#বর্ষণ_মুখর_দিন

জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা

পর্ব ০৫+০৬+০৭


দিনটা শুক্রবার।তাই সবাই আজ বাড়িতে আছে।বিকালে ড্রইংরুমে সোফায় বসে তুহিন আর জারা ঝগড়া করছে টিভির রিমোট নিয়ে।ওদের ঝগড়া দেখলে মনে হবে দুজনই পিঠাপিঠি ভাই-বোন।রাজিয়া বেগম রান্নাঘরে পাকোড়া বানাচ্ছেন সবার জন্য।তাসিনের বাবা এক কাপ চায়ের আশায় টাক মাথায় হাত দিয়ে রান্নাঘরের দিকে চেয়ে আছেন।এই বুঝি রাজিয়া বেগম খুন্তি হাতে নিয়ে উনার উপর হামলে পড়বেন।কলিংবেলের শব্দে তাসিন উঠে গেলো দরজা খুলতে।জারা বা তুহিন দুজনের একজন ও এখন দরজা খুলবেনা ওরা মারামারি নিয়া ব্যস্ত।একজন আরেকজনের চুল ধরে টানছে।


দরজা খুলে দিয়ে রাহির ভাইয়ের সাথে একজন যুবক আর দুজন মধ্যবয়স্ক মানুষকে দেখে তাসিন অবাক হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।রাহির ভাই রাজ বলল,কি ব্যাপার দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি বাসার ভেতরেও যেতে দিবেন।তাসিন দরজা থেকে সরে দাঁড়াতেই রাজ তার সাথে আগত ব্যক্তিদের নিয়ে ভেতরে ঢুকে।

রাজিয়া বেগম খুন্তি হাতে নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন কে এসেছে দেখতে।রাজকে দেখে উনি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তাদের আপ্যায়নে।শত হোক ছেলের হবু বউয়ের ভাই বলে কথা।তাসিন গিয়ে জারা আর তুহিনকে থামাতেই জারা মাথায় ওড়না নিয়ে অবাক হয়ে বলল,স্যার আপনারা?আন্টি আপনি?আমাদের বাসায়?


মিসেস রেনু জারাকে দেখে নিজেও অবাক হয়ে যায়।উনি রাজকে দেখিয়ে বলল,ওইতো আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছে।নিয়াজ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রাজের দিকে তাকিয়ে আছে।নিয়াজের জন্য মেয়ে দেখানোর কথা বলে জারার বাসায় কেনো নিয়ে এসেছে?

মিসেস রেনু জারার মাথায় হাত রেখে বলল,তা মারামারি করছো কেনো ভাইয়ের সাথে?

জারা লজ্জায় মাথা নিচু করে নেয়।আড়চোখে একবার তুহিনকে শাসিয়ে নেয়।তুহিন ভেংচি কেটে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।


রাজ রাজিয়া বেগমকে থামিয়ে দিয়ে বলল,আন্টি আপনি এত ব্যস্ত হবেন না।আগে আমার কথা শুনুন।রাজিয়া বেগম হাতের খুন্তি রেখে রাজের কথায় মনযোগ দিলো।জারা মিসেস রেনুর সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।নিয়াজ সোফায় বসে আড়চোখে জারাকে দেখছে।কি স্নিগ্ধ সেই হাসি। রাজিয়া বেগম,তাসিন,তাসিনের বাবাকে আলাদা করে রাজ বলল,উনারা জারাকে দেখতে এসেছেন।নিয়াজের দিকে ইশারায় দেখিয়ে বলল,এটা পাত্র আমার বন্ধু হয়।বাবা ছেলে দুজনই জারার অফিসের বস।দুঃখিত আন্টি আপনাদের না জানিয়েই আমি উনাদেরকে নিয়ে এসেছি।


তাসিন কপালে ভাঁজ ফেলে বিজ্ঞদের মতো বলল,জারা কি এখন বিয়ে করতে রাজি হবে?তাছাড়া খালা-খালু থেকেও তো তাদের মতামত নিতে হবে।রাজিয়ে বেগম তাসিনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,তুই চুপ থাক।তোর খালার সাথে আমার কথা হয়েছে।জারার জন্য ওর বাবা আবারো ছেলে দেখছে।কায়া আর জারা দুজনের একসাথে বিয়ে দিবে।

মায়ের ধমকে তাসিন চুপসে গেছে।কথাটা একটু স্বাভাবিক ভাবেও বলা যেতো।তা না করে হবু সালাবাবুর সামনে ইনসাল্ট করে দিলো বেচারাকে।তাসিনের একটু খানি মুখ দেখে রাজের খুব হাসি পাচ্ছে।কিন্তু এখন সিরিয়াস মুহূর্তে হাসাটা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়।


রাজিয়া বেগম জারাকে ডেকে বললেন গায়ের জামাটা চেঞ্জ করে একটা নতুন জামা পড়ে আসতে।জারা ভ্রু কুচকে বলল কিন্তু এই জামায় সমস্যা কোথায় খালা?এটাকি ছেড়া?এই জামাটা নামিয়েছি মাসখানেক ও তো হলো না।রাজিয়া বেগম চোখ পাকিয়ে বললেন,তোকে এতকথা বলতে বলেছি আমি?যেটা বলেছি সেটা কর গিয়ে এই জামাটা পাল্টে আয়।খালার কথামতো জারা গেলো জামা পাল্টাতে।


নিয়াজের বাবা মিসেস রেনুর কানে কি যেন বললেন।মিসেস রেনু কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,তোমারই ছেলে তাই তুমি আগ থেকেই সব জেনে বসে আছো।আমিতো আর ওর মা না তোমাদের বাসার কাজের বেটি তাই আমি কিছুই জানিনা।জারাকে তো আমি আগে থেকেই চিনি।যেদিন গ্রাম থেকে এসেছিলাম সেদিন বাসস্ট্যান্ডে ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো।


নিয়াজ চোখ দিয়ে রাজকে ভস্ম করে দিচ্ছে।ওকে জারার বাসায় কেনো নিয়ে এসেছে সেটাই মাথায় ধরছেনা।

