#খোঁপার_ওই_গোলাপকাঁটা

#২য়_পর্ব


[কপি করা নিষিদ্ধ❌]


টগবগে গরম পানি পড়ায় আমার পায়ের পাতা এবং আঙ্গুলের চামড়া ঝলসে গেছে। ফোস্কা পরেছে অল্প। ক্ষত খুব গভীর না। সাহেবের বুদ্ধিমত্তার জন্য মারাত্মক ক্ষতি হয় নি। তবে কেমন লাল লাল মাংস দেখা যাচ্ছে আঙ্গুলের কাছে। বিভৎস সেই দৃশ্য। ব্যথায়, জ্বলনে আমার আত্মা কেঁপে যাচ্ছে। আমার পুড়ে যাওয়া অংশটি খুব বেশি না। পায়ের আঙ্গুল এবং পাতার মধ্যখানি পর্যন্ত৷ অথচ তাতেই কি অসহনীয় ব্যথা! আর যারা কি না দূর্ঘটনায় পুড়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়, না জানি তাদের কতটা কষ্ট হয়। মনে মনে দোয়া করলাম, 

"আল্লাহ এমন নিষ্ঠুর মৃত্যু দিও না।"


আমার ড্রেসিং শেষে সাহেব আমার হাতটা ছাড়ালেন৷ তার মুখে আমার জন্য বিন্দুমাত্র সহানুভূতির ছাপ আমি দেখলাম না। তিনি গম্ভীর স্বরে আমাকে বললেন,

"ডাক্তারের সাথে কথা বলতে যাচ্ছি।"


সাহেব বেরিয়ে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। একটিবার তিনি আমাকে শুধালেন না কেমন আছি! আমি ব্যথা পাচ্ছি নাকি আমার কষ্ট হচ্ছে তা নিয়ে যেন তার মাথাব্যথা নেই। একটিবারো কাঁধে হাত রেখে বললেন না,

 "ভয় পেও না। ক্ষত গভীর না। ঠিক হয়ে যাবে।"


আমি তীব্র আকুলতার সাথে অপেক্ষা করছিলাম যেন। কিন্তু অপেক্ষার পরিণতি কখনোই ভালো হয় না। আমার সাহেব তার গাম্ভীর্য অটুট রাখলেন। কপালে তীব্র ভাঁজ তার অক্ষত রইলো। বেরিয়েই যাচ্ছিলেন ঠিক তখন পেছনে ঘুরে ইমার্জেন্সির নার্সের উদ্দেশ্যে কড়া স্বরে বললেন,

"খেয়াল রাখেন। ব্যথা পাচ্ছে তো, পারলে ব্যাথা উপশমের কিছু দিন।"


আমি তার দিকে বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলাম। ওই মুহূর্তে আমার ব্যথাটা যেন অনেকটা কমে গেলো। রাগী, কঠিন, শক্ত মুখটার পেছনের মানুষটার বোধ করি আমার জন্য সামান্য মায়া আছে। দ্বিমুখী মানুষটা বুঝি আমার কথা ভাবে!


*****


হাসপাতালে সে রাতটা আমরা ভর্তি ছিলাম। পুড়াস্থান ঠিক কতটা গভীর সেটা বোঝার জন্য। বাসায় নেওয়া সম্ভব কিনা সেরাতে ডাক্তার বুঝছিলেন না। সাহেব বাড়িতে জানিয়ে দিলেন আমরা হাসপাতালে আছি। আমাকে ব্যথার ঔষধ দেওয়া হলো। ফলে জ্বলনটা কিছুটা হলেও কমলো। ভর্তি হবার কিছুক্ষণ পর আমার জন্য খাবার এলো। হাসপাতালের বিস্বাদ খাবার আমার গলা দিয়ে নামছিলো না। আপনারা ভাববেন না সে আমাকে পত্নীপ্রেমী স্বামীর মতো নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছেন। একেবারেই না। নার্স যখন খাবার দিলেন, তিনি তখন আমার দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বললেন,

"হাত তো পুড়ে নি, নিজের হাতে খাওয়া কি যাবে?"


