি করলেতো জ্বর আসবে তোমার।কথাটা কে বলেছে কন্ঠ অনুসরণ করে পেছনে তাকাতেই একজন মোটা ফ্রেমের চশমাপড়া মহিলাকে জারার নজরে পড়ে।উনি জারাকে হাতে ইশারা দিয়ে নিজের কাছে ডাকলেন।জারা উনার সামনে গিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলো।মহিলাটি কথায় মাধুর্য নিয়ে বলল,এখানে দাঁড়িয়ে থাকো দেখলাম অনেক্ষণ ধরে পানি নিয়ে দুষ্টুমি করছো।জ্বর আসলে তখন কি করবে?
জারা মুখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,ভালো লাগে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে দিতে।আমি বাসায় যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু বৃষ্টি আমায় যেতে দিচ্ছে না।তাইতো বৃষ্টির সাথে খেলা করছি।
আপনি এখান থেকে কোথায় যাবেন?
ভদ্রমহিলা উত্তরে ঠোঁট প্রসারিত করে বলল,আমি বাবার বাড়ি গেছিলাম।আজকে বাসায় ফিরবো আমার ছেলে আসবে আমাকে নিতে।
ওহ!আমিও বাড়ি থেকে এসেছি।এখানে খালার বাসায় থেকে পড়াশোনা করি।চুপচাপ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোলাগছেনা।হাত দুটো বৃষ্টি কণাগুলোকে ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য নিসপিস করছে।জারা আবারো হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে দিচ্ছে।ভদ্রমহিলা শব্দ করে হেসে দিলেন।জারা পেছন একবার তাকিয়ে নিজেও হেসে ফেলে।
নিয়াজ এতক্ষণ মাকে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে মায়ের দেখা পেলো।এক কোনে একটা টুলে বসে আছেন।মায়ের দিকে এগিয়ে যেতেই চোখেমুখে পানির ঝাপটা এসে পড়ে।চোখমুখ কুচকে বামহাতের তালুদিয়ে পানিটুকু মুছে নেয়।সামনের কোত্থেকে পানি এসে মুখে পড়েছে সেটা অনুসরণ করতে গিয়ে দেখলো একটা মেয়ে ওর থেকে ৯-১০ ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে অনুতাপের স্বরে সরি বলছে।এমনিতেই মাকে এতক্ষণ খুঁজে না পেয়ে মেজাজ হাই ছিলো এখনতো পুরো ৩৬০ ডিগ্রী এঙ্গেলে ঘুরে গেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে নিয়াজ বলল,চোখ কোথায় থাকে আপনার?ডিজগাস্টিং!
জারা মুখটা ছোট করে বলে,বললামতো আমি খেয়াল করিনি।আসলে আমি ও আহাম্মকের মতো পানি ছোড়াছুড়ি করছিলাম আর আপনি হঠাৎ সামনে চলে এলেন।আমি সত্যিই দুঃখিত।
নিয়াজ ঠোঁটের ডগায় বিড়বিড় করে বলে আসলেই একটা আহাম্মক।
ভদ্রমহিলাটি টুল ছেড়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,তোমরা কি নিয়ে ঝগড়া করছো?নিয়াজ তার মায়ের হাত ধরে বলে,তোমাকে কতগুলো কল দিয়েছি সেই খেয়াল আছে তোমার?এদিকে আমি তোমাকে খুজে খুজে হয়রান।ভদ্রমহিলা আঙ্গুলের ডগা দিয়ে চশমাটা উপরের দিকে ঠেলে বললেন,ফোন আমার সাথেই আছে কল কখন বাজলো আমি শুনতে পাইনি।
আচ্ছা এখন বাসায় চলো বলে ভদ্রমহিলার হাত ধরে এগোতে নিলেই উনি বললেন আমার পানির পিপাসা লেগেছে বোতলেও পানি নেই।জারা চটপট উত্তর দিলো আমার কাছে পানি আছে আন্টি।ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করতে গেলেই নিয়াজ তার মাকে বলল তুমি বসো আমি তোমার জন্য পানি নিয়ে আসি।পথেঘাটে কারোকাছ থেকে কিছু খাওয়া ভালোনা সেটা হোক পানি।জারা এবার বিরক্ত হলো লোকটার প্রতি।আড়ালে মুখ বাঁকিয়ে বলল,কি একটা অবস্থা সবকিছু অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি।নিয়াজের মা বললেন পানি খেলে কিছু হবেনা সাথে তুই আছিস না?তাছাড়া তুই এই ভীড় ঠেলে বাইরে গিয়ে আমার জন্য পানি আনতে আনতে আমি শহীদ হয়ে যাবো।
নিয়াজ নাকমুখ কুচকে বলল,মা কি বলছো এগুলা?
জারাকে বলল,দাও মা পানির বোতলটা আমাকে দাও।জারা বোতল এগিয়ে দিতেই পানি খেয়ে জারাকে বোতল ফেরত দিলেন।
নিয়াজের মা বললেন,ওই দেখো তোমার নামটাই জিজ্ঞেস করা হলো না।কি নাম তোমার?