নিয়াজের দৃষ্টি লক্ষ্য করে রাজ সবার উদ্দেশ্য বলল,এক্সকিউজ মি!আমি আর নিয়াজ একটু আসছি।নিয়াজ রাজের সাথে উঠে বাসার বাইরে চলে গেছে।তাসিনের বাবা নিয়াজের বাবা মায়ের সাথে কথা বলছেন।


নিয়াজ রাজকে টেনে হিঁচড়ে প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলল,তুই আমাকে জারার বাসায় কেনো নিয়ে এসেছিস?আমি চাইনা এখানে জারার সংসারে কোনো অশান্তি হোক।

রাজ নিয়াজের ঘাড়ে হাত রেখে সিরিয়াস হয়ে বলল,জারার জামাই মারা গেছে।তুইতো জারাকে ভালোবাসিস।তাই তোকে জারার বাসায় নিয়ে আসলাম।এখন তুই বিয়ে করবিনা জারাকে?

রাজের কথায় নিয়াজের মাথায় যেন কেউ আকাশ ভেঙে ফেলেছে।জারার হাজবেন্ড মারা গেছে মানে কি?কিছুদিনই তো হলো জারার বিয়ে হয়েছে।

নিয়াজের দিকে তাকিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে রাজ বলল,কিরে করবি না বিয়ে জারাকে?

নিয়াজ নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,আমি নিজের ভালোবাসার মানুষকে পাবো এর চেয়ে খুশির খবর আর কি হতে পারে?তুই আজই বিয়ের ব্যবস্থা কর।আমি চাইনা জারা আর কষ্ট পাক।ওর জীবনের সকল দুঃখ মুছে দেবো আমি।ওর ওপর কোনো কষ্টের আঁচ আমি পড়তে দেবোনা।

রাজ নিয়াজের পিঠে চাপড় মেরে বলল,বেডা থাম তুই।একেবারে আজই বিয়ের জন্য লাফিয়ে উঠেছে।

শুন সেদিন জারার বিয়ে হয়নি।ছেলে বউ রেখে জারাকে বিয়ে করতে এসেছে।তাই জারা সেদিন বিয়ে ভেঙে দিয়েছে।আমি প্রথম থেকেই সব কিছু জানতাম।রাহি আমাকে বলেছে কিন্তু তোর দেবদাস ওয়ালা লুক দেখতে আমার সেই আনন্দ হতো তাই এতদিন তোকে কিছু জানাইনি।জারাকে তোর অফিসে প্ল্যান করে আমিই পাঠিয়েছি।আঙ্কেল সবকিছুই জানে।আমি আর আঙ্কেল প্ল্যান করে সবকিছু এতদূর নিয়ে আসলাম।আমাদের এটা জানা জরুরি ছিলো জারার প্রতি তোর অনুভূতিটা কেমন।


রাজের মুখে সব শুনে নিয়াজ বোকা বনে গেলো।সিরিয়াসলি?ওর নিজের বাবা পর্যন্ত এই হারামি বন্ধুটার প্ল্যানে জড়িত।আর এতদিন জারার বিয়ে হয়ে গেছে বলে জারার কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলার চেষ্টা করতো।ও কখনো চাইতো না কোনোভাবে নিয়াজের অনুভূতি গুলো জারা বা ওর হাজবেন্ড জেনে গিয়ে জারার সংসারে অশান্তি হোক।নিয়াজ বরাবর চাইতো জারা ভালো থাকুক।নিয়াজ রাজকে এলোপাতাড়ি মারতে লাগলো।রাজ নিয়াজকে আটকানোর চেষ্টা করে বলল,ভাই তুই দেখি জারা আর তুহিনের মতো কোস্তাকুস্তি শুরু করেছিস।এই জন্যই বলে মানুষের ভালো করতে নেই।নিয়াজ থেমে গিয়ে রাজকে নিয়ে বাসার ভেতরে যায়।


জারা একটা কালো রঙের থ্রিপিস পড়ে সোজা খালার কাছে রান্নাঘরে গেলো।খালা নাস্তার ট্রে জারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজেও পিছু পিছু ড্রইংরুমে আসে।নিয়াজতো সবকিছু বাদ দিয়ে জারাকে দেখে চলেছে।মাথায় ওড়না দিয়ে রাখায় কেমন বউ বউ লাগছে।জারাকে খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে।রাজ বারবার নিয়াজকে খোঁচা দিচ্ছে কিন্তু নিয়াজের দৃষ্টি জারার উপর থেকে সরাতে পারছেনা।রাজ নিয়াজের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আনমনেই বলল,খাইচে এই ছেলে এখনই জারাকে চোখে করে নিয়ে যাচ্ছে বিয়েরপর নাজানি কি করবে।


নিয়াজের বাবা বললেন,আলহামদুলিল্লাহ মেয়ে আমাদের পছন্দ।এখন আপনারা একপা এগোলেই আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারি।মিসেস রেনু জারার থুতনিতে হাত দিয়ে বলেন,এমন মিষ্টি মেয়ে কারো পছন্দ না হয়ে থাকতে পারে?

জারা কিছু বুঝতে না পেরে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে।কারো কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে এবার জিজ্ঞেস করেই ফেললো,কিসের পছন্দের কথা বলছেন আপনারা?

নিয়াজের বাবা মুচকি হেসে বললেন,সেটা নিয়াজের কাছ থেকেই জেনে নিও।তারপর রাজিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,ওদের একটু আলাদা কথা বলার সুযোগ দিলে ভালো হয়।

অবশ্যই বলে রাজিয়া বেগম জারাকে বলল,যা নিয়াজকে তোর ঘরে নিয়ে যা।রাজিয়া বেগম এই কথা বলার দেরি নিয়াজের সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতে দেরি হয়না।জারা আগাগোড়া কিছু না বুঝেই নিয়াজের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে হাটা ধরলো।নিয়াজ জারার পিছু পিছু ওর ঘরে গেলো।

জারা টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দুহাত বুকের সাথে ভাঁজ করে বলল,এখানে কি হচ্ছে স্যার?আমিতো কিছুই বুঝতে পারছিনা।নিয়াজ জারার দিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই জারা হকচকিয়ে যায়।স্যার আপনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে এগিয়ে আসছেন কেনো?নিয়াজ পা চালানো থামিয়ে দিয়ে ভাবলেশহীনভাবে বলল,তেমার আর আমার বিয়ের কথা চলছে।

ওহ আচ্ছা!কথাটা বোধগম্য হতেই জারা চোখ বড় করে চিৎকার করে বলে উঠে কিহ?

