#পালিয়ে_যাওয়া_স্ত্রী
পর্ব ০৫+৬
The Story Haven
চেয়ারম্যানের নামটা শোনার পর আমার মনে হল যেন কেউ আমার মাথার ভেতর ব*জ্রপাত করেছে।
আমি অবিশ্বাসের চোখে পুলিশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“আপনি কি ঠিক শুনেছেন?” আমি ধীরে বললাম।
পুলিশ অফিসার মাথা নেড়ে বললেন,
“আমরা নিজেরাও প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। কিন্তু ব্যাগের ভেতর যে কাগজপত্র পাওয়া গেছে, সেখানে চেয়ারম্যান সাহেবের নাম বারবার এসেছে।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান, মজিবর রহমান—এই মানুষটাকে সবাই খুব সম্মান করে।
গ্রামের স্কুলের উন্নয়ন, রাস্তা মেরামত, মসজিদের কাজ—সব জায়গাতেই তার নাম শোনা যায়।
মানুষ তাকে প্রায়ই বলে “গ্রামের অভিভাবক।”
কিন্তু এখন যদি সত্যিই তিনি এই ভয়ংকর চক্রের সাথে জড়িত হন?
তাহলে বিষয়টা আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড়।
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
“আমাদের খুব সাবধানে এগোতে হবে। কারণ প্রভাবশালী লোকজন জড়িত থাকলে অনেক সময় প্রমাণ লুকানোর চেষ্টা করা হয়।”
আমি দাঁত চেপে বললাম,
“কিন্তু সত্যটা বের করতেই হবে।”
নাজমা তখনও চুপচাপ বসে ছিল।
হঠাৎ সে ধীরে বলল,
“স্যার… আমি একটা কথা বলতে চাই।”
আমরা সবাই তার দিকে তাকালাম।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“বলুন।”
নাজমা একটু দ্বিধা করল। তারপর বলল,
“যে বাড়িতে আমাকে রাখা হয়েছিল… সেখানে মাঝে মাঝে কিছু বড় বড় লোক আসত।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কেমন লোক?”
নাজমা বলল,
“তারা গাড়ি করে আসত। অনেক সময় তাদের সাথে নিরাপত্তার লোকও থাকত।”
মাহবুব সাহেব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
“তুমি কি তাদের কাউকে চিনতে পেরেছিলে?”
নাজমা মাথা নাড়ল।
“না… আমি বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরেই থাকতাম। বাইরে যেতে দিত না।”
সে একটু থামল।
তারপর ধীরে বলল,
“কিন্তু একদিন আমি একটা কণ্ঠস্বর শুনেছিলাম… যেটা খুব পরিচিত মনে হয়েছিল।”
আমার বুক আবার কেঁপে উঠল।
“কার কণ্ঠস্বর?”
নাজমা বলল,
“আমি পুরোপুরি নিশ্চিত না… কিন্তু মনে হচ্ছিল এটা আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেবের গলা।”
ঘরের ভেতর সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
“এই তথ্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
ঠিক তখনই থানার বাইরে হঠাৎ গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
একজন পুলিশ দৌড়ে এসে বলল,
“স্যার! বড় খবর!”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি হয়েছে?”
পুলিশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“আমাদের টিম রাকিবকে ধরেছে!”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কোথায়?”
“শহরের একটা বাসা থেকে।”
আমার হাত মুঠো হয়ে গেল।
এই মানুষটাই আমার জীবনের এত বড় সর্বনাশ করেছে।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“ওকে এখনই এখানে নিয়ে আসো।”
প্রায় আধা ঘণ্টা পর থানার সামনে একটা পুলিশের গাড়ি এসে থামল।
আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
দুইজন পুলিশ ধরে একজন ছেলেকে ভেতরে নিয়ে এল।
তার হাতকড়া লাগানো।
আমি তাকিয়ে দেখলাম—
সে রাকিব।
এক বছর আগের সেই আত্মবিশ্বাসী ছেলেটা যেন আর নেই।
তার মুখ শুকনো, চোখে ভয়।
আমাকে দেখেই সে হঠাৎ থেমে গেল।
আমি ধীরে ধীরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমার বুকের ভেতর তখন আগুন জ্বলছে।
আমি দাঁত চেপে বললাম,
“তুই এটা কেন করলি?”