একেই বিয়ের পর দিন পা পুড়িয়ে হাসপাতালে ভর্তি। এখন যদি নিজের হাতে না খাবার বায়না ধরি তাহলে সাহেবের কুপিত নজরের সম্মুখীন হব বলেই মাথা দু পাশে নাড়িয়ে বললাম,

 "না। কিন্তু!"

"কিন্তু কি?"


তিনি এমন ভাবেই শুধালেন, যেন এখনই ধমকে উঠবেন। তাই হাসপাতালের এই বাজে খাবার যে আমার মুখে রুচবে না আমি বলতে পারলাম না। কথা হারিয়ে গেলো ভয়ে। আমি মাথা দুলিয়ে বললাম, 

 "কিছু না!"


আমার থেকে কিছু না শুনতে পেরে সাহেবের কপালে যেন তীব্র ভাঁজ পড়লো। ভীষণ বিরক্তি প্রকাশ পেলো। চ সূচক শব্দ করে গজগজিয়ে বললো,

 "যতসব!"


বলেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন। হাসপাতালের ছোট্ট রুমটাতে আমি একাই বসে থাকলাম। আমার মন থিতিয়ে গেলো। তীক্ত একটা জ্বালা আমার হৃদয়ের মধ্যিখানে খামচি দিচ্ছিলো। এই জ্বালাটা পায়ের পোড়ার জ্বালা থেকে ঢেরগুণ বেশি। ওই জ্বালাতেই আমার চোখ ঝাপসা বেশি হচ্ছিলো যেন। আমার খেতে ইচ্ছে হলো না। দু চামচ ভাত খেয়েই রেখে দিলাম। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। মা থাকলে নিজের হাতে খাইয়ে দিত। কেন এমন খচ্চরের সাথে বিয়েটা হলো? একটু নরম, ভালো মানুষ কি পাওয়া গেলো না। এই বুড়ো লোক তো কখনোই আমার খোঁপার ফুল হবে না। কাঁটা হয়েই থাকবে আজীবন।আমার চিন্তার মেঘেদের বিচরণের মধ্যেই শব্দ করে দরজা খুললো। আমি চমকে তাকাতেই দেখলাম সাহেব ফিরে এসেছেন। হাতে একটা পুটলি। তিনি প্রথমে হাত ধুলেন। তারপর মেঝেতে বসে পুটলি খুললেন। ভাত, মুরগী ভুনা আর ডাল দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের ওই মরা পাবদা আর নুন-মরিচহীন খাবারের থেকে অনেক বেশি লোভনীয় লাগলো। আমার মতো লোলপড়া দৃষ্টি কি আঁচ করলো সাহেব? তিনি আমার হাসপাতালের প্লেটের খাবার গুলো আয়াকে দিয়ে দিলেন। বললেন,

 "আপনি মাছ খেয়ে নিয়েন। খাওয়া হয় নি কিছু।"


তারপর একটা প্লাস্টিকের প্লেটে আমার জন্য খাবার বেড়ে মেঘমন্দ্র স্বরে বললেন,

 "কৃপা করে খেলে ভালো হয়।"


আবার কৃপা! এই লোক এতো কৃপা চায় কেন? কৃপা চাওয়া লোকের কি দেমাগ! আমার বলতে ইচ্ছে হলো,

"পারবো না কৃপা করতে। হেদিয়ে মরুন যান।"


কিন্তু তিনি যেভাবে তাকান উফ! মনে হয় সিংহ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার শিকারের দিকে তাকিয়ে আছে। এক্ষুনি ঝাপিয়ে কামড়ে দিয়ে প্রাণ নিয়ে ফেলবে। উফ! ভয়ংকর সেই দৃষ্টি। আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় উনার চোখের দিকে তাকালে। তাই আমার সব কথাগুলো মনেই ঘুরপাক খেলো। বলা হলো না কিচ্ছু।