নিয়াজ মিটিমিটি হেসে চলেছে জারার রিয়াকশন দেখে।জারা হন্তদন্ত হয়ে বলে,কিন্তু আপনি কিছু বলেন নি?

নিয়াজ ভাবলেশহীনভাবে বলল,আমারতো রমনী পছন্দ হয়েছে তাহলে আমি কি বলবো?আমার বলা উচিত ছিলো আমি এখনই বিয়ে করবো।


নিয়াজের একের পর এক ব্যবহারে জারা অবাক হচ্ছে।অফিসের সবার কাছে শুনেছে এমনকি এই দুদিনে জারা নিজেও দেখেছে নিয়াজ কেমন গম্ভীর স্বভাবের মানুষ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মানুষটা আস্ত একটা ঠোঁট কাঁটা স্বভাবের।

স্যার আপনি এসব কি বলছেন?

নিয়াজ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,বিয়ে করা প্রয়োজন সেটাই বলছি আরকি।

এবার জারার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।নাকমুখ কুচকে বলল,ছিঃ বেহায়া মানুষ।

নিয়াজ জারার দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর কপালে নিজের ওষ্ঠদয়ের উষ্ণ ছোঁয়া দিয়ে মুচকি হেসে বলল,তোমার কাছে হাজারবার বেহায়া হতেও রাজি আছি।

নিয়াজের ছোঁয়া পেয়ে জারা কেঁপে উঠে।শিরদাঁড়া বেয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়।নিয়াজ যে এই মুহুর্তে এরকম একটা কাজ করবে সেটা জারার কল্পনাতীত ছিলো।জারার অবস্থা দেখে নিয়াজ হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।একটু ছোঁয়াতেই মেয়েটা জমে গেছে।


নিয়াজকে বেরিয়ে আসতে দেখে নিয়াজের মা বললেন,আজ তাহলে আসি।আপনারা আপনাদের মতামত জানিয়ে দিলে ভালো হয়।রাজিয়া বেগম হাসিমুখে বললেন,জারার বাবা মায়ের সাথে কথা বলেই আমরা আপনাদেরকে জানাবো।

জারা আর ঘর থেকেই বের হয়নি।ও শুধু হিসাব মিলিয়ে যাচ্ছে নিয়াজের ব্যবহার গুলোর এত পরিবর্তন কিভাবে?সবার সামনে একরকম আর সবার আড়ালে আস্ত একটা লুইচ্ছার ড্রাম।


সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ তাসিনের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।উনাদের পরিচিত এলাকার ডাক্তার আনলে উনি চেকআপ করে বললেন,ভাইয়ের কত সমস্যা।উনাকে ডাক্তার না করে দিয়েছে চা খেতে।চা টা একটু কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন।ডাক্তার চলে যেতেই রাজিয়া বেগম স্বামীর হাত ধরে ছলছল চোখে বললেন,তুমি শুনলেতো ডাক্তার কি বললো?চা খাওয়াটা বাদ দিয়ে দাও।বুঝতে পারছি তোমার আগের অভ্যাস।ছাড়াতে একটু বেগ পেতে হবে কিন্তু কমিয়েতো দিতে পারো।


তাসিনের বাবা আধো আধো চোখে চেয়ে বললেন,রাজিয়া এক কাপ চা হবে?

মুহূর্তেই রাজিয়া বেগমের অশ্রুভেজা চোখ জোড়া অগ্নিমূর্তির মতো হয়ে যায়।ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে ওঠে,গরম চা এনে তোমার পাছায় ঢালবো।

মায়ের কথা শুনে তুহিন হেসে কুটিকুটি।জারা মুখ চেপে দাঁড়িয়ে আছে।তাসিন ও না পেরে ফিক করে হেসে দেয়।

রাজিয়া বেগম চোখ রাঙিয়ে বললেন,সবগুলা এখান থেকে যা।আর জারা সব নষ্টের গোড়া তুই।তুই যদি আর এই বুড়োকে চা দিয়েছিস তো তোর একদিন আর আমার যা কদিন লাগে।


চলবে……


নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন। 🖤#বর্ষণ_মুখর_দিন

জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা

পর্ব ০৬


রাজিয়া বেগম জারার মায়ের নাম্বারে কল দিলেন।ফোন বেজে উঠতেই জারার মা হাতের কাজ ফেলে আঁচলে হাত মুছে কল রিসিভ করলেন।

প্রথমেই সালাম দিয়ে বোনের সাথে মুছাফাহ করে করে নিলেন রাজিয়া বেগম।কিছুক্ষণ কথা বলার পর রাজিয়া বেগম বললেন মুহিত কোথায় ওকে ডাক তোদের সাথে কথা আছে আমার।

জারার মা গলা উঁচিয়ে জারার বাবাকে ডাক দিলেন।জারার বাবা এসে রাজিয়া বেগমের সাথে কথা বলেন।কেমন আছেন আপা?


উত্তরে রাজিয়া বেগম মুচকি হেসে বললেন,আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।তুমি কেমন আছো?

আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে আমি ও ভালো আছি।

রাজিয়া বেগম আর অন্যদিকে কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বললেন,জারার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।ছেলে জারার অফিসের বস।বিকালেই এসে দেখে গেছেন জারাকে।এখন তোমরা ঢাকায় এসে সবকিছু দেখেশুনে গেলে ভালো হবে।আমার মনে হচ্ছে সমন্ধটি খারাপ হবে না।

মুহিত হাসান লম্বা শ্বাস ফেলে বললেন,আমার কিছু শর্ত আছে।সেগুলো তাদেরকে মানতে হবে।শুধু ছেলের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখলেতো হবে না ছেলেটা কেমন?আমার মেয়ের জন্য উপযুক্ত কিনা সেটাও দেখতে হবে।

রাজিয়া বেগম বললেন,সেই জন্যইতো বলছি তোমরা ঢাকায় এসে সব কিছু দেখে কথা বলে যাও।

মুহিত হাসান রাজিয়া বেগমের কথায় সম্মতি দিলেন।রাজিয়া বেগম বললেন,তোমরা বরং কালকেই ঢাকায় রওনা দিও।


রাতে বারান্দায় বসে নিয়াজ খুশিমনে আকাশ দেখে চলেছে।আজ সত্যি নিজেকে অনেক সুখী মানুষ মনে হচ্ছে।এই সুখটা প্রগাঢ় হবে সেদিন,যেদিন জারাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পাবে।হুট করে নিয়াজের মনে একটা অনুশোচনা জাগে আজ কি করে ফেললাম মেয়েটার অমতে?আমিতো এমন ছিলাম না?আবেগের বশবর্তী হয়ে আমি কিভাবে ওর কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালাম।এটাতো অন্যায়।মুহূর্তেই খুশি হওয়া মনটা খারাপ হয়ে গেলো।

যতক্ষণ না জারার কাছে ব্যাপারটা নিয়ে ক্ষমা চাইবে ততক্ষণ নিয়াজের শান্তি হবেনা।


এই মেদী আমাকে তোর নোট খাতাটা দিস তো?

ছেলেটা কোমরে হাত দিয়ে করুন চোখে বলল,আমার নাম মাহাদী!অনেকে ভুল করে মেহেদী ডাকে তুইতো সেটারো বারোটা বাজিয়ে দিলি।

জারা কপাল চুলকে বলল,যাহাই মাহাদী তাহাই মেদী।এখন তুই আমাকে নোট খাতা দে।বাসায় যেতে হবে।

মাহাদী বলল,আজকে তো আমি নোট আনি নি।কালকে নিয়ে নিস আমি আসার সময় মনে করে নিয়ে আসবো।কালকে হলেতো সামিয়ার কাছ থেকেই নিতে পারবো।

মাহাদী কিছু একটা ভেবে বলল,আচ্ছা আমি বিকালে তুহিনের কাছে দিয়ে দেবো।

ঠিক আছে বলে জারা বাড়ির পথে রওনা হয়।


দুপুরে খেয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ে জারা।আজকে কি করে নিয়াজ স্যারের মুখোমুখি হবে সেটা ভেবেই কেমন অস্বস্তি লাগছে।আজকে আর দেরি করলোনা তাড়াতাড়ি রিকশা ডেকে উঠে পড়লো।এদিক দিয়ে একটা সুবিধা আছে তাসিনদের বাসার কাছেই কতগুলো রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে।তাই যখন-তখন রিকশা পাওয়া যায়।কিন্তু অফিস থেকে ফেরার পথে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা লাগে।ভাড়া মিটিয়ে অফিসের ভেতর চলে গেলো জারা।সারাদিন তেমন কারো সাথে কথা বলেনি।রহিম এসে জানালো জারাকে নিয়াজ ডাকছে।হাতের কাজটা সম্পূর্ণ করে জারা নিয়াজের কক্ষে গিয়ে নক করে।নিয়াজের অনুমতি পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই নিয়াজ জারাকে একটা প্রজেক্ট কমপ্লিট করার দায়িত্ব দিলো।

নিয়াজ খেয়াল করেছে জারা পুরোটা সময় নিচের দিকে দৃষ্টি নত রেখেছে।একবারের জন্যে ও নিয়াজের দিকে তাকায়নি।হয়তো গতকালের নিয়াজের করা কাজের জন্য অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

নিয়াজের নিজেরই এখন গিল্টি ফিল হচ্ছে।

জারা চুপচাপ নিজের কেবিনে গিয়ে বসলো।

রিহা এসে জারাকে বলল,কাল আমার জন্মদিন।গ্রীনল্যান্ড রেস্টুরেন্টে পার্টি রেখেছি।কাল অফিস শেষে তুমি চলে আসবে।আর হ্যাঁ সবাইকে বলে দিয়েছি শাড়ি পড়ে আসতে।আমি নিজেও শাড়ি পড়বো।জারা মুচকি হেসে বলল,চেষ্টা করবো পার্টিতে উপস্থিত থাকার।

রিহা রাগ দেখিয়ে বলল,আমি কোনো কথা শুনতে চাইনা তুমি আসবে মানে আসবে।

জারা হেসে দিয়ে বলল,ঠিক আছে আসবো।রিহা মেয়েটা মিশুক।অল্পতেই যে কারো মনে জায়গা করে নিতে জানে মেয়েটা।


অফিস শেষে জারা রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।রিকশা পেয়ে উঠে বসতেই নিয়াজ হুড়মুড়িয়ে জারার পাশে এসে বসলো।জারা প্রথমে চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে রিকশা থেকে নামতে উদ্যত হতেই নিয়াজ জারার হাত চেপে ধরে।হাতের দিকে দৃষ্টিপাত করে নিয়াজের দিকে তাকাতেই নিয়াজ সামনে তাকিয়ে রিকশাওয়ালাকে বলল আপনি রিকশা চালিয়ে যান।জারা হাত মোচড়ামুচড়ি করে বলল,আমার হাতটা ছাড়ুন।

নিয়াজ জারার হাত ছেড়ে দিয়ে সামনে তাকিয়ে বলে সরি!