জারা মিষ্টি হেসে বলল,আমার নাম জারা হাসান।
বাহ অনেক সুন্দর নাম।তুমি যেমন মিষ্টি তোমার নামটাও তেমন।নিয়াজ ওর মায়ের হাত চেপে ধরে বলল,এবার চলো যেখানে যাও যারতার সাথে কথা জুড়ে দিতে পারলেই চলে।নিয়াজের মা ওর দিকে বিরস মুখে চেয়ে বলে,তুই তোর বাবার মতো একনম্বরের হিটলার।কোথাও কারো সাথে কথা বলতে দেখলেই টেনে হিঁচড়ে বাসায় নিয়া আসিস।
মায়ের কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ হলোনা নিয়াজের।বৃষ্টি অনেকটা কমে গেছে এখন হালকা একটু গুড়িগুড়ি ফোঁটা এসে মানুষকে ভিজিয়ে দিচ্ছে।নিয়াজ নিজের গায়ের কোর্ট খুলে মায়ের মাথার উপর দিয়ে গাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায়।গাড়ির দরজা খুলে পেছনের সিটে মাকে বসিয়ে সামনে বসে ড্রাইভার করে।
বৃষ্টি কমে গেছে মানুষজন ও এক এক করে বেরিয়ে যাচ্ছে।আর দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবেনা ভেবে জারা রাস্তায় বেরিয়ে সিএনজি খুজে নেয়।যেখানে ভাড়া লাগে একশ টাকা বৃষ্টির কারণে দু’শো চেয়ে বসে আছে সিএনজি ড্রাইভার।দামাদামি কষে শেষে একশ পঞ্চাশ টাকায় রাজি হলো।জারা নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে সিএনজিতে উঠে পড়ে।
বৃষ্টি হওয়ার কারণে গাছপালা সব সতেজ হয়ে উঠেছে।মনে হচ্ছে গাঢ় সবুজের সমারোহ।চারপাশ এখন অনেকটা স্নিগ্ধ লাগছে।সাথে কাঁচা মাটির ঘ্রাণ মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ।জারা সিএনজিতে বসে প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর রূপ দেখে চলেছে।
সিএনজি এসে ওর খালার বাসার সামনে থামতেই ভাড়া মিটিয়ে ভেতর চলে যায় জারা।কলিং বেল চাপ দিতেই জারার খালা এসে দরজা খুলে দিলেন।
কিরে তুই নিজে নিজে আসতে গেলি কেন?তাসিন তোকে নিয়ে আসতো।
জারা ক্লান্ত চোখে চেয়ে বলল,খালা আগে ভেতরে যেতে দাও ক্লান্ত হয়ে গেছি আমি।আমি ফ্রেশ হয়ে আসি তুমি খাবার দাও তারপর তোমার কথা শুনবো সরো বলে খালাকে পাশ কাটিয়ে নিজের জন্য রাখা রুমে চলে যায়।
জারার খালা রাজিয়া বেগম রান্নাঘরে চলে গেলেন জারার জন্য খাবার বাড়তে।
গোসল করে খাবার খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় জারা।সারাদিনের জার্নিতে শরীর পুরো ক্লান্ত হয়ে গেছে তাই বিছানায় মাথা রাখার কিছুক্ষণের মাঝেই চোখে ঘুম নেমে আসে।
সন্ধ্যায় সোফায় পা তুলে বসে টিভি দেখছে জারা।কোলের উপর একটা সাফ এসে পড়তেই জারা চিৎকার দিয়ে ওঠে সোফা থেকে নেমে যায়।
পেছন থেকে কারো হাসির আওয়াজে সেদিকে তাকায় জারা।তুহিন হেসে কুটিকুটি।এটা প্লাস্টিকের সাপ ছিলো।জারা নিচ থেকে একটা স্যান্ডেল নিয়ে তুহিনের দিকে ছুঁড়ে মারে।তুহিন সাবধানে পাশ কাটিয়ে যায়।
ভুটকি কখন এলি?
জারা রেগে গিয়ে বলল,বেয়াদব!তুই একি চিকন লাঠি দিন দিন আরো লাঠি হয়ে যাবি আর তোর বউ এত ভুটকি হবে যে তুই খাটেই জায়গা পাবিনা।তখন চোখে হাত দিয়ে কাঁদবি।
তুহিন সোফায় আরাম করে বসে ভাব নিয়ে বলল,জানিস এবারে সাজেক গিয়ে আরো দুটো মেয়েকে পটিয়ে এসেছি।
জারা কোমরে হাত দিয়ে বলল,এত গার্লফ্রেন্ডকে সময় দিস কিভাবে?
তুহিন চোখে চশমা দিয়ে বামহাতে একপাশের চুলগুলো ব্রাশ করে বলে,হিরো তো হিরোই হয় তাইনা।
জারা তুহিনের পেছনে একটা লাথি দিয়ে বলে,এই নে হিরোকে তখন জুতা উপহার দিয়েছিলাম এখন লাথি।
তুহিন কোমর ডলে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,ভুটকি তোর জীবনে বিয়ে হবেনা।
মা কোথায়রে?