আমি গোগ্রাসে খেলাম। খাবারটা অমৃতের মতো লাগলো যেন আমার কাছে। লজ্জা ভুলে আরেকটু ভাতও চাইলাম সাহেবের কাছে। তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কিছুসময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গভীর, শানিত দৃষ্টি, তবে তাচ্ছিল্যভাবটা ছিলো কি না খাওয়ার তালে খেয়াল করতে পারলাম না। আমি ভাত চাইতেই তিনি নিজের প্লেটের কিছু ভাত আর তরকারি টুকু দিয়ে দিলেন। আমি ইতস্ততবোধ করে তার দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টিতে মিয়ে গেলাম। যেন কিছু বললেই ঠাঁটিয়ে চড় বসাবেন। উনি খেলেন খুব সামান্য। খাওয়ার পর আবার তৃতীয় পুরুষে শুধালেন,

 "খাওয়া শেষ?"


আমার খাওয়া শেষ হলো। বেশি খেয়ে ফেলেছিলাম বোধ হয়। নিঃশ্বাস আঁটকে যাচ্ছিলো। এঁটো হাতটা উঁচিয়ে বললাম,

 "হাত ধুঁবো।"


আমার পায়ে ব্যান্ডেজ। হাটা সম্ভব না। বাথরুমে যাওয়া সম্ভব না। আমার পোড়া সারতে পনেরো থেকে একুশ দিন লাগতে পারে বলে ডাক্তারের ধারণা। তিনি ফোঁশ করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে পানি এনে দিলেন। আমি হাত মুখ ধুলাম। এরপর নার্সকে ডেকে দিলেন। তিনি পা পরীক্ষা করে ঔষধ দিলেন। আমাকে শুইয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু আমার কেবিনটা খুব ছোট। একটা ছোট সোফাই আছে। তিনি কোথায় শুবেন আমার খুব চিন্তা হলো। আমি মিনমিন করে বললাম,

 "আপনি ঘুমাবেন কি করে? মাটিতে বিছানোর চাঁদরও তো নেই।"


তিনি কপালে তীব্র ভাঁজ ফেলে আমার দিকে কিছুসময় চেয়ে রইলেন। কেমন তাচ্ছিল্যভাব। অবহেলিত সেই দৃষ্টি আমার ভালো লাগে না। আমি তার মুখ থেকে চোখ নামাতেই তিনি ভারীক্কি স্বরে বললেন,

 "আমার চিন্তা কারো করা লাগবে না। নিজেকে সামলাতে পারে না, আসছে আমার চিন্তা করতে। যতসব। কৃপা করে ঘুমালে ভালো হয়। যন্ত্রণা!"


তার এমন অবজ্ঞাভরা কাঠখোট্টা কথায় আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেলো। আমি আর একটা কথাও বললাম না। ইচ্ছে হলো না। আর কখনো যদি আমি উনার জন্য চিন্তা করি আমার নাম কানন না। আমার নাম আমি "বান্দরি" রেখে দেব। আপনারা অবশ্য আমাকে "বান্দরি" ডাকতেই পারেন। কারণ এই কাঠখোট্টা, খচ্চর সাহেবের শত রাগের সম্মুখীন হয়েও তার চিন্তা করাটা আমি কখনো থামাতে পারি নি। 


****


আমি বাড়ি এলাম একদিন পর। ডাক্তার বলেছেন পনেরোদিন বেড রেস্ট নিতে হবে। প্রতিদিন দু বেলা ড্রেসিং করতে হবে। সাতদিন পর চেকাপ করাতে হবে। মিষ্টি আপুর মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে ছিলো। আমার হাত ধরে বললেন,

 "আমারই ভুল। তোমাকে দেওয়া উচিত হয় নি। আমি পানিটা ঢেলে দিলে আজ এমন হত না।"