জারা কৌতুহল দৃষ্টিতে নিয়াজের দিকে তাকাতেই নিয়াজ দৃষ্টি সামনে আবদ্ধ রেখেই বলল,কালকের ব্যাপারটার জন্য সরি!আসলে আমার উচিত হয়নি তোমাকে ওভাবে স্পর্শ করা।

জারা কিছু না বলে নিয়াজের থেকে আরেকটু সরে বসে।নিয়াজ খপ করে জারার হাত চেপে ধরে ক্ষীণস্বরে বলল,পড়ে যাবে।আমিই নেমে যাচ্ছি।রিকশা থামিয়ে নিয়াজ নেমে পড়তেই জারা লম্বা লম্বা শ্বাস নিতে থাকলো।আরো কিছুক্ষণ এভাবে নিয়াজের এতটা কাছে বসে থাকলে মনে হয় জারা শ্বাস আটকে মরেই যেতো।একবার রিকশার পেছনে তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে হলো।নিজের ইচ্ছেটাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলন্ত রিকশায় থেকে একবার পেছনে তাকালো।নিয়াজ রিকশার দিকেই তাকিয়ে ছিলো।জারাকে পেছনে তাকাতে দেখে ঠোঁট প্রশ্বস্ত করে হাসে।

বাসায় ফিরে সোফায় বাবা মাকে বসে থাকতে দেখে জারা নিজের দেখার ভুল ভেবে চলে যেতে নেয়।কি মনে করে আরেকবার সোফার দিকে তাকিয়ে চোখ কছলে আবার তাকায়।সত্যিইতো বাবা আর মাকে দেখছে।

জারার মা বাবা মেয়ের পাগলামি দেখে মিটিমিটি হাসছেন।জারা দৌঁড়ে গিয়ে বাবা মা দুজনকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে।রাজিয়া বেগম সামনে চায়ের ট্রে রেখে বলেন,তোকে সারপ্রাইজ দেবে বলে আমাকে জানাতে বারণ করেছে।


জারা মুখ ফুলিয়ে বলল,তোমাদের সাথে কথা নেই।

মুহিত হাসান হেসে দিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,সত্যিই কথা বলবেনা?জারা মাথা নেড়ে না জানাতেই জারার মা বললেন,তাহলে আমরা চলে যাচ্ছি।

জারা বলল এত ঢং করতে হবেনা।হঠাৎ আমাকে না জানিয়ে এসেছো কেনো?তোমরা আসবে সেটা কি আমাকে জানানো যেতো না?


মুহিত হাসান বললেন,তেমাকে চমকে দেওয়ার জন্যই বলা হয়নি আমরা আসবো।আচ্ছা পরে কথা হবে।অফিস থেকে এসেছো যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসো।জারা সোফা ছেড়ে নিজের ঘরে চলে আসে।ব্যাগ রাখতে গিয়ে টেবিলের উপর নোট খাতাটার উপর নজর পড়ে।নিশ্চয়ই তুহিন এখানে এনে রেখেছে।

রাতের খাবার খাওয়ার সময় কথায় কথায় জারা জানতে পারে ওর বাবা মা নিয়াজের ফ্যামিলির সাথে কথা বলতেই এখানে এসেছে।চুপচাপ খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে আসে।


নিয়াজের হঠাৎ ইচ্ছে জাগলো জারার কন্ঠস্বর শোনার।ফোনে নাম্বার তুলে ডায়াল করলো জারার নাম্বারে।একবার বাজতেই জারা রিসিভ করে সালাম দেয়।নিয়াজ চুপ করে জারার কন্ঠের মাদকতা অনুভব করছে।


কে বলছেন?হ্যালো!হ্যালো!

ওপাশ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে জারা বিরক্ত হলো।বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল,কি আশ্চর্য!কল দিয়ে কথা বলছেন না এটা কোন ধরনের ভদ্রতা?

এখনো কোনো সাড়া না পেয়ে জারা লাইন কেটে দেয়।লাইন কেটে গিয়েছে বুঝতে পেরে নিয়াজ ফোনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।অন্তত কন্ঠটাতো শুনতে পেরেছে এতেই শান্তি।


সকাল সকাল বেশ পরিপাটি হয়ে রোহান রুম থেকে বের হতে নিলেই তানিশা প্রশ্ন করলো কোথায় যাচ্ছেন?

তানিশার প্রশ্নে পেছন ঘুরে কোনো ভনিতা ছাড়াই রোহান জবাব দিলো ঢাকায় যাচ্ছি।

তানিশা ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো,ঢাকায় কেনো যাচ্ছেন?কোনো কাজ পড়লো নাকি?

সবচেয়ে বড় কাজ সামলাতে ঢাকায় যাচ্ছি।

মানে?


জারা আমাকে ভুল বুঝে আছে।ওকে মানিয়ে নিয়ে আসার জন্য যাচ্ছি।

তানিশা চমকে উঠে বলল,এসব কি বলছেন আপনি?তাছাড়া জারা কখনো আপনার কাছে ফিরবেনা।

রোহান রেগে গিয়ে বলল,সব সমস্যার মূল তুই।তোর কারণে এত কিছু হচ্ছে।আমি জারাকে ঠিক মানিয়ে নিয়ে আসবো।সেখান থেকে ফিরে তোকে এই বাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে দেবো।


না আপনি যাবেন না বলে তানিশা রোহানের পথ আটকে দাঁড়ায়।

রোহান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,এখন এই অবস্থায় আমি তোর গায়ে হাত তুলতে চাইনা।সামনে থেকে সরে দাঁড়া।

তানিশা ত্যাড়ামি করে বলল,নাহ আমি সরবোনা।রোহান তানিশার হাতের কব্জি চেপে ধরে নিজের সামনে থেকে সরিয়ে বেরিয়ে যায়।

রাগে তানিশা টেবিলের উপর থেকে গ্লাস তুলে নিয়ে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলে।


জারা আজ আর ভার্সিটিতে গেলোনা।তুহিন সকালেই বেরিয়ে গেছে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে।জারা মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।ওর মা জারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।এদিকে নিয়াজের বাবা মাকে খবর দেওয়া হয়েছে যেন জারার খালার বাসায় আসেন।


চলবে……..


নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন।🖤#বর্ষণ_মুখর_দিন

জিন্নাত চৌধুরী হাবিবা

পর্ব ০৭


নিয়াজের বাবা মা নিয়াজকে সাথে নিয়েই জারার খালার বাসায় আসেন।জারার বাবা মায়ের নিয়াজকে বেশ মনে ধরেছে।তাই কথা এগোনোর জন্য জারার বাবা গলা ঝেড়ে বললেন,আল্লাহর রহমত থাকলে বিয়েটা হবে কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে।

নিয়াজের বাবা হালকা হেসে বললেন,জ্বি আপনি বলুন।

নিয়াজের বাবার কাছ থেকে সম্মতি পেয়ে জারার বাবা বললেন,আমার মেয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চায়।এখন বিয়ের পর যদি আপনারা বলেন যে বাড়ির বউ পড়ালেখা করতে পারবেনা তাহলে দুঃখিত আমরা এগোতে পারছিনা।


নিয়াজ ঝটপট উত্তর দিলো,জারা পড়ালেখা করবে এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।ও চাকরিটাও চালিয়ে যেতে পারে।নিয়াজের বাবা ও জারার বাবাকে আস্বস্ত করলেন।জারার বাবা সন্তুষ্ট হলেন।ক্ষীণ হেসে মিষ্টির প্লেট থেকে একটা মিষ্টি তুলে নিয়াজের বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,মিষ্টি মুখ করে নিন।

নিয়াজের বাবা একটু মিষ্টি মুখে নিয়ে জারার বাবাকেও খাইয়ে দিলেন।

অবশেষে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হলো।কায়া আর জারার একই দিনে বিয়ে হবে।জারা পর্দার আড়াল থেকে সবকিছুই দেখছে।নিয়াজের সাথে চোখাচোখি হতেই জারা লুকিয়ে পড়ে।নিয়াজ মুচকি মুচকি হাসছে।নিয়াজের মা পার্স থেকে একটা রিং বক্স বের করে জারার মা কে বললেন জারাকে ডেকে আনতে।জারার মা উঠে গিয়ে জারাকে নিয়ে আসলেন।জারা মাথায় ওড়না দিয়ে আড়চোখে একবার সবাইকে দেখে নিয়েছে।জারাকে নিয়াজের পাশে বসিয়ে দিলেন।জারার হৃদ স্পন্দন থেমে আসছে।মিসেস রেনু বক্স থেকে রিং নিয়ে নিয়াজের দিকে বাড়িয়ে দিলেন জারাকে পড়িয়ে দেওয়ার জন্য।আসার সময় রিংটা নিয়ে এসেছেন যদি বিয়ের কথা পাকা হয়ে যায় তাহলে জারাকে রিং পড়িয়ে যাবেন।নিয়াজ রিং নিয়ে জারার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো কিন্তু জারা নিজের হাত এগিয়ে দিচ্ছেনা।থম মেরে বসে রইলো।জারার বাবা বললেন,হাতটা এগিয়ে দাও মা।জারার কেমন কান্না পাচ্ছে হাতটা এগিয়ে দিতে।মনে হচ্ছে রিংটা পড়ালেই জারা বাবা মায়ের থেকে অনেক দূরে সরে যাবে।যদিও চার বছর ধরেই বাবা মায়ের কাছ থেকে দূরে আছে তবু এখন মনে হচ্ছে আরো দূরে সরে যাবে।


চোখে পানি চিকচিক করছে।জারার মা উঠে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন হাতটা এগিয়ে দে মা।কাঁপাকাঁপা হাতটা নিয়াজের দিকে বাড়িয়ে দিলো।জারার কম্পমান হাতের দিকে তাকিয়ে নিয়াজ নিশঃব্দে হাসে।নিজের বাম হাত দিয়ে জারার হাত স্পর্শ করতেই জারার কাঁপা-কাঁপি আরো বেড়ে যায়।শরীর ক্রমেই ঠান্ডা হয়ে আসছে।গতকাল ও ক্ষণিকের জন্য নিয়াজ জারার হাত ধরেছিল।কিন্তু এখন অস্বস্তি হচ্ছে বেশি।কালকে হাত ধরার সময় কেউ না থাকলেও আজ সামনে বাবা মা,খালা,খালু সবাই উপস্থিত।নিয়াজ দেরি না করেই রিংটা জারার হাতে পড়িয়ে দিয়ে দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়।

নিয়াজ হাত সরাতেই জারা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে।মিসেস রেনু জারার গালে হাত রেখে ক্ষীণস্বরে উচ্চারণ করলেন,আমার বউমা!

কথাটা কর্ণগোচর হতেই জারা দৃষ্টি চারদিকে ঘুরাতে থাকে।বউমা কথাটা শুনতে কেমন জানি লাগছে।


নিয়াজরা চলে গেছে অনেক আগেই।জারা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হাতের রিংটা দেখছে।আজ থেকে সে কারো বাগদত্তা।কথাটা ভাবতেই মনের মাঝে একটা ঢেউ খেলে গেলো।রিংটা খুলে রাখতে গিয়ে ও খুললোনা।হাতেই রেখে দিলো।তুহিন জারার রুমে এসেই বলল,তোর নাকি আজ এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে?কই দেখি রিংটা দেখা আমাকে।জারা হাত এগিয়ে তুহিনের সামনে ধরতেই তুহিন জারার হাত উল্টে পাল্টে দেখে বলল,রিং এর গড়ন সুন্দর।এই রিং আমাকে দিয়ে দিস ভবিষ্যতে আমি আমার বউকে দেবো।

জারা তুহিনের বাহুতে একটা চাপড় মেরে বলল,নিজের টাকায় বউকে গিফট করিস।অন্যের জিনিস নিয়া টানাটানি করিস না।আর তুই কয়জনকে বিয়ে করবি তোরতো গার্লফ্রেন্ড এর অভাব নাই।

তুহিন মুখ বাঁকিয়ে বলল,এদের একজনকেও বিয়ে করবোনা।সবাই আমার গার্লফ্রেন্ড আছে জেনেও প্রপোজ করলে রাজি হয়ে যায়।তাই আমি ও সময় কাটানোর জন্য এদের সাথে কথা বলি।


একটা লাল রঙের শাড়ি পড়ে সাথে হিজাব লাগিয়ে অফিসের জন্য তৈরি হয়ে নিয়েছে জারা।চোখে গাঢ় কাজল,ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে বারবার আয়নায় নিজেকে দেখছে।নিজেই নিজের গাল টেনে দিয়ে বলল আউ!আমি কি কিউট!শাড়ি পড়লে আমার নিজেই নিজেকে তুলে নিয়ে যেতে ইচ্ছা করে।গালে হাত দিয়ে ভাবনার ভঙ্গিতে বলল,আচ্ছা লোকে যদি শুনে শাড়ি পড়ে নিজেই নিজের প্রশংসা করছি তাহলে কি আমায় পাগল ভাব্বে?যেটাই ভাবুক তাতে আমার কি?