রাকিব মাথা নিচু করে রইল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“সব সত্যি বলাই এখন তোর জন্য ভালো।”
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
“আমি একা এটা করিনি…”
আমি তীব্র গলায় বললাম,
“তাহলে কারা করেছে?”
রাকিব মাথা তুলে আমাদের দিকে তাকাল।
তার চোখে তখন ভয় স্পষ্ট।
সে ধীরে বলল,
“করিম চাচা শুধু নাম দেয়… কিন্তু আসল লোক অন্য।”
মাহবুব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
“কে?”
রাকিব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর ফিসফিস করে বলল—
“চেয়ারম্যান সাহেব।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল।
কিন্তু ঠিক তখনই রাকিব আরেকটা কথা বলল, যেটা শুনে আমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।
সে বলল,
“কিন্তু একটা কথা আপনি জানেন না…”
আমি কপাল কুঁচকে বললাম,
“কি কথা?”
রাকিব ধীরে বলল,
“নাজমাকে আমরা প্রথমে নেওয়ার পরিকল্পনা করিনি।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“মানে?”
রাকিব আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“ওই তালিকায় প্রথমে অন্য একজনের নাম ছিল… কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেই নামটা কেটে দিয়ে নাজমার নাম লেখা হয়।”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“কেন?”
রাকিব ধীরে বলল—
“কারণ চেয়ারম্যান সাহেব নিজে নাজমাকে দেখেছিলেন… আর তখনই সিদ্ধান্ত বদলে যায়।”
ঘরের ভেতর সবাই স্তব্ধ।
কারণ এখন বোঝা যাচ্ছে—
নাজমা শুধু একটা তালিকার নাম ছিল না।
সে কারো বিশেষ লক্ষ্য হয়ে গিয়েছিল।
রাকিবের মুখ থেকে শেষ কথাটা শোনার পর ঘরের ভেতর যেন এক মুহূর্তের জন্য সব শব্দ থেমে গেল।
“চেয়ারম্যান সাহেব নিজে নাজমাকে দেখেছিলেন… আর তখনই সিদ্ধান্ত বদলে যায়।”
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরটা যেন কেউ শক্ত করে চেপে ধরেছে।
আমি ধীরে বললাম,
“মানে… শুধু তাকে দেখে?”
রাকিব মাথা নিচু করে বলল,
“হ্যাঁ।”
আমার হাত মুঠো হয়ে গেল। এত বড় একটা অপরাধ, এত মানুষের জীবন নষ্ট—আর সবকিছুর শুরু শুধু কারো লোভী চোখ থেকে?
মাহবুব সাহেব কঠিন গলায় বললেন,
“সব পরিষ্কার করে বল।”
রাকিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“করিম চাচা গ্রামের খবর দিত। কোন বাড়িতে কি হচ্ছে, কারা একা থাকে, কারা সহজে ফাঁদে পড়তে পারে—সব।”
আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম।
সে বলল,
“তারপর আমরা সুযোগ বুঝে মেয়েদের শহরে নিয়ে আসতাম। বেশিরভাগ সময় মিথ্যা কথা বলে। কখনো চাকরির কথা, কখনো আত্মীয় অসুস্থ—এমন কিছু।”
নাজমা চুপচাপ বসে শুনছিল।
রাকিব বলল,
“নাজমার ক্ষেত্রেও প্রথমে অন্য একটা নাম ঠিক ছিল। কিন্তু একদিন চেয়ারম্যান সাহেব গ্রামে এসে করিম চাচার সাথে কথা বলছিলেন।”
সে একটু থামল।
তারপর বলল,
“সেদিন নাজমা উঠোনে কাপড় শুকাচ্ছিল।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
রাকিব বলল,
“চেয়ারম্যান সাহেব তাকে দেখে করিম চাচাকে আলাদা করে কিছু বলেছিলেন। পরে করিম চাচা আমাকে ফোন করে বলল—তালিকা বদলাতে হবে।”
আমার মাথা নিচু হয়ে গেল।
এইসব কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল আমার পুরো পৃথিবী ভেঙে পড়ছে।
ঠিক তখনই থানার ভেতরে আবার হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ শুরু হল।
একজন পুলিশ দ্রুত ঘরে ঢুকে বলল,
“স্যার!”