 "না আপু, আমি একটু অসচেতন। আপনার দোষ নেই"


আমার সান্ত্বনাতেও তিনি শান্ত হলেন না। বাড়িতে ফেরার পর শ্বাশুড়িমা সাহেবকে রয়েসয়ে বললেন,

 "আমি ভাবতেছি কি, বউমাকে ওর বাপের বাড়ি পাঠালে কেমন হয়? মিষ্টির তো ক্লাস থাকে। আমার হাড্ডিতে ব্যাথা। উপর নিচ করতে ব্যথা লাগে। তুই অফিস গেলে ওর যত্ন কি করে হবে বল! তাই বলছিলাম যে ওকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেই। বেয়াইকে ফোন করি! কি বলিস মুহাইমিন?"


মায়ের কথা শেষ না হতেই সাহেব চড়া এবং ভীষণ রাগী স্বরে বললেন,

 "ঘরের বউয়ের যত্ন তার বাপের বাড়ি করবে কেন মা? মানুষের কি অভাব আমার বাড়িতে? মিষ্টি এক দুদিন কলেজ বন্ধ করতে পারবে না? আর আমি অফিস যাব তোমাকে কে বলেছে? বিয়ে যখন দিয়েছো, ঘরের বউয়ের যত্নটাও এই বাড়ি-ই করবে।"


সাহেবের ধমকে মায়ের মুখটা পাংশুটে হয়ে গেলো। আমার এত্তো লজ্জা এবং খারাপ লাগলো। মাথা নত হয়ে গেলো। এমন ধমকের কি মানে! মা কি ভুল বলেছে? বাড়ি গেলে কি ভালো হত। মা আমাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিত। ব্যথায় ছটফট করলে আদর করতো। কোলে মাথা রেখে হাত বুলিয়ে দিত। আমার খচ্চর সাহেবের মতো কৃপা কৃপা করতো না। 


****


বাসায় আমার পা পোড়ার খবর যেতেই বাবা-মা ছুটে এলেন। আমি তাদের একমাত্র মেয়ে। বাবার বয়স এখন প্রায় আটান্ন আর মায়ের বয়স বায়ান্ন। বাবা যখন চল্লিশের ঘরে তখন আমি পৃথিবীতে এসেছি। আমার আগে দুবার সন্তান জন্মানোর সময় মা সন্তানহারা হন। একারণে আমি নাকি তাদের যক্ষের ধন। স্বাভাবিকভাবেই আমার আদরের কখনো কমতি ছিলো না। নিজের বাড়িতে আমি রাজকন্যার মতো ছিলাম। যখন আমাকে বাজে ছেলেরা উত্যক্ত করতো বাবার চিন্তার শেষ ছিলো না। তারা ক্ষমতাধর লোকের চামচা। পুলিশের কাছে গেলেও সুবিধা হচ্ছিলো না। মায়ের মনে আতঙ্ক ছিলো যদি কোনোদিন কলেজ যাবার পথে আমার মুখে এসিড ছুড়ে দেয় কেউ! বা তুলে নিয়ে যায়! তাই তিনি আমাকে কলেজ যেতে দিতেন না। আমি বাবা-মাকে দোষ দিতে চাই না। তারা আমাকে যে পরিমাণে ভালোবাসে তা পৃথিবীর কেউ বাসবে না। অন্তত সাহেব তো নাই। এটাই আমার ধারণা ছিলো। তবে চাপা অভিমান কিশোরী বুকের মাঝে একটু হলেও কুন্ডলি পাকিয়েছিলো, যে তারা চাইলে একটা ভালো মানুষের সাথে আমার বিয়েটা দিতে পারতেন। এতো তাড়াহুড়ো করার কি প্রয়োজন ছিলো! 