খালা মনে হয় ঘরে আছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসের জন্য রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়ে নিয়াজ।একটু তাড়াতাড়িই বের হতে হয়।ঢাকা শহর মানেই জ্যাম।জ্যামে বসে থাকার চেয়ে হেটে যাতায়াত করলে মনে হয় তাড়াতাড়ি আসা যাওয়া করা যায়।কিন্তু হাটার মত মনমানসিকতা এখনকার যুগের মানুষের নেই।
তাসিন পরোটা ছিড়তে ছিড়তে বলল,তোকে আমি ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি।দশটার আগে ঠিকানা অনুযায়ী অফিসে চলে যাবি দশটা থেকেই কিন্তু ইন্টারভিউ শুরু।
জারা মাথা দুলিয়ে বলল,আচ্ছা ঠিকাছে।তুমি এখন যেতে পারো আমার ভাবিজান তো আবার তোমার দেখা পাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে।
তাসিন জারার মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল,দিন দিন তুই লজ্জা শরম হারিয়ে ফেলছিস।বড়ভাইয়ের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়ে জানিসনা।জারা দাঁত কেলিয়ে বলে আমাকে জ্ঞান দিতে হবেনা দেখো গিয়ে তোমার না হওয়া বউটা তোমার শোকে জ্ঞান হারিয়ে বসে আছে।জারার কথায় সবাই হেসে দিলো।
তাসিনের বাবা টাক মাথায় হাত বুলিয়ে কন্ঠ খাদে নামি বললেন,আরো এক কাপ চা হবে?
রাজিয়া বেগম ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,চা তোমার মাথায় ঢালবো।মাথার ছাদেতো চুল নেই আশেপাশে যা আছে সেগুলোও গরম চায়ের উত্তাপে ঝরে যাবে।সারাদিন চা চা করে আমার মাথা খায়।খালার কথা শুনে তুহিন আর জারা দুজনেই মুখ টিপে হেসে ওঠে।রাজিয়া বেগম ধমকে উঠে বললেন,তোরা হাসছিস কেনো যে যার কাজে যা।
একটা লং থ্রিপিস সাথে একটা হিজাব পড়ে খালা খালুর কাছে বলে জারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে।ফুটপাত ধরে হাটতে হাটতেই আজ ইন্টারভিউ দিতে যাবে আসার সময় রিকশা করে চলে আসবে।মানুষ চায় কিভাবে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় জারা তার ঠিক উল্টো।রাস্তার পাশে কতগুলো বাচ্চা কদমফুল নিয়ে খেলছে।জারা ওদের কাছ থেকে দুটো কদমফুল নিয়ে সেগুলো ছিঁড়তে ছিঁড়তে হাটছে।
গাড়ি জ্যামের মধ্যে আটকে যাওয়ায় নিয়াজ বিরক্ত হচ্ছে।বিড়বিড় করে ট্রাফিক পুলিশকে কিছু গালি দিলো।জ্যামে বসে থাকতে কার ভালো লাগে?গাড়ির গ্লাস নামিয়ে চারদিকে চোখ বুলাচ্ছে।হঠাৎ নজর যায় ফুটপাত ধরে হাটতে থাকা রমনির দিকে।মুখে হাসি হাতে কদমফুল।সামনের দিকে নজর নেই একমনে কদমফুল দেখে চলেছে।নিয়াজের মনে হলো মেয়েটাকে কোথাও দেখেছে।দু’সেকেণ্ড মাথা খাটাতেই মনে পড়লো এটাতো কালকের মেয়েটা।জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে বলে নিয়াজ গাড়ির গ্লাস উঠিয়ে চলে যায়।এদিকে জারা হেলেদুলে হেটে যাচ্ছে।যেতে কতক্ষণ সময় লাগবে সেই ধারণাটাও ওর নেই কিন্তু হেটেই চলেছে।অনেক্ষণ হাটার পর মনে হলো বহুত হেটেছি আর হাটা যাবে।একটা রিকশা ডেকে তাতে চড়ে বসে।
চলবে……
নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন। 🖤#বর্ষণ_মুখর_দিন
জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা
পর্ব ০৩
তানিশা রান্নাঘরে জায়ের সাথে সকালের নাস্তা তৈরীতে সাহায্য করছে।
মা আমার সাদা শার্টটা পাচ্ছিনা একটু খুজে দিয়ে যাও।রোহানের ভাবি মুখ বাঁকিয়ে বললেন,যাও যাও আর কাজে হাত লাগাতে হবেনা।রান্নাঘরে আসতে না আসতেই তোমার ডাক পড়েছে।
তানিশা মুখটা ছোট করে বলল,উনিতো মাকে ডেকেছেন।
বিয়ের পর মাকে কোনো কিছুর জন্য ছেলেরা ডাকে নাকি?মায়ের উপর দিয়ে তোমাকেই ডাকছে যাও যাও আর দাঁড়িয়ে থেকো না।
রোহানের ভাবির কথাগুলো কেন জানিনা তানিশার কাছে ভালো লাগলো না তাই রান্নাঘর থেকে সোজা রুমে চলে আসে।
তানিশা চলে যেতেই রোহানের ভাবি ঘাঁড় বাকা করে তানিশাকে চলে যেতে দেখে চোখ বড় বড় করে বলল কি মেয়েরে বাবা রান্নাঘরে কাজ ফেলে ঢ্যাংঢ্যাং করে চলে গেলো।
ঘরে গিয়ে রোহানকে কি লাগবে জিজ্ঞেস করতেই রোহান তেড়ে এসে তানিশার হাত মুচড়ে ধরে বলল,তোকে কে ডেকেছে এখানে?তুই বুঝিসনা আমি তোকে সহ্য করতে পারিনা।আমার সাধ্য থাকলে তোকে এই ঘর কেনো এই বাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতাম।
ব্যাথায় তানিশার চোখে পানি চিকচিক করছে।অস্ফুট স্বরে বলল,আমার লাগছে ছাড়ুন! রোহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,লাগুক!লাগার জন্যইতো ধরেছি।তোর জন্য আমি জারাকে বিয়ে করতে পারিনি।কেনো এত গন্ডগোল করলি?আমিতো বলে দিয়েছি বাচ্চাটা এবোরশন করিয়ে নিবি আর তোর কত টাকা লাগবে আমি তোকে দিয়ে দেবো।কিন্তু তুই কি করলি?এখন আমার কাছে থাকবি আর প্রতিনিয়ত আমার আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাঁই হয়ে যাবি।তানিশার হাত ছেড়ে ওকে ধাক্কা দিতেই তানিশা খাটের এক কোনে গিয়ে পড়ে।হাত দিয়ে খাটের কোন চেপে ধরায় পেটে আঘাত লাগেনি।মুখ চেপে ধরে কেঁদে চলেছে তানিশা।রোহান দরজা খুলে গটগট পায়ে নিচে নেমে যায়।
রাস্তায় ফুচকা দেখে রিকশাওয়ালাকে থামিয়ে জারা ফুচকা খেয়ে তারপর আবার রিকশায় উঠেছে।রিকশাওয়ালাকে বলে দিয়েছে মামা ধীরে সুস্থে গাড়ি চালাবেন।
রিকশা এসে তাসিনের দেওয়া ঠিকানায় থেমেছে।জারা রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে সামনের উঁচু দালানের দিকে তাকিয়ে ভেতরে গেলো।ইন্টারভিউ দশটায় শুরু হয়েছে আর এখন এগারোটা বাজে।জারা ভেতরে ঢুকে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখছে।একজন ফর্মাল ড্রেস পড়া লোক এসে জারাকে জিজ্ঞেস করলো আপনি কি এখানে ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন?