মাহবুব সাহেব তাকালেন।
“কি হয়েছে?”
পুলিশ বলল,
“করিম উদ্দিনকে আমরা ধরেছি!”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“কোথায়?”
“হাইওয়ের কাছে একটা লরির ভেতরে লুকিয়ে ছিল।”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“ওকে এখানে নিয়ে আসো।”
কিছুক্ষণ পর থানার সামনে আবার পুলিশের গাড়ি এসে থামল।
দুজন কনস্টেবল ধরে একজন বৃদ্ধ লোককে ভেতরে নিয়ে এল।
আমি তাকিয়ে দেখলাম—
করিম চাচা।
তার মুখে তখন ভয় স্পষ্ট। আমাকে দেখেই সে থেমে গেল।
আমাদের চোখে চোখ পড়তেই সে হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে নিল।
আমি ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“চাচা…”
আমার গলা ভারী হয়ে গিয়েছিল।
“আপনি এটা কিভাবে করলেন?”
তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।
মাহবুব সাহেব কঠোর গলায় বললেন,
“সব সত্যি বলবেন। না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
করিম চাচা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“আমি একা কিছু করিনি।”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আমরা জানি। কিন্তু শুরুটা আপনার থেকেই।”
তিনি মাথা নিচু করে বললেন,
“আমি শুধু নাম দিতাম… বাকিটা তারা করত।”
আমি অবিশ্বাসের চোখে তাকালাম।
“আপনি জানতেন কি হতে পারে তাদের সাথে?”
করিম চাচা ধীরে বললেন,
“শুরুতে ভাবিনি ব্যাপারটা এত দূর যাবে।”
আমি রাগে কাঁপতে লাগলাম।
“মিথ্যা বলবেন না!”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“চেয়ারম্যানের সাথে আপনার সম্পর্ক কি?”
করিম চাচা প্রথমে কিছু বললেন না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,
“সব কাজ তার ইশারায় হত।”
ঘরের ভেতর সবাই আবার স্তব্ধ হয়ে গেল।
“মানে?” মাহবুব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
করিম চাচা বললেন,
“আমি শুধু গ্রামের খবর দিতাম। রাকিব মেয়েদের নিয়ে আসত। আর শহরের লোকজন… তারা সব সামলাত।”
আমি দাঁড়িয়ে শুনছিলাম।
মনে হচ্ছিল এই মানুষটাকে আমি কখনো চিনতেই পারিনি।
ঠিক তখনই থানার বাইরে আবার গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
একজন পুলিশ দ্রুত এসে বলল,
“স্যার, চেয়ারম্যান সাহেব থানায় এসেছেন।”
ঘরের ভেতর সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“তিনি কেন এসেছেন?”
পুলিশ বলল,
“তিনি বলছেন—এই মামলার ব্যাপারে কথা বলতে চান।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
কিছুক্ষণ পর দরজার সামনে একজন মানুষ এসে দাঁড়াল।
সাদা পাঞ্জাবি, গম্ভীর মুখ।
গ্রামের চেয়ারম্যান।
তিনি ভেতরে ঢুকে চারদিকে তাকালেন।
তারপর শান্ত গলায় বললেন,
“আমি শুনেছি আমার নাম এখানে জড়ানো হচ্ছে।”
ঘরের ভেতর তখন নিঃশব্দ উত্তেজনা।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আমাদের কিছু প্রশ্ন আছে।”
চেয়ারম্যান ধীরে হাসলেন।
“প্রশ্ন করতে পারেন।”
কিন্তু ঠিক তখনই রাকিব হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
“স্যার, সাবধানে থাকবেন!”
সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
“এই মানুষটা খুব বিপজ্জনক… কারণ—”
সে বাকিটা বলার আগেই চেয়ারম্যানের চোখে এমন একটা ঠান্ডা দৃষ্টি দেখা গেল, যেটা দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল।
মনে হচ্ছিল…
চলবে..?#পালিয়ে_যাওয়া_স্ত্রী
পর্ব ৬
রাকিব হঠাৎ চিৎকার করে বলার পর ঘরের ভেতর সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“স্যার, সাবধানে থাকবেন!”
তার গলায় এমন ভয় ছিল যে মুহূর্তের জন্য সবাই থেমে গেল।
মাহবুব সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কেন? কি বলতে চাইছ?”
রাকিব কাঁপা গলায় বলল,
“এই মানুষটা খুব শক্তিশালী… অনেক বড় বড় লোক তার সাথে জড়িত। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে সে ছাড়ে না।”
ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা চেয়ারম্যান তখন ধীরে ধীরে হাসলেন।
একটা ঠান্ডা, আত্মবিশ্বাসী হাসি।
তিনি বললেন,
“দেখছেন তো স্যার? অপরাধীরা ধরা পড়লে এমন গল্পই বানায়।”
তার গলা খুব শান্ত, কিন্তু কথার ভেতরে একটা অদ্ভুত চাপা শক্তি ছিল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আপনার নাম কিছু কাগজপত্রে পাওয়া গেছে।”
চেয়ারম্যান ধীরে বললেন,
“কাগজে তো অনেক কিছুই লেখা থাকতে পারে। তাতে সত্যি প্রমাণ হয় না।”
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলাম।
আমার বুকের ভেতর তখন রাগ আর অপমান জমে উঠছে।
আমি হঠাৎ বলে ফেললাম,
“আপনি নাজমাকে চিনেন?”
চেয়ারম্যান প্রথমবারের মতো আমার দিকে তাকালেন।
তার চোখে তখন অদ্ভুত একটা দৃষ্টি।
তিনি বললেন,
“গ্রামের মানুষ তো অনেককেই চিনি।”
আমি দাঁত চেপে বললাম,
“আপনি কি তাকে ওই জায়গায় পাঠানোর সাথে জড়িত?”
ঘরের ভেতর হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল।
চেয়ারম্যান কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর শান্তভাবে বললেন,
“তোমার আবেগ আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু অভিযোগ করার আগে প্রমাণ লাগে।”
মাহবুব সাহেব তখন টেবিলের ওপর খাতাটা রাখলেন।
“এই খাতাটা করিম উদ্দিনের বাড়ি থেকে পাওয়া গেছে।”
চেয়ারম্যান একবার খাতার দিকে তাকালেন।
তার মুখের ভাব বদলাল না।
“এই খাতার সাথে আমার কি সম্পর্ক?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“এই তালিকায় যেসব মেয়ের নাম আছে, তাদের কয়েকজনের বিষয়ে ইতিমধ্যে আমরা তথ্য পেয়েছি।”
চেয়ারম্যান এবার একটু গম্ভীর হলেন।
“তাতে?”
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
“আর এই কাগজে আপনার নাম আছে।”
তিনি টেবিলের ওপর আরেকটা কাগজ রাখলেন।
চেয়ারম্যান কাগজটা হাতে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দেখলেন।
তারপর হালকা হাসলেন।
“এটা তো ফোন নম্বরের তালিকা। আমার নম্বর অনেকের কাছেই থাকতে পারে।”
ঘরের ভেতর আবার চাপা উত্তেজনা।
ঠিক তখন করিম চাচা হঠাৎ বললেন,
“স্যার… আমি একটা কথা বলব।”
সবাই তার দিকে তাকাল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“বলুন।”
করিম চাচা কাঁপা গলায় বললেন,
“সব কাজ তার কথাতেই হত।”
চেয়ারম্যান এবার প্রথমবারের মতো একটু বিরক্ত হলেন।
“কি আজেবাজে কথা বলছ?”