মা এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি আমার পায়ের ব্যান্ডেজ দেখেন আর আঁচলে মুখ চেপে কাঁদেন। সাহেবের দিকে তাকান বটে কিন্তু বলতে পারেন না,

 "আমার মেয়েকে রান্নাঘরের ধারে যেতে দিবেন না বাপ!"


কারণ বিয়ে হবার পর মায়েরা মেয়ের জীবনে কথা বললে অশান্তি বাঁধে--- এটাই তাকে বুঝিয়েছে সবাই। মা চান না আমার জীবনে অশান্তি বাঁধুক। তবুও একটু রয়ে সয়ে বললেন,

 "মুহাইমিন বাবা, কাননকে আমরা নিয়ে যাই?"


সাহেবের মুখ গম্ভীর। চোয়াল শক্ত। দৃষ্টি শান্ত, শীতল। অভদ্রতা না করেও বেশ কঠিন এবং দৃঢ় স্বরে বললেন,

 "না। ঘরের বউ ঘরে থাকবে। আপনাদের কি আমাদের উপর বিশ্বাস নেই?"


মা বিব্রত হলেন। বাবা তার হাত চেপে তাকে থামিয়ে দিলেন। অতঃপর খুব নরম স্বরে বললেন,

"আসলে বাপ আমার একমাত্র সন্তান। বাবা-মায়ের মত তো বুঝোই। আমার মেয়ের সামান্য জ্বর হলেও আমরা তার পাশে বসে থাকি সারারাত। তোমার শ্বাশুড়ি মা পারলে এখনো তাকে খাইয়ে দেয়। কিছু মনে করো না।"

 "আমি কিছু মনে করছি না। তবে আপনার মেয়ের অযত্ন হবে না। নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি তো মরে যাই নি এখনো।"


শেষ কথাটা খুব দৃঢ়ভাবে বললো যেন। কিচহু একটা ছিলো সেই কথায়। বাবা-মা যেন আশ্বস্ত হলেন। কিন্তু আমার মন ছোটো হয়ে গেলো। আমার খুব বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছিলো। কিন্তু যখনই সাহেবের মুখের দিকে তাকালাম তার হিমদৃষ্টিতে আমার ইচ্ছেগুলো কেমন ছাই হয়ে উড়ে গেলো। কেন যেন মনে হলো এখন আমি যদি বায়না ধরি এই লোক হয়তো আমাকে যেতে দিবে কিন্তু আমি তার মুখ কখনো দেখতে পারবো না। তাই বায়না করতে পারলাম না। মা যাবার সময় খুব ধীরে বললেন,

 "জামাই বাবার অবাধ্য হবি না, কেমন! রাগী মানুষের মন নরম থাকে।"


দাহা মিথ্যে কথা! আমার সাহেবের মন কংক্রিটের মতো শক্ত। নয়তো নিজের থেকে ছোট একটা অসুস্থ মানবীর দিকে কেউ কঠিন, হীম শীতল চোখে তাকাতে পারে? আমি মনে মনে তাচ্ছিল্যভরে হাসলাম। সাহেব আমাকে ভালোবাসবেন এটা অলীক কল্পনা। সেই অলীক কল্পনা পূরণ হবার নয়। 


*** 


আমার সাহেব পনেরো দিনের ছুটি নিলেন। এই পনেরো দিনে তিনি বাড়ি থেকে বের না হবার প্রকল্প নিলেন। তার কাজ আমাকে চোখে চোখে রাখা। এমন না যে সে আমার যত্ন করে উলটে দিচ্ছেন। খাবারটাও আমার নিজ হাতেই খেতে হচ্ছে। বাহানা করার কোনো উপায় নেই। মিষ্টি আপু কলেজে যাওয়ার আগে রান্না করে যান। সেই রান্নাটাই প্লেটে বেড়ে তিনি আমার কাছে নিয়ে আসেন। বিছানার পাশের টেবিলে প্লেট রেখে বলেন,

"কৃপা করে খেলে ভালো হয়!"