জারা নিজেকে ঠিক করে অত্যন্ত ভদ্রভাবে উত্তর দিলো জ্বি আমি ইন্টারভিউ দিতেই এখানে এসেছি।
লোকটি বলল,ইন্টারভিউ দশটায় ছিলো আর আপনি এখন এসেছেন?
আসলে আমি ভেবেছিলাম সবাই ইন্টারভিউ দিতে দিতে আমি সময়মতো চলে আসতে পারবো।
আমরা সীমিত আকারে লোক নিচ্ছি আমাদের কম্পানিতে।ইন্টারভিউ ছিলো একঘন্টা।আর আপনি সেই একঘন্টা পরেই এসেছেন?
জারা চোখ পিটপিট করে বলল,তাহলে কি এখন চলে যেতে বলছেন?
আচ্ছা ঠিক আছে,আপনি ওপাশে গিয়ে বসুন।সেখানে আপনার মতো আরো তিনজন আছেন।স্যার যদি বলে তো আপনাদের ইন্টারভিউ নেওয়া হবে।নয়তো আপনাদেরকে বাসায় ফেরত যেতে হবে।
লোকটি তার বসের কাছে গিয়ে বলল,স্যার আরো চারজন ক্যান্ডিডেট আছে যারা দেরি করে এসেছে।এখন তাদেরকে কি চলে যেতে বলবো?
লোকটির বস কিছুক্ষণ ভেবে বলল,উমম এক এক করে পাঠিয়ে দিন।আমাদের আরো একজন অ্যামপ্লয়ি লাগবে।যদি এদের মধ্যে সেরকম দক্ষ কাউকে পাই তো নিয়ে নেবো।
প্রথম তিনজনের ইন্টারভিউ শেষ এখন জারার পালা।জীবনে প্রথম কোথাও ইন্টারভিউ দিচ্ছে।বুকে ফুঁ দিয়ে সাহস সঞ্চয় করে ভেতরে গেলো।
সামনে বসা লোকগুলোকে সালাম দিয়ে ভালো করে তাকাতেই জারা চমকে উঠে।এই লোক এখানে কি করছে?আচ্ছা এটা কি এই লোকের অফিস?তাহলে আমি চাকরি করবো না হুহ।
জারাকে ক্যান্ডিডেট হিসেবে দেখে নিয়াজের তেমন একটা ভাবাবেগ হলো না।সে তার নিজের জায়গায় স্থির।নিয়াজের পাশে বসে থাকা ব্যক্তি হাতে ইশারায় জারাকে বসতে বলে।জারা নিজের সার্টিফিকেট গুলো এগিয়ে দিলে নিয়াজ সেগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়।জারাকে কিছু প্রশ্ন করারপর বেশ গুছিয়েই সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়।
নিয়াজের পাশের জন বলল,আপনি ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসুন।জারা বেরিয়ে যেতেই নিয়াজ আর তাদের বস ডিসকাস করার পর যেখানে একজন নেওয়ার কথা সেখানে দুজনকে সিলেক্ট করে।এর মধ্যে জারা একজন।
অফিসের একজন কর্মকর্তা এসে জারা আর রাফি নামের ছেলেটাকে কংগ্রাচুলেশনস জানিয়ে বলল,আপনারা আমাদের কম্পানির জন্য সিলেক্টেড।
জারাতো খুশিতে লাফিয়ে ওঠে।ও ভাবে নি প্রথমবার ইন্টারভিউ দিয়ে এভাবে টিকে যাবে।লোকটি বলল,কাল দুপুর দুইটা থেকে আপনারা জয়েন্ট করবেন।
জারা বাসায় এসে খালাকে খবরটা দিতেই উনি খুশি হয়ে বলেন,তুই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয় আমি তোর জন্য নুডলস বানিয়ে আনছি।ঘরে গিয়ে বাবার নাম্বারে কল করে বাবাকেও চাকরির খবরটা জানিয়ে দিলো।বাবার সাথে কথা বলে মায়ের সাথেও কিছুক্ষণ কথা বলল জারা।
বিকালে বাসায় পাশের বাসার আন্টি এসে খালার সাথে কথা বলছে।জারা গিয়ে টিভি চালু করে বসলো।
পাশের বাসার মহিলা বললেন,জারার না বিয়া ছিলো সেজন্য আপনারা সবাই গ্রামে গেছেন।এখন দেখি জারা ও এই বাসায়।ছেলেরা কি বিয়ে ভেঙে দিছে নাকি?