করিম চাচা মাথা নিচু করে বললেন,
“আমি মিথ্যা বলছি না।”
তার গলা কাঁপছিল।
“মেয়েদের নাম আমি দিতাম… কিন্তু কোথায় পাঠানো হবে, সেটা চেয়ারম্যান সাহেব ঠিক করতেন।”
ঘরের ভেতর আবার নিস্তব্ধতা।
চেয়ারম্যান এবার ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন।
তিনি করিম চাচার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
“তুমি বুঝে কথা বলছ তো?”
তার গলায় একটা চাপা হুমকি স্পষ্ট ছিল।
কিন্তু করিম চাচা এবার মাথা তুলে বললেন,
“আমি আর মিথ্যা বলতে চাই না।”
তার চোখে তখন ভয় থাকলেও একটা ক্লান্তি ছিল।
মাহবুব সাহেব শান্তভাবে বললেন,
“আপনার কথা আমরা রেকর্ড করছি।”
চেয়ারম্যান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে হেসে বললেন,
“আপনারা মনে করছেন আমি এসবের সাথে জড়িত?”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আমরা তদন্ত করছি।”
চেয়ারম্যান বললেন,
“তদন্ত করুন।”
তারপর তিনি হঠাৎ আমার দিকে তাকালেন।
“তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে যাও। নতুন করে জীবন শুরু করো। এসব ঝামেলায় জড়িও না।”
তার কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলে উঠল।
আমি বুঝতে পারছিলাম—এটা শুধু উপদেশ না।
এটা একটা সতর্কবার্তা।
ঠিক তখনই থানার বাইরে হঠাৎ আবার হৈচৈ শুরু হল।
একজন পুলিশ দৌড়ে এসে বলল,
“স্যার! শহরের ওই বাড়িতে আবার অভিযান চালানো হয়েছে!”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি পাওয়া গেছে?”
পুলিশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ওই জায়গা থেকে কিছু কাগজপত্র আর একটা ভিডিও রেকর্ডিং পাওয়া গেছে।”
ঘরের ভেতর সবাই চুপ।
মাহবুব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
“ভিডিওতে কি আছে?”
পুলিশ ধীরে বলল,
“ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে… কয়েকজন বড় লোক ওই বাড়িতে আসা–যাওয়া করছে।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“তাতে কি চেয়ারম্যানের চেহারা আছে?”
পুলিশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
“স্যার… শুধু চেয়ারম্যান না…”
ঘরের ভেতর সবাই অপেক্ষা করছে।
পুলিশ ধীরে বলল,
“ভিডিওতে আরও একজনকে দেখা গেছে… যাকে দেখে আমরা সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কে?”
পুলিশ অফিসার ধীরে উত্তর দিল—
“আপনার খুব কাছের একজন মানুষ।”
আমার মনে তখন একের পর এক মুখ ভেসে উঠতে লাগল।
গ্রামের বন্ধু… আত্মীয়… পরিচিত মানুষ…
আমি কাঁপা গলায় বললাম,
“নামটা বলুন।”
পুলিশ অফিসার ধীরে আমার দিকে তাকাল।
তারপর বলল—
“আপনার ছোট চাচাতো ভাই… নাসিম।”
আমার মনে হল যেন মাটিটা পায়ের নিচ থেকে সরে গেল।
“নাসিম?”