অসহ্য একটা কথা! কৃপা একটু আমার উপর করলে আমি বাঁচি। ঔষধটাও হাতে দেন না। একটা পিরিচে করে দেন। পানিটাও সেখানে রাখেন। আমি শুধু নিশ্চুপ তার কান্ডগুলো দেখি আর হাসি। কি ভাগ্য! আমার ফুপু বলেছিলেন, 

"তোর বয়স কম। দেখবি বুড়ো বর বেশি সোহাগ করবে।"


মাথা আর মুন্ডু। সোহাগ তো দূর একটু মায়া করে তাকায়ও না। আমি একটু একটু করে নিশ্চিত হতে থাকলাম এই বিয়েটায় তার মত ছিলো না। অবশ্য এটার কিছু যুক্তিও আমার কাছে আছে। তিনি হয়তো একটা গোছানো সংসারী মেয়ে চেয়েছিলেন। যেহেতু তিনি ঘরের কর্তা, তার একজন কর্ত্রী চাই। আমি হলাম লবাজবা। গরম পানিও ঢালতে পারি না। বিয়ের পর দিন তার কতগুলো টাকার গচ্ছা গেলো। পনেরোদিন অফিস কামাই গেলো। এমন মেয়েকে অপছন্দ করাই কি স্বাভাবিক নয়। কিন্তু তবুও আমার ছোট্ট হৃদয় একটুখানি আদর চাইছিলো যেন। একটু কোমল চোখে তাকাবে, একটু মিষ্টি করে বলবে,

 "বউ, তুমি চিন্তা করো না। তোমার পা ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।"


সেগুঁড়েবালি। আমার পায়ে ব্যান্ডেজ হবার জন্য সব থেকে ঝামেলা হলো বাথরুম করতে। সাহেবকে বলতে গেলে গলা কাঠ হয়ে যেত। লজ্জায় শরীর কাঁপতো। গলা থেকে স্বর বেরুতে চাইতো না। প্রথমদিন বলেছিলাম,

"মিষ্টি আপুকে একটু ডাকবেন?"


তিনি তখন মনোযোগে ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। খুব জরুরি কিছু হয়তো। তাই চোখ না তুলেই বললেন,

"হু?"

 "মিষ্টি আপুকে ডাকুন না!"


এবার তিনি চোখ তুলে চাইলেন। ভ্রু যুগল একত্রিত করে কপালে তীব্র ভাঁজ ফেলে ঠান্ডা স্বরে শুধালেন,

"কেন?"


আমার গাল লাল হয়ে গেলো। কেমন যেন হাঁসফাঁস করতে লাগলাম। পা পোঁড়ার পর থেকে শ্বাশুড়ি শুধু পেটিকোট আর ম্যাক্সি পড়তে বলেছেন। কাপড় তুলে বাথরুমের সিটে বসিয়ে দেওয়াটা খুব লজ্জাজনক একটা ঘটনা। আমি তাকে কি করে বলবো সেটা। আমার কান গরম হয়ে গেলো। হাতের ফাঁকে ওড়নাটা দলামচা করতে লাগলাম। তিনি আমার মুখের দিকে ধাঁরালো চোখে তাকিয়ে আছে। যেনো আমার উত্তরের প্রতীক্ষায় আছেন। আমি উত্তর দিলে তিনি সেই অনুযায়ী কাজ করবেন। আমার উত্তর না পেয়ে তিনি চ সূচক শব্দ করে ল্যাপটপ টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই আমার হাত ঘামতে লাগলো। তিনি ঠিক আমার সামনে দাঁড়িয়ে তার বিশাল হাত দুটো দিয়ে আমাকে পাজাকোলে তুলে নিলো। আমি টাল সামলাতে না পেরে তার গলা পেঁচিয়ে ধরলাম। চোখ বড়বড় করে দ্রুত বেগে নিঃশ্বাস ছাড়ছিলাম। বুক কাঁপছিলো আমার। তিনি একবার আমার দিকে তাকিয়ে হাটতে লাগলেন বাথরুমের দিকে। বিড়বিড় করে বললেন,

"যন্ত্রণা!"