রাজিয়া বেগম বললেন,আমরাই বিয়ে ভেঙে দিয়েছি ছেলে ভালো না।
ওহ আচ্ছা আমি তো আরো ভাবলাম ছেলেরাই বিয়ে ভেঙে দিয়েছে পাশের বাসার আন্টি মুখ বাঁকিয়ে বললেন।
উনার সব কথায় জারার কানে আসছে কিন্তু কিছুই বলছে না জারা।পাশের বাসার আন্টিদের কাজই হলো এর কথা ওর কাছে ওর কথা এর কাছে বলা।
পরেরদিন তুহিন আর জারা একসাথে ভার্সিটির উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ে।তুহিন জারার একবছরের জুনিয়র।যারা অনার্স ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট।ভার্সিটিতে দুটো ক্লাস করে জারা বাসায় চলে আসে।গোসল সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে একেবারে অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ে।আজকে আর দেরি করা যাবেনা।বাসার সামনে থেকে রিকশা ডেকে অফিসে চলে যায়।
অফিসের নতুন পুরাতন সবাই সবার সাথে পরিচিত হচ্ছে।সবাইকেই জারার কাছে ভালো লাগলো একজন ছাড়া।মেয়েটা অফিসের সব ছেলেদের গায়ে পড়ার চেষ্টা করে।আগ থেকেই এই অফিসে কাজ করে।মুখে একগাদা মেকাপ করে অফিসে এসেছে যেন এখনে কোনো ফাংশন চলছে।
জারা নিজের কেবিনে বসে সব কিছু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে।এশা মেয়েটা এসে বলল,হাই!আ’ম এশা।জারা মুচকি হেসে বলল,আমি জারা হাসান।
ওয়াও তোমার ওড়নাটা জোস।কোথা থেকে কিনেছো।
এটা আমার বাবা কিনেছে।মনে মনে বলে,ওড়নার কথা জিজ্ঞেস করে তুমি কি করবে তুমিতো ওড়নাই পড়ো না।পিয়ন এসে বলল,ম্যাডাম আপনাকে বড় স্যার উনার কেবিনে ডাকে।এশাকে পাশ কাটিয়ে যারা বসের কেবিনের সামনে গিয়ে নক করে।ভেতর থেকে অনুমতি পেয়ে জারা কেবিনে প্রবেশ করে।
বস বললেন,সবাইকে তাদের কাজ বুঝিয়ে দিয়েছি।আপনি মিস্টার নিয়াজ এহসানের ডিপার্টমেন্টে কাজ করবেন।উনি আপনাকে কাজ বুঝিয়ে দেবে।আমি রহিমকে বলে দিচ্ছি আপনাকে মিস্টার নিয়াজের কেবিনে নিয়ে যেতে।
জারা বলল,স্যার আপনি আমার বাবার সমান তাই আমাকে আপনি করে না বলে তুমি বলতে পারেন।বস মুচকি হেসে বলল,ঠিক আছে এখন থেকে তুমি বলবো।
রহিমকে ডেকে জারাকে নিয়াজের কেবিনে পাঠিয়ে দিলো।
মে আই কাম ইন স্যার!দরজা দিয়ে হালকা মুখ বাড়িয়ে বলল জারা।
নিয়াজ ল্যাপটপে মুখ রেখেই বলল,কাম।
জারাকে কিছু ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল,আপনার আজকের কাজ ফাইল গুলো চেইক করা।অফিস টাইম শেষ হওয়ার আগে ফাইলগুলো দিয়ে যাবেন।জারা চোখ বড় বড় করে ফাইলগুলো গুনছে।প্রথমদিনেই এত কাজ?
নিয়াজ শক্ত কন্ঠে বলল,এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে কাজে লেগে পড়ুন।গো!
একগাদা ফাইল হাতে নিয়ে নিজের কেবিনে এসে ধপ করে বসে পড়ে জারা।ছটপট কাজে লেগে পড়ে।রহিম এসে এক কাপ কফি দিয়ে য়ায়।কাজের ফাঁকে ফাঁকে কফিতে চুমুক দিচ্ছে।নিয়াজ এসে হেঁটে হেঁটে সবার কাজ দেখছে।ও আসতেই সবাই দাঁড়িয়ে যায়।জারার সেদিকে খেয়াল নেই।সে একমনে ফাইল দেখে চলেছে।এশাতো নিয়াজকে দেখেই বিভিন্নরকম অঙ্গভঙ্গি শুরু করে দিয়েছে।
জারার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে নিয়াজ।পাশ থেকে একজন ফিসফিস করে জারাকে বলছে বস এসেছে দাঁড়াও কিন্তু জারা শুনতে পায়নি।আরেক পাক সবার কেবিনের সামনে ঘুরে নিয়াজ নিজের কেবিনে চলে যায়।
পাশের কেবিনের মেয়েটা জারাকে ধাক্কা দিয়ে বলল,বস এসেছিলো তোমাকে এতবার ডাকলাম কিন্তু তোমার মনযোগ কাজে ছিলো।
জারা অবাক হয়ে বলে,বস কখন এসেছে?