জারা অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।

অফিসে এসে জারা খেয়াল করলো শুধু সে নয় আরো অনেকেই পার্টির জন্য রেডি হয়ে এসেছে।রিহা আজ আর অফিসে আসবে না।রাফি আর আরেকজন কলিগ মিলে জারার গায়ে একটা প্লাস্টিকের সাপ ছুড়ে মারে।জারা কিছুক্ষণ সাপটার দিকে তাকিয়ে থেকে জোরে একটা চিৎকার দিয়ে রাফির দিকে তাকিয়ে বলল,হয়েছে?


রাফি আর সাথের কলিগ একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।জারা ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,তোমরাতো এটাই চাইছিলে আমি যেন ভয় পেয়ে চিৎকার করি তাই চিৎকার দিলাম।

রাফি চোখ কিঞ্চিৎ বড় করে বলল,তুমি ভয় পাওনি দেখে আমরাতো পুরাই অবাক!

জারা ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,তোমরা যখন প্ল্যান করছিলে আমাকে ভয় দেখাবে তখনই আমি শুনে ফেলেছি।আগাম ধারণা না থাকলে কিন্তু সত্যিই ভয় পেতাম।রাফি ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,মিস এশা আসুক তাকে ভয় দেখাবো।তবে তোমাকে আজ পুরাই জোস লাগতেছে।শাড়িতে বেশ মানিয়েছে।

জারা মনে মনে বলল,শাড়ি পড়লে আমার নিজেরই মাথা ঠিক থাকেনা।কিন্তু হাসি মুখে বলল,ধন্যবাদ!তোমাদের দুজনকেও সুন্দর লাগছে।


সবার দৃষ্টি অফিসের দরজার দিকে দেখে জারাও সবার দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকালো।এশা শাড়ী পড়ে হেলেদুলে আসছে।সবার এরকম দৃষ্টির মানে দুইটা।প্রথমত এশাকে কোনোদিন শাড়ি পড়তে দেখা যায় নি দ্বিতীয়ত এমন ভাবে শাড়ির আঁচল টেনেছে একটু বাঁকা হলেই মনে হচ্ছে আচলটা পড়ে যাবে শরীর থেকে।এশার হাটার মাঝেই রাফি প্লাস্টিকের সাপটা এশার গায়ে ছুড়ে মারে।এশা চিৎকার করে লাফিয়ে সরতে গিয়ে ডেস্কের সাথে বাড়ি লাগে।সবাই মুখ টিপে হাসছে জারা হো হো করে হেসে উঠলো।


এশা যখন দেখলো সাপটা প্লাস্টিকের তখন রাফিকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিয়ে জারার দিকে এগিয়ে আসে।জারা হাসি থামিয়ে ঠিক করে বসে।এশা মুখ কুচকে বললো,তুমি এভাবে হাসছো কেন?নিজের সাথে এমন হলে বুঝতে।আঙ্গুল দিয়ে কপালের চুলগুলো সরিয়ে বলল,এনিওয়ে তোমার নাকি নিয়াজ স্যারের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে?এতো ভাব নিও না নিয়াজ স্যারের চেয়েও আমার নিউ বফ আরো হ্যান্ডসাম।

জারা মুচকি হেসে দাঁতে দাঁত পিষে বলল,আমি যদি ভাব নেওয়া শুরু করি তাহলে তোমার সব ভাব হাওয়া হয়ে যাবে।লম্বা একটা হাই তুলে বলল,আমার এখন প্রচুর কাজ নিজেও কাজ করো আমাকেও কাজ করতে দাও।

এশা রাগে ফুঁসতেছে।বেশ জোরেই বলে উঠলো তোমার চেয়েও আমি বেশি সুন্দরী।সবাই জারা আর এশার দিকে তাকালো।জারা কিছু না বলে ঠোঁট টিপে হাসলো।মুখে হাসি রেখেই কাজে মন দিলো।এশা নিজের কেবিনে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো।জারার এশার সাথে কোনো শত্রুতা নেই কিন্তু মেয়েটার সেদিনের কথাটা জারার খুব গায়ে লেগেছে।


“এতগুলো দিন এখানে আছি নিয়াজ স্যারের পাশে ঘেষতে পারলাম না।আর তুমি কিনা আসতে না আসতেই একেবারে বুকের কাছে চলে গেলে।এই তোমার ট্রিকসটা আমাকেও একটু শিখিয়ে দিও।”

কথাটা শুনে বেশ খারাপ লাগলো জারার।সেই জন্যই এশার সাথে এরকম করলো।

নিয়াজ অফিসে এসে নিজের কেবিনে যাওয়ার আগে একপলক জারার কেবিনে তাকালো।জারার দিকে তাকাতেই নিয়াজের দৃষ্টি ওখানেই থেমে গেলো।তৃষ্ণার্ত চোখদুটো আজীবন ধরে এই মেয়েটাকেই দেখে যেতে চায়।অপরূপা লাগছে জারাকে লাল শাড়িতে।জারা সামনে তাকিয়ে নিয়াজকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দৃষ্টি নামিয়ে নেয়।চোখাচোখি হওয়াতে নিয়াজও নিজের দৃষ্টি সরিয়ে কেবিনে চলে যায়।


নিজের কেবিনে যাওয়ার আধা ঘন্টা না যেতেই নিয়াজের কেবিনে জারার ডাক পড়লো।যারা নিয়াজের আন্ডারে কাজ করে প্রতিদিন একবার হলেও নিয়াজের কেবিনে তাদের যাওয়া হয়।তাই জারার আসা যাওয়া নিয়েও কারো তেমন মাথা ব্যথা নেই।জারা দরজায় নক করতেই নিয়াজ কিছু কাজ দিয়ে জারাকে নিজের কেবিনে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলো।

জারা আড়ষ্টতা নিয়ে বলল,স্যার আমি আমার কেবিনে চলে যাই।

নিয়াজ শক্ত কন্ঠে জবাব দিলো,কাজটা নিখুতভাবে করতে হবে।কোনো সমস্যায় পড়লে আমাকে দেখাবে সেজন্যই এখানে বসিয়েছি।

জারা কিছু বলতে গেলেই নিয়াজ হাত উঁচিয়ে জারাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,নো মোর টক!