উনার কথায় আমার মুখে কালো মেঘ নামলো। যন্ত্রণা যখন পোহাতে কেউ মাথার দিব্যি তো দেয় নি। কে বলেছে এখানে রাখতে? ছাড়বেও না আবার রাগও দেখাবে। যন্ত্রণা তো আপনি সাহেব! আপনি আস্তো যন্ত্রণা। 


*****


যন্ত্রণা তো কেবল শুরু ছিলো। মূল যন্ত্রণা হলো ঘুমানোর সময়। আমাদের খাট খুব প্রশস্থ নয়। একজনের জন্য একটু বড়। দুজনের জন্য ছোট-ই বলা যায়। ভালো করে ঘুমাতে হলে জড়াজড়ি করতে হবে। সাহেব ঘুমান উদোম গায়ে। সুঠাম শরীরটাকে নিচে ফেলে পিঠ উপরে করে ঘুমান। ফ্যান থাকে ফুলস্পিডে। তার গা থাকে ছড়ানো। প্রথম দিন আমি ঘুমাই নি। কোনো মত কোনায় গা গলিয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন আমার পায়ে ব্যান্ডেজ। সেই পায়ের নিচে থাকে বালিশ। রাত হতেই দেখলাম, সাহেব পাঞ্জাবি খুলে ফেললেন। উদোম গায়ে ঘুমানোর জন্য টানটান হয়ে শুলেন আমার পাশে। আমি নড়ে সরতে গেলেই তিনি প্রায় ধমকে উঠলেন,

 "কি হয়েছে?"


আমি কেঁপে উঠলাম। মিনমিনিয়ে বললাম,

 "এখানেই শুবেন?"

 "হ্যা? শুনি না। কি?"

 "বলছি, খাট তো একটু ছোট!"


আমার কথা শুনে তিনি এমনভাবে চাইলেন যেন আমি তার কিডনি চেয়ে বসেছি। কিছুসময় স্থির শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়েই ছিলেন। অস্বস্তিতে আমার বুক ধুকধুক করছিলো। তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়ে পড়লেন। তার মধ্যে নিচে শোবার কোনো ভাব দেখলাম না। অগত্যা আমি নিজেকে একটু গুটিয়ে নিলাম। তিনি চোখ বুজে কঠিন গলায় বললেন,

"এভাবেই থাকার অভ্যাস করতে হবে। এখন আমি রাতদুপুরে টেনে টেনে খাট বড় করতে পারবো না।"


আমি কি তাকে তাই বলেছি? অসহ্য! যা বোঝার তা না বুঝে, বুঝে খালি উলটা। ধ্যাত। আমি চোখ বুজলাম। কিছু বলতে ইচ্ছে হলো না। বলা মানেই গর্জে উঠবেন মহারাজ। কি দরকার। চোখ বুঝতেই কেমন ক্লান্তি ঢলে পড়লো চোখে। ধীরে ধীরে গাঢ় হলো রাত। নীরবতা আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো ঘরলো। ঘুম তখনও গাঢ় হয় নি আমার। হঠাৎ সুঠাম পেশীবহুল হাতের বাঁধন অনুভূতি হলো শরীরময়। গাঢ় সেই আলিঙ্গন। আমি চমকে উঠলাম। ঘুম পালিয়ে গেলো মুহূর্তেই। নড়তেই যাব অমনি ভারী, গম্ভীর স্বর কানে এলো,

"কৃপা করে না নড়লে ভালো হয়।"........


চলবে


মুশফিকা রহমান মৈথি 


[কৃপা করে লাইক এবং কমেন্ট করে সাথে থাকলে ভালো হয়। দুপুর ৩.৩০-৪ টার মধ্যেই পরবর্তী পর্ব দেবার চেষ্টা করবো]

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url