মেয়েটা বলল,মাত্রই উনি এখান থেকে গেছেন।জারা বলল,আসলে আমি খেয়াল করিনি।আপনার নামটা যেন কি?
মেয়েটা হেসে দিয়ে বলল,ভুলে গেলে?আমার নাম রিহা।আমি তোমাকে তুমি করে বলছি আর তুমি আপনি করে বলছো?
জারা হেসে বলল,আচ্ছা তুমি করে বলবো।এখন একটু কাজ করি অনেকগুলো ফাইল চেইক করতে হবে।
রিহা বলল হ্যাঁ আমার ও কাজ আছে।
অফিস শেষ হয়েছে সন্ধ্যা সাতটায়।সবাই বেরিয়ে পড়েছে।জারা ফাইলগুলো নিয়াজের কাছে জমা দিয়ে অফিস থেকে বের হয়।বাইরে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কোনো রিকশার হদিস পাচ্ছেনা।নিয়াজ বাসায় যাওয়ার পথে জারাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথা বের করে বলল,বাসায় না গিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
জারা একবার নিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল,রিকশা পাচ্ছিনা।
নিয়াজ একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,ড্রপ করে দিচ্ছি আসুন।
জারা সৌজন্যের হাসি দিয়ে বলল,আমি চলে যেতে পারবো।
নিয়াজ আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো।জারা বলল,কি লোকরে বাবা একবার বলেছি আমি যেতে পারবো আর ওই লোক দ্বিতীয়বার গাড়িতে ওঠার কথা বললো না?
আরো কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর একটা রিকশা পেয়ে জারা বাসায় চলে আসে।
চলবে…..
নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন। 🖤#বর্ষণ_মুখর_দিন
জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা
পর্ব ০৪
এবার অন্তত বিয়েটা করে আমাদেরকে নাতি-নাতনির মুখ দেখা।
খাবার চিবোতে চিবোতে নিয়াজ বলল,এখনো অনেক সময় পড়ে আছে।
নিয়াজের বাবা বেশ শক্ত কন্ঠেই বললেন,সময়টা আর কোথায় রইলো?বয়সতো আর কম হলোনা।ত্রিশ ছাপিয়ে যাচ্ছে।বুড়ো হয়ে যাচ্ছো।নিয়াজের মা মাংসের বাটি ধপ করে টেবিলের উপর রেখে থমথমে মুখে বললেন,আমরা মরলেই তোমার ছেলে বিয়ে করবে।
নিয়াজ খাওয়া থামিয়ে দিয়ে বলল,বিয়ে করলেই তোমরা খুশি?
নিয়াজের মা খুশিতে গদগদ হয়ে বললেন,তুই বিয়ে করবি বাবা?
নিয়াজ গম্ভীর মুখে জবাব দিলো তোমাদের বউমা দরকার বিয়ে করে তোমাদের বউমা এনে দেবো।এর থেকে বেশি কিছু আমার কাছে আশা করো না।তারপরেও মরার কথা মুখে নিবে না।
মিসেস রেনু হেসে মনে মনে বললেন,আগে বিয়েটা করো বাবাজান।বাকিটা তোমাকে দিয়ে বউমাই করিয়ে নেবে।
খাবার শেষ করে নিয়াজ নিজের ঘরে যেতেই নিয়াজের বাবা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,যাক অবশেষে ছেলে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে।
নিয়াজ ফোনের স্ক্রিনে একটা ছবির দিকে অপলক চেয়ে আছে।এই ছবির মেয়েটার মাঝেই নিয়াজ নিজের মন হারিয়ে বসে আছে।কোনো এক বৃষ্টিভেজা দিনে নিজের প্রেয়সীকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলো নিয়াজ।ফাঁকা রাস্তায় ছাতা বন্ধ করে ভিজতে ভিজতে বাড়ি ফেরার দৃশ্য এখনও নিয়াজের চোখে ভাসছে।সেদিনের পর কতবার যে লুকিয়ে লুকিয়ে সেই রমনীকে দেখেছে নিয়াজ তার ইয়াত্তা নেই।দুদিন সেই রমনীকে না দেখতে পেয়ে নিয়াজের যেন পাগলপ্রায় অবস্থা।পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে।খবরটা শুনে নিয়াজের পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিলো সেদিন।প্রথম যেদিন নিয়াজ তার প্রেয়সীকে দেখেছিলো সেদিনই লুকিয়ে তার একখানা ছবি নিজের ফোনের ক্যামেরায় বন্দি করে নেয়।সেই থেকে প্রতিরাতে এই ছবিটি দেখেই চোখের তৃষ্ণা মেটায়।মানুষটা তার না হোক কিন্তু তার জন্য বরাদ্দকৃত ভালোবাসাটাতো মিথ্যে নয়।ঘুম না আসা পর্যন্ত নিয়াজ ছবিটার দিকেই তাকিয়ে থাকবে।এটা নিত্যদিনকার রুটিন হয়ে গেছে।যেন ছবির এই মেয়েটিকে একদিন না দেখলে ঘোরতর অন্যায় হয়ে যাবে নিজের সাথে।
বাবা মায়ের পছন্দমতো বিয়ে করবে ঠিক কিন্তু মনের সবটা জুড়ে এই মেয়েটার বিচরণ থাকবে।মনের কোন জুড়ে এই মেয়েটার পদচারণা চলতে থাকে প্রতিনিয়ত।মেয়েটাকে যখন স্বশরীরে নিজের আশেপাশে দেখে তখন ইচ্ছে করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখে বলতে ভালোবাসি!