আমি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলাম।
নাসিম আমার চাচাতো ভাই হলেও প্রায় ছোট ভাইয়ের মতোই ছিল। ছোটবেলা থেকে আমরা একসাথে বড় হয়েছি।
আমি তাকে নিজের ঘরেও অনেকবার এনেছি।
নাজমার সাথেও তার পরিচয় ছিল।
আমি ফিসফিস করে বললাম,
“এটা হতে পারে না…”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“ভিডিওটা এখনো পুরোপুরি পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রথম দেখে মনে হচ্ছে সে ওই বাড়িতে কয়েকবার গেছে।”
আমার মাথা ঘুরে উঠল।
নাজমাও বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে ধীরে বলল,
“নাসিম তো প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসত…”
আমি মাথা নিচু করে বসে পড়লাম।
হঠাৎ অনেক ছোট ছোট ঘটনা মনে পড়তে লাগল।
নাসিম প্রায়ই হঠাৎ করে আমাদের বাড়িতে চলে আসত।
কখনো বলত, “ভাইয়া, একটু বসতে এলাম।”
কখনো বলত, “ভাবির রান্না খেতে ইচ্ছে করছে।”
আমি তখন এসব খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম।
কিন্তু এখন মনে হচ্ছে—
সে কি আমাদের ঘরটা নজর রাখছিল?
ঠিক তখনই থানার বাইরে আবার ফোন বেজে উঠল।
একজন পুলিশ ফোন ধরে কয়েক সেকেন্ড কথা বলল।
তারপর সে দ্রুত মাহবুব সাহেবের দিকে তাকাল।
“স্যার… নতুন খবর এসেছে।”
“কি খবর?”
“আমাদের টিম নাসিমের বাড়িতে গিয়েছিল।”
আমার বুক ধক করে উঠল।
“সে কি সেখানে আছে?”
পুলিশ মাথা নাড়ল।
“না… সে বাড়িতে নেই।”
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
“তাহলে?”
পুলিশ বলল,
“তার পরিবার বলছে সে গতকাল রাত থেকেই নিখোঁজ।”
মাহবুব সাহেব ধীরে বললেন,
“মানে খবরটা হয়তো তার কানেও পৌঁছে গেছে।”
ঘরের ভেতর আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই নাজমা হঠাৎ খুব আস্তে বলল,
“আমি একটা কথা মনে করতে পারছি…”
আমরা সবাই তার দিকে তাকালাম।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি কথা?”
নাজমা একটু ভাবল।
তারপর বলল,
“যে বাড়িতে আমাকে রাখা হয়েছিল… সেখানে একদিন একজন ছেলে এসেছিল।”
“কেমন ছেলে?”
নাজমা বলল,
“আমি পুরো মুখটা দেখতে পাইনি… কিন্তু তার গলার আওয়াজ খুব পরিচিত লাগছিল কিন্তু আমি তাকে দেখতে পারি নাই আমি অনেক চেষ্টা করছি তাকে দেখার জন্য। আমি চিৎকার করছি যাতে আমার পরিচিত হলে আমাকে ওখান থেকে বের করতে পারে ।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম ।
নাজমা বলল,
“সে রাকিবকে বলছিল—‘গ্রামের খবর ঠিকমতো দিস। কেউ যেন সন্দেহ না করে।’”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি ফিসফিস করে বললাম,
“তুমি কি মনে করো সে নাসিম ছিল?”
নাজমা ধীরে বলল,
“আমি নিশ্চিত না… কিন্তু গলাটা অনেকটা তার মতোই ছিল।”
ঘরের ভেতর আবার নীরবতা।
মাহবুব সাহেব বললেন,
“আমাদের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হল নাসিমকে খুঁজে বের করা।”
ঠিক তখনই থানার বাইরে হঠাৎ একটা মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা গেল।
একজন লোক দৌড়ে ভেতরে ঢুকে বলল,
“স্যার!”
মাহবুব সাহেব বললেন,
“কি হয়েছে?”
লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“হাইওয়ের কাছে একটা দুর্ঘ**টনা হয়েছে।”
“তাতে কি?”
লোকটা বলল,
“দুর্ঘট**নায় একজন গুরুতর আহত হয়েছে… আর তার পকেটে যে আইডি কার্ড পাওয়া গেছে—”
“কার?”
লোকটা ধীরে বলল—
“নাসিমের।”
ঘরের ভেতর সবাই এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ এখন প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়াল—
নাসিম কি সত্যিই পালাচ্ছিল?
নাকি কেউ তাকে চুপ করিয়ে দিতে চাইছিল?
চলবে..