জারা আর কোনো কথা না বলে মাথানিচু করে কাজে মন দেয়।নিয়াজ কাজ করছে কম জারাকে দেখছে বেশি।জারাকে এখানে কাজের উদ্দেশ্য নয় মন ভরে দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে।নিয়াজ চায়না সে ছাড়া অন্যকেউ জারাকে শাড়ীতে দেখে মোহিত হোক।

অফিস শেষে সবাই গ্রীনল্যান্ড রেস্টুরেন্টে চলে গেছে।জারা হেঁটে যাচ্ছিলো।রেস্টুরেন্ট কাছেই অফিস থেকে পাঁচমিনিটের পথ হবে।পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকালো।নিয়াজ সামনে তাকিয়ে জারার পাশাপাশি হেঁটে চলেছে।কারো মুখে কোনো কথা নেই।নিয়াজ নিশ্চুপ থেকে পাশে ভালোবাসার মানুষটিকে অনুভব করে চলেছে।জারা একরাশ অস্বস্তির কারনে চুপ করে হেটে চলেছে।রেস্টুরেন্টের কাছাকাছি আসতেই নিয়াজ শব্দ করে বলে ওঠে,”মাশাল্লাহ”।

চকিতেই নিয়াজের দিকে চমকে তাকায় জারা।নিয়াজের দৃষ্টি জারার দিকে।অপলক সেই চাহনি।জারা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে নিয়াজের থেকে আরেকটু দূরত্ব বজায় রেখে হাটে।


রিহা জারার দিকে এগিয়ে এসে বলে,আমি অনেক খুশি হয়েছি তুমি আমার বার্থডেতে এসেছো।জারা মিষ্টি হেয়ে বলল,শুভ জন্মদিন রিহুপাখি!নিজের ব্যাগ থেকে একটা ব্রেসলেট বের করে রিহার হাতে পরিয়ে দিয়ে বলে,আমার তরফ থেকে সামান্য উপহার।রিহার ব্রেসলেট অনেক পছন্দের।একদিন হাতে এক ডিজাইনের ব্রেসলেট পড়ে অফিসে আসতো তাই জারা কি কিনবে ভেবে না পেয়ে শেষে ব্রেসলেট কিনে নিলো অফিসে আসার পথেই।রিহা ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে খুশিতে আপ্লুত হয়ে বলল,ওয়াও ব্রেসলেটটা আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।তোমাকে অনেকগুলো থাঙ্কু🥰।


পার্টির এক পর্যায়ে রিহা জারাকে বলল,আমার বার্থডেতে তুমি একটা গান শোনাবা।সবাই রিহার সাথে একমত হয়ে সমস্বরে বলে ওঠে জারা প্লিজ একটা গান।

জারা মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ গলার রগ গুলো বেরিয়ে আছে।এই মুহূর্তের একটা ছবি তুলে নিলো নিয়াজ।

জারা হাসি থামানোর চেষ্টা করে বলল,আমি গানের গ পারিনা।তোমরা আমাকে গান গাইতে বলছো দেখে প্রচুর হাসি পাচ্ছে।সবাই কয়েকবার বলার পরেও যখন জারা বলল,ও গান পারেনা তখন রিহা সবাইকে আর বেশি জোর করতে না করলো।এশা রিহার কাঁধে হাত রেখে বলল,আমি তোমাকে গান শোনাবো।সবার দৃষ্টি এশার দিকে।খুব সুন্দর করেই গান গাইলো।সবাই এশার কন্ঠের অনেক প্রশংসা করলো।এশা জারার দিকে তাকিয়ে ভাব নিয়ে সামনের চুলগুলো পেছনের দিকে হাত দিয়ে ছুড়ে দেয়।জারাকে বুঝিয়ে দেয় এশার সাথে টক্কর নেওয়া অতো সোজা না।জারা কিছু না বলেই মুচকি হাসে।সবার সব প্রতিভা থাকেনা।

পার্টি শেষ হওয়ার পর জারা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে।নিয়াজ গাড়ি নিয়ে এসে জারার সামনে দাঁড়ায়।অনেক্ষণ যাবত নিয়াজকে দেখেনি জারা।মনেহয় গাড়ি আনতেই গিয়েছিলো।নিয়াজ গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে জারার উদ্দেশ্য বলল,গাড়িতে উঠো।

জারা কিছু না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।নিয়াজ গাড়ি থেকে নেমে জারার দিকে এগোতে নিলেই সামনে একটা বাইক এসে থামে।

তুহিন জারাকে বলে তাড়াতাড়ি উঠে আয়।ভাইয়া আবার বাইক নিয়ে বেরোবে।জারা গিয়ে তুহিনের পেছনে বসে পড়ে।পার্টি শেষ হতে হতে রাত হয়ে যাবে।এই সময় বাসায় একা যাওয়া সেফ না তাই জারা তুহিনকে আগেই বলে রেখেছে ওকে নিতে আসতে।

নিয়াজ মুখটা পাংশুটে করে মনে মনে বলল,এই ছেলে আসার আর সময় পেলোনা।আরো আধাঘন্টা পরে আসতো তাহলে আমি জারাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতে পারতাম।

তুহিন নিয়াজের পাংশুটে মুখ দেখে জারার আড়ালে নিয়াজকে একটা চোখ টিপ দিয়ে বাইক স্টার্ট করে।

নিয়াজের মেজাজ গরম হয়ে গেলো।ছেলেটা সব বুঝতে পেরেও জারাকে নিয়ে যাচ্ছে।স্টুপিড ছেলে!


চলবে……


নতুন পর্ব পড়তে লাইক কমেন্ট ফলো দিয়ে সাথে থাকুন। 🖤

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url