কিন্তু একটাই সংশয় সেটা হলো মানুষটা এখন অন্যকারো।তাকে ছুঁয়ে দেওয়ার অধিকার নিয়াজের নেই।
রাতের খাবার শেষ করে জারা ফোনটা হাতে নিয়েছে।উদ্দেশ্য বাড়িতে ফোন করে কথা বলা।তখনই মায়ের নাম্বার থেকে কল আসায় জারা মুচকি হেসে রিসিভ করে সালাম দেয়।
জারার মা সালামের উত্তর দিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছিস মা?
আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।তোমরা সবাই কেমন আছো?
জবাবে জারার মা বললেন সবাই ভালো আছে।তারপর জারার মা বেশ উসখুস করতে লাগলেন।
জারা বলল,মা কিছু বলতে চাইছো তুমি।তাই এতটা ফর্মালিটি না করে কি বলতে চাও বলে ফেলো।
এবার জারার মা থেমে যাওয়া কন্ঠে বললেন,আসলে কায়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।ছেলে আর কায়া দুজন দুজনকে নাকি আগে থেকেই পছন্দ করে।ছেলে তার বাড়িতে জানিয়েছে উনারা আমাদের বাড়িতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।বেশ ভালোঘর থেকেই প্রস্তাব এসেছে।এখন তোর চাচা চাইছে বিয়েটা দিয়ে দিতে।এরকম ভালোঘর পেলে কোন বাবাই বা বসে থাকবে।
জারা বলল,সবাই যেহেতু রাজি তাহলে বিয়েটা দিয়ে দিলেই পারো।জারার মা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে বললেন,কিন্তু ঘরে বিবাহ উপযুক্ত বড় চাচাতো বোন রেখে কিভাবে ছোটবোন কে বিয়ে দেবো?
জারা ভ্রু কুচকে বলল,তা তোমরা কি করতে চাইছো বলোতো?
জারার মা বললেন তোর বাবা আবারো তোর জন্য ছেলে দেখছে।ভালো সমন্ধ পেলেই দুবোনের বিয়ে একসাথে দিয়ে দেবে।
জারা চমকে উঠে বলে কি বলছো এগুলো?কিছুদিন আগেই একটা বিয়ে ভেঙেছে।আমি এখন চাকরি নিয়েছি।অন্তত অনার্স পরীক্ষার আগে আমি এসব তোমাদের কাছে আশা করিনি।
জারার মা অনুনয়ের স্বরে বললেন,তুই রাগ করিস না।তোর বাবাতো এমনই মানুষ।তবে উনি বলে দিয়েছেন তোর পড়ালেখায় অমত পোষণ করে এমন পরিবারে তোর বিয়ে দেবেনা।এখন তোর চাচা চাইছে কায়ার বিয়েটা দিয়ে দিতে।যদি তোকে রেখে কায়াকে বিয়ে দিতে যাই তাহলে গ্রামের মানুষ কানাকানি শুরু করবে।তোর বাবা গ্রামের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি।
জারা মায়ের কথা শুনে থম মেরে বসে আছে।মায়ের কথার উত্তরে কি বলা উচিত ওর জানা নেই।তবে বাবার কথার উপর কথা বলার সাধ্য জারার নেই।ছোটবেলা থেকেই একমনে বাবার সবকথা শুনে এসেছে।মুহিত হাসান ও কখনো মেয়ের কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন নি।কোনো জিনিসের জন্য মুখ ফুঁটে বলার দেরি মেয়ের সামনে সেই জিনিসটা এনে হাজির করতে দেরি হয়না।
জারার ভাবনার মাঝেই ওর মা আবার বলে উঠে,বিয়েটা ১৫ দিনের মধ্যেই সেরে ফেলতে চায় ছেলেপক্ষ।জারার এখন কথা বলতে ভালো লাগছেনা তাই মাকে বলল,তোমার সাথে পরে কথা বলবো আমার এখন ঘুম পাচ্ছে।
ফোনটা টেবিলের উপর রেখে জারা রান্নাঘরে গেলো চা বানাতে।কড়া করে এক কাপ চা বানিয়ে বারান্দায় একটা টুল টেনে বসলো।পাশের বারান্দা থেকে ফিসফিসানির আওয়াজ শুনে জারা তাড়াতাড়ি চা শেষ করে রুমে চলে আসে।গিয়েছিলো চা নিয়ে একটু একা একা বারান্দা বিলাস করবে কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তাসিন সারারাত ধরে আজ বারান্দায় নিজের প্রেম চালিয়ে যাবে।গার্লফ্রেন্ডের পড়ার চক্করে প্রতিদিন ঠিক করে কথা বলতে পারেনা বেচারা।সপ্তাহে একদিন রাতের অর্ধেক সময় ধরে দুজনে কথা বলে।আর তাসিনের কথা বলার ঐতিহাসিক জায়গাটা হলো বারান্দা।
তাসিন তার গার্লফ্রেন্ড রাহিকে বলছে,আচ্ছা জারার চাকরির খবরটা তোমাকে কে দিলো?
রাহি বলল,আসলে ভাইয়া এসে জারার কথা বললো ও চাকরি করবে কি না?ওর বন্ধুর অফিসে নতুন লোক নিয়োগ দিচ্ছে।ভাইয়া বারবার জারার কথা বলায় আমি তোমাকে বলেছিলাম জারার জন্য চাকরি পেয়েছি।
তাসিন ভাবুক হয়ে বলল,তোমার ভাই হঠাৎ জারার চাকরির জন্য উঠেপড়ে লেগেছে কেনো?
রাহি বিরক্ত হয়ে বলল,উফ!সেটা তুমি ভাইয়াকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো না।এখন কথা বলার সময় পাচ্ছো ঠিক করে কথা বলছো না।পরে পুরো সপ্তাহ ঘ্যানঘ্যান করবা আমি তোমাকে সময় দিই না।
তাসিন বলল,আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে জারার কথা বাদ দিলাম।
সকালে জারা ঘুম থেকে উঠে নামায পড়ে তিনকাপ চা বানিয়ে এককাপ খালুকে দিয়ে আরেককাপ খালার ঘরে দিয়ে আসলো।এককাপ নিজের জন্য রাখলো।জারার খালু সকালে মসজিদ থেকে এসেই সোফায় বসে থাকেন চায়ের জন্য।নাস্তা খাওয়ার আগ অব্দি কয়েক কাপ চা উনার খাওয়া হয়ে যায়।এত চা খায় বলে রাজিয়া বেগম কথা শুনাতে ছাড়েন না।তাই জারাকে দেখলে চুপিচুপি জারার কাছে চা চায়।চা টা শেষ করে হাতের কাপটা ধুয়ে সকালের নাস্তা বানানোতে হাত লাগায় জারা।মাঝেমাঝেই জারা সকালের নাস্তা অনেকসময় দুপুরের রান্নাটাও করে ফেলে।রাজিয়া বেগম না করলেও জারা শুনেনা।
নাস্তা বানানো শেষ করে যারা গোসল করে নেয়।চুলার গরমে একেবারে ঘেমে গেছে।
সবার নাস্তা খাওয়া প্রায় অর্ধেক শেষ জারা এসে নিজের প্লেটে একটা পরোটা আর ভাজি নিয়ে খাওয়া শুরু করলো।তাসিন আজ এখনো নিচে আসেনি।কচ্ছপের মতো ধীরে ধীরে আজকে নিচে নামবে।যেদিন রাতে কথা বলে তারপরের দিন ঘুমের কারণে উঠতে কষ্ট হয়।তখন আস্তে আস্তে ঢুলতে ঢুলতে নিচে নামবে।অফিসে গিয়েও বসের কাছে ঝাড়ি খাবে।
ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরে জারা কিছুক্ষণ শুয়েছিলো।কখন যে চোখটা লেগে গেছে বুঝতেই পারেনি।ঘুম ভাঙে রাজিয়া বেগমের ডাকে।ফোন হাতড়ে সময় দেখে ১ঃ২০ মিনিট বাজে।তড়িঘড়ি করে ফ্রেশ হয়ে নামাযটা পড়েই অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ে।দুপুরের খাবার খেতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।বাসার সামনে থেকে একটা রিকশা নিয়ে অফিসে চলে আসে।অলরেডি পাঁচ মিনিট লেইট।তাড়াহুড়ো করে অফিসে ঢুকতেই কিছুর সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যেতে নেয়।চোখমুখ খিঁচে সামনে যা পায় সেটাই আঁকড়ে ধরে পড়া থেকে বাঁচার জন্য।অকস্মাৎ সামনের ব্যক্তির শার্ট চেপে ধরায় সে টাল সামলাতে না পেরে জারার কোমর শক্ত করে ধরে দাঁড়ায়।কোমরে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলে তাকায় জারা।নিয়াজকে সামনে দেখে ওর শার্ট ছেড়ে দিয়ে সিটকে দূরে সরে যায়।অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে নেয় জারা
নিয়াজ কপট রাগ দেখিয়ে বলল,দেখে হাটতে পারেন না।এমনিতে ও পাঁচমিনিট লেইট করে এসেছেন।
জারা মাথা নিচু করে বলল,সরি স্যার!
সবাই কাজ ফেলে রেখে সার্কাস দেখছে।নিয়াজ সবাইকে একটা ধমক দিয়ে নিজের কেবিনে চলে যেতেই এশা এসে জারাকে চেপে ধরে বলল,এতগুলো দিন এখানে আছি নিয়াজ স্যারের পাশে ঘেষতে পারলাম না।আর তুমি কিনা আসতে না আসতেই একেবারে বুকের কাছে চলে গেলে।এই তোমার ট্রিকসটা আমাকেও একটু শিখিয়ে দিও।
জারা বিরক্ত হয়ে বলে,ট্রিকস মানে?আপনি দেখলেন আমি পড়ে যাচ্ছিলাম।
এশা বলল,হ্যা সেটাইতো বলছি।এরকম পড়ে যাওয়ার ট্রিকস আমাদের শিখালেও পারো।
জারা আর কথা না বাড়িয়ে নিজের কেবিনে এসে বসে কাজে মন দেয়।
আজকে আর নিয়াজের কাজে মন বসবেনা।নিজের কেবিনের সাথে সংযুক্ত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়।জারার স্পর্শ পেয়ে কেমন যেন মনটা বিষিয়ে উঠেছে।কি হতো যদি জারার বিয়েটা না হতো?
চলবে…….
নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন। 🖤
